সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.২০ — সর্বভূতে এক অবিনশ্বর সত্তার উপলব্ধি: সাত্ত্বিক জ্ঞানের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।অবিভক্তং বিভক্তেষু তজজ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্।।২০।।
সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।
অবিভক্তং বিভক্তেষু তজজ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্।।২০।।

অনুবাদঃ যে জ্ঞানের দ্বারা সমস্ত প্রানীতে এক অবিভক্ত চিন্ময় ভাব দর্শন হয়, অনেক জীব পরস্পর ভিন্ন হলেও চিন্ময় সত্তায় তারা এক, সেই জ্ঞানকে সাত্ত্বিক বলে জানবে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের বিংশতি সংখ্যক শ্লোক জ্ঞানকে দেখার এক গভীর ও সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সামনে তুলে ধরে। শ্লোকটি হলো “সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে। অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্।” এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো সমস্ত জীব ও অস্তিত্বের বহুমাত্রিক প্রকাশের মধ্যে যে এক অবিনশ্বর সত্তা বিরাজমান, তাকে যে জ্ঞান উপলব্ধি করতে পারে, সেই জ্ঞানই সাত্ত্বিক জ্ঞান। মানুষের সাধারণ দৃষ্টি বাহ্যিক পার্থক্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কে মানুষ, কে প্রাণী, কে ধনী, কে দরিদ্র, কে আপন, কে পর, কে শক্তিশালী, কে দুর্বল, এইসব পার্থক্য আমাদের চোখে সহজেই ধরা পড়ে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞান শুধু বাহ্যিক বৈচিত্র্যকে দেখা নয়। প্রকৃত জ্ঞান হলো সেই বৈচিত্র্যের অন্তরালে থাকা গভীর ঐক্যকে উপলব্ধি করা। এই কারণেই এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় বাণী নয়, বরং অস্তিত্ব, জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবতা এবং আত্মোপলব্ধি সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক ঘোষণা।

শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সর্বভূতেষু। সর্ব অর্থ সমস্ত এবং ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। সেই অর্থে ভূত বলতে অস্তিত্বশীল সত্তা বোঝায়। সর্বভূতেষু অর্থ সমস্ত অস্তিত্বশীল সত্তার মধ্যে। এখানে শুধু মানুষকে বোঝানো হয়নি। সমস্ত জীব, সমস্ত প্রাণী এবং বৃহত্তর অর্থে সমস্ত প্রকাশিত অস্তিত্ব এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে গীতা জ্ঞানের ক্ষেত্রকে সীমিত মানবকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে সর্বজনীনতার দিকে নিয়ে যায়।

এরপর এসেছে একং। এক শব্দটি সাধারণভাবে একটি সংখ্যা নির্দেশ করলেও এখানে এর অর্থ কেবল সংখ্যাগত এক নয়। এখানে এক বলতে বোঝানো হয়েছে অভিন্নতা, ঐক্য এবং একটি মৌলিক অস্তিত্বগত ভিত্তি। পৃথিবীতে অসংখ্য রূপ দেখা যায়, কিন্তু সাত্ত্বিক জ্ঞান সেই অসংখ্য রূপের অন্তরালে একটি ঐক্য উপলব্ধি করে। এরপর এসেছে ভাবম্। ভাব শব্দের সঙ্গে হওয়া, অস্তিত্ব, সত্তা এবং বাস্তবতার ধারণা যুক্ত। তাই একং ভাবম্ বলতে এমন এক অভিন্ন অস্তিত্বসত্তাকে বোঝানো হয়েছে, যা বহুরূপী প্রকাশের অন্তর্নিহিত ভিত্তি।

এই এক সত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অব্যয়ম্। অব্যয় শব্দটি অ এবং ব্যয় ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। ব্যয় অর্থ ক্ষয়, নিঃশেষ বা বিনাশ এবং অ অর্থ তার অনুপস্থিতি। ফলে অব্যয় অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা নিঃশেষ হয় না এবং যা অবিনশ্বর। গীতার এই বক্তব্য আমাদের পরিবর্তনশীল জগতের দিকে নতুনভাবে তাকাতে শেখায়। দেহ পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সমাজ পরিবর্তিত হয় এবং প্রকৃতির রূপও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও এমন এক গভীর অস্তিত্বগত সত্যের সন্ধান করা হচ্ছে, যা পরিবর্তনের দ্বারা নিঃশেষিত হয় না।

ঈক্ষতে শব্দটির অর্থ দেখে বা প্রত্যক্ষ করে। তবে এখানে শুধু চোখ দিয়ে দেখার কথা বলা হয়নি। এটি এমন এক গভীর উপলব্ধির কথা বলে, যেখানে জ্ঞানী ব্যক্তি বাহ্যিক রূপের বাইরে গিয়ে অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করেন। সাধারণ মানুষ যা দেখে তা হলো পৃথক পৃথক দেহ ও ব্যক্তিত্ব। জ্ঞানী ব্যক্তি সেই পৃথকতার মধ্যে সম্পর্ক ও ঐক্য দেখতে পান।

শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর অংশ হলো অবিভক্তং বিভক্তেষু। অবিভক্ত অর্থ যা বিভক্ত নয় এবং বিভক্তেষু অর্থ বিভক্ত বা পৃথক পৃথক সত্তাগুলোর মধ্যে। অর্থাৎ বহু পৃথক রূপের মধ্যে এমন এক সত্তা রয়েছে, যা নিজে বিভক্ত নয়। এই বাক্যাংশের মধ্যেই গীতার ঐক্যদর্শনের গভীরতম রহস্য নিহিত আছে। বহুত্বকে অস্বীকার না করেও তার অন্তর্নিহিত ঐক্যকে উপলব্ধি করা হচ্ছে সাত্ত্বিক জ্ঞানের লক্ষণ।

তজ্জ্ঞানং অর্থ সেই জ্ঞান। এখানে তৎ এবং জ্ঞানম্ একত্র হয়ে তজ্জ্ঞানম্ হয়েছে। কোন জ্ঞানকে বলা হচ্ছে তা শ্লোকের পূর্ববর্তী অংশেই বলা হয়েছে। যে জ্ঞান সমস্ত বিভক্ত সত্তার মধ্যে এক অবিনশ্বর ও অবিভক্ত সত্তাকে উপলব্ধি করে, সেটিই সেই জ্ঞান। আর বিদ্ধি অর্থ জেনে রাখো বা নিশ্চিতভাবে বুঝে নাও। শেষে সাত্ত্বিকম্ শব্দটি এসেছে। সত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত সাত্ত্বিক শব্দের অর্থ হলো স্বচ্ছতা, ভারসাম্য, বিশুদ্ধতা এবং জ্ঞানের আলো দ্বারা উদ্ভাসিত অবস্থা। তাই সাত্ত্বিক জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান যা মানুষকে সংকীর্ণ বিভেদের বাইরে নিয়ে গিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়।

শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য

মানুষ সাধারণত পৃথিবীকে বহুত্বের দৃষ্টিতে দেখে। আমি এবং তুমি, আমার পরিবার এবং অন্যের পরিবার, আমার দেশ এবং অন্যের দেশ, আমার স্বার্থ এবং অন্যের স্বার্থ, এই ধরনের বিভাজন আমাদের দৈনন্দিন চিন্তার একটি স্বাভাবিক অংশ। এই পার্থক্য বাস্তব জগতের একটি স্তরকে অবশ্যই প্রকাশ করে। কিন্তু গীতা বলছে, জ্ঞান যদি কেবল এই পার্থক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অস্তিত্বের গভীরতম সত্যকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। সাত্ত্বিক জ্ঞান হলো পার্থক্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে তার অন্তর্নিহিত ঐক্যকে উপলব্ধি করা।

একটি বৃক্ষের কথা ভাবা যেতে পারে। একটি বিশাল বৃক্ষে অসংখ্য পাতা, শাখা, ফুল এবং ফল রয়েছে। প্রত্যেকটি পাতা আলাদা, প্রত্যেকটি শাখার আকৃতি আলাদা এবং প্রত্যেকটি ফলের রূপও আলাদা। কিন্তু এই অসংখ্য বৈচিত্র্যের গভীরে রয়েছে একই বৃক্ষের জীবনপ্রবাহ। যদি একটি পাতা কেবল নিজের পৃথকত্বকে দেখে, তবে সে বৃক্ষের সামগ্রিক সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে না। একইভাবে মানুষ যদি কেবল নিজের পৃথক অস্তিত্বকে দেখে এবং বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ভুলে যায়, তবে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আরেকটি সুন্দর উপমা হলো স্বর্ণের অলংকার। আংটি, হার, বালা এবং মুকুট দেখতে আলাদা। তাদের নাম আলাদা এবং ব্যবহারও আলাদা। কিন্তু উপাদানের দিক থেকে তারা একই স্বর্ণের প্রকাশ। রূপের দিক থেকে সেখানে বহুত্ব রয়েছে, কিন্তু উপাদানের দিক থেকে একটি ঐক্য রয়েছে। গীতার অবিভক্তং বিভক্তেষু ধারণাকে বোঝার জন্য এই উপমাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

দার্শনিক অর্থ

ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে বহুর মধ্যে একের উপলব্ধি আত্মা ও ব্রহ্মের ঐক্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নাম ও রূপের দিক থেকে জগত বহু হলেও চূড়ান্ত সত্যের স্তরে এক চৈতন্যসত্তার উপলব্ধিই জ্ঞানের পরিণতি। এই দৃষ্টিতে দেহ বহু হতে পারে, ব্যক্তিত্ব বহু হতে পারে এবং প্রকাশের ধরন বহু হতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত চৈতন্যের সত্য এক।

বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে ঐক্যের সঙ্গে বৈচিত্র্যের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে বহুত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয় না। বরং বহু জীব ও জগত একটি পরম সত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে একের মধ্যে বহু এবং বহুর মধ্যে একের সম্পর্ককে একটি সামগ্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখা যায়।

দ্বৈত দর্শনে জীব এবং ঈশ্বরের সম্পূর্ণ অভিন্নতা গ্রহণ করা হয় না। তবুও সর্বভূতের মধ্যে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি এবং বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে জীবের সম্পর্কের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের ঐক্যদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে গীতার এই শ্লোক কেবল একটি নির্দিষ্ট দার্শনিক মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতীয় দর্শনের বৃহত্তর ঐতিহ্যে গভীর চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

মানবজীবনে এর প্রভাব

সাত্ত্বিক জ্ঞান মানুষের নৈতিক জীবনকেও গভীরভাবে পরিবর্তন করতে পারে। যখন মানুষ অন্যকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং বিচ্ছিন্ন বলে মনে করে, তখন তার মধ্যে অহংকার, হিংসা, ঘৃণা এবং স্বার্থপরতা সহজেই জন্ম নিতে পারে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে অন্যের অস্তিত্বও বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশ, তখন তার মধ্যে সহমর্মিতা জন্ম নেয়। অন্যের দুঃখ তখন আর সম্পূর্ণ অপরের দুঃখ বলে মনে হয় না। অন্যের আনন্দও তার কাছে অর্থহীন হয়ে থাকে না।

এই কারণে সাত্ত্বিক জ্ঞান কেবল ধ্যান বা তাত্ত্বিক দর্শনের বিষয় নয়। এটি দৈনন্দিন আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন মানুষ যদি সত্যিই সকলের মধ্যে এক অস্তিত্বের অনুভব করতে পারেন, তবে তার আচরণে দয়া, সহিষ্ণুতা, অহিংসা, বিনয় এবং ন্যায়বোধের প্রকাশ ঘটতে পারে। সে বুঝতে পারে যে নিজের উন্নতি অন্যকে ধ্বংস করার মাধ্যমে অর্জন করা প্রকৃত উন্নতি নয়। মানুষের সত্যিকারের উৎকর্ষ তখনই ঘটে যখন তার জ্ঞান তার আচরণকেও উন্নত করে।

মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্য

মানুষের মন অনেক সময় একটি শক্তিশালী বিভাজন তৈরি করে। আমি এবং অন্য, আমার এবং তোমার, লাভ এবং ক্ষতি, সাফল্য এবং ব্যর্থতা এই দ্বৈততার মধ্যেই মানুষের অহং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই বিভাজন যখন অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে শুরু করে। তার মধ্যে একাকিত্ব, ভয় এবং নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে।

সাত্ত্বিক জ্ঞান এই মানসিক বিভাজনের গভীরে গিয়ে সম্পর্কের সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখায়। এর অর্থ এই নয় যে ব্যক্তিত্ব বা ব্যক্তিগত সীমারেখা বিলীন হয়ে যাবে। বরং এর অর্থ হলো ব্যক্তি নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক উপলব্ধি করবে। ফলে অহংকারের পরিবর্তে বিনয় এবং বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সংযোগের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

নৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য

এই শ্লোকের শিক্ষা সমাজজীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যখন কেবল বাহ্যিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিচার করে, তখন বিভাজন সৃষ্টি হয়। জাতি, ভাষা, অর্থ, সামাজিক অবস্থান, পেশা এবং বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষ একে অপরকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সকল সত্তার মধ্যে একটি মৌলিক অস্তিত্বগত ঐক্য উপলব্ধি করার দৃষ্টি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে।

এখানে সাত্ত্বিক জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শিক্ষা হলো মানুষের মর্যাদা কেবল তার বাহ্যিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। প্রত্যেক জীবনের একটি অন্তর্নিহিত মূল্য রয়েছে। এই উপলব্ধি মানবিক ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করতে পারে।

বৈচিত্র্য ও ঐক্যের সমন্বয়

এই শ্লোকের একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো এটি বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে না। বরং বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য দেখতে শেখায়। পৃথিবীতে সবাই একই রকম হবে এমন নয়। মানুষের চিন্তা আলাদা হবে, সংস্কৃতি আলাদা হবে, প্রতিভা আলাদা হবে এবং জীবনযাপনের পদ্ধতিও আলাদা হবে। এই বৈচিত্র্য জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।

কিন্তু বৈচিত্র্য যেন বিভেদের কারণ না হয়, সেই শিক্ষা এই শ্লোকের গভীরে রয়েছে। বহুত্ব থাকবে, কিন্তু বহুত্বের অন্তরে যে সম্পর্ক ও ঐক্য আছে তা ভুলে যাওয়া যাবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে একদিকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মূল্য বুঝতে শেখায় এবং অন্যদিকে বৃহত্তর ঐক্যের অনুভূতিও প্রদান করে।

সাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপ

সাত্ত্বিক জ্ঞান মানে শুধু অনেক কিছু জানা নয়। একজন ব্যক্তি পৃথিবীর অসংখ্য তথ্য জানলেও তার জ্ঞান সাত্ত্বিক নাও হতে পারে। সাত্ত্বিকতার প্রশ্ন জ্ঞানের পরিমাণে নয়, জ্ঞানের দৃষ্টিতে। সে জ্ঞান মানুষকে কতটা স্বচ্ছ করে, কতটা অহংকারমুক্ত করে, কতটা সত্যের কাছে নিয়ে যায় এবং কতটা বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তার ওপর এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে।

একজন জ্ঞানী ব্যক্তি তাই কেবল জানেন না যে পৃথিবীতে অনেক মানুষ রয়েছে। তিনি উপলব্ধি করেন যে প্রত্যেক মানুষের সুখ ও দুঃখের গভীরে মানব অস্তিত্বের একটি সাধারণ সত্য রয়েছে। তিনি কেবল জানেন না যে জীবজগৎ অসংখ্য প্রজাতিতে বিভক্ত। তিনি উপলব্ধি করেন যে সমস্ত জীবনের মধ্যেই অস্তিত্বের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি শুধু বাহ্যিক রূপ দেখেন না। তিনি রূপের অন্তর্নিহিত সত্যের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেন।

উপসংহার

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার “সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে। অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্” শ্লোকটি মানুষের জ্ঞানকে বাহ্যিক বহুত্ব থেকে অন্তর্নিহিত ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। সর্বভূতেষু আমাদের সমস্ত অস্তিত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। একং আমাদের ঐক্যের কথা বলে। ভাবম্ আমাদের অস্তিত্বের গভীরে নিয়ে যায়। অব্যয়ম্ পরিবর্তনের মধ্যেও অবিনশ্বর সত্যের সন্ধান করতে শেখায়। ঈক্ষতে কেবল বাহ্যিক দৃষ্টি নয়, অন্তর্দৃষ্টির কথা বলে। অবিভক্তং বিভক্তেষু প্রকাশ করে এই শ্লোকের সর্বোচ্চ দার্শনিক সত্য। আর সাত্ত্বিকম্ ঘোষণা করে যে এই ঐক্যদর্শী উপলব্ধিই স্বচ্ছ ও উন্নত জ্ঞানের লক্ষণ।

এই শ্লোকের সারকথা হলো পৃথিবীতে রূপের বৈচিত্র্য আছে, কিন্তু সেই বৈচিত্র্যের গভীরে একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে। সত্যিকার জ্ঞান সেই ঐক্যকে দেখতে শেখে। যে চোখ কেবল বিভেদ দেখে, সে জগতের একটি অংশ দেখে। যে চোখ বিভেদের মধ্যেও সম্পর্ক দেখতে পায়, সে আরও গভীর সত্যের দিকে এগিয়ে যায়। আর যে চেতনা বহুর মধ্যে এক অবিনশ্বর সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে, তার জ্ঞান ধীরে ধীরে সংকীর্ণতা অতিক্রম করে সত্য, শান্তি, সহমর্মিতা এবং আত্মোপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়। এই কারণেই গীতার শিক্ষা অনুযায়ী বিভক্তের মধ্যে অবিভক্ত একের উপলব্ধিই সাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রকৃত পরিচয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি