সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.২৮ — অলসতা, জড়তা ও কপটতার দ্বারা গঠিত তামসিক কর্তার লক্ষণ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোহলসঃ।বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।২৮।।
অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোহলসঃ।
বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।২৮।।

অনুবাদঃ অনুচিত কার্যপ্রিয়, জড় চেষ্টাযুক্ত, অনম্র, শঠ, অন্যের অবমাননাকারী, অলস, বিষাদযুক্ত ও দীর্ঘসূত্রী যে কর্তা, তাকে তামসিক কর্তা বলা হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টাবিংশতি শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কর্মপ্রবণতার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ করেছেন। শ্লোকটি হলো “অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোহলসঃ বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।” অর্থাৎ যে কর্তা অযুক্ত, প্রাকৃত, স্তব্ধ, শঠ, নৈষ্কৃতিক, অলস, বিষাদী এবং দীর্ঘসূত্রী, তাকে তামসিক কর্তা বলা হয়। এই শ্লোকের বিশেষত্ব হলো এখানে কোনো কাজকে সরাসরি ভালো বা মন্দ বলা হয়নি। বরং কাজটি যে ব্যক্তি করছেন তার অন্তর্গত মানসিক অবস্থা, উদ্দেশ্য, প্রবৃত্তি এবং কর্মপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এই শ্লোক কেবল প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষার অংশ নয়, মানুষের চরিত্র, কর্মপ্রবণতা, মানসিকতা এবং আত্মোন্নতির একটি গভীর বিশ্লেষণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অযুক্তঃ। সংস্কৃত যুক্ত শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে। যুজ্ ধাতুর মধ্যে যুক্ত করা, সংযুক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণে আনার ভাব রয়েছে। যুক্ত ব্যক্তি অর্থাৎ যিনি নিজের মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয় ও কর্মের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে সক্ষম। এর বিপরীত হলো অযুক্ত। অযুক্ত কর্তা এমন ব্যক্তি যার চিন্তা ও কাজের মধ্যে যথাযথ সামঞ্জস্য নেই। তিনি কী করছেন, কেন করছেন এবং তার কাজের পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিবেচনা নাও থাকতে পারে। তাঁর মন একদিকে যেতে চায়, বুদ্ধি অন্যদিকে নির্দেশ করে এবং কর্ম আবার অন্য পথে চলে। ফলে জীবনে একটি অন্তর্গত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই অযুক্ততা তামসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ, কারণ তমস মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে এবং তাকে নিজের প্রকৃত স্বার্থ ও কর্তব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

এরপর এসেছে প্রাকৃতঃ শব্দটি। এই শব্দের সঙ্গে প্রকৃতি শব্দের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতি শব্দটি প্র এবং কৃ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত এবং এর মধ্যে মূল স্বভাব বা প্রাথমিক প্রকৃতির ধারণা নিহিত রয়েছে। প্রাকৃত অর্থ অপরিশীলিত, সাধারণ বা নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত। এই অর্থে তামসিক কর্তা উচ্চতর বিবেক, নৈতিক শিক্ষা বা আত্মসংযমের আলোকে নিজের আচরণ পরিচালনা না করে তাৎক্ষণিক প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন। তিনি যা চান তাই করতে চান এবং নিজের ইচ্ছার বাইরে বৃহত্তর কল্যাণ, কর্তব্য বা নৈতিকতার কথা বিবেচনা করতে অনাগ্রহী হন। এখানে প্রাকৃততা মানুষের স্বাভাবিক অস্তিত্বকে নিন্দা করে না। বরং বোঝায় এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ নিজের উচ্চতর সম্ভাবনাকে বিকশিত না করে নিম্নতর প্রবৃত্তির স্তরেই আটকে থাকে।

স্তব্ধঃ শব্দটি সাধারণ অর্থে স্থির, নিশ্চল বা অচল বোঝালেও এই শ্লোকে এর অর্থ অনমনীয়তা, জেদ এবং আত্মসংশোধনের অক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তামসিক কর্তা নিজের ভুল বুঝতে পারলেও সহজে তা স্বীকার করতে চান না। তিনি নিজের মতামতকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিতে পারেন। অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করা, নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা কিংবা প্রয়োজন অনুসারে নিজেকে পরিবর্তন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। এই স্তব্ধতা বাহ্যিক দৃঢ়তার মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা অনেক সময় অন্তর্গত দুর্বলতার প্রকাশ। কারণ সত্যিকার দৃঢ়তা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে পরিবর্তিত হতে জানে, আর জড়তা পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকলেও পরিবর্তনকে প্রত্যাখ্যান করে।

শঠঃ শব্দটি আরও গভীর নৈতিক অর্থ বহন করে। শঠ বলতে কপট, ছলনাময়, ধূর্ত বা প্রতারণাপ্রবণ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। শঠতার মূল সমস্যা হলো বাহ্যিক আচরণ এবং অন্তরের উদ্দেশ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য। একজন শঠ ব্যক্তি যা প্রকাশ করেন তার আড়ালে অন্য উদ্দেশ্য লুকিয়ে রাখতে পারেন। তিনি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যকে বিভ্রান্ত করতে পারেন। এই কারণে শঠতা শুধু মিথ্যা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সত্য কথাকেও যদি কৌশলে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যাতে অন্য ব্যক্তি বিভ্রান্ত হন এবং নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, তাহলেও সেখানে শঠতার প্রবণতা থাকতে পারে। গীতার দৃষ্টিতে এমন আচরণ চেতনার অন্ধকারকে প্রকাশ করে, কারণ এতে সত্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং কপটতা প্রাধান্য পায়।

নৈষ্কৃতিকঃ শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। এর মধ্যে অনিষ্ট করা, ক্ষতি সাধন করা, নিষ্ঠুরতা এবং অন্যের অকল্যাণের প্রবণতার ভাব রয়েছে। শঠ ব্যক্তি প্রতারণা করতে পারেন, কিন্তু নৈষ্কৃতিক ব্যক্তি অন্যের ক্ষতিসাধনের দিকেও এগিয়ে যেতে পারেন। ফলে শঠতা যেখানে প্রধানত কপটতার পরিচয়, নৈষ্কৃতিকতা সেখানে অনিষ্টপ্রবণতার প্রকাশ। একজন মানুষ নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যদি অন্যের ক্ষতি করার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন, তবে তাঁর কর্মচেতনার মধ্যে নৈষ্কৃতিকতার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এই বৈশিষ্ট্য তামসের একটি অধিক অন্ধকার রূপকে নির্দেশ করে, কারণ এখানে অজ্ঞতা কেবল নিজের জীবনকে প্রভাবিত করছে না, অন্যের জীবনেও ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।

এরপর এসেছে অলসঃ শব্দটি। অলসতা মানুষের পরিচিত একটি দুর্বলতা হলেও গীতার আলোচনায় এর অর্থ আরও গভীর। অলসতা কেবল বিশ্রাম নেওয়া নয়। বিশ্রাম প্রয়োজনীয় এবং স্বাস্থ্যকর, কারণ তা কর্মশক্তিকে পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু অলসতা হলো প্রয়োজনীয় কর্ম করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কর্ম থেকে সরে থাকা। যে ব্যক্তি কর্তব্য জানেন কিন্তু উদ্যোগ নেন না, সুযোগ পান কিন্তু ব্যবহার করেন না, নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কর্মকে এড়িয়ে যান, তাঁর মধ্যে তামসিক অলসতা কাজ করতে পারে। এই অলসতা ধীরে ধীরে মানুষের আত্মবিশ্বাস, কর্মক্ষমতা এবং সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়।

বিষাদী শব্দটি বিষাদ থেকে এসেছে। বিষাদ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত সদ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে অবসন্ন হয়ে পড়া বা নিচে নেমে যাওয়ার ভাব নিহিত। বিষাদ মানে হতাশা, গভীর মনোবেদনা, অবসাদ বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়া। তামসিক কর্তার ক্ষেত্রে বিষাদ এমন এক মানসিক প্রবণতা যেখানে মানুষ কর্মের সম্ভাবনার পরিবর্তে ব্যর্থতার সম্ভাবনাকে বেশি দেখতে থাকে। তিনি ভাবতে পারেন যে চেষ্টা করেও কোনো লাভ হবে না, পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয় অথবা তিনি নিজে কিছু করতে পারবেন না। ফলে বিষাদ কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং কর্মহীনতা আবার বিষাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এভাবে একটি নেতিবাচক মানসিক চক্র তৈরি হয়।

দীর্ঘসূত্রী শব্দটির মধ্যে অত্যন্ত সুন্দর একটি রূপক অর্থ রয়েছে। দীর্ঘ এবং সূত্র শব্দের সমন্বয়ে গঠিত এই শব্দের আক্ষরিক ভাব দীর্ঘ সুতো। কিন্তু রূপক অর্থে দীর্ঘসূত্রী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি কোনো কাজকে অযথা দীর্ঘায়িত করেন এবং বারবার পিছিয়ে দেন। আধুনিক ভাষায় যাকে কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা বা প্রোক্রাস্টিনেশন বলা হয় তার সঙ্গে এর কিছুটা তুলনা করা যায়। অলস ব্যক্তি কাজ করতে আগ্রহী নাও হতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘসূত্রী ব্যক্তি অনেক সময় কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং কাজের গুরুত্বও বোঝেন, তবু বারবার বলেন পরে করব। আজকের কাজ আগামীকালের কাছে, আগামীকালের কাজ পরশুর কাছে চলে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সময় চলে যায় এবং কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই দীর্ঘসূত্রিতা মানুষের সময়, শক্তি এবং সম্ভাবনার একটি নীরব অপচয়।

এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যের পরে এসেছে কর্তা শব্দটি। কর্তা শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন এবং এর অর্থ যিনি করেন বা কর্মসম্পাদন করেন। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্তা শব্দটি কেবল কাজ সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। এর সঙ্গে আমি করছি এই আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি জড়িত। মানুষ যখন নিজের কর্মকে সম্পূর্ণভাবে নিজের অহংকারের সঙ্গে যুক্ত করে তখন তার মধ্যে কর্তার অহংবোধ শক্তিশালী হয়। সে নিজের সাফল্যকে নিজের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব এবং ব্যর্থতাকে অন্যের দোষ বলে ভাবতে পারে। গীতার বৃহত্তর শিক্ষায় এই কর্তার ধারণাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আত্মজ্ঞানহীন অবস্থায় মানুষ নিজেকে দেহ ও মনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন মনে করে এবং সেখান থেকেই অহংকার, আসক্তি ও কর্মফলের বন্ধন তৈরি হয়।

সবশেষে এসেছে তামসঃ শব্দটি। তমস শব্দের আক্ষরিক অর্থ অন্ধকার। কিন্তু গীতার দর্শনে তমস কেবল বাহ্যিক অন্ধকার নয়। এটি চেতনার অন্ধকার, জ্ঞানের আচ্ছাদন, জড়তা, মোহ এবং বিচারবুদ্ধির অস্পষ্টতার প্রতীক। সত্ত্ব যেখানে স্বচ্ছতা ও জ্ঞানের প্রতীক এবং রজস যেখানে গতি ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে তমস স্থবিরতা ও অজ্ঞানতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তামসিক কর্তা এমন একজন মানুষ যার কর্মকে স্বচ্ছ জ্ঞান ও বিবেকের পরিবর্তে জড়তা, মোহ, কপটতা, হতাশা এবং কর্মবিমুখতা প্রভাবিত করে।

এই শ্লোকের দার্শনিক গুরুত্ব এখানেই যে গীতা আমাদের শুধু কী কাজ করছি সেই প্রশ্ন করতে শেখায় না, বরং কোন চেতনা নিয়ে কাজ করছি সেই প্রশ্নও করতে শেখায়। একই কাজ তিনজন মানুষ তিনটি ভিন্ন মানসিক অবস্থায় করতে পারেন। একজন মানুষের কর্মে যদি কর্তব্যবোধ, জ্ঞান, আত্মসংযম ও বৃহত্তর কল্যাণের চিন্তা থাকে তবে তার কর্মচেতনা আলোকিত। অন্যজন যদি নিজের লাভ, সম্মান, সাফল্য বা পরিচিতির আকাঙ্ক্ষায় কাজ করেন তবে সেখানে রাজসিকতার প্রাধান্য থাকতে পারে। আর কেউ যদি কাজটি বোঝার চেষ্টা না করেন, দায়িত্ব এড়িয়ে যান, অন্যকে প্রতারণা করেন, কাজ ফেলে রাখেন এবং ব্যর্থতার জন্য সবসময় অন্যকে দোষ দেন, তবে সেখানে তামসিকতার প্রকাশ দেখা যায়। অর্থাৎ কাজের বাহ্যিক রূপের চেয়ে কর্তার অন্তর্গত চেতনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। মানুষের মধ্যে আমি কর্তা এই অনুভূতি অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু আত্মজ্ঞান লাভের পথে প্রশ্ন ওঠে আমি কে। আমি কি কেবল দেহ, মন এবং বুদ্ধি, নাকি এর অতীতেও আমার কোনো চৈতন্যস্বরূপ আছে। আত্মাকে দেহ ও মনের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন মনে করাই অবিদ্যার একটি প্রকাশ। এই অবিদ্যা থেকেই কর্তার অহংকার, কর্মফলের প্রতি আসক্তি এবং সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রতি অতিরিক্ত আবেগ জন্ম নিতে পারে। সেই দৃষ্টিতে তামসিক কর্তা শুধু একজন অলস ব্যক্তি নন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যাঁর চেতনা নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অন্ধকারে আবৃত।

যোগদর্শনের দৃষ্টিতে তমস চিত্তকে ভারী, অস্পষ্ট এবং স্থবির করে। ফলে চিন্তা অস্পষ্ট হয়, সিদ্ধান্ত দুর্বল হয় এবং কর্মের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। একজন ব্যক্তি যদি বারবার কাজ শুরু করার কথা ভেবে তা পিছিয়ে দেন, ব্যর্থতার ভয়ে উদ্যোগ না নেন এবং নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করেন, তাহলে তিনি ধীরে ধীরে একটি তামসিক কর্মচক্রে আটকে যেতে পারেন। অযুক্ততা থেকে ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ব্যর্থতা, ব্যর্থতা থেকে বিষাদ, বিষাদ থেকে কর্মবিমুখতা এবং কর্মবিমুখতা থেকে আরও ব্যর্থতা তৈরি হতে পারে। এই চক্র ভাঙতে হলে চেতনার মধ্যে স্বচ্ছতা ও সচেতনতা ফিরিয়ে আনতে হয়।

আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও শ্লোকটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে কিছু ধারণার তুলনা করা যায়। অযুক্ততার সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, স্তব্ধতার সঙ্গে মানসিক অনমনীয়তা, শঠতার সঙ্গে কৌশলী বা প্রতারণামূলক আচরণ, অলসতার সঙ্গে কর্মবিমুখতা, বিষাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক মানসিক প্রবণতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার সঙ্গে কাজ পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতার কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে এগুলো সরাসরি সমার্থক নয়। গীতার তামস ধারণা একটি বৃহত্তর দার্শনিক কাঠামোর অংশ, যেখানে মানুষের চেতনা, প্রকৃতি, কর্ম এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন একসঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অযুক্ততা মানুষের অন্তর্গত বিচ্ছিন্নতার প্রতীক। প্রাকৃততা অপরিশীলিত প্রবৃত্তির প্রতীক। স্তব্ধতা জমাট অহংকারের প্রতীক। শঠতা মানুষের মুখোশের প্রতীক। নৈষ্কৃতিকতা অন্ধকারের সক্রিয় রূপের প্রতীক। অলসতা সুপ্ত শক্তির প্রতীক। বিষাদ সম্ভাবনার প্রতি আস্থাহীনতার প্রতীক এবং দীর্ঘসূত্রিতা সময়ের অপচয়ের প্রতীক। এইভাবে পুরো শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি প্রতীকী মানচিত্রের মতো কাজ করে।

বাস্তব জীবনে একজন ছাত্রের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। একজন ছাত্র জানে যে পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করা প্রয়োজন। কিন্তু সে প্রতিদিন বলে আজ নয়, কাল থেকে পড়ব। কাল এলে সে আবার নতুন অজুহাত তৈরি করে। কিছুদিন পরে সময় কমে গেলে সে হতাশ হয়ে ভাবে এখন আর ভালো ফল করা সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে সে নিজের অবহেলার পরিবর্তে শিক্ষক, প্রশ্নপত্র বা পরিস্থিতিকে দোষ দিতে শুরু করে। এই একটি ঘটনাতেই অলসতা, দীর্ঘসূত্রিতা, বিষাদ, অযুক্ততা এবং দায়িত্ব এড়ানোর মতো একাধিক বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে। এখানেই শ্লোকটির বাস্তব জীবনের প্রাসঙ্গিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একইভাবে একজন কর্মজীবী মানুষও তামসিক প্রবণতায় আক্রান্ত হতে পারেন। তিনি নিজের কাজের গুরুত্ব জানেন কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ করেন না। ভুল হলে তা স্বীকার করেন না। অন্যের সাফল্যে বিরক্ত হন এবং নিজের ব্যর্থতার জন্য অন্যকে দোষ দেন। প্রয়োজনে পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজের পুরোনো পদ্ধতিতেই আটকে থাকেন। বাইরে থেকে তিনি হয়তো একজন কর্মরত মানুষ, কিন্তু তাঁর কর্তার চেতনার মধ্যে তমসের বৈশিষ্ট্য প্রবল হতে পারে। তাই তামসিকতা মানেই সম্পূর্ণ কর্মহীনতা নয়। একজন মানুষ কাজ করেও তামসিক কর্তা হতে পারেন, যদি তার কাজের অন্তর্গত চেতনা অজ্ঞানতা, কপটতা, জড়তা ও অনিষ্টপ্রবণতার দ্বারা পরিচালিত হয়।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো তামসিকতা কোনো স্থায়ী পরিচয় নয়। মানুষ নিজের প্রবণতাকে চিনতে পারে এবং ধীরে ধীরে তা পরিবর্তন করতে পারে। অযুক্ততার পরিবর্তে আত্মসংযম, প্রাকৃততার পরিবর্তে আত্মশিক্ষা, স্তব্ধতার পরিবর্তে নম্রতা, শঠতার পরিবর্তে সত্যনিষ্ঠা, নৈষ্কৃতিকতার পরিবর্তে কল্যাণবোধ, অলসতার পরিবর্তে উদ্যোগ, বিষাদের পরিবর্তে আশাবাদ এবং দীর্ঘসূত্রিতার পরিবর্তে সময়নিষ্ঠা গড়ে তুলতে পারলে মানুষের কর্তার চেতনা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এই পরিবর্তন বাহ্যিক আচরণের পাশাপাশি অন্তর্গত মানসিক অবস্থারও রূপান্তর ঘটায়।

অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টাবিংশতি শ্লোক মানুষের চরিত্র ও কর্মজীবনের একটি গভীর আয়না। এখানে তামসিক কর্তার যে বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো কেবল অন্যের মধ্যে খুঁজে দেখার বিষয় নয়। বরং নিজের মধ্যেও কোন সময় অযুক্ততা, জেদ, কপটতা, অলসতা, বিষাদ কিংবা দীর্ঘসূত্রিতা প্রকাশ পাচ্ছে কি না তা উপলব্ধি করার আহ্বান রয়েছে। কারণ মানুষ নিজের অন্ধকারকে চিনতে পারলেই আলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ খুঁজে পায়। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটির প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের কর্মকে শুধু বাহ্যিক সাফল্য দিয়ে বিচার না করে তার অন্তর্গত চেতনাকে শুদ্ধ করা। তমসের অন্ধকার থেকে জ্ঞানের স্বচ্ছতার দিকে, জড়তা থেকে কর্মশীলতার দিকে, কপটতা থেকে সত্যের দিকে এবং হতাশা থেকে আত্মবিশ্বাসের দিকে অগ্রসর হওয়াই এই শিক্ষার গভীর মানবিক তাৎপর্য।

সার্বিকভাবে বলা যায়, অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠঃ নৈষ্কৃতিকঃ অলসঃ বিষাদী এবং দীর্ঘসূত্রী এই শব্দগুলো একত্রে মানুষের এমন এক কর্মচরিত্রকে প্রকাশ করে যার ওপর তমোগুণের প্রভাব প্রবল। এখানে অযুক্ততা বোঝায় অন্তর্গত অসামঞ্জস্য, প্রাকৃততা বোঝায় অপরিশীলিত প্রবৃত্তি, স্তব্ধতা বোঝায় অনমনীয়তা, শঠতা বোঝায় কপটতা, নৈষ্কৃতিকতা বোঝায় অনিষ্টপ্রবণতা, অলসতা বোঝায় কর্মবিমুখতা, বিষাদ বোঝায় মানসিক অবসন্নতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা বোঝায় কর্তব্যকে অনন্তকাল পিছিয়ে দেওয়া। আর কর্তা শব্দটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষ কেবল কর্মের বাহক নয়, সে নিজের কর্মচেতনারও নির্মাতা। তাই গীতার এই শ্লোক আমাদের অন্যকে বিচার করার আগে নিজেকে দেখার শিক্ষা দেয়। নিজের মধ্যে তমসের উপস্থিতি চিনে তাকে জ্ঞান, সততা, আত্মসংযম, কর্মনিষ্ঠা ও কল্যাণবোধের মাধ্যমে রূপান্তর করতে পারাই এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর এবং চিরন্তন শিক্ষা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি