ভগবদ্গীতা ১৮.১৭ — অহংকারমুক্ত কর্তা, কর্মবন্ধন ও কর্মের অন্তর্নিহিত স্বাধীনতার তত্ত্ব
যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে।
হত্বাপি স ইমাল্লোকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।১৭।।
অনুবাদঃ যাঁর অহঙ্কারের ভাব নেই এবং যাঁর বুদ্ধি কর্মফলে লিপ্ত হয় না, তিনি এই সমস্ত প্রাণীকে হত্যা করেও হত্যা করেন না এবং হত্যার কর্মফলে আবদ্ধ হন না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোকটি মানুষের কর্ম, অহংকার, বুদ্ধি, দায়িত্ব এবং কর্মবন্ধনের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। শ্লোকটি হলো “যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে। হত্বাপি স ইমাল্লোকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।” এর সরল অর্থ হলো, যার মধ্যে আমি কর্তা এই অহংকারজাত ভাব নেই এবং যার বুদ্ধি কর্মের দ্বারা লিপ্ত হয় না, সে সমস্ত লোককে হত্যা করলেও প্রকৃত অর্থে হত্যা করে না এবং কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। প্রথম দর্শনে এই বক্তব্য বিস্ময়কর এবং আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী মনে হয়। কিন্তু গীতার কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ এবং আত্মতত্ত্বের আলোকে বিচার করলে বোঝা যায় যে এখানে বাহ্যিক কর্মের চেয়ে কর্তার অন্তর্গত চেতনা এবং কর্মের সঙ্গে তার আত্মপরিচয়ের সম্পর্ককে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “যস্য”। সংস্কৃত “যৎ” সর্বনাম থেকে উৎপন্ন এই শব্দের অর্থ হলো যার। শ্লোকে এটি সেই ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে যার অন্তরে একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরপর এসেছে “নাহংকৃতো ভাবো”। এখানে “অহং” অর্থ আমি এবং “কৃত” শব্দটি সংস্কৃত √কৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। তাই অহংকৃত ভাব বলতে বোঝায় আমি করেছি অথবা আমি কর্তা এই ধারণা দ্বারা নির্মিত অন্তর্গত মানসিক অবস্থা। এখানে অহংকার বলতে সাধারণ আত্মপরিচয় বোঝানো হয় না। মানুষ হিসেবে আমি আছি এই স্বাভাবিক সচেতনতা অহংকার নয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন মানুষ মনে করে আমি একাই সবকিছুর কর্তা, আমার ইচ্ছাতেই সবকিছু ঘটে এবং কর্মের সম্পূর্ণ অধিকার ও ফল আমার নিজের। গীতার দৃষ্টিতে এই কর্তা ভাবই বন্ধনের অন্যতম প্রধান কারণ।
“ভাব” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √ভূ ধাতু থেকে। √ভূ ধাতুর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা পরিণত হওয়া। সেই অর্থে ভাব শুধু আবেগ নয়, বরং কোনো একটি অন্তর্গত অবস্থা বা চেতনার রূপ। “অহংকৃত ভাব” তাই এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি নিজের কর্মের সঙ্গে নিজের অহংকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করে ফেলে। সে মনে করে কাজটি শুধু তার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এবং তার সাফল্য বা ব্যর্থতার সম্পূর্ণ পরিচয়ও তার নিজের সঙ্গে যুক্ত। এই অবস্থার বিপরীতে গীতা এমন এক চেতনার কথা বলছে যেখানে মানুষ নিজের কর্তব্য সম্পাদন করে কিন্তু নিজেকে সর্বস্বাধীন এবং সর্বময় কর্তা বলে মনে করে না।
এই প্রসঙ্গে “বুদ্ধি” শব্দটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। বুদ্ধি এসেছে সংস্কৃত √বুধ ধাতু থেকে। এই ধাতুর অর্থ জাগা, জানা, উপলব্ধি করা বা সচেতন হওয়া। তাই বুদ্ধি শুধু তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা নয়। গীতার ভাষায় বুদ্ধি হলো বিচার করার ক্ষমতা, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য উপলব্ধি করার শক্তি এবং জীবনের গভীর বাস্তবতাকে চিনতে পারার অন্তর্দৃষ্টি। “বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে” অর্থ হলো যার বুদ্ধি লিপ্ত হয় না। এখানে “লিপ্যতে” শব্দটি এসেছে √লিপ ধাতু থেকে যার অর্থ লেপা, মাখা বা কোনো কিছুর দ্বারা আবৃত হওয়া। এই শব্দটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতীক বহন করে। যেমন পরিষ্কার কাপড়ে কালি লাগলে তার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়, তেমনই অহংকার, আসক্তি, লোভ, প্রতিহিংসা এবং ফলের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়ে গেলে মানুষের বিচারশক্তি কলুষিত হয়। কিন্তু জ্ঞানীর বুদ্ধি কর্মের ফলের সঙ্গে এমনভাবে লেপ্টে থাকে না যে তার আত্মপরিচয় সেই ফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই অবস্থাকে বোঝার জন্য কর্ম এবং কর্মবন্ধনের মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। মানুষ যতদিন জীবিত থাকে ততদিন কোনো না কোনোভাবে কর্ম করতেই হয়। কথা বলা, চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সংসারের দায়িত্ব পালন করা এবং সমাজে নিজের ভূমিকা পালন করা সবই কর্মের অন্তর্ভুক্ত। তাই গীতার শিক্ষা কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা নয়। বরং কর্ম করার সময় মানুষের অন্তরের অবস্থাকে শুদ্ধ করার শিক্ষা। যখন কর্মের সঙ্গে অহংকার এবং ফলের প্রতি আসক্তি যুক্ত হয় তখন কর্ম মানুষের জন্য বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন মানুষ নিজের কর্তব্য যথাসাধ্য সম্পাদন করে এবং কর্মের ফলকে নিজের অহংকারের পরিচয় বানিয়ে ফেলে না তখন সেই কর্ম মুক্তির পথেও পরিণত হতে পারে।
শ্লোকটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো “হত্বাপি স ইমাল্লোকান্ন হন্তি”। “হত্বা” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √হন ধাতু থেকে যার অর্থ হত্যা করা বা আঘাত করা। “অপি” অর্থ এমনকি বা করেও। ফলে “হত্বাপি” অর্থ দাঁড়ায় হত্যা করেও। এরপর বলা হয়েছে “ন হন্তি” অর্থ হত্যা করে না। এখানে একটি গভীর বিরোধাভাস সৃষ্টি হয়েছে। বাহ্যিকভাবে হত্যা সংঘটিত হলেও কীভাবে বলা যায় যে সে হত্যা করে না। এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে গীতার আলোচনার পরিপ্রেক্ষিত মনে রাখতে হবে। গীতা রচিত হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকটকে কেন্দ্র করে। অর্জুনের সামনে নিজের আত্মীয়, গুরু এবং প্রিয়জনরা ছিলেন। তিনি ভাবছিলেন যুদ্ধ করলে তিনি তাদের হত্যা করবেন এবং সেই কর্মের পাপ তাঁকে আবদ্ধ করবে। কৃষ্ণ এই সংকটের মধ্যে কর্ম, আত্মা, কর্তব্য এবং অহংকারের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন।
“হত্যা করেও হত্যা করে না” কথাটিকে তাই সাধারণ নৈতিক অনুমতি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এর অর্থ এই নয় যে অহংকারহীনতার দাবি করে কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করতে পারে। বরং এর গভীর অর্থ হলো আত্মজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি নিজের আত্মাকে দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং অহংকারের সমস্ত কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখেন না। তিনি উপলব্ধি করেন যে দেহ এবং প্রকৃতির স্তরে কর্ম সংঘটিত হয়, কিন্তু আত্মার পরম স্বরূপ সেই কর্মের দ্বারা কলুষিত হয় না। এই উপলব্ধিই তাকে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।
এই বক্তব্যের সঙ্গে “ন নিবধ্যতে” শব্দটি সরাসরি যুক্ত। “নিবধ্যতে” এসেছে সংস্কৃত √বন্ধ ধাতু থেকে যার অর্থ বাঁধা। তাই ন নিবধ্যতে অর্থ হলো আবদ্ধ হয় না। এখানে বন্ধন বলতে কোনো বাহ্যিক দড়ি বা শারীরিক বন্ধন বোঝানো হয় না। এটি কর্মবন্ধন। মানুষ একটি কাজ করে, কাজের ফল লাভ করে, সেই ফলের প্রতি আসক্ত হয়, আবার নতুন ফলের আকাঙ্ক্ষায় কর্ম করে এবং এভাবে আকাঙ্ক্ষা ও কর্মের একটি ধারাবাহিক চক্রের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। গীতার দর্শনে এই বন্ধনই সংসারের বন্ধন। জ্ঞানী ব্যক্তি এই চক্রের মধ্যে কর্ম করলেও কর্মফলকে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেন না। তাই কর্ম তাকে আগের মতো আবদ্ধ করতে পারে না।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত সমস্যা কর্ম নয়, বরং কর্মের সঙ্গে তার অহংকারপূর্ণ সম্পর্ক। একজন ব্যক্তি কাজ করে যদি মনে করেন এই কাজের সম্পূর্ণ কর্তা আমি, এর সাফল্য আমার, এর ব্যর্থতাও আমার, এর ফল আমার এবং আমার মূল্য এই ফলের ওপর নির্ভরশীল, তাহলে তার মন কর্মের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হবে। কিন্তু অন্য একজন একই কাজ করে যদি মনে করেন আমি আমার কর্তব্য যথাসাধ্য পালন করছি, কিন্তু সমস্ত পরিস্থিতি এবং ফল আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, তাহলে তার অন্তরের অবস্থাটি সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। গীতার কর্মযোগ এই দ্বিতীয় অবস্থার দিকে মানুষকে নিয়ে যেতে চায়।
এই শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষক নিজের ছাত্রদের শিক্ষা দেন। যদি তিনি মনে করেন ছাত্রের প্রতিটি সাফল্য তার ব্যক্তিগত কৃতিত্ব এবং প্রতিটি ব্যর্থতা তার ব্যক্তিগত অপমান, তাহলে তার মধ্যে অতিরিক্ত অহংকার ও হতাশা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি তিনি আন্তরিকভাবে শিক্ষা দেওয়াকে নিজের কর্তব্য মনে করেন এবং নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করেন, তবে ছাত্রের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই এই সত্যটিও গ্রহণ করতে পারেন। একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন। তিনি নিজের জ্ঞান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু জীবনের প্রতিটি ফল তার হাতে নেই। একজন অভিভাবক সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সন্তানকে নিজের সম্পত্তি মনে করলে ভালোবাসার সঙ্গে অধিকারবোধ মিশে যায়। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে কর্মের সঙ্গে অহংকারের সম্পর্কই মানুষের মানসিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই শ্লোককে অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে দেখলে এর অর্থ আরও গভীর হয়। অদ্বৈত বেদান্তের মতে আত্মা মূলত অকর্তা এবং অভোক্তা। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির স্তরে নানা কর্ম সংঘটিত হয়, কিন্তু আত্মার প্রকৃত স্বরূপ সেই পরিবর্তনশীল কর্মজগতের অতীত। অজ্ঞতার কারণে মানুষ দেহ ও আত্মাকে এক মনে করে এবং দেহের কর্মকে নিজের কর্ম বলে গ্রহণ করে। তখন জন্ম নেয় আমি কর্তা এই অহংকার। আত্মজ্ঞান উদয় হলে এই ভুল পরিচয় দূর হয়। তখন ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে যে চৈতন্য সব অভিজ্ঞতার সাক্ষী, তাকে কোনো বাহ্যিক কর্মের সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না।
সাংখ্য দর্শনের আলোতেও এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ দ্রষ্টা এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল কার্যপ্রবাহের মূল। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন এবং বুদ্ধি প্রকৃতির অন্তর্গত। প্রকৃতির গুণসমূহের মাধ্যমে নানা কর্ম সংঘটিত হয়। কিন্তু অবিদ্যার কারণে পুরুষ নিজেকে প্রকৃতির কর্মের সঙ্গে এক করে দেখে। তখন সৃষ্টি হয় কর্তা ভাব। জ্ঞান উদয় হলে এই ভ্রান্ত পরিচয় ধীরে ধীরে দূর হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে “নাহংকৃতো ভাবঃ” হলো প্রকৃতির কার্যকে আত্মার সঙ্গে ভুলভাবে এক করে না দেখার শিক্ষা।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের দুঃখের একটি বড় কারণ হলো নিজের পরিচয়কে বাহ্যিক সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত করা। মানুষ বলে আমি ব্যর্থ হয়েছি, আমি অপমানিত হয়েছি, আমি হেরে গেছি অথবা আমি সবকিছু করেছি। এই আমি কেন্দ্রিকতা যত তীব্র হয় ততই মানসিক চাপ ও অস্থিরতা বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে যদি মানুষ নিজের কর্তব্য এবং প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেয় কিন্তু প্রতিটি ফলকে নিজের অহংকারের মাপকাঠি না বানায়, তাহলে তার মধ্যে একটি পরিণত মানসিক স্বাধীনতা তৈরি হতে পারে। এই অর্থে গীতার অহংকারবর্জন আত্মসম্মানহীনতা নয়। এটি নিজেকে ছোট করা নয়। বরং নিজের পরিচয়কে সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রশংসা এবং নিন্দার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করার একটি প্রচেষ্টা।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত শক্তিশালী। এখানে অহংকার হলো মিথ্যা কর্তার প্রতীক। বুদ্ধি হলো অন্তর্দৃষ্টি এবং সত্য উপলব্ধির প্রতীক। লিপ্ত হওয়া হলো কর্মের সংস্কার ও ফলের দ্বারা চেতনার আবৃত হয়ে যাওয়ার প্রতীক। আর বন্ধন হলো সংসারচক্রের প্রতীক। মানুষ যখন মনে করে আমি কর্তা, তখন কর্মের ফলের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে আসে আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে ভয় ও হতাশা। আবার সেই আকাঙ্ক্ষা নতুন কর্মের জন্ম দেয়। এইভাবে মানুষ নিজের তৈরি মানসিক বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ হতে থাকে। গীতার শিক্ষা হলো এই চক্রের মূলস্থানে থাকা অহংকারকে চিনতে শেখা।
এই কারণে “নাহংকৃতো ভাবঃ” এবং “বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে” এই দুটি অংশকে একসঙ্গে দেখতে হয়। শুধু অহংকারহীনতার দাবি যথেষ্ট নয়। বুদ্ধিরও শুদ্ধি প্রয়োজন। কারণ মানুষ মুখে বলতে পারে আমি অহংকার করি না, কিন্তু নিজের কাজের প্রশংসা, নিজের মতের প্রতিষ্ঠা এবং নিজের ফলের প্রতি গভীর আসক্তি থেকে যেতে পারে। সত্যিকারের অহংকারবর্জন তখনই সম্ভব যখন বুদ্ধি কর্মের প্রকৃতি, আত্মার প্রকৃতি এবং ফলের অনিশ্চয়তা সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন হয়। তখন কর্ম চলে, কিন্তু কর্মের সঙ্গে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় জুড়ে যায় না।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অনন্য। “হত্বাপি” এবং “ন হন্তি” শব্দের পাশাপাশি অবস্থান একটি গভীর বিরোধাভাস সৃষ্টি করেছে। এই বিরোধাভাস পাঠককে বাহ্যিক অর্থের সীমা অতিক্রম করে গভীর অর্থ অনুসন্ধান করতে বাধ্য করে। হত্যা করেও হত্যা করে না এই বাক্যটি আসলে প্রশ্ন তোলে মানুষের প্রকৃত কর্তা কে, আত্মা কী, দেহের কর্মের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক কী এবং কর্মের বন্ধন কোথায় সৃষ্টি হয়। এভাবেই একটি ছোট শ্লোক মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক বিশাল দার্শনিক প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়।
তবে এই শ্লোকের শিক্ষা গ্রহণের সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। অহংকারহীনতার অর্থ দায়িত্বহীনতা নয়। আমি কর্তা নই বলে আমি যা খুশি করতে পারি এমন ধারণা গীতার শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। অহংকার ত্যাগ করতে হবে, কিন্তু কর্তব্য ত্যাগ করতে হবে না। ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করতে হবে, কিন্তু সৎ প্রচেষ্টা ত্যাগ করতে হবে না। ব্যক্তিগত অহংকার ত্যাগ করতে হবে, কিন্তু নৈতিক বিবেচনা ত্যাগ করা যাবে না। এই ভারসাম্যই গীতার কর্মযোগের অন্যতম সৌন্দর্য।
সমগ্র শ্লোকটিকে একটি গভীর অন্তর্জাগতিক যাত্রা হিসেবে দেখা যায়। প্রথমে আছে অহংকার, যেখানে মানুষ বলে আমি কর্তা। এরপর আছে কর্ম, যেখানে সে নিজের কাজকে নিজের পরিচয়ের অংশ বানায়। তারপর আছে ফলের আকাঙ্ক্ষা, যা তাকে সুখ ও দুঃখের মধ্যে দোলাতে থাকে। এরপর কর্মের ছাপ তার বুদ্ধিকে আবৃত করে এবং শেষ পর্যন্ত সে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এর বিপরীত পথে জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের কর্তা ভাবকে পরীক্ষা করেন, বুদ্ধিকে শুদ্ধ করেন, কর্তব্য পালন করেন, ফলের প্রতি আসক্তি কমান এবং ধীরে ধীরে কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে এগিয়ে যান।
অতএব “যস্য নাহংকৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে” কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের আত্মপরিচয়, কর্মপ্রবণতা, অহংকার, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক বক্তব্য। শব্দতাত্ত্বিকভাবে এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ একটি বিশেষ ধারণাকে ধারণ করে। অহং আমাদের আমি বোধের দিকে নিয়ে যায়, কৃত আমাদের কর্তার ধারণার দিকে নিয়ে যায়, ভাব আমাদের অন্তর্গত অবস্থার কথা বলে, বুদ্ধি আমাদের বিচার ও জ্ঞানের কথা বলে, লিপ্যতে কর্মের ছাপের কথা বলে এবং নিবধ্যতে কর্মবন্ধনের কথা প্রকাশ করে। এই শব্দগুলো একত্রে মানুষের বন্ধন ও মুক্তির একটি সূক্ষ্ম মানচিত্র তৈরি করে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং কর্মের মধ্যে থেকেও অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করা। মানুষ কর্ম করবে, কর্তব্য পালন করবে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু নিজের অহংকারকে সেই কর্মের একমাত্র কেন্দ্র বানাবে না। সে বুঝবে যে জীবনের প্রতিটি ঘটনা তার একার ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না। সে ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তির পরিবর্তে কর্তব্য ও সত্যের প্রতি প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন কর্ম তার জন্য শুধু বন্ধনের কারণ হবে না, বরং আত্মজ্ঞান ও অন্তরের পরিশুদ্ধির পথ হয়ে উঠতে পারে। এই অর্থে শ্লোকটির গভীরতম বার্তা হলো, মানুষের মুক্তি কর্মহীনতায় নয়, বরং অহংকারহীন কর্মে। যে ব্যক্তি নিজের কর্মের মধ্যে থেকেও নিজের অন্তর্গত আত্মস্বরূপকে কর্মের ঊর্ধ্বে উপলব্ধি করতে পারে, তার জন্য কর্ম আর শৃঙ্খল থাকে না। তখন কর্ম হয়ে ওঠে সাধনা, কর্তব্য হয়ে ওঠে আত্মশুদ্ধির পথ এবং জীবন নিজেই হয়ে ওঠে আত্মজ্ঞান লাভের একটি মহান ক্ষেত্র।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!