ভগবদ্গীতা ১৮.২৬ — অনাসক্ত, অহংকারমুক্ত ও সমভাবসম্পন্ন সাত্ত্বিক কর্তার লক্ষণ
মুক্তাসঙ্গোহনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।২৬।।
অনুবাদঃ সমস্ত জড় আসক্তি থেকে মুক্ত, অহঙ্কারশুন্য, ধৃতি ও উৎসাহ সমন্বিত এবং সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে নির্বিকার- এরূপ কর্তাকেই সাত্ত্বিক বলা হয়।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ছাব্বিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কর্মজীবনের একটি অত্যন্ত গভীর সত্য তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো “মুক্তসঙ্গোহনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে”। এর সরল অর্থ হলো, যে ব্যক্তি কর্মের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত, অহংকারবশত নিজেকে একমাত্র কর্তা বলে মনে করে না, ধৈর্য ও উৎসাহে পরিপূর্ণ থাকে এবং সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয় অবস্থাতেই মানসিকভাবে স্থির থাকে, সেই কর্তাকে সাত্ত্বিক কর্তা বলা হয়। এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের কর্মজীবন, মানসিক গঠন, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে শুধু কী কাজ করা হচ্ছে তা নয়, বরং কোন মানসিকতা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, সেই বিষয়টিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো মুক্তসঙ্গ। মুক্তসঙ্গ শব্দটি মূলত মুক্ত এবং সঙ্গ এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। মুক্ত শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত মুচ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মূল অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া, মুক্ত করা বা বন্ধন থেকে অবমুক্ত করা। অন্যদিকে সঙ্গ বলতে বোঝায় সংযোগ, সংসর্গ, আসক্তি বা কোনো কিছুর সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে পড়া যার কারণে নিজের মানসিক স্বাধীনতা নষ্ট হয়। সুতরাং মুক্তসঙ্গ বলতে বোঝায় এমন একজন মানুষ, যিনি কর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকেন কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তিতে আবদ্ধ হন না। এর অর্থ কোনো সম্পর্ক ত্যাগ করা নয় এবং সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়াও নয়। বরং এর অর্থ হলো সম্পর্কের মধ্যে থেকেও অন্তরের স্বাধীনতা বজায় রাখা। একজন মানুষ পরিবারকে ভালোবাসতে পারেন, নিজের কাজকে আন্তরিকভাবে করতে পারেন, জীবনের সাফল্য কামনা করতে পারেন, কিন্তু সেই সাফল্য বা সম্পর্ককে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি বানাবেন না। এখানেই মুক্তসঙ্গের প্রকৃত তাৎপর্য।
মুক্তসঙ্গের গভীর অর্থ বোঝার জন্য কর্ম এবং কর্মফলের পার্থক্য উপলব্ধি করা জরুরি। মানুষ নিজের প্রচেষ্টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু সবসময় ফলাফলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একজন ছাত্র নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে, কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল তার প্রত্যাশামতো নাও হতে পারে। একজন ব্যবসায়ী পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করতে পারেন, কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি সবসময় তার অনুকূলে থাকবে না। একজন শিল্পী তার সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় সম্পন্ন করতে পারেন, কিন্তু দর্শকের প্রতিক্রিয়া তার হাতে থাকে না। মুক্তসঙ্গের শিক্ষা হলো নিজের কর্তব্য ও প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া, কিন্তু ফলাফলকে আঁকড়ে ধরে নিজের শান্তি নষ্ট না করা।
এরপর আসে অনহংবাদী শব্দটি। অনহংবাদী বলতে বোঝায় যে ব্যক্তি অহংকারপূর্ণভাবে নিজেকে সর্বময় কর্তা বলে দাবি করেন না। এখানে অহং শব্দটি শুধু সাধারণ অর্থে আত্মপরিচয় নয়, বরং সেই মানসিক প্রবণতা যেখানে মানুষ মনে করে সবকিছু তার নিজের শক্তি, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত কৃতিত্বের ফল। অনহংবাদী ব্যক্তি নিজের কর্মের দায়িত্ব এড়িয়ে যান না। তিনি কাজ করেন, সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজের কর্তব্য পালন করেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেন যে কোনো কাজের সাফল্যের পেছনে কেবল তার ব্যক্তিগত শক্তিই কাজ করে না। তার শরীর, মন, শিক্ষা, পরিবেশ, সমাজ, সহকর্মী, পরিবার, প্রকৃতি এবং অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কারণ তার কর্মকে প্রভাবিত করে। তাই তিনি নিজের ভূমিকার গুরুত্ব স্বীকার করেন, কিন্তু নিজেকে সর্বশক্তিমান বা একমাত্র কর্তা মনে করেন না।
অনহংকারের অর্থ নিজেকে ছোট করা নয়। বরং এটি নিজের প্রকৃত সীমা উপলব্ধি করা। অহংকারী ব্যক্তি সাফল্য পেলে বলে আমি করেছি এবং ব্যর্থ হলে অন্যকে দোষ দেয়। কিন্তু অনহংবাদী ব্যক্তি সাফল্যে কৃতজ্ঞ থাকে এবং ব্যর্থতায় নিজের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তার কাছে কর্ম হলো কর্তব্য, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যম নয়। এই কারণে অনহংকার মানুষের কর্মকে আরও বিশুদ্ধ করে। যখন মানুষ নিজের কৃতিত্বের প্রদর্শনের জন্য কাজ করে না, তখন তার কর্মের মধ্যে আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়।
এরপর শ্লোকে এসেছে ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ। এই পদটি ধৃতি এবং উৎসাহের সমন্বিত অর্থ প্রকাশ করে। ধৃতি শব্দটি সংস্কৃত ধৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা বা স্থির রাখা। তাই ধৃতি হলো এমন এক অন্তর্গত শক্তি যা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষকে নিজের কর্তব্যে স্থির রাখে। জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন কাজ কঠিন হয়ে যায়, ফলাফল বিলম্বিত হয় অথবা প্রত্যাশা পূরণ হয় না। তখন যে ব্যক্তি হতাশ হয়ে পথ ছেড়ে দেন না এবং নিজের লক্ষ্য ও কর্তব্যকে ধরে রাখেন, তার মধ্যে ধৃতি রয়েছে।
উৎসাহ হলো কর্মের প্রাণশক্তি। উৎসাহের মধ্যে উদ্যম, আগ্রহ, উদ্যোগ এবং প্রাণবন্ততার ধারণা রয়েছে। শুধু ধৈর্য থাকলেই মানুষ সাত্ত্বিক কর্তা হতে পারেন না। কারণ ধৈর্য যদি উদ্যমহীন হয়ে যায়, তবে তা নিষ্ক্রিয়তায় পরিণত হতে পারে। আবার শুধু উৎসাহ থাকলেও চলবে না, কারণ নিয়ন্ত্রণহীন উৎসাহ অনেক সময় অস্থিরতা ও তাড়াহুড়োর সৃষ্টি করে। তাই কৃষ্ণ ধৃতি ও উৎসাহকে একত্রে স্থাপন করেছেন। ধৃতি মানুষকে স্থির রাখে এবং উৎসাহ তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ধৃতি হলো অন্তরের মেরুদণ্ড এবং উৎসাহ হলো কর্মের প্রাণশক্তি। এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি পরিণত কর্মচেতনা গড়ে ওঠে।
এরপর আসে সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ। সিদ্ধি অর্থ সাফল্য, সম্পূর্ণতা বা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা। অসিদ্ধি হলো তার বিপরীত অর্থাৎ ব্যর্থতা, অসম্পূর্ণতা বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া। মানুষের জীবনে এই দুই অভিজ্ঞতা অবশ্যম্ভাবী। কখনো মানুষ সফল হবে, কখনো ব্যর্থ হবে। কখনো তার পরিশ্রমের ফল প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হবে, আবার কখনো বিপুল পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো এই দুই অবস্থার মধ্যেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
নির্বিকার শব্দের অর্থ বিকারহীন বা মানসিকভাবে অস্থিরতামুক্ত। তবে নির্বিকার মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়। সাত্ত্বিক কর্তা আনন্দ অনুভব করেন, দুঃখ অনুভব করেন, সাফল্যে সন্তুষ্ট হন এবং ব্যর্থতায় কষ্টও পেতে পারেন। কিন্তু তিনি কোনো অনুভূতির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত হন না। সাফল্য তার অহংকারকে আকাশে তুলে দেয় না এবং ব্যর্থতা তার আত্মপরিচয়কে ধ্বংস করে না। তিনি জানেন যে সাফল্য একটি ঘটনা এবং ব্যর্থতাও একটি ঘটনা। কোনোটিই তার সম্পূর্ণ অস্তিত্বের সংজ্ঞা নয়।
এই ধারণাটি একটি সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সমুদ্রের উপরিভাগে কখনো বিশাল ঢেউ ওঠে, কখনো ছোট ঢেউ দেখা যায়। কিন্তু সমুদ্রের গভীর স্তর তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। মানুষের জীবনেও সাফল্য ও ব্যর্থতা ঢেউয়ের মতো আসে এবং চলে যায়। সাত্ত্বিক কর্তা বাহ্যিক জীবনের ঢেউকে অস্বীকার করেন না, কিন্তু তার অন্তরের গভীরতাকে সেই ঢেউয়ের হাতে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করেন না। তাই নির্বিকারতা হলো এমন এক অন্তর্গত স্থিতি যেখানে বাহ্যিক পরিবর্তন থাকলেও মানুষের চেতনার কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে না।
এই শ্লোকে কর্তা শব্দটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কর্তা শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ করা। কর্তা হলেন যিনি কোনো কাজ করেন। গীতার আলোচনায় কর্তা কেবল বাহ্যিক কর্মসম্পাদনকারী ব্যক্তি নন। তার মানসিক অবস্থা, উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, ধৈর্য এবং ফলাফলের প্রতি তার প্রতিক্রিয়াও তার কর্তৃত্বের প্রকৃতি নির্ধারণ করে। একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারেন, কিন্তু তাদের অন্তরের মানসিকতা ভিন্ন হলে সেই কর্মের আধ্যাত্মিক গুণও ভিন্ন হতে পারে।
এই কারণেই শ্লোকটির শেষে এসেছে সাত্ত্বিক উচ্যতে। সাত্ত্বিক শব্দটি সত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। সত্ত্ব ভারতীয় দর্শনে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, ভারসাম্য, পবিত্রতা এবং আলোকিত চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক ধারণা। সাত্ত্বিক কর্তা সেই ব্যক্তি যার কর্মচেতনা স্বচ্ছ, স্থির ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি কর্ম থেকে পালিয়ে যান না, আবার কর্মের ফলের দ্বারা নিজেকে বন্দীও করেন না। তিনি নিজের কর্তব্য পালন করেন, কিন্তু নিজের অহংকারকে সেই কর্মের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেন না।
এই শ্লোকের সঙ্গে কর্মযোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কর্মযোগ মানুষকে কর্ম ত্যাগ করতে শেখায় না, বরং কর্মের মধ্যে থেকে আসক্তি ও অহংকার অতিক্রম করতে শেখায়। মানুষ তার কর্তব্য পালন করবে, যথাসাধ্য চেষ্টা করবে এবং নিজের সামর্থ্যকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগাবে। কিন্তু কর্মের ফলাফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র বিচারক বানাবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে একদিকে কর্মনিষ্ঠ করে এবং অন্যদিকে মানসিকভাবে স্বাধীন রাখে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে অনহংবাদী ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। মানুষ যখন বলে আমি কর্তা, তখন প্রশ্ন ওঠে এই আমি কে। শরীর, মন, বুদ্ধি, স্মৃতি, শিক্ষা, পরিবেশ এবং অসংখ্য অভিজ্ঞতার সমষ্টির মধ্যেই আমাদের সাধারণ আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে। সাংখ্য দর্শনের আলোকে প্রকৃতির গুণসমূহই বিভিন্ন কর্মে প্রকাশিত হয় এবং চৈতন্যস্বরূপ পুরুষ সেই কার্যকলাপের সাক্ষী। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের অহংকারকে নম্র করে এবং তাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা বাস্তব হলেও মানুষ বিশ্বব্যাপী কারণসমূহের একমাত্র উৎস নয়।
বেদান্তীয় দৃষ্টিতে এই শিক্ষা আরও গভীর হয়। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর, মন ও অহংকারের সীমিত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে, তখন কর্তৃত্ববোধ শক্তিশালী হয়। কিন্তু আত্মজ্ঞান গভীর হলে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার প্রকৃত সত্তা আরও গভীর। ফলে কর্মের মধ্যে থেকেও অন্তরে এক ধরনের স্বাধীনতা জন্মায়। ভক্তির দৃষ্টিতে এই অনহংকার আরও একটি অর্থ গ্রহণ করে। মানুষ মনে করতে পারে যে সে ঈশ্বরের সেবক এবং তার কর্ম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তখন আমি সবকিছুর কর্তা এই অহংকারের পরিবর্তে আমি আমার কর্তব্য পালন করছি এই বিনয় জন্ম নেয়।
এই শ্লোককে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও ব্যাখ্যা করা যায়। মুক্তসঙ্গকে অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত মানসিকতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। অনহংবাদী মানসিকতা অতিরিক্ত অহংকেন্দ্রিক পরিচয় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। ধৃতি মানুষের প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দেয়। উৎসাহ অভ্যন্তরীণ প্রেরণা ও কর্মশক্তির সঙ্গে তুলনীয়। নির্বিকারতা আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক ভারসাম্যের সঙ্গে তুলনীয়। যদিও এগুলো আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সরাসরি সমার্থক নয়, তবু গীতার এই শিক্ষা আধুনিক মানুষের মানসিক সুস্থতা ও কর্মজীবনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
একজন ছাত্রের উদাহরণ নিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। একজন ছাত্র যদি মনে করে আমাকে অবশ্যই প্রথম হতে হবে, না হলে আমি ব্যর্থ মানুষ, তাহলে তার আত্মপরিচয় পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে একজন ছাত্র যদি মনে করে আমি সর্বোচ্চ নিষ্ঠায় পড়ব, নিজের ভুল সংশোধন করব এবং ফলাফল থেকে শিক্ষা নেব, তাহলে তার কর্মের মধ্যে মুক্তসঙ্গ ও ধৃতি প্রকাশ পায়। সে সফল হলে অহংকারী হয় না এবং ব্যর্থ হলে নিজের জীবনকে অর্থহীন মনে করে না। তার কাছে সাফল্য আনন্দের এবং ব্যর্থতা শিক্ষার একটি সুযোগ।
একজন শিল্পীর জীবনেও একই সত্য দেখা যায়। শিল্পী যদি প্রশংসার ওপর নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে প্রশংসা না পেলেই তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়তে পারে। আবার সমালোচনাকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অপমান মনে করলে সৃজনশীলতাও নষ্ট হতে পারে। সাত্ত্বিক শিল্পী তার কাজের প্রতি সম্পূর্ণ নিষ্ঠাবান থাকেন, কিন্তু প্রশংসা ও সমালোচনাকে নিজের অন্তরের স্বাধীনতার ওপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব করতে দেন না। তিনি সৃষ্টিকে ভালোবাসেন, কিন্তু সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অহংকার প্রতিষ্ঠা করতে চান না।
মানবজীবনে এই শ্লোকের প্রতীকী তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মুক্তসঙ্গ প্রতীক হয়ে ওঠে বন্ধনমুক্ত মনের। অনহংবাদী প্রতীক হয়ে ওঠে অহংকার অতিক্রমের। ধৃতি প্রতীক হয়ে ওঠে অন্তরের মেরুদণ্ডের। উৎসাহ প্রতীক হয়ে ওঠে জীবনীশক্তির। সিদ্ধি ও অসিদ্ধি জীবনের উত্থান ও পতনের প্রতীক। নির্বিকারতা প্রতীক হয়ে ওঠে এমন এক অন্তর্গত স্থিতির যেখানে বাইরের পরিবর্তন মানুষের চেতনার কেন্দ্রকে সম্পূর্ণভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে না।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কর্ম থেকে মুক্তি নয়, কর্মের মধ্যেই অন্তরের মুক্তি। মানুষ সংসারে থাকবে, কাজ করবে, সম্পর্ক গড়বে, সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করবে, ব্যর্থতার মুখোমুখি হবে এবং প্রতিদিন নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। কিন্তু তার অন্তরের স্বাধীনতা তখনই রক্ষা পাবে যখন সে কর্মকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করবে, ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মাপকাঠি বানাবে না, নিজের কৃতিত্ব নিয়ে অহংকার করবে না এবং প্রতিকূলতার সময় ধৈর্য ও উৎসাহ বজায় রাখবে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, “মুক্তসঙ্গোহনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে” শ্লোকটি একজন আদর্শ কর্মীর গভীর মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। এখানে সাত্ত্বিক কর্তা এমন একজন মানুষ যিনি কর্মে নিষ্ঠাবান কিন্তু কর্মফলের দাস নন, শক্তিশালী কিন্তু অহংকারী নন, ধৈর্যশীল কিন্তু নিষ্ক্রিয় নন, উৎসাহী কিন্তু অস্থির নন এবং সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে নিজের স্বরূপ হারান না কিংবা ব্যর্থতায় ভেঙে পড়ে নিজের মূল্য অস্বীকার করেন না। তার জীবনের মূলনীতি হলো নিজের কর্তব্য সর্বোচ্চ আন্তরিকতায় সম্পন্ন করা এবং ফলাফলের মধ্যেও অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখা। এই দৃষ্টিতে গীতার সাত্ত্বিক কর্তা কেবল ধর্মীয় আদর্শের একটি চরিত্র নন, তিনি একজন পরিণত, আত্মনিয়ন্ত্রিত, দায়িত্বশীল ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাঁর কর্মে আছে নিষ্ঠা, মনে আছে স্বাধীনতা, চেতনায় আছে নম্রতা এবং জীবনে আছে সমত্ব। এই সমন্বিত অবস্থাই মানুষকে কর্মের বন্ধন অতিক্রম করে অন্তরের গভীর শান্তি ও স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!