সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.১৮ — জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা: কর্মপ্রেরণা ও কর্মসংগ্রহের ত্রিবিধ তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।কারণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।১৮।।
জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।
কারণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।১৮।।

অনুবাদঃ জ্ঞান, জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা- এই তিনটি কর্মের প্রেরণা, করণ, কর্ম ও কর্তা-এই তিনটি কর্মের আশ্রয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের জ্ঞান ও কর্মের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো “জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা। কারণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।” এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি, জ্ঞান, প্রেরণা এবং কর্মের একটি সম্পূর্ণ দার্শনিক কাঠামো প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ হঠাৎ করে কোনো কাজ করে না। তার কাজের পেছনে থাকে কোনো উপলব্ধি, কোনো জ্ঞানের ভিত্তি, কোনো উদ্দেশ্য এবং কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মানসিক প্রেরণা। সেই কারণে এই শ্লোক কেবল কর্মের বাহ্যিক রূপ নিয়ে আলোচনা করে না, বরং কর্মের অন্তর্নিহিত উৎস কোথায় এবং কীভাবে জ্ঞান থেকে কর্মের জন্ম হয়, সেই গভীর সত্যকে তুলে ধরে।

“জ্ঞানং” শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞান শব্দ থেকে এসেছে এবং এর মূল ধাতু হলো √জ্ঞা। এই ধাতুর অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা কোনো বিষয় সম্পর্কে বোধ লাভ করা। জ্ঞান বলতে কেবল কোনো তথ্য মুখস্থ করাকে বোঝায় না। প্রকৃত জ্ঞান হলো কোনো বিষয়কে যথাযথভাবে বোঝা এবং তার প্রকৃতি সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি অর্জন করা। মানুষের জীবনে জ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষ তার জ্ঞান ও উপলব্ধির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। একজন মানুষ যদি কোনো বিষয় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করে, তবে তার কর্মও সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। আবার ভুল জ্ঞান বা অসম্পূর্ণ জ্ঞান অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত ও ভুল কর্মের জন্ম দিতে পারে। তাই মানুষের কর্মের গুণমান অনেকাংশে তার জ্ঞানের গুণমানের ওপর নির্ভর করে।

“জ্ঞেয়ং” শব্দটিও √জ্ঞা ধাতু থেকে উৎপন্ন। জ্ঞেয় অর্থ হলো যা জানা যায়, যা জানার বিষয় অথবা যাকে জানা উচিত। জ্ঞান কখনো শূন্যে অবস্থান করে না। কোনো কিছু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয় এবং সেই কোনো কিছুই হলো জ্ঞেয়। যেমন একজন শিক্ষার্থী যখন একটি বই পড়ে, তখন শিক্ষার্থী হলো জ্ঞাতা এবং বইয়ের বিষয়বস্তু হলো জ্ঞেয়। সেই বিষয়বস্তু সম্পর্কে যে উপলব্ধি তার মনে তৈরি হয় সেটিই জ্ঞান। এইভাবে জ্ঞাতা, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। মানুষের জ্ঞানজগৎ এই ত্রয়ীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা কে, কী জানছি এবং কীভাবে জানছি, এই তিনটি প্রশ্ন মানুষের চিন্তা ও চেতনার গভীরতম স্তরের সঙ্গে যুক্ত।

“পরিজ্ঞাতা” শব্দটি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। শব্দটির মধ্যে পরি উপসর্গ এবং জ্ঞা ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। পরি অর্থ চারদিকে, সম্পূর্ণভাবে বা সর্বতোভাবে। সেই অর্থে পরিজ্ঞাতা হলেন যিনি কোনো বিষয়কে যথাযথভাবে বা সম্পূর্ণভাবে জেনেছেন। সাধারণভাবে জ্ঞাতা এবং পরিজ্ঞাতাকে একই অর্থে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু দার্শনিক অর্থে পরিজ্ঞাতা শব্দের মধ্যে গভীর উপলব্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা এবং কোনো বিষয়ের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। মানুষ যখন নিজের জ্ঞানকে গভীর করে এবং কোনো বিষয়কে তার প্রকৃত স্বরূপে বোঝার চেষ্টা করে, তখন সে সাধারণ জ্ঞাতা থেকে পরিজ্ঞাতার দিকে অগ্রসর হয়।

এই তিনটি শব্দকে একত্রে দেখলে একটি অসাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো প্রকাশিত হয়। জ্ঞাতা হলেন যিনি জানেন, জ্ঞেয় হলো যা জানা হচ্ছে এবং জ্ঞান হলো জানার মাধ্যমে অর্জিত উপলব্ধি। আধুনিক দর্শনের ভাষায় একে জ্ঞানী, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় বিষয়ের সম্পর্ক বলা যেতে পারে। একজন মানুষ যখন কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়, তখন তার মধ্যে প্রথমে একটি অনুসন্ধিৎসা সৃষ্টি হয়। সে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে, চিন্তা করে, বিচার করে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছায়। সেই উপলব্ধি আবার তার ভবিষ্যৎ কর্মকে প্রভাবিত করে। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞান, জ্ঞেয় এবং পরিজ্ঞাতাকে কর্মের চোদনা বা প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

“কর্মচোদনা” শব্দটি কর্ম এবং চোদনা এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। কর্ম অর্থ কাজ এবং চোদনা অর্থ প্রেরণা, উদ্দীপনা বা কোনো কাজের দিকে পরিচালিত করার শক্তি। সুতরাং কর্মচোদনা হলো সেই প্রেরণা যার দ্বারা মানুষ কোনো কাজে প্রবৃত্ত হয়। মানুষের বাহ্যিক কর্মের পেছনে সবসময় একটি অন্তর্নিহিত কারণ থাকে। একজন মানুষ কেন একটি কাজ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তার জ্ঞান, তার উপলব্ধি এবং তার সামনে থাকা বিষয়ের দিকে তাকাতে হয়। কোনো বিষয় সম্পর্কে তার যে ধারণা তৈরি হয়, সেই ধারণা তার মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত সৃষ্টি করে এবং সেই সিদ্ধান্ত থেকেই কর্মের জন্ম হয়।

ধরা যাক একজন কৃষক তার জমির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন যে জমিতে জল দেওয়া প্রয়োজন। এখানে কৃষক হলেন জ্ঞাতা, জমির অবস্থা হলো জ্ঞেয় এবং জমিতে জল দেওয়া প্রয়োজন এই উপলব্ধি হলো জ্ঞান। এই জ্ঞান থেকেই তার মধ্যে কাজ করার প্রেরণা তৈরি হলো। তারপর তিনি সেচের ব্যবস্থা করলেন। এই সাধারণ ঘটনাটির মধ্যেই শ্লোকটির গভীর তত্ত্বকে বোঝা যায়। মানুষ কোনো কাজ করার আগে কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতিকে জানে, বিচার করে এবং তারপর কর্মে প্রবৃত্ত হয়। অর্থাৎ জ্ঞান কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ভিত্তি।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে “কারণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।” এখানে করণ, কর্ম এবং কর্তা এই তিনটি কর্মের উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। করণ শব্দটি √কৃ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ হলো যার মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পন্ন করা হয়। কর্মও √কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন এবং এর অর্থ হলো সম্পাদিত কাজ। কর্তা শব্দের অর্থ হলো যিনি কাজ করেন। এই তিনটি মিলে কর্মের বাস্তব কাঠামো তৈরি হয়। কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য একজন কর্মসম্পাদক প্রয়োজন, কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য কোনো মাধ্যম বা উপকরণ প্রয়োজন এবং সেই মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন হয়।

একজন ছাত্র যখন পড়াশোনা করে তখন ছাত্র হলো কর্তা, বই, কলম, কম্পিউটার এবং তার বুদ্ধি হলো করণের অংশ এবং পড়াশোনা করাই হলো কর্ম। একজন চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। চিকিৎসক হলেন কর্তা, চিকিৎসার বিভিন্ন উপকরণ ও পদ্ধতি হলো করণ এবং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হলো কর্ম। এভাবে মানুষের প্রতিটি সচেতন কর্মের মধ্যে কর্তা, করণ এবং কর্মের সম্পর্ক দেখা যায়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ কর্মকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে তার সম্পূর্ণ কাঠামোর মধ্যে বিচার করতে বলেছেন।

এই শ্লোকের গভীরতা বোঝার জন্য দুটি ত্রয়ীকে পাশাপাশি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ত্রয়ী হলো জ্ঞাতা, জ্ঞান এবং জ্ঞেয়। দ্বিতীয় ত্রয়ী হলো কর্তা, করণ এবং কর্ম। প্রথম ত্রয়ী মানুষের জ্ঞান ও চেতনার জগতকে প্রকাশ করে এবং দ্বিতীয় ত্রয়ী মানুষের কার্য ও আচরণের জগতকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ মানুষ প্রথমে কোনো বিষয়কে জানে, তারপর সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে কর্মের দিকে অগ্রসর হয়। তাই বলা যায়, জ্ঞান ও কর্ম পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষের চিন্তা যেমন তার কর্মকে প্রভাবিত করে, তেমনি কর্মও তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গভীর করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করে। মানুষ যেমনভাবে পৃথিবীকে দেখে, তেমনভাবেই সে পৃথিবীর সঙ্গে আচরণ করে। একজন ব্যক্তি যদি মনে করেন পৃথিবী কেবল প্রতিযোগিতার স্থান, তবে তার কর্মে প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপরতা বেশি দেখা যেতে পারে। আবার কেউ যদি পৃথিবীকে সহযোগিতা ও সেবার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন, তবে তার কর্মে সহমর্মিতা ও কল্যাণবোধ প্রকাশ পেতে পারে। একই বাস্তবতা ভিন্ন মানুষের মধ্যে ভিন্ন কর্মের জন্ম দিতে পারে, কারণ তাদের জ্ঞান ও উপলব্ধি এক নয়। তাই কর্ম পরিবর্তন করতে হলে অনেক সময় শুধু বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানের পরিবর্তনও প্রয়োজন।

গীতার কর্মযোগের আলোকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। মানুষ যখন কোনো কর্ম করে তখন সাধারণত সে মনে করে “আমি কর্তা”। এই কর্তার ধারণার সঙ্গে অহংকার, আকাঙ্ক্ষা এবং ফলের প্রত্যাশা যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু গীতার দর্শন মানুষকে কর্মের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলা হয়নি। বরং নিজের কর্তব্য পালন করতে বলা হয়েছে এবং সেই কর্মের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। কর্মের সঙ্গে যুক্ত কর্তা, করণ এবং কর্মকে বুঝতে পারলে মানুষ নিজের কর্মের প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে দেখলে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম হয়। প্রকৃতির গুণসমূহ বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন ও বুদ্ধির সঙ্গে অভিন্ন মনে করে তখন সে নিজেকে সব কর্মের একমাত্র কর্তা বলে মনে করতে থাকে। গীতার গভীর শিক্ষা হলো নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করা এবং কর্মের সঙ্গে অহংকারের অন্ধ সংযোগকে অতিক্রম করা। এই উপলব্ধি মানুষকে কর্মহীন করে না। বরং তাকে আরও সচেতন ও নিঃস্বার্থ কর্মের দিকে নিয়ে যায়।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ব্যবহারিক জগতে জ্ঞাতা, জ্ঞান এবং জ্ঞেয়ের পার্থক্য রয়েছে। আমরা একজন জ্ঞাতাকে দেখি, একটি জ্ঞেয় বিষয় দেখি এবং তাদের মধ্যে জ্ঞানের সম্পর্ক দেখি। কিন্তু পরম সত্যের অনুসন্ধানে এই বিভেদের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আত্মজ্ঞান লাভের পথে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে যে এই জ্ঞাতা আসলে কে। সে কি কেবল দেহ, মন ও বুদ্ধি, নাকি তার অন্তরে আরও গভীর কোনো চৈতন্যসত্তা রয়েছে। এই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত আত্মস্বরূপ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ কোনো ঘটনা দেখেই সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানায় না। সে প্রথমে ঘটনাটিকে উপলব্ধি করে, তারপর তার একটি অর্থ তৈরি করে এবং সেই অর্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। একই ঘটনা একজন মানুষের কাছে বিপদ মনে হতে পারে এবং অন্যজনের কাছে সুযোগ মনে হতে পারে। ফলে তাদের কর্মও ভিন্ন হয়। এই কারণে মানুষের আচরণ পরিবর্তনের জন্য তার চিন্তা ও উপলব্ধির পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের ভাষায় জ্ঞান, জ্ঞেয় ও জ্ঞাতার যে সম্পর্ক এখানে প্রকাশিত হয়েছে, আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোচনাতেও তার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও গভীর। জ্ঞাতা মানুষের অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক, জ্ঞান তার চেতনার আলো এবং জ্ঞেয় তার সামনে বিস্তৃত জগতের প্রতীক। অন্যদিকে কর্তা মানুষের সক্রিয় সত্তার প্রতীক, করণ তার কর্মসম্পাদনের উপায় এবং কর্ম তার জীবনের প্রকাশিত আচরণের প্রতীক। এইভাবে পুরো শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করে। ভিতরে যে জ্ঞান ও উপলব্ধি তৈরি হয়, বাইরে তারই কোনো না কোনো রূপ কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

এই তত্ত্বকে একটি সাধারণ জীবনের উদাহরণ দিয়ে আরও স্পষ্ট করা যায়। একজন ছাত্র যদি উপলব্ধি করে যে তার ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন, তবে সেই জ্ঞান তাকে পড়াশোনার দিকে প্রেরণা দেবে। ছাত্র হলো জ্ঞাতা এবং পরে কর্তা, শিক্ষার বিষয় হলো জ্ঞেয়, পড়াশোনা সম্পর্কে তার উপলব্ধি হলো জ্ঞান, বই ও অন্যান্য শিক্ষার উপকরণ হলো করণ এবং পড়াশোনা করাই হলো কর্ম। এই উদাহরণ দেখায় যে মানুষের কর্ম আসলে তার জ্ঞান ও উপলব্ধির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে এই শ্লোকের প্রশ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করে আমি কী জানি এবং আমি কী করছি। কিন্তু আত্মঅনুসন্ধানী মানুষ প্রশ্ন করে আমি কে, যে জানছে এবং যে করছে। এই প্রশ্নের মধ্যেই গীতার আত্মজ্ঞানমূলক শিক্ষা নিহিত। বাহ্যিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন থেকে শুরু করে নিজের অন্তর্নিহিত স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের দিকে যাত্রাই আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। যখন মানুষ নিজের জ্ঞান, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা এবং কর্তার ধারণাকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে, তখন তার মধ্যে আত্মসচেতনতা জন্মায়।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কর্মকে বিচার করতে হলে শুধু কাজটির বাহ্যিক রূপ দেখলেই হয় না। দেখতে হয় সেই কাজের পেছনে কী জ্ঞান ছিল, কী উদ্দেশ্য ছিল, কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে সেই জ্ঞান তৈরি হয়েছিল, কে কর্মটি করছে এবং কোন উপায়ে করছে। একটি কাজ বাহ্যিকভাবে একই রকম হলেও তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ভিন্ন হতে পারে। একজন মানুষ দান করতে পারেন খ্যাতির জন্য, আবার অন্যজন দান করতে পারেন নিঃস্বার্থ সহানুভূতি থেকে। বাহ্যিক কর্ম একই হলেও অন্তরের প্রেরণা আলাদা। তাই গীতার কর্মদর্শনে কর্মের অন্তর্নিহিত চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, “জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা” কেবল কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের জ্ঞান, চেতনা, প্রেরণা এবং কর্মের একটি গভীর দর্শন। জ্ঞাতা জানেন, জ্ঞেয় হলো জানার বিষয় এবং জ্ঞান হলো সেই জানার উপলব্ধি। এই তিনের সমন্বয়ে কর্মের প্রেরণা তৈরি হয়। তারপর কর্তা, করণ এবং কর্মের মাধ্যমে সেই প্রেরণা বাস্তব জীবনে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে তার কাজের পাশাপাশি তার জ্ঞান ও চেতনাকেও বুঝতে হবে। মানুষ যা জানে, যেভাবে জানে এবং যে দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতকে দেখে, তার কর্ম অনেকাংশে সেই জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। তাই এই শ্লোকের গভীর শিক্ষা হলো নিজের কর্মকে শুদ্ধ করতে হলে নিজের জ্ঞানকে শুদ্ধ করতে হবে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং সর্বোপরি নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে হবে। জ্ঞান থেকে প্রেরণা, প্রেরণা থেকে কর্ম এবং কর্মের মধ্য দিয়ে আত্মসচেতনতার যে যাত্রা, সেই যাত্রাকেই এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর শ্লোক অসাধারণ দার্শনিক শক্তির সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি