ভগবদ্গীতা ১৮.৩ — কর্মত্যাগ ও যজ্ঞ-দান-তপস্যা: ত্যাগের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে ভিন্ন মত
ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ।
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে।।৩।।
অনুবাদঃ এক শ্রেণীর মনীষীগণ বলেন যে, কর্ম দোষযুক্ত,সেই হেতু তা পরিত্যজ্য। অপর এক শ্রেণীর পন্ডিত যজ্ঞ, দান, তপস্যা প্রভৃতি কর্মকে অত্যাজ্য বলে সিদ্ধান্ত করেছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগ সম্পর্কে প্রচলিত দুটি ভিন্ন মত আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো, ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ। যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে।। অর্থাৎ কোনো কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন যে কর্ম দোষযুক্ত বলে কর্ম ত্যাগ করা উচিত। আবার অন্য কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি বলেন যে যজ্ঞ, দান ও তপস্যার মতো কর্ম কখনোই ত্যাগ করা উচিত নয়। এই শ্লোকের বিশেষত্ব হলো এখানে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে প্রথমে ত্যাগ সম্পর্কে মানুষের বিভিন্ন চিন্তাধারা তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ পরবর্তী আলোচনায় প্রকৃত ত্যাগের স্বরূপ ব্যাখ্যা করার জন্য একটি দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন।
এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ত্যাজ্য। ত্যাজ্য শব্দটি সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে এসেছে। ত্যজ্ ধাতুর অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা, বর্জন করা বা দূরে সরিয়ে রাখা। এই ধাতু থেকেই ত্যাগ এবং ত্যক্তের মতো শব্দের উৎপত্তি। ত্যাজ্য বলতে বোঝায় এমন কিছু যা পরিত্যাগ করা উচিত। তাই শ্লোকে ত্যাজ্যং কর্ম বলা হলে তার সরল অর্থ দাঁড়ায় কর্ম ত্যাগ করা উচিত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ নিজে এই মুহূর্তে বলছেন না যে সব কর্ম ত্যাগ করা উচিত। তিনি কেবল এমন একটি মত তুলে ধরছেন যা কিছু জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্যে প্রচলিত ছিল।
এরপর এসেছে দোষবৎ শব্দটি। দোষবৎ গঠিত হয়েছে দোষ এবং বৎ এই দুই অংশ থেকে। দোষ অর্থ ত্রুটি, অশুদ্ধতা, অসঙ্গতি বা ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য এবং বৎ এমন একটি ভাব প্রকাশ করে যার মধ্যে কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই দোষবৎ অর্থ দোষযুক্ত বা ত্রুটিপূর্ণ। কোনো কোনো জ্ঞানী মনে করতেন যে কর্মের মধ্যেই দোষ রয়েছে। কারণ কর্মের সঙ্গে কামনা, আকাঙ্ক্ষা, প্রচেষ্টা, সংঘর্ষ এবং ফলের সম্পর্ক জড়িত। মানুষ যখন কর্ম করে তখন তার মধ্যে কর্তার ভাব এবং ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। সেই কারণে কর্মকে বন্ধনের কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
কর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে। কৃ ধাতুর অর্থ হলো করা, সম্পাদন করা বা সৃষ্টি করা। কর্ম শব্দের সরল অর্থ হলো যে কাজ করা হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্মের অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। মানুষের কর্তব্য, সামাজিক দায়িত্ব, ধর্মীয় আচরণ, সেবা, সাধনা এবং জীবনের বিভিন্ন কার্যকলাপ কর্মের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষের জীবন কর্মবিহীন নয়। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে কোনো না কোনোভাবে কর্ম করতে হয়। তাই কর্মের প্রশ্নটি গীতার দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসল প্রশ্ন শুধু কর্ম করব কি করব না তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো কর্ম কেন করছি, কীভাবে করছি এবং কর্মের সঙ্গে আমার মানসিক সম্পর্ক কেমন।
শ্লোকের প্রাহুঃ শব্দটির অর্থ হলো বলেন বা মত প্রকাশ করেন। এটি সংস্কৃত ব্রূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। শ্রীকৃষ্ণ যখন প্রাহুঃ শব্দ ব্যবহার করছেন তখন বোঝা যায় তিনি নিজের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার আগে বিভিন্ন জ্ঞানী মানুষের মত তুলে ধরছেন। অর্থাৎ এখানে একটি দার্শনিক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একদল মনে করেন কর্ম দোষযুক্ত এবং তাই কর্ম পরিত্যাগ করা উচিত। অন্যদল মনে করেন কিছু কর্ম মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করে এবং তাই সেগুলো কখনো ত্যাগ করা উচিত নয়।
মনীষিণঃ শব্দের অর্থ হলো জ্ঞানী, চিন্তাশীল, প্রজ্ঞাবান বা গভীর বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। মনীষা শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে এবং মনীষা বলতে গভীর চিন্তা ও বিচারবুদ্ধিকে বোঝানো হয়। ফলে মনীষী শুধু সাধারণ অর্থে শিক্ষিত ব্যক্তি নন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে তার সত্য উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন। শ্রীকৃষ্ণ এই শব্দ ব্যবহার করে বোঝাচ্ছেন যে ত্যাগের প্রশ্নটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং এর উত্তর কেবল বাহ্যিক আচরণ দেখে দেওয়া যায় না।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে এসেছে যজ্ঞ, দান ও তপস্যা। এই তিনটি শব্দ ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যজ্ঞ শব্দটি যজ্ ধাতু থেকে এসেছে। যজ্ অর্থ পূজা করা, উপাসনা করা, অর্পণ করা বা নিবেদন করা। বৈদিক যুগে যজ্ঞ বলতে নির্দিষ্ট বিধি অনুসারে দেবতার উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান বোঝানো হতো। কিন্তু গীতায় যজ্ঞের ধারণা অনেক গভীর এবং বিস্তৃত। নিজের কর্মকে বৃহত্তর উদ্দেশ্যের জন্য নিবেদন করা, নিজের শক্তি ও সামর্থ্যকে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সত্যের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেও যজ্ঞের ভাব প্রকাশ পায়।
দান শব্দটি এসেছে দা ধাতু থেকে। দা অর্থ দেওয়া। সাধারণভাবে দান বলতে অর্থ বা সম্পদ অন্যকে দেওয়াকে বোঝানো হলেও এর প্রকৃত অর্থ অনেক বিস্তৃত। অর্থ, খাদ্য, জ্ঞান, সময়, শ্রম, সহানুভূতি এবং সেবা সবই দানের রূপ হতে পারে। দানের গভীর তাৎপর্য হলো নিজের সম্পদকে কেবল নিজের জন্য ধরে না রাখা। মানুষ যখন অন্যের কল্যাণে নিজের সামর্থ্য ব্যবহার করে তখন তার মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাই দান শুধু সামাজিক কাজ নয়, এটি অন্তরের শুদ্ধিরও একটি মাধ্যম।
তপঃ শব্দটি এসেছে তপ্ ধাতু থেকে। তপ্ ধাতুর মূল অর্থ হলো উত্তপ্ত হওয়া বা তাপ সৃষ্টি করা। এই ধারণা থেকেই তপস্যার অর্থ বিকশিত হয়েছে। তপস্যা বলতে কেবল শরীরকে কষ্ট দেওয়া বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো আত্মসংযম, ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা, সহিষ্ণুতা এবং উচ্চতর উদ্দেশ্যের জন্য নিম্নতর আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ যখন তাৎক্ষণিক আনন্দের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সত্য ও কল্যাণকে বেছে নেয় তখন তার মধ্যেও তপস্যার ভাব প্রকাশ পায়।
যজ্ঞ, দান এবং তপস্যাকে একসঙ্গে রাখার মধ্যেও একটি গভীর দর্শন রয়েছে। যজ্ঞ মানুষকে নিজের চেয়ে বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে। দান মানুষকে নিজের সম্পদ ও সামর্থ্যের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত করে। তপস্যা মানুষকে নিজের মন ও ইন্দ্রিয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। অর্থাৎ যজ্ঞ মানুষের নিবেদনের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে, দান তার উদারতাকে বিকশিত করে এবং তপস্যা তার আত্মসংযমকে শক্তিশালী করে। এই তিনটি কর্ম মানুষের বাহ্যিক আচরণ এবং অন্তর্গত চরিত্র উভয়কেই পরিশুদ্ধ করতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। কর্ম কি নিজেই দোষযুক্ত, নাকি কর্মের সঙ্গে যুক্ত কামনা ও আসক্তিই দোষের মূল। গীতার সামগ্রিক দর্শনের আলোকে দেখা যায় যে কর্ম নিজে সবসময় বন্ধনের কারণ নয়। কর্মের সঙ্গে যুক্ত কর্তার অহংকার, কামনা এবং ফলের প্রতি আসক্তিই মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। একই কাজ একজন মানুষ স্বার্থপর উদ্দেশ্যে করতে পারেন এবং অন্য একজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে করতে পারেন। বাহ্যিক কর্ম একই হলেও অন্তরের অবস্থার কারণে তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
একজন চিকিৎসকের কথা ভাবা যেতে পারে। তিনি যদি শুধু অর্থ, খ্যাতি এবং সামাজিক মর্যাদার জন্য রোগীর চিকিৎসা করেন তাহলে তার কর্মের সঙ্গে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে যুক্ত থাকবে। কিন্তু যদি তিনি রোগীর কল্যাণকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা করেন তাহলে তার কর্মের মধ্যে সেবার ভাব জন্ম নেয়। এখানে কর্ম ত্যাগ করা হয়নি। বরং কর্মের উদ্দেশ্য শুদ্ধ হয়েছে। তার জ্ঞান অন্যের উপকারে ব্যবহার করা দানের একটি রূপ হতে পারে। কঠিন পরিস্থিতিতেও সততা ও নিয়ম বজায় রাখা তপস্যার রূপ নিতে পারে এবং নিজের কাজের সমস্ত কৃতিত্ব নিজের অহংকারের সম্পত্তি না বানানো ত্যাগের ভাব প্রকাশ করতে পারে।
একজন ছাত্রের জীবনেও এই শিক্ষা প্রযোজ্য। একজন ছাত্র যদি কেবল পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য পড়াশোনা করে তাহলে তার মন সর্বদা ফলের চিন্তায় ব্যস্ত থাকতে পারে। পরীক্ষার ফল ভালো হলে সে অহংকারে ভুগতে পারে এবং ফল খারাপ হলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে পারে। কিন্তু যদি সে জ্ঞান অর্জনকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াশোনা করে তাহলে তার মন কর্মের গুণমানের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে কিন্তু ফলাফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড বানাবে না। এই মানসিক অবস্থাই গীতার ত্যাগের ধারণার দিকে নিয়ে যায়।
একজন বাবা বা মায়ের জীবনেও এই শিক্ষা প্রযোজ্য। সন্তানকে ভালোবাসা, শিক্ষা দেওয়া এবং তার জন্য ত্যাগ করা স্বাভাবিক কর্তব্য। কিন্তু যদি বাবা বা মা মনে করেন যে আমি এত কিছু করেছি তাই সন্তানকে অবশ্যই আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী চলতে হবে তাহলে ভালোবাসার সঙ্গে অধিকারবোধ যুক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে যদি তিনি সন্তানের কল্যাণের জন্য নিজের কর্তব্য পালন করেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট ফল বা স্বীকৃতির দাবি না করেন তাহলে তার কর্মের মধ্যে ত্যাগের গভীরতা প্রকাশ পায়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের মূল প্রশ্ন হলো মানুষ কি কর্মের জন্য জন্মগ্রহণ করেছে, নাকি কর্ম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় এই প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়। কেউ কর্মকে বন্ধনের কারণ হিসেবে দেখেছেন এবং তাই কর্ম থেকে দূরে থাকার কথা বলেছেন। আবার গীতার কর্মযোগ কর্মকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে না। বরং কর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিবর্তন করতে শেখায়। কর্ম থাকবে, কর্তব্য থাকবে, প্রচেষ্টা থাকবে, কিন্তু কর্মের সঙ্গে যুক্ত অহংকার এবং ফলের প্রতি অন্ধ আসক্তি ধীরে ধীরে কমবে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে দেখা যায় প্রকৃতি তার স্বভাব অনুযায়ী কর্ম করে এবং পুরুষ মূলত সাক্ষীস্বরূপ। মানুষ যখন নিজেকে সমস্ত কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করে তখন তার মধ্যে কর্তার অহংকার জন্মায়। বেদান্তীয় চিন্তায়ও এই কর্তার ভাব মানুষের অজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি করলাম, আমি পেলাম, এটি আমার এবং আমার জন্যই এটি ঘটেছে এই ধরনের চিন্তা মানুষের মধ্যে আসক্তি সৃষ্টি করে। এই আসক্তি থেকেই আনন্দ ও দুঃখের ওঠানামা শুরু হয়। ত্যাগের মাধ্যমে এই অধিকারবোধ ধীরে ধীরে শিথিল হয়।
প্রতীকী দৃষ্টিতে যজ্ঞ হলো নিবেদনের প্রতীক, দান হলো উদারতার প্রতীক এবং তপস্যা হলো আত্মসংযমের প্রতীক। আর ত্যাগ হলো আসক্তিমুক্তির প্রতীক। মানুষ যখন নিজের মধ্যে এই চারটি গুণ বিকশিত করে তখন তার জীবন ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বৃহত্তর চেতনার দিকে এগিয়ে যায়। সে শুধু নিজের জন্য বাঁচে না। তার কর্ম অন্যের উপকারের সঙ্গে যুক্ত হয়। তার সম্পদ ভাগ করার মানসিকতা তৈরি হয় এবং তার প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
এই শ্লোককে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদীর স্বভাব হলো প্রবাহিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া। নদী যদি প্রতিটি মুহূর্তে ভাবতে থাকে যে আমি কোথায় পৌঁছাব, আমি কী পাব এবং আমার যাত্রার ফল কী হবে তাহলে তার স্বাভাবিক প্রবাহের অর্থ হারিয়ে যায়। মানুষের জীবনও অনেকটা এমন। আমাদের কাজ হলো যথাসাধ্য সৎভাবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কর্তব্য পালন করা। ভবিষ্যতের প্রতিটি ফলাফল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কর্মের প্রতি নিষ্ঠা এবং ফলের প্রতি অনাসক্তি মানুষের মনকে অধিক শান্ত ও স্বাধীন করতে পারে।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কেবল কষ্ট আছে বলে কোনো কর্মকে পরিত্যাজ্য মনে করা উচিত নয়। অনেক মূল্যবান কাজের মধ্যেই কষ্ট থাকে। একজন শিক্ষককে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়, একজন চিকিৎসককে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, একজন কৃষককে প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয় এবং একজন সাধককে নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। কষ্ট থাকা মানেই কর্ম দোষযুক্ত নয়। অনেক সময় সেই কষ্টই চরিত্রকে পরিণত করে এবং মানুষকে নিজের সীমা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।
শ্রীকৃষ্ণ তাই এই শ্লোকে ত্যাগের প্রশ্নকে আরও গভীর স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন। যদি কেউ মনে করেন সব কর্মই দোষযুক্ত তাই সব কর্ম ত্যাগ করতে হবে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে যজ্ঞ, দান ও তপস্যার মতো শুদ্ধিকর কর্মের কী হবে। আবার যদি কেউ বলেন কোনো কর্মই ত্যাগ করা যাবে না, তাহলেও প্রশ্ন থাকে কামনা ও আসক্তির সঙ্গে যুক্ত কর্মের কী হবে। এই দুই চরম অবস্থার মধ্যেই গীতার সূক্ষ্ম দর্শন ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়।
সুতরাং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোক আমাদের সামনে ত্যাগের একটি গভীর দার্শনিক সমস্যা তুলে ধরে। কর্ম ত্যাগ করাই কি মুক্তির পথ, নাকি কর্মের সঙ্গে যুক্ত কামনা ও ফলাসক্তি ত্যাগ করাই মুক্তির পথ। শ্লোকটি প্রথমে দুটি মত প্রকাশ করলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের বাহ্যিক কর্মের চেয়ে অন্তরের অবস্থার দিকে তাকাতে শেখায়। মানুষ কর্মের মধ্যেই থাকতে পারে, সংসারের দায়িত্ব পালন করতে পারে, যজ্ঞ করতে পারে, দান করতে পারে, তপস্যা করতে পারে এবং একই সঙ্গে নিজের অহংকার ও ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি কমাতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো ত্যাগ মানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। ত্যাগ মানে জীবনের কর্মকে নতুন চেতনার আলোয় দেখা। যজ্ঞ আমাদের শেখায় নিজের কর্মকে বৃহত্তর সত্যের কাছে নিবেদন করতে, দান শেখায় নিজের সামর্থ্য অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করতে, তপস্যা শেখায় নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ত্যাগ শেখায় কর্মের ফলকে নিজের অহংকারের সম্পত্তি না বানাতে। তাই প্রকৃত ত্যাগ কর্মকে ধ্বংস করে না, বরং কর্মের সঙ্গে মানুষের বন্ধনকে পরিবর্তন করে। বাহ্যিকভাবে মানুষ কর্মরত থাকে, কিন্তু অন্তরে সে ধীরে ধীরে স্বাধীন হয়ে ওঠে। এই অন্তরের স্বাধীনতাই গীতার ত্যাগ দর্শনের অন্যতম গভীর সত্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!