ভগবদ্গীতা ১৮.২১ — পৃথকত্বের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজসিক জ্ঞানের প্রকৃতি
পৃথক্ত্বেন তু যজজ্ঞানং নানাভাবান্ পৃথগবিধান্।
বেত্তি সর্বেষু ভুতেষু তজজ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্।।২১।।
অনুবাদঃ যে জ্ঞানের দ্বারা সমস্ত প্রাণীতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আত্মা অবস্থিত বলে পৃথকরূপে দর্শন হয়, সেই জ্ঞানকে রাজসিক বলে জানবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একুশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞানের রাজসিক রূপ ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো “পৃথক্ত্বেন তু যজ্জ্ঞানং নানাভাবান্ পৃথগ্বিধান্। বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্।” এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের জ্ঞান বা উপলব্ধির একটি বিশেষ প্রবণতা তুলে ধরেছেন। মানুষ যখন জগতের সমস্ত জীব ও সত্তাকে প্রধানত পৃথক পৃথক পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, স্বার্থ এবং অবস্থানের মাধ্যমে দেখতে থাকে এবং তাদের অন্তর্নিহিত সম্পর্ক ও ঐক্যের দিকটি উপলব্ধি করতে পারে না, তখন সেই জ্ঞানকে রাজসিক জ্ঞান বলা হয়। এখানে পৃথক্ত্বেন শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই একটি শব্দের মধ্যেই মানুষের বিভাজনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, বহুত্বের প্রতি আকর্ষণ এবং পৃথক সত্তাকে কেন্দ্র করে জগতকে বোঝার প্রবণতা গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
পৃথক্ত্বেন শব্দটি সংস্কৃত পৃথক শব্দ থেকে গঠিত। পৃথক অর্থ আলাদা, স্বতন্ত্র, ভিন্ন বা বিচ্ছিন্ন। এর সঙ্গে ত্ব প্রত্যয় যুক্ত হয়ে পৃথক্ত্ব শব্দের সৃষ্টি হয়েছে, যার অর্থ পৃথক হওয়ার অবস্থা, পৃথকতা বা স্বাতন্ত্র্য। এরপর পৃথক্ত্ব শব্দের সঙ্গে এন বিভক্তি যুক্ত হয়ে পৃথক্ত্বেন রূপটি গঠিত হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় পৃথকত্বের দ্বারা, পৃথকভাবে অথবা পৃথকতার দৃষ্টিতে। তাই শব্দটির মধ্যে শুধু বাহ্যিকভাবে আলাদা থাকার ধারণা নেই। এর মধ্যে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির ধারণাও রয়েছে। মানুষ যখন কোনো বিষয়কে তার সামগ্রিক সম্পর্কের পরিবর্তে আলাদা একটি সত্তা হিসেবে দেখে, তখন সে পৃথক্ত্বের দৃষ্টিতে বিষয়টিকে উপলব্ধি করছে। এই কারণে পৃথক্ত্বেন শব্দটি ভাষাগত অর্থের পাশাপাশি জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক অর্থেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই শ্লোকের যজ্জ্ঞানম্ শব্দটির অর্থ হলো যে জ্ঞান। জ্ঞান শব্দটি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। জানা, বোঝা, উপলব্ধি করা এবং সত্যকে চিনতে পারা এই ধাতুর মূল ভাব। গীতার ভাষায় জ্ঞান কেবল কিছু তথ্য সংগ্রহ করার নাম নয়। জ্ঞান হলো বাস্তবতাকে দেখার একটি পদ্ধতি। একজন মানুষ কী দেখছে তার পাশাপাশি সে কীভাবে দেখছে সেটিও জ্ঞানের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। তাই একই পৃথিবীকে দুইজন মানুষ দুইভাবে দেখতে পারে। একজন মানুষের চোখে পৃথিবী হলো পৃথক পৃথক ব্যক্তি ও স্বার্থের সমষ্টি। অন্যজন সেই পৃথক ব্যক্তিদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্পর্ক, নির্ভরতা এবং গভীরতর ঐক্য উপলব্ধি করতে পারে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি রাজসিক জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়, আর দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সাত্ত্বিক জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হয়।
নানাভাবান্ শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। নানা অর্থ বহু প্রকার বা বিভিন্ন এবং ভাব শব্দের মধ্যে অবস্থা, সত্তা, প্রকৃতি বা অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে। ফলে নানাভাবান্ বলতে বিভিন্ন প্রকার সত্তা বা নানা ধরনের অস্তিত্বকে বোঝানো হয়েছে। পৃথগ্বিধান্ শব্দের অর্থ হলো বিভিন্ন প্রকার পৃথক রূপে অবস্থিত। এই দুটি শব্দ একত্রে বোঝাচ্ছে যে রাজসিক জ্ঞান জগতের বিভিন্নতা এবং পৃথক বৈশিষ্ট্যকে খুব তীব্রভাবে উপলব্ধি করে। সে মানুষের মধ্যে পার্থক্য দেখে, জীবের মধ্যে পার্থক্য দেখে, ক্ষমতার পার্থক্য দেখে, সম্পদের পার্থক্য দেখে এবং পরিচয়ের পার্থক্য দেখে। এই দেখার মধ্যে বাস্তবতার একটি অংশ অবশ্যই রয়েছে। কারণ জগতের বাহ্যিক স্তরে বৈচিত্র্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো বাহ্যিক বৈচিত্র্যকে বাস্তবতার সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বেত্তি শব্দের অর্থ জানে বা উপলব্ধি করে। এখানে কৃষ্ণের বক্তব্যের সূক্ষ্মতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি বলেননি যে রাজসিক জ্ঞান সম্পূর্ণ মিথ্যা বিষয়কে সত্য বলে জানে। বরং তিনি বলেছেন যে এই জ্ঞান সমস্ত জীবের মধ্যে নানা পৃথক সত্তাকে পৃথকভাবে দেখে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল জ্ঞানের বিষয়বস্তুতে নয়, জ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতেও রয়েছে। পার্থক্য দেখা ভুল নয়। কিন্তু পার্থক্যকেই যদি চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করা হয়, তখন জ্ঞান অসম্পূর্ণ হয়ে যায়। মানুষ তখন অন্যের মধ্যে নিজের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো গভীর সত্য দেখতে পারে না। সে অন্যকে কেবল অন্য হিসেবে দেখে। এখানেই পৃথক্ত্বেন শব্দটির প্রকৃত দার্শনিক গুরুত্ব প্রকাশিত হয়।
সর্বেষু ভূতেষু শব্দের অর্থ হলো সকল জীবের মধ্যে। এখানে ভূত শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে অস্তিত্ব লাভ করার ধারণা রয়েছে। তাই ভূত বলতে শুধু অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তাকে বোঝায় না। গীতার এই প্রসঙ্গে ভূত বলতে সমস্ত জীবিত ও অস্তিত্বশীল সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। কৃষ্ণ বলছেন যে রাজসিক জ্ঞান সমস্ত জীবের মধ্যেই পৃথকত্বকে বিশেষভাবে দেখতে থাকে। অর্থাৎ মানুষের বিভাজনমুখী দৃষ্টি কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সে সমগ্র অস্তিত্বকেই নানা পৃথক সত্তার সমষ্টি হিসেবে দেখতে পারে।
রাজসম্ শব্দটি এসেছে রজঃ থেকে। গীতার গুণতত্ত্বে রজঃ হলো ক্রিয়া, আকাঙ্ক্ষা, স্পৃহা, আবেগ, অস্থিরতা এবং বাহ্যিক সাফল্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রাজসিক মানেই খারাপ এমন নয়। রজঃ মানুষের কর্মশক্তি জাগিয়ে তোলে, তাকে উদ্যোগী করে এবং তাকে পরিবর্তনের দিকে চালিত করে। কিন্তু যখন এই প্রবণতা অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। নিজের সাফল্যকে অন্যের ব্যর্থতার সঙ্গে এবং নিজের লাভকে অন্যের ক্ষতির সঙ্গে বিচার করতে থাকে। তখন পৃথকত্বের অনুভূতি শক্তিশালী হয়। এই কারণেই পৃথকত্বের দৃষ্টিকে রাজসিক জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সাত্ত্বিক জ্ঞান এবং রাজসিক জ্ঞানের পার্থক্য বোঝার জন্য অষ্টাদশ অধ্যায়ের পরপর তিনটি শ্লোক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশতম শ্লোকে বলা হয়েছে যে সাত্ত্বিক জ্ঞান বহু জীবের মধ্যে এক অবিনশ্বর তত্ত্বকে উপলব্ধি করে। একুশতম শ্লোকে বলা হয়েছে যে রাজসিক জ্ঞান সেই জীবগুলোর মধ্যে পৃথক পৃথক সত্তা ও বৈচিত্র্যকে দেখে। বাইশতম শ্লোকে তামসিক জ্ঞান একটি সীমিত বিষয়কে সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে করে। তাই এই তিনটি জ্ঞানকে একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায় যে গীতা মানুষের উপলব্ধির তিনটি স্তর দেখাচ্ছে। সাত্ত্বিক জ্ঞান ঐক্যের মধ্যে বৈচিত্র্য উপলব্ধি করে। রাজসিক জ্ঞান বৈচিত্র্য ও পৃথকত্বকে প্রধান করে দেখে। তামসিক জ্ঞান সীমিত অংশের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। রাজসিক জ্ঞানকে বুঝতে গিয়ে পৃথকত্বকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা উচিত নয়। কারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই পৃথক পরিচয়ের প্রয়োজন রয়েছে। একজন শিক্ষককে বুঝতে হয় কোন ছাত্রের কোন ক্ষমতা। একজন চিকিৎসককে প্রত্যেক রোগীর পৃথক অবস্থা বুঝতে হয়। একজন প্রশাসককে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন বিবেচনা করতে হয়। একজন মানুষকেও নিজের কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। এই অর্থে পার্থক্য উপলব্ধি করা জ্ঞানের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেই পার্থক্যের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যকে ভুলে যাওয়া হলো সীমাবদ্ধতা। তাই গীতার শিক্ষা হলো পার্থক্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং পার্থক্যের মধ্যেও গভীরতর সম্পর্ককে উপলব্ধি করা।
এই সত্যকে সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা দিয়ে বোঝা যায়। সমুদ্রের মধ্যে অসংখ্য তরঙ্গ রয়েছে। প্রতিটি তরঙ্গের আকার আলাদা, গতি আলাদা এবং স্থায়িত্ব আলাদা। একটি তরঙ্গ অন্য তরঙ্গের তুলনায় নিজেকে বড় মনে করতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে সব তরঙ্গই জলের প্রকাশ। তরঙ্গের পৃথকত্ব বাহ্যিকভাবে সত্য হলেও তার গভীরতর অস্তিত্ব জলের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। রাজসিক জ্ঞান তরঙ্গের পার্থক্যকে প্রবলভাবে দেখে। সাত্ত্বিক জ্ঞান তরঙ্গের পার্থক্য দেখেও ভুলে যায় না যে প্রত্যেকটির অন্তর্নিহিত সত্তা একই জলের প্রকাশ। এই উপমাই পৃথক্ত্বেন শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।
মানবজীবনে পৃথকত্বের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় অহংকার সৃষ্টি করে। মানুষ ভাবতে শুরু করে আমি অন্যদের থেকে আলাদা, আমার স্বার্থ অন্যদের থেকে আলাদা এবং অন্যের সাফল্য আমার জন্য হুমকি। এখান থেকেই প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, হিংসা এবং সংঘাতের জন্ম হতে পারে। একটি কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মী যদি সহকর্মীকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, তাহলে তার কাছে অন্যের উন্নতি নিজের ক্ষতি বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যদি সে বুঝতে পারে যে প্রত্যেকের দক্ষতা আলাদা হলেও বৃহত্তর প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সঙ্গে সবাই পরস্পর সম্পর্কিত, তাহলে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরও বিস্তৃত হয়। এই পরিবর্তনই পৃথকত্বের সংকীর্ণতা থেকে সম্পর্কের বৃহত্তর উপলব্ধির দিকে যাত্রা।
মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও পৃথক্ত্বেন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই জগতকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে। আমি এবং তুমি, আমাদের দল এবং অন্য দল, সফল এবং ব্যর্থ, আপন এবং পর এই ধরনের বিভাজন মানুষের চিন্তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। এই শ্রেণিবিন্যাস কখনও কখনও প্রয়োজনীয়ও হয়। কিন্তু যখন এই বিভাজন মানুষের চেতনার প্রধান ভিত্তি হয়ে যায়, তখন অন্যকে মানুষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে একটি পরিচয় হিসেবে দেখা শুরু হয়। তখন সহমর্মিতা কমে যায় এবং বিরোধ বৃদ্ধি পায়। গীতার রাজসিক জ্ঞানের ধারণাকে এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার আলোকে দেখলে এর আধুনিক প্রাসঙ্গিকতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ আরও গভীর হয়। অদ্বৈত দর্শনে বহুর মধ্যে এক ব্রহ্মতত্ত্ব উপলব্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। জগতে অসংখ্য নাম ও রূপ দেখা গেলেও চূড়ান্ত সত্যের স্তরে একত্ব উপলব্ধি করা হয়। সেই দৃষ্টিতে রাজসিক জ্ঞান হলো নাম ও রূপের পার্থক্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। তবে অন্যান্য বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যায় পার্থক্যের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে দেখা হয়। তাই এই শ্লোককে কেবল পার্থক্য অস্বীকারের শিক্ষা হিসেবে দেখা যথার্থ নয়। বরং বলা যায় যে কৃষ্ণ এমন একটি জ্ঞানকে নির্দেশ করছেন যেখানে পার্থক্যকে দেখা হয় কিন্তু সেই পার্থক্যের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক ও বৃহত্তর সত্যকে উপেক্ষা করা হয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে পৃথক্ত্বেন মানুষের অহংচেতনার একটি প্রতীক। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, নাম, পরিচয়, সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখে, তখন তার কাছে অন্য সব সত্তা পৃথক হয়ে ওঠে। সে ভাবে আমি একদিকে এবং পৃথিবী অন্যদিকে। কিন্তু আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান তাকে প্রশ্ন করতে শেখায় যে এই পৃথকতার অনুভূতি কি সম্পূর্ণ সত্য। আমি যে বায়ু গ্রহণ করছি তা বৃক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি যে খাদ্য গ্রহণ করছি তা অসংখ্য জীব ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার জীবন পরিবার, সমাজ এবং সমগ্র প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত। এই উপলব্ধি মানুষকে পৃথকত্বের সংকীর্ণতা থেকে পারস্পরিক নির্ভরতার বৃহত্তর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও পৃথকত্ব একটি শক্তিশালী প্রতীক। সাহিত্যের বহু চরিত্র নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য বলে আমি অন্যদের মতো নই। এই স্বাতন্ত্র্য কখনও সৃজনশীলতার শক্তি হয়ে ওঠে, আবার কখনও অহংকার ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়। মানুষের জীবনের একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো আমি কে এবং অন্যের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী। পৃথক্ত্বেন শব্দটি এই দুই প্রশ্নের মধ্যে প্রথমটির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণের বিপদকে নির্দেশ করতে পারে। নিজের স্বাতন্ত্র্যকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন, কিন্তু সেই স্বাতন্ত্র্যের কারণে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করা জ্ঞানের পরিপূর্ণতা নয়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা হলো বৈচিত্র্যকে অস্বীকার না করেও ঐক্যকে উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীতে মানুষ আলাদা, জীব আলাদা, প্রকৃতির প্রকাশ আলাদা এবং প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা। কিন্তু এই পার্থক্যের মধ্যেও একটি গভীর আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। একটি বৃক্ষ একা বেঁচে থাকে না। তার জীবন মাটি, জল, আলো, বায়ু এবং অসংখ্য জীবের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষও একা নয়। তার অস্তিত্ব পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি এবং বৃহত্তর জীবনের সঙ্গে যুক্ত। তাই পৃথকত্ব বাস্তবতার একটি স্তর হলেও সম্পর্ক ও ঐক্য তার আরও বিস্তৃত উপলব্ধি।
এই অর্থে বলা যায় যে রাজসিক জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিকে বহির্মুখী করে এবং তাকে বৈচিত্র্য, পার্থক্য ও পৃথক পরিচয়ের দিকে আকৃষ্ট করে। এই জ্ঞান কর্মজীবনে প্রয়োজনীয় সক্রিয়তা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু যদি এর সঙ্গে আত্মকেন্দ্রিকতা ও আসক্তি যুক্ত হয়, তবে মানুষ নিজের স্বার্থের বাইরে দেখতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সাত্ত্বিক জ্ঞান সেই সীমাকে অতিক্রম করে। সে পৃথক সত্তাগুলিকে অস্বীকার করে না, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য অনুভব করে। তাই আধ্যাত্মিক পরিপক্বতা হলো পৃথকত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং পৃথকত্বের মধ্যেও ঐক্যের সত্যকে উপলব্ধি করা।
সবশেষে বলা যায়, “পৃথক্ত্বেন তু যজ্জ্ঞানং” শ্লোকাংশের মধ্যে মানুষের জ্ঞান ও চেতনার একটি গভীর রহস্য নিহিত রয়েছে। পৃথক্ত্বেন অর্থ কেবল পৃথকভাবে নয়, পৃথকত্বের দৃষ্টিতে। এই পৃথকত্ব যখন কেবল বাহ্যিক বৈচিত্র্যকে বোঝার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয়। কিন্তু যখন পৃথকত্বই অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য বলে মনে হয়, তখন জ্ঞান রাজসিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ হয়ে যায়। গীতার শিক্ষা আমাদের আরও বিস্তৃত দৃষ্টির দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে, জীবকে জীব হিসেবে এবং প্রকৃতিকে প্রকৃতি হিসেবে পৃথকভাবে চিনব, কিন্তু একই সঙ্গে উপলব্ধি করব যে এই অসংখ্য পৃথক প্রকাশ এক বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো পার্থক্যকে অস্বীকার করা নয় এবং পৃথকত্বে আটকে থাকাও নয়। বরং বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে ঐক্যকে এবং পৃথক সত্তার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সম্পর্ককে উপলব্ধি করাই জ্ঞানের পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!