সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৩১ — ধর্ম ও অধর্মের যথার্থ বিচার করতে অক্ষম রাজসিক বুদ্ধির প্রকৃতি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যয়া ধর্মমধর্মং চ কার্যং চাকার্যমেব চ।অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।৩১।।
যয়া ধর্মমধর্মং চ কার্যং চাকার্যমেব চ।
অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।৩১।।

অনুবাদঃ যে বুদ্ধির দ্বারা ধর্ম ও অধর্ম, কার্য ও অকার্য আদির পার্থক্য অসম্যক্ রূপে জানতে পারা যায়, সেই বুদ্ধি রাজসিকী।

ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের বুদ্ধির একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার ব্যাখ্যা করেছেন। শ্লোকটি হলো

এর সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, যে বুদ্ধি ধর্ম ও অধর্ম এবং করণীয় ও অকরণীয়কে যথাযথভাবে জানতে বা বিচার করতে পারে না, সেই বুদ্ধি রাজসিক। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের নৈতিক বিচারবোধ, কর্মপ্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থপরতা, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল একটি বুদ্ধির সংজ্ঞা দিচ্ছেন না, বরং মানুষের অন্তর্জগতে কীভাবে বিচারশক্তি ক্রমশ আকাঙ্ক্ষা ও আসক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সত্যকে বিকৃতভাবে দেখতে শুরু করে, তার একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো বুদ্ধি। সংস্কৃত বুদ্ধি শব্দটির উৎপত্তি √বুধ ধাতু থেকে। বুধ ধাতুর অর্থ জাগ্রত হওয়া, জানা, উপলব্ধি করা বা সচেতন হওয়া। এই একই ধাতুর সঙ্গে বোধ এবং বুদ্ধের মতো শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। তাই বুদ্ধি বলতে কেবল সাধারণ জ্ঞান বা মেধাকে বোঝায় না। বুদ্ধি হলো মানুষের সেই অন্তর্গত বিচারশক্তি যার সাহায্যে সে সত্য ও অসত্য, ন্যায় ও অন্যায়, কর্তব্য ও অকর্তব্য এবং গ্রহণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। মানুষের চিন্তা ও কর্মের মধ্যে বুদ্ধির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ কোনো কাজ করার আগে তার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে, সেই ধারণার ভিত্তিতে বিচার করে এবং তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই কারণে বুদ্ধি যেমন হবে, মানুষের সিদ্ধান্তও তেমন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

শ্লোকে ব্যবহৃত ধর্ম শব্দটির গভীরতা আরও বিস্তৃত। ধর্ম শব্দটি সংস্কৃত √ধৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা বা স্থিতি রক্ষা করা। সেই দিক থেকে ধর্ম হলো এমন নীতি যা ব্যক্তি, সমাজ এবং বৃহত্তর নৈতিক ব্যবস্থাকে ধারণ করে রাখে। ধর্মকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় বা আচার হিসেবে বোঝা এই শ্লোকের অর্থকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। এখানে ধর্ম বলতে ন্যায়, সত্য, কর্তব্য, নৈতিকতা এবং যথার্থ আচরণের সেই নীতিকে বোঝানো হয়েছে যা জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। ধর্ম হলো এমন একটি শক্তি যা মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে বৃহত্তর সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে।

এর বিপরীতে রয়েছে অধর্ম। অধর্ম শব্দটি অ এবং ধর্ম এই দুই অংশে গঠিত। এখানে অ উপসর্গটি ধর্মের অভাব, বিপরীততা বা বিরোধিতা নির্দেশ করে। ফলে অধর্ম হলো ধর্মের বিপরীত অবস্থা। অন্যায়, অসত্য, অনৈতিকতা, কর্তব্যবিরোধী আচরণ এবং ন্যায়ের পরিপন্থী কর্ম অধর্মের অন্তর্ভুক্ত। শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম ও অধর্মকে পাশাপাশি স্থাপন করে বোঝাতে চেয়েছেন যে মানুষের বুদ্ধির একটি মৌলিক কাজ হলো এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক পার্থক্য নির্ণয় করা। মানুষ যদি ধর্মকে অধর্ম এবং অধর্মকে ধর্ম বলে গ্রহণ করে, তবে তার বিচারবোধ বিপর্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু রাজসিক বুদ্ধির ক্ষেত্রে সমস্যা আরও সূক্ষ্ম। এখানে মানুষ সবসময় ধর্ম ও অধর্মের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। বরং সে অনেক সময় তাদের পার্থক্য সম্পর্কে কিছুটা জানে, কিন্তু তার বিচার যথার্থ ও নিরপেক্ষ থাকে না।

শ্লোকে কার্য এবং অকার্য শব্দ দুটি এই নৈতিক বিচারকে আরও ব্যবহারিক পর্যায়ে নিয়ে আসে। কার্য শব্দটি √কৃ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। কার্য অর্থ যা করা উচিত, যা সম্পাদনীয় বা যা কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। অকার্য হলো যা করা উচিত নয়। অর্থাৎ ধর্ম ও অধর্ম যেখানে বৃহত্তর নৈতিক নীতির কথা বলে, কার্য ও অকার্য সেখানে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্ন নিয়ে আসে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে কোনো না কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাকে নির্ধারণ করতে হয় এখন তার কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়। এই সিদ্ধান্তের যথার্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার বুদ্ধির স্বচ্ছতার ওপর।

এখানেই অযথাবৎ শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য প্রকাশ পায়। অযথাবৎ অর্থ যথাযথভাবে নয়, সঠিকভাবে নয় অথবা বাস্তব সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেননি যে রাজসিক বুদ্ধি কিছুই জানে না। তিনি বলেছেন অযথাবৎ প্রজানাতি। অর্থাৎ সে জানে, কিন্তু যথার্থভাবে জানে না। সে বিচার করে, কিন্তু তার বিচার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়। সে যুক্তি দেয়, কিন্তু সেই যুক্তির মধ্যে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের প্রভাব থাকতে পারে। এই একটি শব্দের মধ্যেই রাজসিক বুদ্ধির গভীর মনস্তত্ত্ব নিহিত রয়েছে।

মানুষের জীবনে এমন ঘটনা খুব সাধারণ যে সে জানে কোনো কাজ নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, তবু নিজের স্বার্থের কারণে সেই কাজকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। একজন ব্যবসায়ী জানেন যে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করা উচিত নয়, কিন্তু তিনি মনে করতে পারেন যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য এই কাজ করা প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি জানেন যে মিথ্যা বলা অন্যায়, কিন্তু নিজের সুবিধার জন্য সে বলতে পারে যে পরিস্থিতি তাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করেছে। একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি জানেন যে অন্যায়ভাবে কারও অধিকার হরণ করা উচিত নয়, কিন্তু নিজের ক্ষমতা ও স্বার্থের কারণে তিনি তার কাজের পক্ষে নানা যুক্তি দাঁড় করাতে পারেন। এখানে জ্ঞান সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয়। বরং জ্ঞানকে নিজের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থাই অযথাবৎ বিচারবোধের একটি বাস্তব উদাহরণ।

রাজসিক বুদ্ধির সঙ্গে রজোগুণের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংখ্য দর্শনে সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণ। সত্ত্বের মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য ও প্রকাশ। রজঃ নির্দেশ করে গতি, আকাঙ্ক্ষা, কর্মচাঞ্চল্য, আবেগ, প্রতিযোগিতা ও ফলের প্রতি আকর্ষণ। তমঃ নির্দেশ করে জড়তা, অন্ধকার ও অবিদ্যা। রাজসিক বুদ্ধি রজোগুণের প্রভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। সে ক্রমাগত কিছু অর্জন করতে চায়, কিছু পেতে চায়, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে চায়। ফলে সত্য ও কর্তব্যের বিচার অনেক সময় নিজের আকাঙ্ক্ষার অধীন হয়ে পড়ে।

রজোগুণ নিজে সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। কর্মশক্তি, উদ্যোগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সৃষ্টিশীলতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও রজোগুণের প্রকাশ রয়েছে। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন কর্মশক্তির সঙ্গে ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি যুক্ত হয়। তখন কর্মের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত লাভ, সম্মান, ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠা। মানুষ তখন আর শুধু এই প্রশ্ন করে না যে কাজটি সঠিক কি না। বরং প্রশ্ন করে কাজটি করলে তার কী লাভ হবে। এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম হলেও নৈতিক জীবনের জন্য তা গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাত্ত্বিক বুদ্ধি এবং রাজসিক বুদ্ধির মধ্যে এখানেই প্রধান পার্থক্য। সাত্ত্বিক বুদ্ধি ধর্ম ও অধর্ম, কার্য ও অকার্যকে যথাযথভাবে বিচার করতে পারে। সে নিজের ইচ্ছাকে সত্যের ওপর চাপিয়ে দেয় না। অন্যদিকে রাজসিক বুদ্ধি বিচার করতে গিয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থ ও আসক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই রাজসিক বুদ্ধি অজ্ঞতার সমার্থক নয়। অনেক সময় একজন অত্যন্ত মেধাবী এবং যুক্তিবাদী মানুষের মধ্যেও রাজসিক বুদ্ধি থাকতে পারে। তার সমস্যা জ্ঞানের পরিমাণে নয়, বরং সেই জ্ঞানকে নিরপেক্ষভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতায়।

তামসিক বুদ্ধি আবার আরও গভীর অন্ধকারের প্রতীক। রাজসিক বুদ্ধি যেখানে সঠিক বিচার করতে ব্যর্থ হয়, তামসিক বুদ্ধি সেখানে ভুলকেই সত্য বলে গ্রহণ করতে পারে। এই কারণে গীতায় বুদ্ধির তিনটি প্রকৃতির মধ্যে একটি ক্রমও লক্ষ্য করা যায়। সাত্ত্বিক বুদ্ধি সত্যকে যথাযথভাবে দেখতে পারে। রাজসিক বুদ্ধি সত্যকে দেখতে গিয়ে আকাঙ্ক্ষার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। তামসিক বুদ্ধি সত্য ও অসত্যের পার্থক্যকেই উল্টে দিতে পারে।

এই শ্লোকের দার্শনিক অর্থ আরও গভীর হয় যখন আমরা বেদান্তের আলোকে বুদ্ধিকে দেখি। বেদান্তীয় দৃষ্টিতে আত্মা স্বপ্রকাশ চৈতন্য। কিন্তু মানুষের অন্তঃকরণ যখন বিভিন্ন গুণ ও প্রবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন সেই চৈতন্যের প্রকাশও বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়। রজোগুণে আচ্ছন্ন বুদ্ধি তখন সত্যকে নিজের আকাঙ্ক্ষার আলোকে দেখতে শুরু করে। মানুষ তখন প্রশ্ন করে না সত্য কী। বরং প্রশ্ন করে আমার জন্য কোনটি সুবিধাজনক। এই পরিবর্তনটি আত্মিক জীবনের জন্য একটি বড় বাধা। কারণ আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের ইচ্ছার কেন্দ্র থেকে সত্যের কেন্দ্রের দিকে নিয়ে যায়।

এই শ্লোককে আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোতেও একটি আকর্ষণীয় উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। মানুষ অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খুঁজে নেয় এবং নিজের পছন্দকে সমর্থন করে এমন তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ তথ্যকে উপেক্ষা করার প্রবণতাও দেখা যায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের প্রবণতাকে বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। গীতার রাজসিক বুদ্ধির ধারণার সঙ্গে এগুলোর সরাসরি ঐতিহাসিক সমীকরণ করা ঠিক নয়, তবে অযথাবৎ বিচার কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে তা বোঝার ক্ষেত্রে এই তুলনাগুলো শিক্ষণীয়।

রাজসিক বুদ্ধিকে একটি অস্থির আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি পরিষ্কার আয়নায় কোনো বস্তু যেমন, তেমনই প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আয়না যদি ক্রমাগত কাঁপতে থাকে, তাহলে প্রতিবিম্ব দেখা গেলেও তা পরিষ্কার হয় না। রাজসিক বুদ্ধিও ঠিক তেমন। সে বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেয় না। মানুষ সবকিছুই কিছুটা দেখতে পায়। কিন্তু কামনা, লোভ, ভয়, অহংকার, প্রতিযোগিতা এবং স্বার্থের আন্দোলনের কারণে সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি পরিষ্কার থাকে না। তাই রাজসিক বুদ্ধি সম্পূর্ণ অন্ধ নয়। বরং সে অস্থির এবং পক্ষপাতদুষ্ট।

আরেকটি সুন্দর উপমা হলো রঙিন চশমা। কেউ যদি লাল রঙের চশমা পরে পৃথিবীর দিকে তাকায়, তাহলে পৃথিবী তার কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয় না। সে সবকিছু দেখতে পায়, কিন্তু সবকিছুর ওপর একটি নির্দিষ্ট রঙের প্রভাব পড়ে। রজোগুণও বুদ্ধির ওপর তেমন একটি রঙ চাপিয়ে দেয়। তখন মানুষ বাস্তবতাকে নিজের আকাঙ্ক্ষার রঙে দেখতে শুরু করে। সে অন্যায়কে পুরোপুরি অন্যায় বলে দেখতে পারে না, কারণ তার ব্যক্তিগত স্বার্থ সেই অন্যায়কে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চাইছে।

মহাভারতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবনে পারিবারিক আসক্তি, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিশোধ, অহংকার, পক্ষপাত এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় নৈতিক বিচারকে দুর্বল করে। মানুষ কখনো কখনো জানে কোন পথ ন্যায়ের, তবু অন্য পথ বেছে নেয়। কারণ জ্ঞান থাকা এবং সেই জ্ঞান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। গীতার বুদ্ধি তত্ত্ব এই পার্থক্যটিকে অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরে।

এই শ্লোক আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমীক্ষার পথ দেখায়। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হয় যে আমরা সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করছি, নাকি নিজের ইচ্ছাকে সত্য প্রমাণ করার জন্য যুক্তি ব্যবহার করছি। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে আমি কি সত্যিই কর্তব্য অনুসরণ করছি, নাকি আমার আকাঙ্ক্ষাকে কর্তব্যের রূপ দিচ্ছি। আমি কি ন্যায়কে অনুসরণ করছি, নাকি নিজের স্বার্থকে ন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করছি। আমি কি সত্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি, নাকি নিজের সিদ্ধান্তের কাছে সত্যকে সমর্পণ করতে চাইছি। এই প্রশ্নগুলো রাজসিক বুদ্ধিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই কারণেই গীতার শিক্ষা কেবল কর্মের পরিবর্তনের শিক্ষা নয়। এটি বুদ্ধির পরিবর্তনের শিক্ষাও। মানুষকে শুধু ভালো কাজ করতে বলা হয়নি। তাকে এমন বুদ্ধি অর্জনের দিকে পরিচালিত করা হয়েছে যা ভালো ও মন্দ, কর্তব্য ও অকর্তব্য এবং ধর্ম ও অধর্মকে যথাযথভাবে বিচার করতে পারে। কারণ ভুল বুদ্ধি থেকে সঠিক কর্মের ধারাবাহিকতা তৈরি করা কঠিন। কর্মের পেছনে থাকে সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে বিচার এবং বিচারের পেছনে থাকে বুদ্ধির অবস্থা।

অতএব এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত উন্নতি শুধু বাহ্যিক কর্মের পরিবর্তনে নয়, তার বিচারবোধের শুদ্ধতায়। রাজসিক বুদ্ধি মানুষকে কর্মশীল করে তুলতে পারে, কিন্তু যদি সেই কর্মশক্তি ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়, তাহলে বিচারবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সেই কারণে কর্মশক্তিকে ধ্বংস না করে তাকে শুদ্ধ করা প্রয়োজন। আকাঙ্ক্ষাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে তাকে বৃহত্তর কর্তব্য ও সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। বুদ্ধিকে নিষ্ক্রিয় করা নয়, বরং বুদ্ধিকে স্বচ্ছ করা প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের একটি চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে। মানুষ সবসময় অজ্ঞতার কারণে ভুল করে না। অনেক সময় সে জানে কী সত্য, কিন্তু নিজের আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থ ও আসক্তির কারণে সেই সত্যকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ধর্ম ও অধর্মের পার্থক্য জানা, করণীয় ও অকরণীয় নির্ণয় করা এবং নিজের ইচ্ছার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে গ্রহণ করা হলো পরিশুদ্ধ বুদ্ধির লক্ষণ। যে বুদ্ধি সত্যকে নিজের কামনার অধীন করে, তা রাজসিক। যে বুদ্ধি সত্যকে তার যথার্থ রূপে দেখতে শেখে, তা সাত্ত্বিকতার দিকে অগ্রসর হয়। তাই এই শ্লোক কেবল রাজসিক বুদ্ধির সংজ্ঞা নয়। এটি মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে আত্মজ্ঞান, অস্থিরতা থেকে স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা থেকে সত্য ও কর্তব্যের দিকে যাত্রার একটি গভীর আধ্যাত্মিক নির্দেশনা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি