ভগবদ্গীতা ১৮.৩২ — অধর্মকে ধর্ম মনে করার বিপরীত বুদ্ধি: তামসী বুদ্ধির গভীর তত্ত্ব
অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা।
সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।৩২।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! যে বুদ্ধি অধর্মকে ধর্ম এবং সমস্ত বস্তুকে বিপরীত বলে মনে করে, তমসাবৃত সেই বুদ্ধিই তামসিকী।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের বত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের বুদ্ধির একটি অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম অবস্থার কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো “অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা। সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।” এর সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, যে বুদ্ধি তমস দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে এবং সমস্ত বিষয়কে বিপরীতভাবে উপলব্ধি করে, সেই বুদ্ধিই তামসী বুদ্ধি। এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের নৈতিক বিচারবোধ, সত্য উপলব্ধি, আত্মপ্রবঞ্চনা, অজ্ঞতা এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের একটি গভীর বিশ্লেষণ নিহিত রয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ, নৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আত্মজিজ্ঞাসার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অধর্ম। সংস্কৃত অধর্ম শব্দটি অ এবং ধর্ম এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এখানে অ একটি নিষেধ বা বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে এবং ধর্ম শব্দটি সংস্কৃত ধৃ ধাতু থেকে এসেছে। ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা বা সমর্থন করা। সেই দিক থেকে ধর্ম হলো যা ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বজগতের নৈতিক ও সুশৃঙ্খল অবস্থাকে ধারণ করে। আর অধর্ম হলো যা সেই ধারণক্ষম নীতি থেকে বিচ্যুত হয়। তাই অধর্মকে শুধু পাপ বা খারাপ কাজ হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। অধর্ম হলো সত্য, ন্যায়, কর্তব্য, বিবেক ও কল্যাণের বিরুদ্ধে অবস্থান। অন্যদিকে ধর্ম শব্দটির অর্থও এখানে শুধু কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় বা আচার বোঝায় না। গীতার ভাষায় ধর্মের মধ্যে কর্তব্য, ন্যায়, সত্য, নৈতিকতা এবং জীবনের সঠিক পথের ধারণা অন্তর্ভুক্ত।
শ্লোকে এরপর এসেছে ইতি এবং মন্যতে শব্দ। মন্যতে শব্দটি সংস্কৃত মন ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ চিন্তা করা, মনে করা, বিবেচনা করা বা ধারণা করা। ইতি শব্দটি কোনো বক্তব্য বা ধারণাকে নির্দেশ করে। তাই অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে বলতে বোঝায় যে ব্যক্তি বা বুদ্ধি অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ শুধু এমন ব্যক্তির কথা বলছেন না যে অধর্মের কাজ করে। তিনি এমন একটি বুদ্ধির কথা বলছেন যা অধর্মকে অধর্ম হিসেবে চিনতেই পারে না এবং বরং তাকে ধর্ম বলে গ্রহণ করে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যাটি মানুষের চিন্তা, উপলব্ধি এবং নৈতিক বিচারবোধের গভীরে অবস্থান করে।
এই কারণেই শ্লোকের তমসাবৃতা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তমস অর্থ অন্ধকার, অজ্ঞানতা, জড়তা, মোহ এবং চেতনার অস্পষ্টতা। আবৃত অর্থ আচ্ছাদিত বা ঢাকা। তমসাবৃতা বলতে বোঝানো হয়েছে তমস দ্বারা আচ্ছাদিত। এখানে অন্ধকার কোনো বাহ্যিক অন্ধকার নয়। এটি অন্তরের অন্ধকার। মানুষের চোখ খোলা থাকলেও তার বিচারবুদ্ধি সত্যকে দেখতে না পারলে সেই অবস্থাই তমস দ্বারা আবৃত হওয়া। সত্য সামনে উপস্থিত থাকলেও যদি মোহ, অহংকার, স্বার্থ, আসক্তি বা অজ্ঞতার কারণে মানুষ সত্যকে গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে তার বুদ্ধির উপর তমসের আবরণ সৃষ্টি হয়।
বুদ্ধি শব্দটিরও গভীর ব্যুৎপত্তিগত তাৎপর্য রয়েছে। এটি সংস্কৃত বুধ ধাতু থেকে এসেছে। বুধের অর্থ জাগ্রত হওয়া, জানা, উপলব্ধি করা বা সচেতন হওয়া। তাই বুদ্ধি শুধু সাধারণ বুদ্ধিমত্তা নয়। গীতার দর্শনে বুদ্ধি হলো বিচার করার শক্তি, সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা, কর্তব্য ও অকর্তব্য নির্ণয় করার সামর্থ্য এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্তর্নিহিত শক্তি। একজন মানুষ অনেক জ্ঞানী হতে পারেন, অনেক তথ্য জানতে পারেন, যুক্তি করতে পারেন এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলে পরিচিত হতে পারেন। কিন্তু তার বিচারবোধ যদি ন্যায় ও সত্যের পরিবর্তে মোহ ও স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে সেই বুদ্ধি গীতার দৃষ্টিতে সত্যিকার অর্থে প্রজ্ঞাময় নয়।
শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন যে তামসী বুদ্ধি অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে, তখন তিনি মানুষের নৈতিক উপলব্ধির একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থার কথা তুলে ধরছেন। ভুল কাজ করা এক বিষয় এবং ভুল কাজকে সঠিক বলে মনে করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একজন মানুষ যদি জানে যে সে ভুল করছে, তাহলে তার মধ্যে অনুশোচনা ও সংশোধনের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যখন সে নিজের অন্যায়কে ন্যায় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন তার নিজের কাছে নিজের ভুল আর ভুল বলে মনে হয় না। তখন সংশোধনের দরজাটিও অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এই কারণেই অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করা সাধারণ ভুলের তুলনায় অনেক বেশি গভীর নৈতিক বিপর্যয়।
তামসী বুদ্ধির আরেকটি লক্ষণ হলো সমস্ত বিষয়কে বিপরীতভাবে দেখা। শ্লোকে সর্বার্থান্ বিপরীতান্ কথাটি এই অর্থ প্রকাশ করে। অর্থাৎ শুধু একটি বিশেষ বিষয়ের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের নানা বিষয়ের ক্ষেত্রেই বিচারবোধ উল্টো হয়ে যেতে পারে। সত্যকে অসত্য মনে হওয়া, ন্যায়কে অন্যায় মনে হওয়া, কর্তব্যকে বোঝা মনে হওয়া, অন্যায়কে অধিকার বলে মনে করা এবং আত্মসংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা এই বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্ন প্রকাশ। এমন অবস্থায় মানুষ বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমন দেখতে পারে না। সে নিজের অজ্ঞতা, আসক্তি ও পূর্বধারণার মধ্য দিয়ে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে থাকে।
এই অবস্থাকে একটি বিকৃত আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। স্বচ্ছ আয়না বাস্তব বস্তুর একটি সঠিক প্রতিফলন দেখায়। কিন্তু আয়না যদি বিকৃত হয়, তাহলে বস্তুটি যেমন, তার প্রতিবিম্ব তেমন থাকে না। তামসী বুদ্ধিও অনেকটা এমন। বাস্তবতা পরিবর্তিত হয় না, কিন্তু বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা বিকৃত হয়ে যায়। অধর্ম তখন ধর্মের মতো দেখায় এবং ধর্ম অধর্মের মতো মনে হয়। এই কারণেই তামসী বুদ্ধির প্রধান সমস্যা বাইরের জগতে নয়, মানুষের অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে।
বেদান্ত দর্শনের দৃষ্টিতে এই ধারণার সঙ্গে অবিদ্যার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অবিদ্যা হলো বাস্তব সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা। অজ্ঞতার কারণে মানুষ কখনো কখনো যা বাস্তব নয় তাকে বাস্তব বলে মনে করে। অন্ধকারে একটি দড়িকে সাপ বলে মনে হওয়ার উপমাটি এই বিষয়টি বোঝাতে অত্যন্ত কার্যকর। দড়ি বাস্তবে দড়িই, কিন্তু অন্ধকার ও ভয়ের কারণে তা সাপ বলে মনে হয়। তেমনি ধর্ম ও অধর্মের প্রকৃত স্বরূপ বাস্তবে যা, তা পরিবর্তিত হয় না। কিন্তু তমসের আবরণে আচ্ছন্ন বুদ্ধি তার বিপরীত ধারণা তৈরি করতে পারে। এখানে সত্যের পরিবর্তন ঘটে না, পরিবর্তন ঘটে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতায়।
সাংখ্য দর্শনের আলোতেও এই শ্লোকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতির তিনটি গুণ হলো সত্ত্ব, রজঃ এবং তমস। সত্ত্ব স্বচ্ছতা, জ্ঞান ও ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। রজস ক্রিয়া, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা ও প্রবল কর্মপ্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। তমস জড়তা, অজ্ঞানতা, মোহ ও আচ্ছাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তামসী বুদ্ধি হলো এমন বিচারবুদ্ধি যেখানে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং অজ্ঞতা ও মোহ বাস্তবতার উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এই বুদ্ধি সত্যকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না এবং তাই তার নৈতিক সিদ্ধান্তও বিপরীত হয়ে যেতে পারে।
এই শ্লোকের সঙ্গে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের কিছু ধারণারও তুলনা করা যায়। মানুষ অনেক সময় নিজের ভুলকে যুক্তি দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। নিজের স্বার্থের সঙ্গে মিল আছে এমন তথ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করে এবং নিজের ধারণার বিরোধী তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করে। কখনো নিজের অন্যায় আচরণকেও পরিস্থিতি, প্রয়োজন বা আত্মরক্ষার নামে বৈধতা দেওয়া হয়। এই ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা মানুষের নৈতিক বিচারকে দুর্বল করে। গীতার তামসী বুদ্ধির ধারণা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের এই প্রবণতাগুলোর সঙ্গে সরাসরি অভিন্ন না হলেও তুলনামূলকভাবে এগুলোকে বোঝার একটি শক্তিশালী দার্শনিক কাঠামো প্রদান করে।
বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন মানুষ যদি অন্যায়ভাবে অর্থ গ্রহণ করে এবং মনে করে যে পরিবারের স্বার্থে সে সঠিক কাজ করেছে, তাহলে সে নিজের কাজকে নৈতিকতার আলোকে পুনর্বিবেচনা করছে না। একজন ব্যক্তি প্রতিশোধ গ্রহণ করে যদি মনে করে যে সে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে, তাহলে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের পার্থক্য তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। আবার কেউ নিজের ক্ষতিকর অভ্যাসকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে যেন সেটিই তার জন্য কল্যাণকর। এসব ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু কাজের মধ্যে নয়। কাজের পেছনে যে বিচারবোধ কাজ করছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সামাজিক ও ঐতিহাসিক জীবনেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। বড় ধরনের অন্যায় অনেক সময় এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না যে তার সমর্থকেরা নিজেদের অন্যায়কারী বলে মনে করে। বরং তারা নিজেদের কাজকে ন্যায়, কর্তব্য, নিরাপত্তা বা বৃহত্তর কল্যাণের নামে ব্যাখ্যা করতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের অন্যায়কে ন্যায় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন অন্যায় আরও দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে নৈতিক জীবনে শুধু কাজের বিচার করাই যথেষ্ট নয়। কাজকে যে চিন্তা ও মূল্যবোধ পরিচালিত করছে, তারও বিচার করা প্রয়োজন।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও তামসী বুদ্ধির ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাহিত্যের বহু ট্র্যাজিক চরিত্র নিজেদের পতনকে পতন হিসেবে দেখতে পারে না। তারা নিজেদের অহংকারকে মর্যাদা, প্রতিশোধকে ন্যায়, আসক্তিকে ভালোবাসা এবং ক্ষমতার লালসাকে কর্তব্য বলে ব্যাখ্যা করে। ফলে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে ওঠে নিজেদের সম্পর্কে ভুল ধারণা। মানুষ যখন নিজের অন্ধকারকে আলো বলে মনে করে, তখন তার পতন আরও গভীর হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক সত্য মহাকাব্য থেকে আধুনিক উপন্যাস পর্যন্ত সাহিত্যের বহু চরিত্রের মধ্যে দেখা যায়।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো আত্মজিজ্ঞাসা। মানুষ সাধারণত প্রশ্ন করে আমি কী করছি। কিন্তু গীতা আরও গভীর প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কেন এটিকে সঠিক মনে করছি। আমার বিচার কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, নাকি আমার অহংকার, ভয়, স্বার্থ, আসক্তি ও মোহের দ্বারা পরিচালিত। আমি কি সত্যকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, নাকি শুধু নিজের ধারণাকে সমর্থন করে এমন কথাই শুনতে চাই। এই প্রশ্নগুলো মানুষের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তামসী বুদ্ধিকে একটি নৈতিক কম্পাসের বিকৃত অবস্থার সঙ্গেও তুলনা করা যায়। একটি কম্পাসের কাজ হলো সঠিক দিক নির্দেশ করা। কিন্তু কম্পাসের দিকনির্দেশ যদি ভুল হয়ে যায়, তাহলে একজন দক্ষ মানুষও ভুল পথে যেতে পারে। একইভাবে মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও দক্ষতা যত বেশি হোক না কেন, যদি তার নৈতিক বিচারবোধ বিকৃত হয়, তাহলে সেই জ্ঞান ও দক্ষতাই কখনো কখনো ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই শুধু বুদ্ধিমান হওয়া যথেষ্ট নয়। বুদ্ধির দিকও সঠিক হওয়া প্রয়োজন।
এই কারণেই গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে বুদ্ধির গুণগত পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত্ত্বিক বুদ্ধি ধর্ম ও অধর্ম, কর্তব্য ও অকর্তব্য, ভয় ও অভয় এবং বন্ধন ও মুক্তির প্রকৃতি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে। রাজসিক বুদ্ধি এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়। আর তামসী বুদ্ধি এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যেখানে ধর্মকে অধর্ম এবং অধর্মকে ধর্ম বলে মনে হয়। এই তিন ধরনের বুদ্ধির আলোচনা মানুষের বাহ্যিক কাজের পাশাপাশি তার অন্তর্গত বিচারক্ষমতারও মূল্যায়ন করে।
আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য, মতামত, প্রচার এবং প্রলোভনের মধ্যে বসবাস করি। তাই শুধু অনেক কিছু জানা যথেষ্ট নয়। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি ন্যায় এবং কোনটি অন্যায় তা বিচার করার ক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কখনো কখনো নিজের পছন্দের তথ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করে এবং অপছন্দের সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। এই অবস্থায় তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও প্রজ্ঞার অভাব থেকে যেতে পারে। গীতার তামসী বুদ্ধির ধারণা আমাদের তাই নিজের বিচারবোধকে নিয়মিত পরীক্ষা করার শিক্ষা দেয়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক মানুষের অন্তরের একটি গভীর বিপদের দিকে ইঙ্গিত করে। মানুষ ভুল করতে পারে এবং সেই ভুল স্বীকার করে সংশোধিত হতে পারে। কিন্তু যখন সে নিজের ভুলকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে, তখন তার অজ্ঞতা আত্মপ্রবঞ্চনার রূপ নেয়। অধর্মকে ধর্ম মনে করা তাই কেবল একটি ভুল ধারণা নয়। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা ধীরে ধীরে আবৃত হয়ে যায়। তমস সেই আবরণ তৈরি করে, বুদ্ধি তার দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং মানুষের নৈতিক দিকনির্দেশনা বিপরীত হয়ে যায়।
সুতরাং “অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা” শ্লোকটি আমাদের শুধু ধর্ম ও অধর্মের পার্থক্য শেখায় না। এটি আমাদের নিজের বিচারবুদ্ধির প্রকৃতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। সত্যকে জানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ভুল ধারণাকে চিনতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিক অন্ধকারে পথ হারানো সহজ, কিন্তু অন্তরের অন্ধকারে পথ হারানো আরও বিপজ্জনক, কারণ সেখানে মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে সে পথ হারিয়েছে। তামসী বুদ্ধির প্রকৃত বিপদ এখানেই। তাই জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন যে আমার বিচার কি সত্য, ন্যায় ও বিবেকের আলোয় পরিচালিত হচ্ছে, নাকি অজ্ঞতা, মোহ, অহংকার ও স্বার্থের অন্ধকারে আবৃত হয়ে আছে। এই আত্মজিজ্ঞাসাই মানুষকে তামসী বুদ্ধির অন্ধকার থেকে সাত্ত্বিক বোধের স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!