সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.২৭ — আসক্তি, লোভ ও ফলকামনায় আবদ্ধ রাজসিক কর্তার লক্ষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
রাহী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোহশুচিঃ।হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।২৭।।
রাহী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোহশুচিঃ।
হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।২৭।।

অনুবাদঃ কর্মাসক্ত, কর্মফলে আকাঙ্ক্ষী, লোভী, হিংসাপ্রিয়, অশুচি, হর্ষ ও শোকযুক্ত যে কর্তা, সে রাজসিক কর্তা বলে কথিত হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ২৭ নম্বর শ্লোক মানবচরিত্র, কর্মপ্রবণতা এবং কর্মের অন্তর্নিহিত মানসিক অবস্থাকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্লোক। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন একজন কর্তার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন যিনি রজোগুণ দ্বারা প্রভাবিত। সংস্কৃত শ্লোকটি হলো “রাগী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোহশুচিঃ। হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি কর্মের প্রতি আসক্ত, কর্মের ফল লাভ করতে অত্যন্ত আগ্রহী, লোভী, অন্যকে পীড়ন করার প্রবণতাসম্পন্ন, অন্তরে অশুদ্ধ এবং সাফল্যে আনন্দিত ও ব্যর্থতায় শোকাকুল হয়ে পড়ে, সেই কর্তা রাজসিক বলে পরিচিত। এই শ্লোকের বিশেষত্ব হলো এখানে কেবল বাহ্যিক কর্মের বিচার করা হয়নি। বরং কর্মের পেছনে যে মানসিকতা কাজ করে, সেই মানসিক অবস্থাকেই কর্তার প্রকৃত পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “রাগী”। সংস্কৃত রাগ শব্দের সঙ্গে আসক্তি, অনুরাগ এবং কোনো বিষয়ের প্রতি গভীর আকর্ষণের ধারণা যুক্ত। রাগ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত রঞ্জ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে বলে এর মধ্যে রঙে রঞ্জিত হওয়ার একটি সুন্দর রূপক অর্থও নিহিত আছে। যেমন কোনো সাদা কাপড়ে একটি রং লাগলে কাপড়টি সেই রঙে রঞ্জিত হয়ে যায়, তেমনি মানুষের মন যখন কোনো ব্যক্তি, বস্তু, বিষয়, কর্ম, অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান কিংবা আকাঙ্ক্ষার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়, তখন মন সেই বিষয়ের রঙে রঞ্জিত হয়ে যায়। এই অবস্থাই রাগ বা আসক্তি। এখানে রাগী শব্দটি কেবল ক্রোধপ্রবণ মানুষকে বোঝায় না। বরং এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যার মন কোনো বিষয়ের প্রতি এমনভাবে আকৃষ্ট হয়েছে যে সেই বিষয়ের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সঙ্গে তার মানসিক শান্তি জড়িয়ে গেছে। তাই রাগী মানুষ নিজের ইচ্ছার বিষয়কে কেবল পছন্দ করে না, বরং তার সঙ্গে নিজের সুখ ও পরিচয়কে যুক্ত করে ফেলে।

এর পরেই এসেছে “কর্মফলপ্রেপ্সু” শব্দটি। এটি একটি যৌগিক পদ। কর্ম অর্থ কাজ, ফল অর্থ কাজের ফলাফল এবং প্রেপ্সু অর্থ লাভ করতে ইচ্ছুক বা পেতে আকাঙ্ক্ষী। ফলে কর্মফলপ্রেপ্সু বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি যে নিজের কর্মের ফল লাভের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী। এখানে কর্মফলের আকাঙ্ক্ষাকে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। মানুষ কাজ করে এবং কাজের ফল আশা করে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাজসিক কর্তার বৈশিষ্ট্য হলো তার কর্মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফল। সে কাজটিকে কর্তব্য হিসেবে দেখে না, বরং কাজের বিনিময়ে কী পাবে সেটিই তার কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। তার কাছে কর্মের মূল্য নির্ধারিত হয় ফলের মাধ্যমে। সে ভাবে আমি কত অর্থ পাব, কত সম্মান পাব, কত ক্ষমতা পাব, কত প্রশংসা পাব কিংবা কত দ্রুত সফল হব। এই ফলনির্ভর মানসিকতা ধীরে ধীরে মানুষকে কর্মের অন্তর্নিহিত মূল্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

কর্মফলের আকাঙ্ক্ষার পর এসেছে “লুব্ধ” শব্দটি। লুব্ধ অর্থ লোভী, অতৃপ্ত এবং অধিক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ। রাগ যখন আরও তীব্র হয় এবং মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষিত বিষয়কে যতটা পেয়েছে তাতে সন্তুষ্ট না থেকে আরও বেশি চাইতে থাকে, তখন সেই আকর্ষণ লোভে পরিণত হয়। রাগ বলে আমি এটি চাই। কর্মফলপ্রেপ্সা বলে আমি আমার কাজের ফল পেতে চাই। আর লোভ বলে আমি আরও চাই এবং যতই পাই না কেন আমার চাওয়া শেষ হবে না। এখানেই রাজসিক মানসিকতার একটি গভীর সমস্যা প্রকাশ পায়। লোভ মানুষের প্রয়োজনকে সীমাহীন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত করে। তখন মানুষ যা প্রয়োজন তার জন্য কাজ করে না, বরং নিজের আকাঙ্ক্ষাকে তৃপ্ত করার জন্য ক্রমাগত ছুটতে থাকে।

এর পরবর্তী শব্দ “হিংসাত্মক”। হিংসা শব্দের অর্থ অন্যকে পীড়ন করা, আঘাত করা বা ক্ষতি করা। আত্মক শব্দটি কোনো কিছুর স্বভাব বা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে। ফলে হিংসাত্মক বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যার আচরণে অন্যকে পীড়ন করার প্রবণতা রয়েছে। এখানে হিংসা শুধু শারীরিক আঘাত বা হত্যাকে বোঝায় না। মানুষের প্রতি অবিচার করা, প্রতারণা করা, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, প্রতিযোগিতায় অন্যকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা, কুৎসা রটানো, মানসিকভাবে অপমান করা কিংবা নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করাও বৃহত্তর অর্থে হিংসার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যখন লোভ অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে তখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষার পথে অন্য মানুষকে বাধা হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। তখন অন্যের কল্যাণের পরিবর্তে নিজের স্বার্থই তার কাছে সর্বোচ্চ হয়ে ওঠে। গীতার এই শব্দটি সেই বিপজ্জনক মানসিক পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে।

“অশুচি” শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত গভীর। শুচি অর্থ নির্মল, পবিত্র ও শুদ্ধ। তার সঙ্গে অ উপসর্গ যুক্ত হয়ে অশুচি অর্থ দাঁড়ায় যা শুদ্ধ নয়। তবে এখানে অশুচি বলতে কেবল বাহ্যিক অপরিচ্ছন্নতা বোঝানো হয় না। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন হয়েও অন্তরে লোভ, ঈর্ষা, প্রতারণা, অহংকার ও বিদ্বেষ ধারণ করতে পারে। তাই গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত শুচিতা কেবল দেহের পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং মন ও উদ্দেশ্যের নির্মলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। রাজসিক কর্তার অন্তরে যখন ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, লোভ এবং অন্যের প্রতি পীড়নের প্রবণতা জন্মায়, তখন তার অন্তরের স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণেই শ্লোকে লোভ ও হিংসার পরেই অশুচি শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এরপর এসেছে “হর্ষশোকান্বিত”। হর্ষ অর্থ আনন্দ বা উল্লাস এবং শোক অর্থ দুঃখ বা বিষাদ। অন্বিত অর্থ যুক্ত বা আক্রান্ত। ফলে হর্ষশোকান্বিত বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি যে আনন্দ ও দুঃখের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এখানে আনন্দ নিজে কোনো দোষ নয় এবং দুঃখও মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। সমস্যাটি তখনই সৃষ্টি হয় যখন মানুষের অন্তরের শান্তি সম্পূর্ণভাবে বাইরের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাজসিক কর্তা সাফল্য পেলে অতিরিক্ত উল্লসিত হয় এবং ব্যর্থ হলে গভীরভাবে ভেঙে পড়ে। প্রশংসা পেলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং নিন্দা পেলে সে অস্থির হয়ে ওঠে। লাভ তাকে উত্তেজিত করে এবং ক্ষতি তাকে বিষণ্ণ করে। অর্থাৎ তার মন বাইরের ঘটনার সঙ্গে ক্রমাগত দুলতে থাকে। সে নিজের অন্তরের স্থিতিকে স্বাধীনভাবে ধরে রাখতে পারে না।

এই পর্যায়ে “কর্তা” শব্দটির তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কর্তা শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে। কৃ অর্থ করা বা সম্পাদন করা এবং কর্তা অর্থ যে কাজ করে। কিন্তু গীতার আলোচনায় কর্তা কেবল বাহ্যিকভাবে কাজ করা ব্যক্তিকে বোঝায় না। এখানে কর্তা হলো সেই চেতনা বা মানসিক অবস্থার অধিকারী ব্যক্তি যার মাধ্যমে কর্ম সংঘটিত হয়। একই কাজ দুইজন মানুষ করতে পারে, কিন্তু তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য এক নাও হতে পারে। একজন মানুষ দান করতে পারে মানুষের কল্যাণের জন্য, আবার অন্যজন দান করতে পারে কেবল নিজের নাম ও খ্যাতি প্রতিষ্ঠার জন্য। বাহ্যিক কাজ একই হলেও কর্তার মানসিকতা আলাদা। গীতা তাই কর্মের সঙ্গে কর্তার চেতনাকেও সমান গুরুত্ব দেয়।

“রাজস” শব্দটি এসেছে রজস থেকে। ভারতীয় দর্শনে প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণ হলো সত্ত্ব, রজস এবং তমস। রজসের মধ্যে গতি, কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, উদ্যম, প্রতিযোগিতা এবং অর্জনের প্রবল তাগিদ রয়েছে। তাই রজসকে কেবল নেতিবাচক বলে বোঝা উচিত নয়। মানুষের কর্মশক্তি, উদ্যোগ এবং সৃষ্টিশীলতার মধ্যেও রজসের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যখন কর্মশক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত আসক্তি, ফলের আকাঙ্ক্ষা, লোভ, প্রতিযোগিতা এবং আবেগের অস্থিরতা যুক্ত হয় তখন সেই কর্মচেতনা রাজসিক হয়ে ওঠে। রাজসিক মানুষ সাধারণত অলস নয়। বরং সে অত্যন্ত কর্মঠও হতে পারে। তার সমস্যা কর্মে নয়, বরং কর্মের পেছনে থাকা আকাঙ্ক্ষার প্রকৃতিতে।

শ্লোকের শেষ শব্দ “পরিকীর্তিত” অর্থ সুস্পষ্টভাবে অভিহিত বা ঘোষিত। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এখানে রাজসিক কর্তার একটি নির্দিষ্ট মানসিক পরিচয় তুলে ধরেছেন। এই পরিচয়কে যদি একত্রে দেখা হয় তবে একটি ধারাবাহিক মানসিক প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়। প্রথমে কোনো বিষয়ের প্রতি আসক্তি জন্মায়। তারপর সেই বিষয় লাভ করার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়। আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে লোভে পরিণত হতে পারে। লোভ নিজের স্বার্থকে অন্যের স্বার্থের ওপরে স্থান দিতে পারে। সেখান থেকে হিংসা বা অন্যকে পীড়নের প্রবণতা জন্ম নিতে পারে। এই প্রবণতা অন্তরের শুদ্ধতাকে নষ্ট করে। এরপর সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে মানুষের সুখ ও দুঃখ এমনভাবে যুক্ত হয় যে তার মন ক্রমাগত ওঠানামা করতে থাকে। এই সমগ্র মানসিক কাঠামোর অধিকারী কর্তাকেই গীতা রাজসিক বলে অভিহিত করেছে।

আধুনিক জীবনের দিকে তাকালেও এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। একজন ব্যবসায়ী যদি ব্যবসা করেন মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং ন্যায্য লাভের উদ্দেশ্যে, তবে তার কর্মের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে পারে। কিন্তু যদি তার একমাত্র লক্ষ্য হয় অন্য সবাইকে হারিয়ে সর্বোচ্চ লাভ করা, তাহলে তার মধ্যে রাজসিক প্রবণতা প্রকাশ পেতে পারে। একজন ছাত্র জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়াশোনা করতে পারে। আবার অন্য একজন একই পড়াশোনা করতে পারে শুধু সবার আগে থাকার জন্য। বাহ্যিক কাজ একই হলেও অন্তরের উদ্দেশ্য আলাদা। একজন কর্মী নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন। আবার কেউ একই কাজ করতে পারেন কেবল পদোন্নতি, প্রশংসা কিংবা ক্ষমতার জন্য। গীতার দৃষ্টিতে কর্মের এই অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণে গীতার এই শ্লোককে অন্য মানুষকে বিচার করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে আত্মপর্যবেক্ষণের আয়না হিসেবে ব্যবহার করা অধিক অর্থপূর্ণ। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো সময় রজসিক প্রবণতা প্রকাশ পেতে পারে। আমরা কোনো বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হতে পারি, কর্মফলের জন্য অস্থির হতে পারি, আরও বেশি পাওয়ার লোভে পড়তে পারি কিংবা সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে নিজের আত্মমর্যাদাকে যুক্ত করতে পারি। তাই শ্লোকটি আমাদের অন্যকে রাজসিক বলে চিহ্নিত করতে শেখায় না। বরং নিজের মনকে প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কি কাজ করছি কারণ এটি আমার কর্তব্য, নাকি শুধু ফলের জন্য। আমি কি সাফল্যকে গ্রহণ করছি কিন্তু ব্যর্থতাকেও শান্তভাবে গ্রহণ করতে পারছি। আমি কি আমার আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি আকাঙ্ক্ষাই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমি কি নিজের উন্নতির পথে অন্যের ক্ষতি করছি। এই প্রশ্নগুলোই শ্লোকটির প্রকৃত আত্মিক শিক্ষা।

দার্শনিকভাবে দেখলে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীনতার একটি গভীর সমস্যাকেও সামনে নিয়ে আসে। একজন মানুষ বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করলেও তার অন্তরে যদি ফলের আকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সে কতটা স্বাধীন। সে যদি মনে করে আমাকে জিততেই হবে, আমাকে প্রশংসা পেতেই হবে, আমাকে অন্যের চেয়ে বেশি পেতেই হবে, তাহলে তার কর্ম বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও অভ্যন্তরীণভাবে সে নিজের আকাঙ্ক্ষার অধীন। এই অর্থে রাজসিকতা হলো কর্মের দাসত্বের একটি সূক্ষ্ম রূপ। মানুষ কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু তার মন ফলের সঙ্গে বাঁধা। গীতার কর্মযোগ এই বন্ধনকে অতিক্রম করার শিক্ষা দেয়। কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং কর্মের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং ফলের ওপর নিজের অস্তিত্বকে নির্ভরশীল করে তোলা থেকে মুক্ত হওয়াই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। মানুষের মনকে যদি একটি রথের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে আকাঙ্ক্ষাগুলো হতে পারে অশান্ত ঘোড়া। তারা সবসময় আরও দূরে ছুটতে চায়। অর্থ, সম্মান, ক্ষমতা, সাফল্য ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা একের পর এক মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। যদি বুদ্ধি ও আত্মসংযমের লাগাম দৃঢ় না থাকে, তবে সেই রথের গন্তব্য নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাজসিক কর্তা সেই মানুষের প্রতীক, যে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় কিন্তু অন্তরে নিজের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা চালিত। তার গতি আছে, কিন্তু সবসময় সঠিক দিকনির্দেশ থাকে না।

সবশেষে বলা যায়, গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ২৭ নম্বর শ্লোক মানুষের কর্মজীবনের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। “রাগী” শব্দে আসক্তির সূচনা, “কর্মফলপ্রেপ্সু” শব্দে ফলের আকাঙ্ক্ষা, “লুব্ধ” শব্দে অতৃপ্ত লোভ, “হিংসাত্মক” শব্দে অন্যকে পীড়নের সম্ভাবনা, “অশুচি” শব্দে অন্তরের অস্বচ্ছতা এবং “হর্ষশোকান্বিত” শব্দে সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে মানসিক শান্তির বন্ধন প্রকাশ পেয়েছে। এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়ে যে কর্মচেতনার সৃষ্টি করে তাকে বলা হয়েছে রাজসিক কর্তা। শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা হলো কর্ম নিজে মানুষকে আবদ্ধ করে না, বরং কর্মের সঙ্গে মানুষের আসক্তি এবং ফলের প্রতি তার আঁকড়ে ধরা তাকে আবদ্ধ করে। তাই প্রকৃত আধ্যাত্মিক অগ্রগতি কর্ম ত্যাগে নয়, বরং কর্মের অন্তর্গত আসক্তিকে পরিশুদ্ধ করার মধ্যে নিহিত। মানুষ যখন নিজের কর্তব্যকে আন্তরিকভাবে সম্পাদন করে, কিন্তু সাফল্য ও ব্যর্থতার দ্বারা নিজের অন্তরের শান্তিকে নিয়ন্ত্রিত হতে দেয় না, তখন সে ধীরে ধীরে রাজসিক অস্থিরতা অতিক্রম করে অধিকতর নির্মল ও স্থির চেতনার দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক কেবল প্রাচীন ধর্মদর্শনের একটি অংশ নয়। এটি আজও মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতা, সাফল্য, ব্যর্থতা, লোভ, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাধীনতাকে বোঝার জন্য এক গভীর আত্মদর্শনের আয়না।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি