ভগবদ্গীতা ১৮.২২ — সংকীর্ণ ও অসম্পূর্ণ উপলব্ধি: তামসিক জ্ঞানের প্রকৃতি
যত্তু কৃৎস্নবদেকস্মিন কার্যে সক্তমহৈতুকম্।
অতত্ত্বার্থবদল্পং চ তত্তামসমুদাহৃতম্।।২২।।
অনুবাদঃ আর যে জ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত তত্ত্ব অবগত না হয়ে, কোন একটি বিশেষ কার্যে পরিপূর্ণের ন্যায় আসক্তির উদয় হয়, সেই তুচ্ছ জ্ঞানকে তামসিক জ্ঞান বলে কথিত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের দ্বাবিংশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের জ্ঞানের একটি বিশেষ সীমাবদ্ধ রূপকে তামসিক জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো, “যত্তু কৃৎস্নবদেকস্মিন্ কার্যে সক্তমহৈতুকম্। অতত্ত্বার্থবদল্পং চ তত্তামসমুদাহৃতম্।” এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়েছেন যে জ্ঞান কেবল কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা নয়। জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে মানুষ সেই বিষয়কে কতটা বিস্তৃতভাবে, যুক্তিসংগতভাবে এবং তার প্রকৃত স্বরূপের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উপলব্ধি করতে পারছে তার ওপর। যে জ্ঞান একটি সীমিত বিষয়কে সমগ্র সত্য বলে ধরে নেয়, যার মধ্যে যথার্থ কারণ অনুসন্ধানের প্রবণতা নেই, যা কোনো বিষয়ের গভীর তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে না এবং যা সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, সেই জ্ঞানকে গীতা তামসিক জ্ঞান বলে অভিহিত করেছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কৃৎস্নবৎ। কৃৎস্ন শব্দের অর্থ সমগ্র, সম্পূর্ণ, সর্বাঙ্গীন বা সমস্ত। এর সঙ্গে বৎ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে কৃৎস্নবৎ এমন একটি ভাব প্রকাশ করে যার অর্থ সমগ্রের মতো বা যেন সম্পূর্ণটাই। কিন্তু শ্লোকের প্রসঙ্গে এর গভীর অর্থ হলো একটি সীমিত বিষয়কে এমনভাবে গ্রহণ করা যেন সেটিই সমগ্র বাস্তবতা। অর্থাৎ কোনো বিষয়ের একটি অংশকে উপলব্ধি করে সেই অংশকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে করা। এই প্রবণতা মানুষের জ্ঞানকে সংকুচিত করে এবং বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতি তার দৃষ্টিকে বন্ধ করে দেয়। মানুষ যখন নিজের সীমিত অভিজ্ঞতা, মতামত বা উপলব্ধিকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেয়, তখন তার জ্ঞান আর অনুসন্ধানী থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠে আত্মনির্ভর, সংকীর্ণ এবং অনেক সময় অন্ধ বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল।
এরপর এসেছে একস্মিন্ কার্যে। একস্মিন্ শব্দের অর্থ একটি বা একটির মধ্যে এবং কার্য শব্দের অর্থ কাজ, করণীয় বিষয়, কর্ম বা সম্পাদনীয় কার্য। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট কাজ বা বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। এই শব্দযুগল বোঝায় যে তামসিক জ্ঞান বৃহত্তর বাস্তবতাকে দেখার পরিবর্তে কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের মধ্যে আটকে থাকে। কোনো একটি কাজ মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কোনো একটি বিশ্বাস সত্যের একটি দিক প্রকাশ করতে পারে অথবা কোনো একটি অভিজ্ঞতা গভীর শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু সেই একটি বিষয়কে সমগ্র জীবন, সমগ্র সত্য বা সমস্ত বাস্তবতার একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা জ্ঞানের সংকীর্ণতার পরিচয়।
সক্তম্ শব্দটি এই সীমাবদ্ধতার সঙ্গে আসক্তির বিষয়টি যুক্ত করেছে। সক্ত শব্দের মধ্যে লেগে থাকা, সংযুক্ত থাকা, আসক্ত হওয়া এবং কোনো কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে আবদ্ধ থাকার অর্থ রয়েছে। এখানে আসক্তি বলতে কেবল ভালোবাসা বোঝানো হয় না। বরং এমন মানসিক আবদ্ধতা বোঝানো হয় যার ফলে মানুষ কোনো একটি ধারণা বা বিষয়ের বাইরে দেখতে অক্ষম হয়ে পড়ে। একজন মানুষ কোনো একটি মতবাদ, পেশা, পরিচয়, স্বার্থ বা বিশ্বাসের সঙ্গে এমনভাবে নিজেকে একাত্ম করে ফেলতে পারে যে তার কাছে সেই বিষয়ের বাইরে আর কোনো সত্যের অস্তিত্বই যেন থাকে না। তখন জ্ঞান মুক্তির পথ না হয়ে আবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অহৈতুকম্। এই শব্দটি অ এবং হেতু ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। হেতু অর্থ কারণ, যুক্তি বা ভিত্তি। সেই অর্থে অহৈতুক অর্থ কারণবোধহীন বা যথার্থ যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে কারণহীনতা বলতে শুধু কোনো কিছুর কোনো কারণ নেই এমন বোঝানো হয় না। বরং বোঝানো হয় যে মানুষ কোনো বিষয়কে গ্রহণ করার আগে তার কারণ, প্রমাণ, সম্পর্ক এবং প্রকৃত ভিত্তি অনুসন্ধান করছে না। সে যা দেখছে সেটিকেই সত্য বলে ধরে নিচ্ছে এবং তার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজন অনুভব করছে না। এই কারণেই তামসিক জ্ঞান অনেক সময় অন্ধবিশ্বাস, গোঁড়ামি এবং মানসিক জড়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।
অতত্ত্বার্থবৎ শব্দটি শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতা আরও বৃদ্ধি করেছে। তত্ত্ব শব্দের অর্থ প্রকৃত সত্য, বাস্তব স্বরূপ, মৌলিক সত্য বা কোনো বিষয়ের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি। অর্থ শব্দের মধ্যে বিষয়ের মর্ম, উদ্দেশ্য, তাৎপর্য বা প্রকৃত অর্থের ধারণা রয়েছে। অতত্ত্বার্থবৎ বলতে তাই এমন জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে যা কোনো বিষয়ের প্রকৃত তত্ত্ব বা গভীর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে না। বাহ্যিক রূপ দেখা এবং তার অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। মানুষ কোনো ঘটনার বাহ্যিক রূপ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে, কিন্তু সেই ঘটনার কারণ, পরিণতি এবং বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক বুঝতে না পারলে সেই জ্ঞান এখনো পূর্ণ জ্ঞান হয়ে ওঠে না।
অল্পম্ শব্দটি এই জ্ঞানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। অল্প অর্থ সামান্য, সীমিত, ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ। কিন্তু এখানে অল্প শব্দকে কেবল জ্ঞানের পরিমাণ কম বোঝালে শ্লোকটির গভীরতা যথাযথভাবে ধরা যায় না। এখানে অল্প মূলত জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতার সংকীর্ণতা বোঝায়। একজন মানুষ প্রচুর তথ্য জানতে পারে এবং তবুও তার জ্ঞান তামসিক হতে পারে, যদি সে সেই তথ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক, সীমা এবং গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে না পারে। তাই তথ্যের পরিমাণ এবং জ্ঞানের গভীরতা এক জিনিস নয়। বহু তথ্য জানা এবং সত্যকে উপলব্ধি করা একই বিষয় নয়।
এই সমস্ত শব্দ একত্রে একটি সম্পূর্ণ মানসিক অবস্থার ছবি তৈরি করে। একজন মানুষ কোনো একটি বিষয়কে সমগ্র সত্য বলে মনে করছে, সেই বিষয়ের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত হয়ে আছে, তার কারণ ও ভিত্তি অনুসন্ধান করছে না, তার প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারছে না এবং সীমিত জ্ঞানকেই সম্পূর্ণ জ্ঞান বলে মনে করছে। এই অবস্থাকেই শ্রীকৃষ্ণ তামসিক জ্ঞান বলেছেন। এখানে তামসিক শব্দটি তমস থেকে এসেছে। তমস অর্থ অন্ধকার এবং ভারতীয় দর্শনে তমোগুণের সঙ্গে অজ্ঞতা, জড়তা, মোহ, অবিদ্যা ও আচ্ছন্নতার সম্পর্ক রয়েছে। তাই তামসিক জ্ঞান এমন জ্ঞান যা মানুষের সামনে সত্যকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ না করে বরং সত্যের ওপর অজ্ঞতার আবরণ সৃষ্টি করে।
এই শ্লোকের প্রকৃত তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয় যখন এটিকে অষ্টাদশ অধ্যায়ের পূর্ববর্তী দুটি শ্লোকের সঙ্গে দেখা হয়। গীতার বিশতম শ্লোকে সাত্ত্বিক জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যেখানে বহুর মধ্যে এক অবিভক্ত সত্যকে উপলব্ধি করা হয়। একুশতম শ্লোকে রাজসিক জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সত্তা ও বস্তুকে পৃথক পৃথকভাবে দেখা হয়। আর দ্বাবিংশ শ্লোকে তামসিক জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যেখানে একটি সীমিত বিষয়কে সমগ্র বলে ধরে নেওয়া হয়। এই তিনটি অবস্থাকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায় যে সাত্ত্বিক জ্ঞান বাস্তবতার অন্তর্নিহিত ঐক্যকে উপলব্ধি করে, রাজসিক জ্ঞান বহুত্ব ও পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয় এবং তামসিক জ্ঞান সীমিত কোনো অংশকে সমগ্র বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে।
তামসিক জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তাই শুধু কম জানা নয়। বরং কম জানাকে সম্পূর্ণ জানা বলে মনে করা। অল্প জ্ঞান নিজে কোনো অপরাধ নয়। মানুষ স্বভাবতই সীমিত এবং কোনো মানুষই সমস্ত কিছু জানে না। প্রকৃত জ্ঞানের লক্ষণ হলো নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা এবং নতুন সত্য অনুসন্ধানের জন্য মনকে উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু যখন মানুষ তার সীমিত জ্ঞানকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে এবং অন্য কোনো দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তখন সেই সীমাবদ্ধতা তামসিকতার রূপ নিতে পারে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি জ্ঞানতত্ত্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। বাস্তবতা বহুমাত্রিক এবং জটিল। কিন্তু মানুষ প্রায়ই জটিল বাস্তবতাকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চায়। অর্থই জীবনের সবকিছু, ক্ষমতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, একটি নির্দিষ্ট মতবাদই সমস্ত সত্য অথবা একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতাই মানুষের জীবনের সম্পূর্ণ অর্থ এই ধরনের ধারণা তখনই সমস্যাজনক হয়ে ওঠে যখন কোনো একটি সত্যের অংশকে সমগ্র সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। একটি অংশ সত্য হতে পারে, কিন্তু অংশ সত্য হওয়া এবং সমগ্র সত্য হওয়া এক বিষয় নয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি উপলব্ধি করতে না পারাই তামসিক জ্ঞানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। অদ্বৈত দর্শন নাম ও রূপের বৈচিত্র্যের অন্তরালে একটি মৌলিক ঐক্যের কথা বলে। বাহ্যিক পার্থক্যকে অস্বীকার না করেও তার অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করা এখানে জ্ঞানের উচ্চতর রূপ। তামসিক জ্ঞান তার বিপরীত দিকে কাজ করে। এটি অংশের মধ্যে আটকে থাকে এবং অংশের বাইরে বৃহত্তর সত্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। ফলে মানুষের চেতনা নিজের সীমিত ধারণার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে তামসিকতার সঙ্গে আচ্ছাদনের ধারণা যুক্ত করা যায়। সত্ত্ব জ্ঞানের স্বচ্ছতা ও প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত, রজঃ গতি ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তমঃ জড়তা ও আচ্ছাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তামসিক জ্ঞান তাই বাস্তবতাকে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ না করে তার ওপর এক ধরনের মানসিক অন্ধকার সৃষ্টি করে। মানুষ যা দেখছে তার বাইরে আরও কিছু থাকতে পারে এই সম্ভাবনাটিও সে স্বীকার করতে চায় না। ফলে তার জ্ঞান অনুসন্ধান থেকে বিশ্বাসে এবং বিশ্বাস থেকে গোঁড়ামিতে পরিণত হতে পারে।
এই শ্লোকের সঙ্গে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে মানুষ কখনো নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্য বেশি গ্রহণ করে এবং বিপরীত তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে। কখনো জটিল ঘটনাকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করে। কখনো একটি অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ মানুষ বা একটি বৃহৎ গোষ্ঠী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আবার কখনো নিজের কোনো একটি পরিচয়কে নিজের সমগ্র সত্তা বলে মনে করে। গীতার তামসিক জ্ঞানের ধারণার সঙ্গে এসব প্রবণতার তুলনা করা যায়। কারণ প্রত্যেক ক্ষেত্রেই একটি সীমিত উপলব্ধি বৃহত্তর বাস্তবতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই ধারণার ব্যাপক তাৎপর্য রয়েছে। সাহিত্যে অনেক চরিত্র নিজের সীমিত অভিজ্ঞতাকে পৃথিবীর একমাত্র সত্য বলে মনে করে এবং সেই সংকীর্ণতার কারণে সংঘাত বা পতনের দিকে এগিয়ে যায়। মানুষের জীবনের ট্র্যাজেডির একটি কারণ প্রায়ই এই যে সে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে অন্য বাস্তবতা দেখতে পারে না। সে নিজের অভিজ্ঞতাকে সত্য মনে করতে পারে, কিন্তু অন্যের অভিজ্ঞতাকে সত্য হিসেবে স্বীকার করতে পারে না। ফলে সত্যের বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়।
একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যায়। ধরা যাক একজন মানুষ একটি বিশাল বনের মধ্যে প্রবেশ করল এবং সেখানে একটি মাত্র গাছ দেখল। সে যদি বলে এই গাছটাই পুরো বন, তবে সে যা দেখেছে তা মিথ্যা নয়। গাছ সত্যিই বনের অংশ। কিন্তু গাছটিকে পুরো বন মনে করাই তার ভুল। তামসিক জ্ঞানও ঠিক এমন। এটি সবসময় সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। বরং এর মধ্যে আংশিক সত্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই আংশিক সত্যকে সমগ্র সত্য বলে ধরে নেওয়ার কারণে জ্ঞান বিকৃত হয়ে যায়।
মানবজীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। কেউ যদি মনে করে অর্থই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য, তবে সে জীবনের একটি বাস্তব প্রয়োজনকে সমগ্র জীবনের অর্থে পরিণত করছে। কেউ যদি নিজের পেশাকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে, তবে সে নিজের মানবিক, পারিবারিক, নৈতিক ও সৃজনশীল সত্তাকে সংকুচিত করছে। কেউ যদি নিজের ধর্মীয় আচরণের একটি অংশকে সম্পূর্ণ ধর্ম বলে মনে করে এবং ধর্মের নৈতিকতা, আত্মসংযম, জ্ঞান ও আত্মোপলব্ধিকে উপেক্ষা করে, তাহলেও একই ধরনের সংকীর্ণতা দেখা দিতে পারে। আবার কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক মতকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যে নিজের পক্ষের সবকিছুকে সঠিক এবং অন্য পক্ষের সবকিছুকে ভুল মনে করে, তাহলেও একটি সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি সমগ্র সত্যকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
এই কারণে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় সাধনার জন্য নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে। এটি আমাদের শেখায় যে কোনো বিষয় সম্পর্কে দৃঢ় মত থাকা এবং সেই মতকে চূড়ান্ত সত্য মনে করা এক জিনিস নয়। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা মানে নিজের সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করা। একজন সত্যসন্ধানী মানুষ প্রশ্ন করতে জানে, নিজের ভুল স্বীকার করতে জানে এবং নতুন তথ্যের আলোকে নিজের ধারণা সংশোধন করতে প্রস্তুত থাকে। তামসিক মন এই উন্মুক্ততা হারিয়ে ফেলে।
শ্লোকটির আধ্যাত্মিক শিক্ষা তাই অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এটি আমাদের কোনো বিষয়কে তুচ্ছ করতে বলে না। বরং বলে যে কোনো সীমিত বিষয়কে তার যথাযথ অবস্থানে রাখতে হবে। অর্থের গুরুত্ব আছে, কিন্তু অর্থই সবকিছু নয়। কর্মের গুরুত্ব আছে, কিন্তু কর্মই মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কেবল তথ্যের সঞ্চয়ই জ্ঞান নয়। ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ধর্মের বাহ্যিক রূপের মধ্যে তার সম্পূর্ণ সত্যকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের নিজস্ব মূল্য আছে, কিন্তু কোনো একটি ক্ষেত্রকে সমগ্র সত্যের আসনে বসিয়ে দিলে দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে যায়।
এই শ্লোকের একটি গভীরতম শিক্ষা হলো যে সত্যের অনুসন্ধানে বিনয় অপরিহার্য। যে মানুষ জানে যে তার জ্ঞান সীমিত, সে আরও জানতে পারে। যে মানুষ মনে করে সে সব জানে, তার শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাই তামসিক জ্ঞানের বিপরীতে জ্ঞানের প্রকৃত অগ্রগতি শুরু হয় তখনই যখন মানুষ নিজের উপলব্ধির সীমা দেখতে শেখে। নিজের দেখা অংশকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেই অংশকে বৃহত্তর সমগ্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হলো পরিণত জ্ঞানের লক্ষণ।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য, ছবি, ভিডিও ও মতামতের মুখোমুখি হয়। একটি ছোট ঘটনা, একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য বা একটি বিচ্ছিন্ন তথ্য দেখে মানুষ কখনো কখনো পুরো ঘটনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু কোনো বিষয়ের একটি অংশ দেখা এবং পুরো সত্য জানা এক নয়। গীতার এই শ্লোক আমাদের সেই কারণেই সতর্ক করে যে সত্যের কোনো একটি অংশকে পুরো সত্য বলে ধরে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের দ্বাবিংশ শ্লোক মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এক অসাধারণ দার্শনিক শিক্ষা প্রদান করে। কৃৎস্নবৎ আমাদের দেখায় কীভাবে একটি অংশকে সমগ্র বলে মনে করা হয়। একস্মিন্ কার্যে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সেই দৃষ্টি একটি সীমিত বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ। সক্তম্ সেই বিষয়ের প্রতি অন্ধ আসক্তির কথা বলে। অহৈতুকম্ যথার্থ কারণ ও বিচার অনুসন্ধানের অভাবকে প্রকাশ করে। অতত্ত্বার্থবৎ জানায় যে বাহ্যিক উপলব্ধি থাকলেও প্রকৃত তত্ত্বের মর্ম অনুধাবিত হয়নি। অল্পম্ জ্ঞানের সংকীর্ণতা প্রকাশ করে এবং তামসম্ জানায় যে এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য তমোগুণজাত অজ্ঞতা ও মোহের সঙ্গে যুক্ত।
এই শ্লোকের গভীরতম প্রশ্ন তাই আমাদের প্রত্যেকের জন্য প্রযোজ্য। আমরা কি সত্যকে তার পূর্ণতার মধ্যে দেখতে চেষ্টা করছি, নাকি সত্যের একটি ছোট অংশকে সমগ্র সত্য বলে ধরে নিয়েছি। আমরা কি প্রশ্ন করছি, নাকি শুধু বিশ্বাস করছি। আমরা কি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করছি, নাকি নিজের সীমিত জ্ঞানকেই চূড়ান্ত বলে মনে করছি। গীতার শিক্ষা হলো সত্যের পথে এগিয়ে যেতে হলে অংশকে অংশ হিসেবে দেখতে হবে এবং তাকে সমগ্র বলে ভুল করা যাবে না। কারণ জ্ঞানের প্রকৃত পরিণতি কেবল বেশি জানা নয়, বরং যা জানা হয়েছে তার সীমা উপলব্ধি করে বৃহত্তর সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এই কারণেই একটি সীমিত বিষয়কে সমগ্র সত্য বলে আঁকড়ে ধরা তামসিক জ্ঞানের লক্ষণ এবং সত্যের বহুমাত্রিকতা উপলব্ধি করা জ্ঞানের পরিপক্বতার লক্ষণ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!