ভগবদ্গীতা ১৮.৩৪ — ধর্ম, কাম ও অর্থে আসক্ত ফলকামী দৃঢ়তা: রাজসিক ধৃতির তত্ত্ব
যয়া তু ধর্মকামার্থান্ ধৃত্যা ধারয়তেহর্জুন।
প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।৩৪।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! হে পার্থ! যে ধৃতি ফলাকাঙ্ক্ষার সহিত ধর্ম, অর্থ ও কামকে ধারণ করে, সেই ধৃতি রাজসী।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের বুদ্ধি, কর্ম, কর্তা, ধৃতি এবং সুখকে সত্ত্ব, রজস ও তমস এই তিন গুণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন। এই ধারাবাহিক আলোচনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অষ্টাদশ অধ্যায়ের চৌত্রিশতম শ্লোক। শ্লোকটিতে বলা হয়েছে, “যয়া তু ধর্মকামার্থান্ ধৃত্যা ধারয়তেহর্জুন প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।” অর্থাৎ যে ধৃতির দ্বারা মানুষ ধর্ম, কাম ও অর্থকে আসক্তির সঙ্গে এবং কর্মফলের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ধারণ ও অনুসরণ করে, সেই ধৃতিকে রাজসিক বলা হয়। এই শ্লোকের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে শুধু অনুবাদ জানলেই যথেষ্ট নয়। এর প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ, শব্দের ব্যুৎপত্তি, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং গীতার কর্মদর্শনের সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হয়।
এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় শব্দ হলো ধৃতি। সংস্কৃত ধৃতি শব্দটি ধৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন। ধৃ ধাতুর মূল অর্থ হলো ধারণ করা, ধরে রাখা, বহন করা, সংরক্ষণ করা এবং কোনো কিছুকে স্থির রাখা। এই ধাতুর মধ্যেই ধৃতির প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। ধৃতি বলতে শুধু সাধারণ ধৈর্য বোঝায় না। এটি মানুষের সেই অন্তর্নিহিত মানসিক শক্তি, যার দ্বারা সে কোনো সংকল্প, আদর্শ, কর্ম বা মানসিক অবস্থাকে দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখতে পারে। মানুষ কোনো কাজ শুরু করতে পারে ইচ্ছার দ্বারা, কিন্তু সেই কাজের পথে বাধা এলেও অবিচল থাকার যে শক্তি তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সেটিই ধৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এই কারণে ধৃতিকে সংকল্পশক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, স্থৈর্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি হিসেবেও বোঝা যায়।
ধৃতি শব্দের সঙ্গে ধারয়তে শব্দটির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ধারয়তে অর্থ ধারণ করে, ধরে রাখে বা বহন করে। অর্থাৎ ধৃতি হলো ধারণ করার শক্তি এবং ধারয়তে হলো সেই শক্তির মাধ্যমে ধারণ করার কার্য। শ্লোকে যয়া এবং ধৃত্যা উভয় শব্দই নির্দেশ করছে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট মানসিক শক্তির মাধ্যমে মানুষ তার জীবনধারা ও লক্ষ্যকে ধরে রাখছে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানে শুধু দৃঢ়তার প্রশংসা করছেন না। তিনি দেখাচ্ছেন যে দৃঢ়তার প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেই দৃঢ়তা কোন দিকে পরিচালিত হচ্ছে এবং তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী।
শ্লোকে ধর্মকামার্থান্ একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌগিক পদ। ধর্ম, কাম এবং অর্থ এই তিনটি ধারণা ভারতীয় জীবনদর্শনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম বলতে কর্তব্য, নৈতিকতা, ন্যায়, সৎপথ এবং জীবনের বিধিসম্মত দায়িত্ব বোঝানো হয়। কাম বলতে শুধু ইন্দ্রিয়ভোগ বোঝায় না। এর মধ্যে মানুষের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সুখপ্রাপ্তির বাসনা এবং বিভিন্ন অভিলাষ অন্তর্ভুক্ত। অর্থ বলতে শুধু অর্থসম্পদ বা টাকা বোঝানো হয় না। এর মধ্যে জীবনের বস্তুগত নিরাপত্তা, সম্পদ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং পার্থিব সাফল্যের ধারণাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাই ধর্ম, কাম ও অর্থ মানুষের পার্থিব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিমুখকে নির্দেশ করে। গীতার এই শ্লোক এসব বিষয়কে অস্বীকার করছে না। বরং এগুলোর প্রতি মানুষের মানসিক সম্পর্ক কেমন, সেটিই এখানে বিচার করা হচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে প্রসঙ্গেন শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গ শব্দের মধ্যে কোনো কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়া বা লেগে থাকার ধারণা রয়েছে। শ্লোকে প্রসঙ্গেন বলতে সাধারণ অর্থে কোনো প্রসঙ্গ বা পরিস্থিতি বোঝানো হয় না। এখানে এর তাৎপর্য হলো আসক্তি, প্রবল সংশ্লিষ্টতা এবং কোনো কিছুর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়া, যার কারণে মানুষের মানসিক স্বাধীনতা ক্ষীণ হয়ে যায়। মানুষ যখন ধর্ম, অর্থ, কাম বা অন্য কোনো পার্থিব লক্ষ্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে যে সেই লক্ষ্য অর্জনই তার আত্মপরিচয় এবং মানসিক শান্তির প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার কর্মশক্তির সঙ্গে আসক্তি যুক্ত হয়। এই আসক্তিই রাজসিক ধৃতির অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
এরপর আসে ফলাকাঙ্ক্ষী শব্দটি। ফল অর্থ কর্মের ফল বা প্রত্যাশিত পরিণতি এবং আকাঙ্ক্ষী অর্থ যে কামনা করে বা প্রত্যাশা করে। ফলে ফলাকাঙ্ক্ষী বলতে বোঝায় এমন ব্যক্তি যে তার কর্মের ফল লাভের জন্য গভীরভাবে আকাঙ্ক্ষিত। গীতার কর্মদর্শনে কর্মফল একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। কর্মের ফল স্বাভাবিকভাবেই আসে। কিন্তু ফলের অস্তিত্ব এবং ফলের প্রতি আসক্তি এক জিনিস নয়। মানুষ কাজ করবে এবং তার কাজের ফল হবে। কিন্তু যখন মানুষের মন সেই ফলের সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে যায় যে ফল না পাওয়া মানেই নিজের ব্যর্থতা, অপমান বা অস্তিত্বের সংকট বলে মনে হয়, তখন কর্মফলাসক্তি জন্ম নেয়। এই মানসিকতাই রাজসিক ধৃতির দিকে নিয়ে যায়।
এই কারণে রাজসিক ধৃতি দুর্বলতার প্রতীক নয়। বরং এটি অনেক সময় অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মধ্যেও দেখা যায়। একজন ব্যক্তি প্রচণ্ড পরিশ্রমী হতে পারেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটি লক্ষ্য অনুসরণ করতে পারেন এবং অসংখ্য বাধা অতিক্রম করতে পারেন। বাহ্যিকভাবে তার দৃঢ়তা দেখে তাকে আদর্শ মানুষ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে শুধু তার পরিশ্রম বা সংকল্প দেখলেই তার ধৃতির প্রকৃতি নির্ধারণ করা যায় না। প্রশ্ন হলো তার সেই দৃঢ়তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কী। যদি সে সম্পদ, খ্যাতি, ক্ষমতা, মর্যাদা, ভোগ বা ব্যক্তিগত সাফল্যের ফল লাভের জন্য অবিচল থাকে এবং সেই ফলের সঙ্গে তার গভীর আসক্তি থাকে, তাহলে তার দৃঢ়তা রাজসিক।
এই শিক্ষা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন ছাত্র প্রতিদিন অনেক ঘণ্টা পড়াশোনা করতে পারে। তার ধৈর্য এবং অধ্যবসায় অসাধারণ হতে পারে। কিন্তু যদি তার সমস্ত মানসিক শান্তি নির্ভর করে অন্য সবাইকে পরাজিত করে প্রথম হওয়ার ওপর, তাহলে তার দৃঢ়তার মধ্যে রাজসিকতার উপাদান রয়েছে। একজন ব্যবসায়ী বহু বছর কঠোর পরিশ্রম করে ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। তার মধ্যে অসাধারণ সংকল্প থাকতে পারে। কিন্তু যদি তার জীবনের সমস্ত মূল্যবোধ কেবল মুনাফা, প্রতিযোগিতায় জয় এবং অন্যদের তুলনায় বেশি সম্পদ অর্জনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই ধৃতিও রাজসিক প্রকৃতির হতে পারে। একজন সমাজসেবী মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারেন। কিন্তু যদি সেই কাজের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হয় প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা অথবা নিজের মহানত্ব প্রতিষ্ঠা করা, তাহলেও বাহ্যিকভাবে মহৎ কাজের মধ্যে রাজসিক ফলাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।
এখানে গীতার একটি অত্যন্ত গভীর নৈতিক শিক্ষা প্রকাশিত হয়। মানুষের কাজের বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত মানসিক প্রেরণাও গুরুত্বপূর্ণ। একই কাজ দুই ব্যক্তি করতে পারেন, কিন্তু তাদের অন্তরের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলে সেই কাজের গুণগত প্রকৃতিও ভিন্ন হতে পারে। একজন মানুষ কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করতে পারেন, অন্যজন একই কাজ করতে পারেন প্রশংসা বা পুরস্কারের জন্য। বাইরে থেকে দুজনের কাজ একই মনে হলেও তাদের অন্তরের অবস্থান এক নয়। তাই গীতার দর্শন মানুষকে শুধু কী করছে সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় না। তার চেয়েও গভীর প্রশ্ন হলো কেন করছে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সত্ত্ব, রজস এবং তমস প্রকৃতির তিন গুণ। রজসের মধ্যে রয়েছে কর্মচাঞ্চল্য, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আসক্তি এবং অর্জনের প্রবল তাড়না। রাজসিক ধৃতির মধ্যে তাই শক্তির অভাব থাকে না। বরং শক্তি প্রবল থাকে। সমস্যা হলো সেই শক্তি ফলের সঙ্গে আবদ্ধ থাকে। মানুষ কাজ করে, সংগ্রাম করে এবং এগিয়ে যায়, কিন্তু তার মন বারবার ফিরে যায় এই প্রশ্নে যে সে কী পেল, কতটা পেল এবং অন্যদের তুলনায় কতটা বেশি পেল। ফলে তার দৃঢ়তা তাকে কর্মক্ষম করলেও অন্তরে স্থিরতা দেয় না।
কর্মযোগের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। গীতার শিক্ষা মানুষকে কর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না। বরং নিষ্ঠার সঙ্গে কর্ম করতে শেখায়। কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত হতে বলে। রাজসিক ধৃতিতে মানুষ কর্মের সঙ্গে ফলকে এমনভাবে জুড়ে দেয় যে তার মানসিক স্থিরতা ফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সাফল্য এলে সে অহংকারে ভরে যায় এবং ব্যর্থতা এলে ভেঙে পড়ে। প্রশংসা এলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং সমালোচনা এলে তার মন অস্থির হয়ে যায়। এইভাবে তার মানসিক অবস্থা বাহ্যিক ফলাফলের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে থাকে।
সাত্ত্বিক ধৃতির সঙ্গে রাজসিক ধৃতির পার্থক্য এখানেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাত্ত্বিক দৃঢ়তা মানুষকে আত্মসংযম, সত্য, কর্তব্য, যোগ এবং অন্তরের স্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। রাজসিক দৃঢ়তা মানুষকে ফল, অর্জন, ভোগ, সম্পদ, প্রতিযোগিতা এবং মর্যাদার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই দৃঢ়তা নিজে ভালো বা খারাপ নয়। দৃঢ়তার দিক এবং উদ্দেশ্যই তার প্রকৃতি নির্ধারণ করে। একজন মানুষ যেমন নিজের ইন্দ্রিয় ও মনকে সংযত করার জন্য দৃঢ় হতে পারেন, তেমনই অন্য একজন অর্থ ও খ্যাতি অর্জনের জন্য দৃঢ় হতে পারেন। বাহ্যিকভাবে উভয়ের সংকল্প শক্তিশালী হলেও অন্তর্নিহিত চেতনা ভিন্ন।
এই সত্যকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন নৌকার মাঝির হাতে শক্তিশালী দাঁড় থাকতে পারে। তার শরীরের শক্তিও অনেক হতে পারে। কিন্তু নৌকার দিক যদি সঠিক না হয়, তাহলে সেই শক্তি তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে না। মানুষের ধৃতিও তেমন। ধৃতি হলো চালনার শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়। রাজসিক ধৃতিতে শক্তি থাকে, কিন্তু সেই শক্তি আকাঙ্ক্ষা এবং আসক্তির দ্বারা চালিত হয়। সাত্ত্বিক ধৃতিতে শক্তি থাকে, কিন্তু সেই শক্তি আত্মসংযম ও সত্যের দিকে পরিচালিত হয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার দিকে আহ্বান করে। মানুষ প্রায়ই মনে করে যে সে যত বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তত বেশি উন্নত। কিন্তু গীতা দেখায় যে শুধু দৃঢ়তা আধ্যাত্মিকতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ কীসের প্রতি দৃঢ়, সেটি জানা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যদি সে অহংকারকে ধরে রাখে, তবে তার দৃঢ়তা তাকে বন্ধনেই রাখবে। যদি সে ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে ধরে রাখে, তবে তার দৃঢ়তা আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করবে। যদি সে সম্পদ ও মর্যাদাকে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি বানিয়ে ফেলে, তবে তার দৃঢ়তা তাকে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে আরও আবদ্ধ করবে। কিন্তু যদি সে সত্য, আত্মসংযম, কর্তব্য এবং আত্মজ্ঞানকে ধরে রাখে, তবে সেই দৃঢ়তা মুক্তির পথে সহায়ক হতে পারে।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা অসাধারণ। বর্তমান সমাজে সাফল্যকে প্রায়ই অর্থ, পদমর্যাদা, জনপ্রিয়তা এবং সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। মানুষ দিনের পর দিন কাজ করে, নিজের দক্ষতা বাড়ায়, প্রতিযোগিতা করে এবং উন্নতির চেষ্টা করে। এগুলোর কোনোটি নিজে দোষের নয়। কিন্তু যখন মানুষের আত্মমূল্য সম্পূর্ণভাবে বাহ্যিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তখন তার মধ্যে রাজসিক ধৃতির প্রবলতা দেখা দিতে পারে। সে তখন কাজ করে আনন্দের জন্য নয়, কর্তব্যের জন্য নয়, বরং নিজের মূল্য প্রমাণ করার জন্য। ফলস্বরূপ সাফল্য তাকে সাময়িক আনন্দ দেয় এবং ব্যর্থতা তাকে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করে।
এই অবস্থার বিপরীতে গীতার শিক্ষা হলো কর্মে দৃঢ় হওয়া, কিন্তু ফলের প্রতি অন্তরের স্বাধীনতা বজায় রাখা। মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বকে ফলাফলের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে ফেলবে না। সে কাজ করবে কারণ কাজটি তার কর্তব্য, তার মূল্যবোধ এবং তার বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অবস্থায় কর্মের মধ্যে নিষ্ঠা থাকবে, কিন্তু অতিরিক্ত আসক্তি থাকবে না। চেষ্টা থাকবে, কিন্তু অহংকার থাকবে না। সাফল্য এলে কৃতজ্ঞতা থাকবে এবং ব্যর্থতা এলে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষমতা থাকবে।
এইভাবে দেখলে ১৮.৩৪ শ্লোকটি শুধু একটি প্রাচীন আধ্যাত্মিক শিক্ষার অংশ নয়। এটি মানুষের অন্তর্গত প্রেরণার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। এটি আমাদের শেখায় যে মানুষের দৃঢ়তা তার চরিত্রের একটি শক্তিশালী উপাদান হলেও সেই শক্তির মূল্য নির্ভর করে তার উদ্দেশ্যের ওপর। ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা দৃঢ়তাকে বন্ধনে পরিণত করতে পারে। আবার কর্তব্য, আত্মসংযম এবং জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত দৃঢ়তা মানুষকে অন্তরের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতা ১৮.৩৪ এর মূল শিক্ষা হলো মানুষের কর্মশক্তিকে দুর্বল করা নয়, বরং সেই শক্তিকে শুদ্ধ করা। ধৃতি মানুষের ভিতরের সেই শক্তি যা তাকে ধরে রাখে এবং এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু যখন সেই ধৃতি ধর্ম, কাম ও অর্থের প্রতি আসক্তি এবং কর্মফলের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা রাজসিক হয়ে ওঠে। রাজসিক ধৃতির মধ্যে শক্তি আছে, অধ্যবসায় আছে, সংকল্প আছে, কিন্তু অন্তরের স্বাধীনতা কম। তাই গীতার প্রকৃত আহ্বান হলো দৃঢ়তা ত্যাগ করা নয়, বরং দৃঢ়তার কেন্দ্রকে পরিবর্তন করা। মানুষ যেন ফলের জন্য নয়, সত্যের জন্য দৃঢ় হয়। মানুষের সংকল্প যেন অহংকারকে শক্তিশালী না করে আত্মজ্ঞানকে গভীর করে। তার কর্ম যেন তাকে বাহ্যিক অর্জনের দাস না বানিয়ে অন্তরের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়। এই উপলব্ধিই শ্লোকটির ভাষাগত, দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক গভীরতাকে একসূত্রে আবদ্ধ করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!