সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.১৯ — জ্ঞান, কর্ম ও কর্তার ত্রিবিধ প্রকৃতি এবং গুণত্রয়ের প্রভাব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ।প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্যপি।।১৯।।
জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ।
প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্যপি।।১৯।।

অনুবাদঃ প্রকৃতির তিনটি গুণ অনুসারে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা তিন প্রকার বলে কথিত হয়েছে। সেই সমস্তও যথাযথ রূপে শ্রবণ কর।

ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের উনিশ নম্বর শ্লোকটি মানবজীবন, কর্মপ্রবাহ এবং চেতনার প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে। শ্লোকে বলা হয়েছে, জ্ঞান, কর্ম এবং কর্তা এই তিনটিই প্রকৃতির তিন গুণের ভেদ অনুসারে তিন প্রকার বলে বিবেচিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে জানাচ্ছেন যে মানুষের জ্ঞান যেমন তার অন্তর্দৃষ্টিকে প্রকাশ করে, কর্ম তেমন তার আচরণকে প্রকাশ করে এবং কর্তা তার কর্মের পেছনে থাকা মানসিক প্রবণতা ও আত্মপরিচয়ের প্রকাশ ঘটায়। ফলে একজন মানুষকে বুঝতে হলে শুধু সে কী কাজ করছে তা দেখলেই যথেষ্ট হয় না। তাকে কীভাবে দেখছে, কেন কাজ করছে এবং কী মানসিক অবস্থায় কাজ করছে সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো জ্ঞানম্। জ্ঞান শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু হলো জ্ঞা, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা, চিনতে পারা বা সত্যকে অনুধাবন করা। জ্ঞান কেবল কোনো তথ্য মুখস্থ করে রাখার নাম নয়। তথ্য মানুষের স্মৃতিতে থাকতে পারে, কিন্তু জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে। গীতার আলোচনায় জ্ঞান বলতে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে। একজন মানুষ পৃথিবী, অন্য মানুষ, নিজের শরীর, মন, কর্তব্য এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে কীভাবে দেখে তার মধ্যেই তার জ্ঞানের প্রকৃতি প্রকাশ পায়। একই ঘটনাকে দুইজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখতে পারে এবং সেই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের পরবর্তী কর্মকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে পারে। এই কারণে গীতার দৃষ্টিতে জ্ঞান কর্মের পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

পরবর্তী শব্দ হলো কর্ম। কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কার্য সম্পন্ন করা। কর্মের সাধারণ অর্থ কাজ হলেও গীতার দর্শনে কর্মের অর্থ অনেক বিস্তৃত। মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত, আচরণ, কর্তব্য পালন এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ কার্যকলাপ কর্মের বিস্তৃত পরিসরের মধ্যে পড়ে। মানুষ যে কাজটি বাহ্যিকভাবে সম্পন্ন করে সেটিই শুধু কর্ম নয়, সেই কাজের উদ্দেশ্য, মানসিক প্রবণতা এবং ফলের প্রতি তার আকর্ষণও কর্মের প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। তাই একই বাহ্যিক কাজ দুইজন মানুষের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। একজন কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করতে পারে, অন্যজন ব্যক্তিগত লাভের জন্য কাজ করতে পারে এবং আরেকজন অজ্ঞতা বা অবিবেচনার কারণে একই কাজ করতে পারে। বাহ্যিক কর্ম একই হলেও অন্তর্নিহিত চেতনা ভিন্ন হওয়ায় তার প্রকৃতিও ভিন্ন হয়ে যায়।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কর্তা। কর্তা শব্দটি কৃ ধাতুর সঙ্গে তৃচ্ প্রত্যয়ের মাধ্যমে গঠিত এবং এর আক্ষরিক অর্থ হলো যে করে বা যে কোনো কাজ সম্পাদন করে। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্তা শুধু কাজের বাহ্যিক সম্পাদনকারী ব্যক্তি নয়। কর্তার সঙ্গে তার মানসিক অবস্থা, অহংবোধ, উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা এবং কর্মের সঙ্গে তার নিজের সম্পর্ক গভীরভাবে যুক্ত। একজন মানুষ যখন বলে আমি করলাম, তখন তার মধ্যে একটি কর্তা বোধ প্রকাশ পায়। এই কর্তা বোধ কখনও কর্তব্যনিষ্ঠ ও অহংকারমুক্ত হতে পারে, আবার কখনও ফলের আকাঙ্ক্ষা, আত্মগরিমা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। তাই গীতার দৃষ্টিতে কর্তা বিশ্লেষণ মানে মানুষের অন্তর্গত কর্মচেতনার বিশ্লেষণ।

শ্লোকে ত্রিধৈব শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ত্রিধা অর্থ তিনভাবে বা তিন প্রকারে এবং এব শব্দটি বক্তব্যকে দৃঢ়তা প্রদান করে। অর্থাৎ জ্ঞান, কর্ম এবং কর্তা তিনটি গুণের ভেদ অনুসারে তিন ধরনের প্রকাশ লাভ করে। এই তিন গুণ হলো সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ। এখানে গুণ শব্দটিকে সাধারণ অর্থে ভালো বা মন্দ গুণ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। সাংখ্য ও গীতার দর্শনে গুণ বলতে প্রকৃতির মৌলিক প্রবণতা বা কার্যধারাকে বোঝানো হয়েছে। সত্ত্ব স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য ও প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। রজঃ গতি, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি ও কর্মপ্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তমঃ জড়তা, মোহ, অজ্ঞান, অবিবেচনা ও অন্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের মধ্যে এই তিন গুণ বিভিন্ন মাত্রায় কাজ করে এবং তাদের পারস্পরিক প্রাধান্যের ফলে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও আচরণে বৈচিত্র্য দেখা দেয়।

গুণভেদতঃ শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম প্রধান দার্শনিক চাবিকাঠি। গুণ অর্থ প্রকৃতির প্রবণতা এবং ভেদ অর্থ পার্থক্য। ফলে গুণভেদতঃ বলতে গুণের পার্থক্য অনুসারে বা গুণের প্রাধান্যের ভিত্তিতে বোঝানো হয়েছে। মানুষ একই অবস্থায় সর্বদা থাকে না। কখনও তার মধ্যে স্বচ্ছতা ও শান্তি প্রবল হয়, কখনও আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং কখনও জড়তা ও বিভ্রান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে। তাই গুণকে মানুষের স্থায়ী পরিচয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এগুলো মানুষের চেতনা ও আচরণের পরিবর্তনশীল প্রবণতা হিসেবে বোঝা অধিক যথার্থ।

প্রোচ্যতে শব্দের অর্থ বলা হয় বা নির্দিষ্ট করা হয়। এর মূল রয়েছে সংস্কৃত বচ্ ধাতুতে, যার অর্থ বলা। প্র উপসর্গের মাধ্যমে শব্দটির অর্থ বিশেষভাবে প্রকাশিত বা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এমন ধারণা পায়। গুণসংখ্যানে শব্দটি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। এখানে সংখ্যা শুধু গণনার অর্থে ব্যবহৃত নয়। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক পরিভাষায় সংখ্যা বিশ্লেষণ, পৃথকীকরণ এবং তত্ত্বকে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার অর্থও বহন করে। ফলে গুণসংখ্যানে বলতে গুণের বিশ্লেষণ বা গুণতত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাসকে বোঝানো যায়। শ্রীকৃষ্ণ তাই শুধু তিনটি নাম বলছেন না, বরং মানুষের জ্ঞান, কর্ম ও কর্তার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করার একটি দার্শনিক কাঠামো উপস্থাপন করছেন।

শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর দিক হলো জ্ঞান, কর্ম ও কর্তার পারস্পরিক সম্পর্ক। জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গঠন করে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি তার সিদ্ধান্ত ও কর্মকে প্রভাবিত করে। আবার কর্মের ধারাবাহিকতা মানুষের মানসিক প্রবণতা ও চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে জ্ঞান থেকে কর্ম এবং কর্ম থেকে কর্তার প্রকাশ ঘটে। আবার কর্তার মানসিকতা ভবিষ্যতের জ্ঞানকেও প্রভাবিত করে। এভাবে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত চক্র তৈরি করে। স্বচ্ছ জ্ঞান মানুষকে বিবেচনাপূর্ণ কর্মের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং বিবেচনাপূর্ণ কর্ম আবার অন্তরের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে পারে। বিপরীতে ভুল জ্ঞান ভুল কর্মের জন্ম দিতে পারে এবং ভুল কর্ম সেই অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সাত্ত্বিক জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য হলো বহুত্বের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করা। মানুষ যখন বাহ্যিক পার্থক্যের আড়ালে একটি গভীর সম্পর্ক ও ঐক্য দেখতে শেখে তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত হয়। রাজসিক জ্ঞান সাধারণত পৃথকত্বকে বেশি গুরুত্ব দেয়। আমি এবং তুমি, আমার স্বার্থ এবং তোমার স্বার্থ, আমার সাফল্য এবং তোমার সাফল্য এই পার্থক্যগুলো তার চেতনার কেন্দ্রে থাকে। তামসিক জ্ঞান আরও সংকীর্ণ ও অপর্যাপ্ত হতে পারে। কোনো একটি সীমিত ধারণাকে সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেওয়া এবং বৃহত্তর বাস্তবতাকে অস্বীকার করা তামসিক জ্ঞানের লক্ষণ হিসেবে বোঝানো যায়। এই তিন ধরনের জ্ঞানের মাধ্যমে গীতা মানুষের বাস্তবতা উপলব্ধির তিনটি ভিন্ন মানসিক স্তরকে নির্দেশ করে।

কর্মের ক্ষেত্রেও একই বিভাজন দেখা যায়। সাত্ত্বিক কর্ম কর্তব্যবোধ, আসক্তিহীনতা এবং বিবেচনার সঙ্গে সম্পাদিত হয়। সেখানে কর্মের উদ্দেশ্য শুধু ব্যক্তিগত লাভ নয়। রাজসিক কর্মের মধ্যে ফলের আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত সাফল্য, প্রতিযোগিতা এবং আসক্তি প্রবল থাকে। তামসিক কর্ম অজ্ঞতা, মোহ, অবিবেচনা এবং পরিণামের প্রতি উদাসীনতার দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। একই বাহ্যিক কাজ তাই ভিন্ন ভিন্ন গুণের প্রকাশ হতে পারে। একজন মানুষ দান করতে পারেন অন্যের কল্যাণের জন্য, অন্যজন নিজের খ্যাতির জন্য এবং আরেকজন কোনো বিবেচনা ছাড়াই এমন কিছু দিতে পারেন যা বাস্তবে ক্ষতির কারণ হতে পারে। কাজটি একই ধরনের হলেও তার অন্তর্নিহিত গুণগত প্রকৃতি এক নয়।

কর্তার ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত্ত্বিক কর্তা সাধারণত আসক্তিহীন, অহংকারমুক্ত, দৃঢ় এবং কর্তব্যপরায়ণ। সাফল্য ও ব্যর্থতার পরিবর্তনের মধ্যেও সে নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয় না। রাজসিক কর্তা ফলের আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিগত লাভ, অহংকার এবং আসক্তির দ্বারা প্রবলভাবে চালিত হতে পারে। তার কাছে কর্মের সাফল্য নিজের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তামসিক কর্তা অলসতা, অবিবেচনা, অস্থিরতা এবং দায়িত্বহীনতার দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। এই বিশ্লেষণ মানুষের বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি তার অন্তর্গত মানসিক কাঠামোকেও বুঝতে সাহায্য করে।

শ্লোকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী অর্থ হলো জ্ঞানকে চোখ, কর্মকে হাত এবং কর্তাকে অন্তরের আমি বোধ হিসেবে দেখা। চোখ যেমন পৃথিবীকে দেখে, তেমনি জ্ঞান মানুষের বাস্তবতাকে দেখার পদ্ধতি নির্ধারণ করে। হাত যেমন দেখা বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ সম্পাদন করে, তেমনি কর্ম মানুষের উপলব্ধিকে বাহ্যিক জীবনে প্রকাশ করে। আর কর্তা হলো সেই অভ্যন্তরীণ অনুভূতি যার মাধ্যমে মানুষ মনে করে যে সে কাজটি করছে। এই তিনটি যখন সমন্বিত হয় তখন মানুষের জীবন একটি সুসংবদ্ধ গতিপথ লাভ করে। কিন্তু জ্ঞান যদি বিকৃত হয়, কর্ম যদি অস্থির হয় এবং কর্তা যদি অহংকারে আবদ্ধ হয় তবে জীবনের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।

আধুনিক জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়েও এই বিষয়টি বোঝা যায়। একজন ব্যক্তি সামাজিক মাধ্যমে কোনো সংবাদ দেখল। সে যদি যাচাই না করে সংবাদটিকে সত্য বলে গ্রহণ করে এবং উত্তেজনার বশে ছড়িয়ে দেয় তবে সেখানে জ্ঞানের সংকীর্ণতা এবং কর্মের অবিবেচনা প্রকাশ পায়। অন্য কেউ একই সংবাদ নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। সেখানে কর্মের পেছনে রাজসিক আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে। আবার একজন ব্যক্তি সংবাদটির উৎস যাচাই করে, বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এবং মানুষের ক্ষতি হতে পারে কিনা তা ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত নিলে তার মধ্যে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও সাত্ত্বিক প্রবণতা দেখা যায়। বাহ্যিক পরিস্থিতি একই, কিন্তু জ্ঞান, কর্ম ও কর্তার মানসিকতা ভিন্ন হওয়ায় ফলও ভিন্ন হতে পারে।

এই শ্লোকের সঙ্গে অহংকারের সম্পর্কও গভীর। মানুষ সাধারণত বলে আমি করলাম, আমি অর্জন করলাম, আমার জন্য হলো। কিন্তু গীতার বিশ্লেষণ মানুষের এই সরল কর্তা ধারণাকে প্রশ্ন করে। কোনো কর্মের পেছনে শুধু একজন ব্যক্তির ইচ্ছা কাজ করে না। শরীর, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি, পূর্বকারণ এবং প্রকৃতির বিভিন্ন প্রবণতা একত্রে কর্মের পরিণতি গঠন করে। ফলে নিজের কর্মের দায়িত্ব অস্বীকার করা গীতার শিক্ষা নয়, কিন্তু নিজেকে সমস্ত কর্মের একমাত্র ও স্বাধীন কর্তা মনে করাও গীতার গভীর দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে কর্মের দায়িত্ব এবং অহংকারমুক্ত কর্তা বোধের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক আরও গভীর একটি সত্যের দিকে নির্দেশ করে। মানুষের মধ্যে যে রাগ, আকাঙ্ক্ষা, জড়তা, স্বচ্ছতা বা অস্থিরতা দেখা দেয় তার সবকিছুকেই যদি সে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে তাহলে সে গুণের সঙ্গে নিজের আত্মপরিচয়কে এক করে ফেলে। কিন্তু যদি সে বলতে শেখে যে আমার মধ্যে রাগের প্রবণতা উঠেছে, তাহলে সে রাগকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। তখন সে আর শুধু রাগের সঙ্গে একাত্ম থাকে না। একইভাবে মানুষের মধ্যে রজঃ বা তমঃ প্রবল হতে পারে, কিন্তু সেই গুণগত প্রবণতাই তার চূড়ান্ত আত্মস্বরূপ নয়। এই পর্যবেক্ষণশীলতা মানুষকে ধীরে ধীরে গুণের কার্যপ্রণালী বোঝার এবং গুণের বন্ধন অতিক্রম করার পথে নিয়ে যেতে পারে।

এই কারণে গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের উনিশ নম্বর শ্লোককে শুধু একটি শ্রেণিবিন্যাসের শ্লোক হিসেবে দেখলে এর গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এটি আসলে মানুষের জীবনকে বোঝার একটি দার্শনিক মানচিত্র। মানুষ কীভাবে দেখে, কীভাবে কাজ করে এবং কাজের সঙ্গে নিজেকে কীভাবে যুক্ত করে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তার অন্তর্জগতের প্রকৃতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জ্ঞান তার দৃষ্টিকে প্রকাশ করে, কর্ম তার দৃষ্টিভঙ্গির বাহ্যিক প্রকাশ ঘটায় এবং কর্তা তার অন্তর্গত মানসিক অবস্থাকে প্রকাশ করে। আর এই তিনটির বৈচিত্র্যের পেছনে কাজ করে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ নামের প্রকৃতির তিন গুণ।

সবশেষে বলা যায়, জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ এই বক্তব্য মানুষের আত্মপরিচয় ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে একটি গভীর শিক্ষা প্রদান করে। মানুষকে শুধু তার কাজ দিয়ে বিচার করা যায় না। তার জ্ঞানের প্রকৃতি, কর্মের উদ্দেশ্য এবং কর্তা হিসেবে তার মানসিক অবস্থাকেও বুঝতে হয়। সাত্ত্বিক প্রবণতা মানুষকে স্বচ্ছতা, সাম্য ও কর্তব্যবোধের দিকে নিয়ে যায়। রাজসিক প্রবণতা তাকে আকাঙ্ক্ষা, ফললাভ ও অস্থিরতার দিকে চালিত করে। তামসিক প্রবণতা তাকে মোহ, জড়তা ও অবিবেচনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই তিন গুণই পরিবর্তনশীল প্রকৃতির প্রকাশ। গীতার গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো মানুষ যেন নিজের মধ্যে এই গুণগুলির কার্যকলাপকে চিনতে শেখে এবং ধীরে ধীরে তাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে তাদের সাক্ষী হতে শেখে। সেই উপলব্ধির মধ্যেই জ্ঞান গভীর হয়, কর্ম শুদ্ধ হয় এবং কর্তা বোধ অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে আত্মসচেতনতার দিকে অগ্রসর হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি