ভগবদ্গীতা ১৮.৩৩ — মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সংযমে অবিচল ধৃতি: সাত্ত্বিক দৃঢ়তার তত্ত্ব
ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।
যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।৩৩।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! যে অব্যভিচারিণী ধৃতি যোগ অভ্যাস দ্বারা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াসকলকে ধারণ করে, সেই ধৃতিই সাত্ত্বিকী।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের তেত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্গত দৃঢ়তার একটি গভীর ও সূক্ষ্ম রূপের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হল ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী। এই শ্লোকের মূল বিষয় হল ধৃতি। সাধারণ অর্থে ধৃতি বলতে দৃঢ়তা, ধৈর্য, স্থৈর্য, অধ্যবসায়, সংকল্প বা মানসিক শক্তিকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার এই শ্লোকে ধৃতি শব্দটির অর্থ আরও গভীর। এখানে ধৃতি হল এমন এক অন্তর্নিহিত ধারণশক্তি, যার দ্বারা মানুষ নিজের মন, প্রাণ এবং ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে স্থির ও সংযত রাখতে পারে। এই ধৃতি যখন যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং কোনোভাবেই তার যথার্থ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় না, তখন তাকে সাত্ত্বিক ধৃতি বলা হয়।
ধৃতি শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু হল ধৃ। এই ধাতুর মৌলিক অর্থ হল ধারণ করা, ধরে রাখা, বহন করা, স্থির রাখা এবং সংরক্ষণ করা। ধৃতি শব্দের মধ্যেই তাই ধারণ করার একটি গভীর ভাব নিহিত রয়েছে। যে শক্তি কোনো কিছুকে ধরে রাখে, স্থির রাখে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে দেয় না, সেটিই ধৃতির মূল স্বরূপ। এই একই ধাতুর সঙ্গে ধারণ, ধারক এবং ধারয়তি প্রভৃতি শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। গীতার এই শ্লোকে ধৃতি এবং ধারয়তে শব্দের মধ্যে ধাতুগত একটি সুন্দর সম্পর্ক দেখা যায়। ধৃতি হল ধারণ করার শক্তি এবং ধারয়তে হল সেই শক্তির দ্বারা ধারণ করে রাখা। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এমন এক অন্তঃশক্তির কথা বলছেন, যা মানুষের বিচ্ছিন্ন ও অস্থির প্রবাহকে ধরে রেখে তাকে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে স্থাপন করতে সক্ষম।
শ্লোকের ধৃত্যা শব্দটি ধৃতি শব্দের তৃতীয়া একবচন রূপ। এর অর্থ ধৃতির দ্বারা বা দৃঢ়তার মাধ্যমে। যয়া অর্থ যে শক্তির দ্বারা। ধারয়তে অর্থ ধারণ করে, ধরে রাখে, স্থির রাখে বা সংযত করে। মনঃ অর্থ মন। প্রাণ অর্থ জীবনশক্তি এবং ইন্দ্রিয় অর্থ জগতের সঙ্গে মানুষের অনুভব ও ক্রিয়ার মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনকারী শক্তি। ক্রিয়াঃ অর্থ কার্যকলাপ বা কার্যপ্রবাহ। এই সব শব্দ একত্রে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ পদটি গঠন করেছে। এর অর্থ হল মন, প্রাণ এবং ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ। ফলে শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্বকে অত্যন্ত সামগ্রিকভাবে দেখছে। এখানে শুধু মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হয়নি। মন কীভাবে চিন্তা করে, প্রাণ কীভাবে প্রবাহিত হয় এবং ইন্দ্রিয় কীভাবে বাহ্যজগতের দিকে প্রবাহিত হয়, সেই সমগ্র অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রবাহকে ধারণ করার কথা বলা হয়েছে।
মন শব্দটির অর্থ শুধু চিন্তা নয়। ভারতীয় দর্শনে মন হল সংকল্প ও বিকল্পের ক্ষেত্র। মন কখনও একটি বিষয় চায়, আবার অন্য মুহূর্তে অন্য কিছুর দিকে আকৃষ্ট হয়। কখনও অতীতের স্মৃতি তাকে টেনে নিয়ে যায়, আবার কখনও ভবিষ্যতের আশঙ্কা তাকে অস্থির করে তোলে। প্রাণ হল জীবনের গতিশীল শক্তি। ইন্দ্রিয় মানুষকে বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। চোখ দেখতে চায়, কান শুনতে চায়, জিহ্বা স্বাদ নিতে চায়, ত্বক স্পর্শ অনুভব করতে চায় এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয়ও নিজ নিজ বিষয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। এইভাবে মানুষের মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয় একসঙ্গে নানা দিকে ছুটতে থাকে। ধৃতি সেই বিচ্ছিন্ন প্রবাহকে একটি উচ্চতর লক্ষ্যের অধীনে ধরে রাখার শক্তি।
এই কারণে ধৃতিকে শুধু ধৈর্য বলে অনুবাদ করলে শব্দটির গভীরতা সম্পূর্ণ প্রকাশ পায় না। ধৈর্য হল কষ্ট সহ্য করে অপেক্ষা করার ক্ষমতা। কিন্তু ধৃতি তার চেয়ে বিস্তৃত। ধৃতির মধ্যে ধৈর্য যেমন আছে, তেমনই আছে সংকল্প, স্থৈর্য, আত্মসংযম, অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যনিষ্ঠা। একজন মানুষ কোনো কাজের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য যদি অসৎ হয়, তাহলে সেই অপেক্ষা বা অধ্যবসায় সাত্ত্বিক ধৃতি নয়। আবার কেউ অন্যায়ের পথে অত্যন্ত দৃঢ় থাকতে পারে। সেই দৃঢ়তাও সাত্ত্বিক নয়। তাই গীতার দৃষ্টিতে দৃঢ়তা নিজে যথেষ্ট নয়। সেই দৃঢ়তা কোন উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
শ্লোকে যোগেন শব্দটি এসেছে যোগ শব্দ থেকে। যোগের মূল সংস্কৃত ধাতু হল যুজ, যার অর্থ যুক্ত করা, সংযুক্ত করা, একত্র করা এবং নিয়োজিত করা। এই প্রসঙ্গে যোগকে শুধু শারীরিক আসন হিসেবে বোঝা উচিত নয়। যোগ এখানে একাগ্রতা, আত্মসংযোগ, চেতনার ঐক্য, সাধনা এবং উচ্চতর সত্যের সঙ্গে অন্তরের সংযোগের অর্থ বহন করে। মানুষের মন যখন নানা বিষয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যোগ তাকে একটি কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে। ধৃতি সেই কেন্দ্রীভূত অবস্থাকে স্থায়ী রাখে। ফলে যোগ এবং ধৃতির মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যোগ মানুষকে একত্রিত করে এবং ধৃতি তাকে সেই ঐক্যের মধ্যে স্থির রাখে।
অব্যভিচারিণ্যা শব্দটিও এই শ্লোকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অব্যভিচারিণী অর্থ যে বিচ্যুত হয় না, যে লক্ষ্য থেকে সরে যায় না, যে অবিচল থাকে। এর মধ্যে একনিষ্ঠতা এবং লক্ষ্যনিষ্ঠতার ভাব রয়েছে। এই শব্দটি ধৃতির প্রকৃতি স্পষ্ট করে দেয়। সাত্ত্বিক ধৃতি এমন দৃঢ়তা নয় যা যেকোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকে। বরং এটি এমন দৃঢ়তা যা সত্য, জ্ঞান, যোগ এবং কল্যাণের পথে অবিচল থাকে। কেউ নিজের ভুল ধারণার প্রতিও দৃঢ় থাকতে পারে। কেউ নিজের অহংকারকেও শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। কিন্তু সেই দৃঢ়তা অব্যভিচারিণী সাত্ত্বিক ধৃতি নয়। সাত্ত্বিক ধৃতির দৃঢ়তার সঙ্গে বিবেক এবং সত্যের সম্পর্ক রয়েছে।
এই কারণেই ধৃতি এবং জেদের মধ্যে গভীর পার্থক্য রয়েছে। জেদ বলে আমি যা চাই তাই করব। ধৃতি বলে যা সত্য, যা কর্তব্য, যা কল্যাণকর এবং যা উচ্চতর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার পথে আমি অবিচল থাকব। জেদের কেন্দ্রে অহংকার থাকতে পারে, কিন্তু সাত্ত্বিক ধৃতির কেন্দ্রে থাকে বিবেক। জেদ অনেক সময় মানুষকে সংকীর্ণ করে, অথচ ধৃতি মানুষকে নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে উচ্চতর আদর্শের দিকে নিয়ে যায়। তাই ধৃতি হল অন্ধ একগুঁয়েমি নয়। এটি বিবেকনির্দেশিত দৃঢ়তা।
ধৃতি এবং দমনের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। ইন্দ্রিয়কে জোর করে চেপে রাখা ধৃতি নয়। ধৃতি হল ইন্দ্রিয়ের শক্তিকে সঠিক দিকে পরিচালিত করা। একটি নদীর জলকে শুধু আটকে রাখা এবং সেই জলকে সেচ, বিদ্যুৎ ও জীবনধারণের কাজে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। তেমনই মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তিকে শুধু দমন করা এবং সেই শক্তিকে জ্ঞান, সাধনা, সৃজনশীলতা ও কল্যাণের পথে ব্যবহার করা এক নয়। সাত্ত্বিক ধৃতি শক্তিকে ধ্বংস করে না। বরং শক্তিকে সংগঠিত করে।
গীতার দর্শনে বুদ্ধি এবং ধৃতির সম্পর্কও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বুদ্ধি মানুষকে বলে কোনটি কর্তব্য এবং কোনটি অকর্তব্য, কোন পথ কল্যাণকর এবং কোন পথ ক্ষতিকর। কিন্তু শুধু সঠিক পথ চিনতে পারলেই মানুষের জীবন সঠিক পথে চলে না। সেই পথে থাকার জন্য প্রয়োজন ধৃতি। তাই বলা যায়, বুদ্ধি পথ দেখায় এবং ধৃতি সেই পথে মানুষকে ধরে রাখে। বুদ্ধি যদি দিকনির্দেশ হয়, ধৃতি হল সেই দিকনির্দেশ অনুসরণ করার অন্তর্গত শক্তি। মানুষের জীবনে অনেক সময় এমন হয় যে সে জানে কী করা উচিত, কিন্তু তা করতে পারে না। এই জ্ঞান এবং কর্মের ব্যবধান পূরণ করার ক্ষেত্রে ধৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ছাত্র জানে যে নিয়মিত পড়াশোনা করলে তার জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু মোবাইল, বিনোদন, অলসতা এবং নানা আকর্ষণ তাকে পড়াশোনা থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। সে যদি নিজের লক্ষ্যকে স্মরণ করে বারবার পড়াশোনায় ফিরে আসে, তাহলে তার মধ্যে ধৃতির প্রকাশ ঘটে। একজন সাধক ধ্যান করতে বসে দেখলেন যে তার মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। তিনি আবার মনকে ফিরিয়ে আনলেন। আবার মন চলে গেল। আবার তিনি ফিরিয়ে আনলেন। এই বারবার সত্যের দিকে ফিরে আসার শক্তিও ধৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। ধৃতি মানে মন কখনও বিচলিত হবে না এমন নয়। বরং বিচলিত হওয়ার পরও লক্ষ্যচ্যুত না হয়ে ফিরে আসার শক্তিই ধৃতির গভীর পরিচয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে ধৃতি মানুষের অন্তরের নোঙরের মতো। সমুদ্র যতই উত্তাল হোক, নোঙর জাহাজকে ভেসে যেতে দেয় না। তেমনই জীবনের নানা আকর্ষণ, ভয়, দুঃখ, প্রলোভন এবং পরিবর্তনের মধ্যেও ধৃতি মানুষকে তার অন্তরের সত্য থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। মন হতে পারে উত্তাল সমুদ্র, ইন্দ্রিয় হতে পারে তার ঢেউ এবং আকাঙ্ক্ষা হতে পারে সেই ঢেউয়ের প্রবল টান। এই পরিস্থিতিতে ধৃতি হল সেই নোঙর, যা মানুষকে তার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রাখে।
ধৃতিকে একটি পর্বতের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। ঝড় আসে, বৃষ্টি আসে, রৌদ্র আসে এবং ঋতু পরিবর্তিত হয়, কিন্তু পর্বত তার অবস্থান ত্যাগ করে না। মানুষের জীবনেও সুখ আসে, দুঃখ আসে, প্রশংসা আসে, নিন্দা আসে, সাফল্য আসে এবং ব্যর্থতা আসে। যে ব্যক্তি এসব পরিবর্তনের মধ্যেও সত্য, কর্তব্য ও আত্মোন্নতির পথে স্থির থাকতে পারে, তার মধ্যে ধৃতির প্রকাশ ঘটে। তবে সাত্ত্বিক ধৃতি কেবল কঠিন হওয়া নয়। পর্বতের মতো স্থির হলেও তার অন্তরে জ্ঞান ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে ধৃতির তিনটি রূপের আলোচনা এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। সাত্ত্বিক ধৃতি মন, প্রাণ এবং ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপকে যোগের মাধ্যমে অবিচলভাবে ধারণ করে। রাজসিক ধৃতি কামনা, কর্মফল, অর্থ, ভোগ এবং সাফল্যের আকাঙ্ক্ষাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে। তামসিক ধৃতি আবার ঘুম, ভয়, শোক, বিষাদ, অলসতা এবং অজ্ঞানতার মতো অবস্থাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। ফলে তিন ক্ষেত্রেই এক ধরনের দৃঢ়তা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ও অভিমুখ ভিন্ন। এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে দৃঢ়তা নিজে কোনো চূড়ান্ত গুণ নয়। দৃঢ়তা কোন দিকে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপর তার প্রকৃতি নির্ভর করে।
এই দৃষ্টিতে একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষও সাত্ত্বিক নাও হতে পারেন। যদি তার সমস্ত পরিশ্রম কেবল অন্যকে পরাজিত করা, সম্পদ অর্জন করা বা অহংকার প্রতিষ্ঠার জন্য হয়, তাহলে তার দৃঢ়তা রাজসিক হতে পারে। আবার কেউ নিজের ক্ষতিকর অভ্যাস ছাড়তে অস্বীকার করেও এক ধরনের দৃঢ়তা দেখাতে পারে। সেটি তামসিক ধৃতির উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি সত্য, জ্ঞান, আত্মসংযম, কর্তব্য এবং কল্যাণের পথে নিজের মন ও ইন্দ্রিয়কে স্থির রাখে, তার দৃঢ়তা সাত্ত্বিক ধৃতির দিকে অগ্রসর হয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ভাষায় ধৃতির সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যনিষ্ঠ আচরণ, মনোযোগের স্থায়িত্ব, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, প্রলোভন নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়ের কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তবে ধৃতিকে শুধু মানসিক দক্ষতা হিসেবে দেখলে তার আধ্যাত্মিক গভীরতা হারিয়ে যায়। গীতার ধৃতি এমন আত্মনিয়ন্ত্রণ, যার সঙ্গে নৈতিকতা, জ্ঞান, যোগ এবং জীবনের উচ্চতর উদ্দেশ্য যুক্ত। এখানে প্রশ্ন শুধু আমি কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তা নয়। প্রশ্ন হল আমি নিজেকে কোন সত্যের অধীনে নিয়ন্ত্রণ করছি।
ধৃতি শব্দটির মধ্যে তাই একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। মানুষ সারাজীবন কিছু না কিছু ধারণ করে। কেউ অর্থের চিন্তা ধারণ করে, কেউ ভয় ধারণ করে, কেউ ক্রোধ ধারণ করে, কেউ অতীতের স্মৃতি ধারণ করে, আবার কেউ সত্য, প্রেম, জ্ঞান ও ঈশ্বরচেতনাকে ধারণ করে। মানুষের চরিত্র অনেকাংশে নির্ধারিত হয় সে তার অন্তরে কী ধারণ করে তার দ্বারা। তাই প্রশ্ন শুধু আমি কতটা দৃঢ় তা নয়। আরও গভীর প্রশ্ন হল আমি কী ধারণ করে আছি। এই প্রশ্নের উত্তরই ধৃতির প্রকৃতি প্রকাশ করে।
ধৃতিকে তাই মানুষের অন্তরের কেন্দ্ররক্ষাকারী শক্তি বলা যায়। মন একদিকে যেতে চায়, ইন্দ্রিয় অন্যদিকে টানে, আকাঙ্ক্ষা আরেকদিকে নিয়ে যায় এবং পুরোনো অভ্যাস আবার অন্য পথে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ধৃতি মানুষকে বলে নিজের কেন্দ্র হারিয়ো না। তোমার বুদ্ধি যে সত্যকে চিনেছে, তোমার বিবেক যে পথকে গ্রহণ করেছে এবং তোমার আত্মোন্নতির জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে, তার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখো। এই অর্থে ধৃতি মানুষের অন্তর্গত ঐক্যের রক্ষক।
ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা হল মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা শুধু নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার মধ্যে নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা হল নিজের মন, প্রাণ, ইন্দ্রিয় এবং আকাঙ্ক্ষাকে একটি উচ্চতর সত্যের অধীনে পরিচালিত করতে পারা। যে ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়ের প্রতিটি আকর্ষণের অনুসরণ করে, সে বাহ্যিকভাবে স্বাধীন হলেও অন্তরে তার প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তিকে চিনতে পারে, তার আকর্ষণকে অতিক্রম করতে পারে এবং বিবেকনির্দেশিত পথে নিজেকে স্থির রাখতে পারে, তার মধ্যেই প্রকৃত আত্মসংযমের প্রকাশ ঘটে।
সবশেষে বলা যায়, ধৃতি শব্দটি কেবল দৃঢ়তা বা ধৈর্যের নাম নয়। এটি মানুষের অন্তরের সেই গভীর শক্তি, যা তাকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে, মনকে স্থির করে, প্রাণশক্তিকে সংগঠিত করে এবং ইন্দ্রিয়ের প্রবাহকে সঠিক দিকে পরিচালিত করে। ধৃতি যখন যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়, যখন তা অবিচল থাকে এবং যখন তা জ্ঞান, সত্য ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত হয়, তখন তা সাত্ত্বিক ধৃতিতে পরিণত হয়। বুদ্ধি মানুষকে সঠিক পথ দেখায়, যোগ তাকে সেই পথে একত্রিত করে এবং ধৃতি তাকে সেই পথে ধরে রাখে। তাই গীতার এই শ্লোক আমাদের শুধু দৃঢ় হতে শেখায় না। এটি আমাদের জিজ্ঞাসা করতে শেখায় যে আমাদের দৃঢ়তা কোন সত্যকে ধারণ করছে এবং আমাদের মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয় কোন লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রশ্নের মধ্যেই ধৃতির প্রকৃত দর্শন নিহিত। ধৃতি হল নিজের অন্তরকে ধরে রাখার শক্তি, সত্যকে ধারণ করে থাকার শক্তি এবং জীবনের সকল পরিবর্তনের মধ্যেও উচ্চতর কল্যাণের পথে অবিচল থাকার শক্তি। সেই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় এমন অবিচল, যোগনিষ্ঠ এবং জ্ঞানসমর্থিত ধৃতিই সত্যিকার অর্থে সাত্ত্বিক ধৃতি।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!