ভগবদ্গীতা ১৮.৩৫ — নিদ্রা, ভয়, শোক ও বিষাদে আবদ্ধ মানসিক দৃঢ়তা: তামসিক ধৃতির তত্ত্ব
যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ।
ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।৩৫।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! যে ধৃতি স্বপ্ন, ভয়, শোক, বিষাদ, মদ আদিকে ত্যাগ করে না, সেই বুদ্ধিহীনা ধৃতিই তামসী।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের পঁয়ত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের মানসিক দৃঢ়তার একটি বিশেষ রূপের কথা বলেছেন। সেই শ্লোকটি হলো “যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ। ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।” অর্থাৎ হে পার্থ, যে ধৃতির দ্বারা দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি নিদ্রা, ভয়, শোক, বিষাদ ও মদ ত্যাগ করতে পারে না, সেই ধৃতিই তামসিক ধৃতি। এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের মন, বুদ্ধি, অভ্যাস, আসক্তি, দুর্বলতা এবং আত্মপরিচয়ের একটি গভীর বিশ্লেষণ নিহিত রয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল অলসতা বা ঘুমের নিন্দা করেননি। তিনি এমন এক মানসিক শক্তির কথা বলেছেন, যা মানুষকে উন্নতির পথে ধরে রাখার পরিবর্তে তার অজ্ঞানতা, ভয়, হতাশা, শোক এবং অহংকারের মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখে।
এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় শব্দ হলো ধৃতি। সংস্কৃত ধৃতি শব্দটি ধৃ ধাতু থেকে এসেছে। ধৃ অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা, বহন করা অথবা স্থির রাখা। তাই ধৃতি বলতে বোঝায় মানুষের সেই অন্তর্নিহিত মানসিক শক্তি, যার দ্বারা সে কোনো সংকল্প, চিন্তা, আচরণ, প্রবণতা অথবা মানসিক অবস্থাকে ধরে রাখে। সাধারণ অর্থে ধৃতি হলো দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, মানসিক স্থিরতা এবং সংকল্পশক্তি। কিন্তু গীতার শিক্ষা এখানে আরও সূক্ষ্ম। কারণ সব দৃঢ়তা কল্যাণকর নয়। একজন মানুষ সত্য ও কর্তব্যের প্রতি যেমন দৃঢ় থাকতে পারে, তেমনি নিজের ভুল, অহংকার, ভয় অথবা অলসতার প্রতিও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকতে পারে। তাই ধৃতির মূল্য কেবল তার দৃঢ়তার মধ্যে নয়, বরং সে কীকে ধরে রেখেছে তার মধ্যেই নিহিত।
শ্লোকে ব্যবহৃত তামসী শব্দটি এসেছে তমস শব্দ থেকে। তমসের অর্থ অন্ধকার, জড়তা, অজ্ঞানতা, আচ্ছন্নতা এবং চেতনার অস্পষ্টতা। গীতার ত্রিগুণতত্ত্বে সত্ত্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করে, রজঃ আকাঙ্ক্ষা ও কর্মচাঞ্চল্যের জন্ম দেয় এবং তমঃ চেতনাকে আচ্ছন্ন করে জড়তা ও অজ্ঞানতার দিকে নিয়ে যায়। সেই অর্থে তামসী ধৃতি হলো এমন এক দৃঢ়তা, যা মানুষকে সত্য, কর্তব্য ও আত্মোন্নতির দিকে এগিয়ে না নিয়ে অন্ধকার ও জড়তার মধ্যে আটকে রাখে। এটি দুর্বলতার অনুপস্থিতি নয়। বরং কখনো কখনো এটি দুর্বলতার প্রতি অতিরিক্ত দৃঢ় আসক্তি।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ যয়া। এর অর্থ যার দ্বারা। অর্থাৎ এখানে একটি নির্দিষ্ট শক্তির কথা বলা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মানুষ কোনো কিছু ধরে রাখে বা ছেড়ে দিতে পারে। সেই শক্তিই ধৃতি। কিন্তু দুর্মেধা ব্যক্তি যখন তামসিক ধৃতির অধীন হয়, তখন তার ধারণশক্তি তাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যায় না। বরং সে এমন কিছু বিষয়কে আঁকড়ে ধরে রাখে, যেগুলো তার চেতনা ও কর্মশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই কারণে শ্লোকটির প্রকৃত শিক্ষা বোঝার জন্য ধৃতিকে শুধু সাহস বা দৃঢ়তার অর্থে গ্রহণ করলে চলবে না। ধৃতি হলো এমন একটি শক্তি, যার দিক সঠিক না হলে সেই শক্তিই বন্ধনের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শ্লোকে স্বপ্ন শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বপ্ন শব্দটি সংস্কৃত স্বপ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মূল অর্থ ঘুমানো। স্বপ্ন বলতে সাধারণভাবে ঘুমের মধ্যে দেখা দৃশ্য বোঝালেও এই শ্লোকের প্রসঙ্গে নিদ্রা বা অতিরিক্ত ঘুমের অর্থ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তামসিক মানসিকতার অন্যতম লক্ষণ হলো চেতনার অবসন্নতা এবং কর্মবিমুখতা। মানুষ যখন নিজের কর্তব্য থেকে পালাতে চায়, তখন ঘুম ও নিষ্ক্রিয়তা কখনো কখনো তার আশ্রয় হয়ে ওঠে। এখানে ঘুমকে স্বাভাবিক বিশ্রাম হিসেবে নিন্দা করা হয়নি। বরং এমন নিদ্রা বা জড়তার কথা বলা হয়েছে, যা মানুষকে সচেতনতা, কর্তব্য এবং আত্মোন্নতির পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
এরপর এসেছে ভয় শব্দটি। সংস্কৃত ভয় শব্দটি ভী ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভয় মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রবৃত্তি এবং বাস্তব বিপদের ক্ষেত্রে এটি আমাদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু যখন ভয় মানুষের চিন্তা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তামসিক ধৃতির ক্ষেত্রে মানুষ নিজের ভয়কে অতিক্রম করার চেষ্টা না করে ভয়ের মধ্যেই বসবাস করতে শুরু করে। সে ভাবতে থাকে যে পরিবর্তন বিপজ্জনক, নতুন পথে যাওয়া অসম্ভব অথবা নিজের ক্ষমতার বাইরে। ফলে ভয় তার সতর্কতার শক্তি না হয়ে তার নিষ্ক্রিয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শোক শব্দটি মানুষের হৃদয়ের গভীর দুঃখকে প্রকাশ করে। শোকের সঙ্গে সংস্কৃত শুচ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে দহন বা দুঃখের ভাব রয়েছে। জীবনে প্রিয়জনের বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা, অপমান অথবা কোনো গভীর ক্ষতির ফলে শোক আসতে পারে। শোক মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু তামসিক ধৃতির সমস্যা হলো মানুষ যখন শোককে অতিক্রম করার পরিবর্তে তাকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তখন অতীতের ঘটনা তার বর্তমান জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সে বারবার একই ঘটনা মনে করে এবং নিজের জীবনের সমস্ত সম্ভাবনাকে অতীতের একটি দুঃখজনক ঘটনার সঙ্গে বেঁধে ফেলে। তখন শোক কেবল একটি অনুভূতি থাকে না। তা জীবনের একটি স্থায়ী মানসিক অবস্থায় পরিণত হয়।
শোকের সঙ্গে বিষাদের একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বিষাদ শব্দটি সংস্কৃত বিষাদ থেকে এসেছে এবং এর মধ্যে অবসন্ন হয়ে পড়ার ভাব রয়েছে। শোক হলো দুঃখের অনুভূতি, আর বিষাদ হলো সেই দুঃখের কারণে অন্তরের শক্তি ও কর্মপ্রেরণার দুর্বল হয়ে যাওয়া। একজন মানুষ কোনো ঘটনায় দুঃখ পেতে পারেন এবং পরবর্তীতে সেই দুঃখ অতিক্রম করে আবার জীবনের পথে ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু যখন তিনি মনে করতে শুরু করেন যে তার জীবনে আর কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন শোক বিষাদে পরিণত হয়। বিষাদ মানুষকে বসিয়ে দেয়, তার উদ্যোগ কমিয়ে দেয় এবং তার নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস নষ্ট করে। তামসিক ধৃতি এই বিষাদকেই ধরে রাখে।
এরপর এসেছে মদ শব্দটি। মদ শব্দের মূলের মধ্যে মত্ততা, গর্ব ও অহংকারের ভাব রয়েছে। এখানে মদ বলতে শুধু কোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য বোঝানো হয় না। বরং অহংকার, আত্মম্ভরিতা, নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত মোহ এবং নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অজ্ঞতাও এর অন্তর্ভুক্ত। আশ্চর্যের বিষয় হলো একই শ্লোকে ভয় এবং মদ পাশাপাশি এসেছে। একদিকে মানুষ নিজেকে অত্যন্ত দুর্বল মনে করে ভয়ে কুঁকড়ে যায়, অন্যদিকে সে নিজের অহংকারকে ছাড়তে পারে না। কখনো সে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে এবং কখনো নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় মনে করে। উভয় অবস্থার কেন্দ্রেই থাকে অতিরঞ্জিত আত্মকেন্দ্রিকতা।
শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো বিমুঞ্চতি। এটি মুচ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ মুক্ত করা, ছেড়ে দেওয়া অথবা বিচ্ছিন্ন করা। বিমুঞ্চতি অর্থ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া বা মুক্ত করা। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে ন বিমুঞ্চতি, অর্থাৎ ছেড়ে দেয় না। এই ছোট্ট নিষেধবাচক শব্দটির মধ্যেই তামসিক ধৃতির গভীরতা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ ভয় অনুভব করতেই পারে, শোক পেতেই পারে, বিষাদে আক্রান্ত হতেই পারে অথবা অহংকারের অনুভূতি তার মধ্যে আসতেই পারে। কিন্তু সমস্যাটি তখন সৃষ্টি হয়, যখন সে এগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করে না এবং এগুলোকেই নিজের স্থায়ী অবস্থান হিসেবে ধরে রাখে।
দুর্মেধা শব্দটিও গভীর অর্থ বহন করে। দুর এবং মেধা এই দুটি অংশ নিয়ে শব্দটি গঠিত। মেধা অর্থ বুদ্ধি, বিচারশক্তি ও উপলব্ধি। দুর্মেধা অর্থ যার বিচারশক্তি বিকৃত বা দুর্বল। এখানে কৃষ্ণ মানুষটিকে পাপী বা নিকৃষ্ট বলেননি। তিনি বলেছেন তার বিচারশক্তি সঠিকভাবে কাজ করছে না। সে বুঝতে পারছে না কোন জিনিস তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে এবং কোন জিনিস তাকে বন্ধনে আবদ্ধ করবে। তামসিকতার মূল সমস্যা তাই শুধু ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা নয়। এর সঙ্গে বিচারবোধের আচ্ছন্নতাও যুক্ত।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো দৃঢ়তা নিজে কখনো চূড়ান্ত গুণ নয়। একজন মানুষ খুব দৃঢ়ভাবে ভুল ধারণাকে আঁকড়ে ধরতে পারে। সে বলতে পারে, আমি ভুল হলেও আমার অবস্থান পরিবর্তন করব না। কেউ জানে যে তার কোনো অভ্যাস তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তবুও সে অভ্যাস পরিবর্তন করতে চায় না। কেউ জানে যে অতীতের দুঃখ তার বর্তমান জীবনকে নষ্ট করছে, তবুও সে সেই দুঃখকে ছাড়তে পারে না। এই সমস্ত ক্ষেত্রেই একটি ধরনের দৃঢ়তা রয়েছে। কিন্তু সেই দৃঢ়তা সাত্ত্বিক নয়। কারণ এটি মানুষকে সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। এটি তাকে নিজের দুর্বলতার সঙ্গে আরও শক্তভাবে বেঁধে দিচ্ছে।
এই কারণেই তামসী ধৃতিকে একটি ভুল জায়গায় নোঙর করা নৌকার সঙ্গে তুলনা করা যায়। নোঙরের কাজ নৌকাকে স্থির রাখা। কিন্তু নৌকা যদি সঠিক গন্তব্যে যাওয়ার পরিবর্তে ভুল জায়গায় নোঙর করা থাকে, তাহলে নোঙরের শক্তি যত বেশি হবে, নৌকা তত বেশি আটকে থাকবে। ধৃতিও তেমন। ধৃতি মানুষের শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি যদি সত্য, কর্তব্য ও আত্মজ্ঞানকে ধারণ করে, তাহলে তা মুক্তির সহায়ক হয়। আর যদি তা নিদ্রা, ভয়, শোক, বিষাদ ও অহংকারকে ধারণ করে, তাহলে সেই শক্তিই বন্ধনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আধুনিক জীবনের দিকে তাকালেও এই শিক্ষার গভীর প্রাসঙ্গিকতা দেখা যায়। একজন ছাত্র পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর বলতে পারে যে সে কোথায় ভুল করেছে তা বুঝবে এবং নতুনভাবে চেষ্টা করবে। তার ধৃতি তাকে কর্তব্যে ধরে রাখছে। আবার অন্য একজন ব্যর্থতার পরে মনে করতে পারে যে তার দ্বারা কোনোদিন কিছুই সম্ভব হবে না। সে অতিরিক্ত ঘুমাতে শুরু করে, পড়াশোনা এড়িয়ে চলে, ব্যর্থতার কথা বারবার চিন্তা করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যর্থতাকেই নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলে। এখানে তার মানসিক দৃঢ়তা তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে না। বরং সে তার ভয় ও বিষাদের মধ্যেই স্থির হয়ে গেছে। এই অবস্থাই তামসিক ধৃতির বাস্তব উদাহরণ।
একইভাবে জীবনের সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র এবং ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা প্রযোজ্য। কোনো মানুষ অতীতের অপমানকে এত গভীরভাবে ধরে রাখতে পারে যে বহু বছর পরেও সে সেই ঘটনার দ্বারা নিজের বর্তমান আচরণ নির্ধারণ করে। কেউ নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিকে এত শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে যে নতুন সুযোগের সামনে দাঁড়িয়েও চেষ্টা করতে ভয় পায়। আবার কেউ নিজের সামান্য সাফল্যকে এত বড় করে দেখে যে অহংকারের কারণে নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এসব ক্ষেত্রেই ধৃতির শক্তি আছে, কিন্তু তার দিকটি ভুল।
দার্শনিক দৃষ্টিতে তামসী ধৃতি মানুষের আত্মপরিচয়ের সমস্যার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপকে না জেনে নিজেকে কেবল শরীর, মন, সাফল্য, ব্যর্থতা অথবা সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখে, তখন ভয় ও শোক জন্মায়। যা পরিবর্তনশীল তাকে স্থায়ী বলে গ্রহণ করাই বন্ধনের একটি প্রধান কারণ। তামসিক ধৃতি সেই ভুল পরিচয়কে আঁকড়ে রাখে। মানুষ তখন বলে আমি ব্যর্থ, আমি দুর্বল, আমি এমনই, আমার দ্বারা কিছু হবে না। ধীরে ধীরে এই ধারণাগুলো তার মানসিক পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। ফলে সে নিজের ভিতরের পরিবর্তনের সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করতে শুরু করে।
সাংখ্য দর্শনের ত্রিগুণতত্ত্বের আলোকে তামসিক ধৃতি হলো তমোগুণের প্রভাবাধীন মানসিক ধারণশক্তি। তমস জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে, রজঃ মানুষকে আকাঙ্ক্ষার দিকে চালিত করে এবং সত্ত্ব চেতনাকে স্বচ্ছ করে। তাই সাত্ত্বিক ধৃতি মানুষকে তার কর্তব্য, সংযম এবং আত্মশাসনে স্থির রাখে। রাজসিক ধৃতি মানুষকে ফল, আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত রাখে। আর তামসিক ধৃতি মানুষকে জড়তা, ভয়, শোক, বিষাদ ও অহংকারের মধ্যে আটকে রাখে। তিন ক্ষেত্রেই ধৃতির কাজ হলো ধরে রাখা, কিন্তু যে বিষয়কে ধরে রাখা হচ্ছে তার গুণ অনুযায়ী ধৃতির প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়।
এই শ্লোককে প্রতীকী অর্থে দেখলে মানুষের তিনটি সময়ের সঙ্গেও এর একটি সুন্দর সম্পর্ক দেখা যায়। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিরিক্ত আশঙ্কা থেকে ভয় জন্মায়। অতীতের সঙ্গে অতিরিক্ত বন্ধন থেকে শোক জন্মায়। বর্তমানের কর্মশক্তি হারিয়ে গেলে বিষাদ জন্মায়। আর নিজের সীমিত সত্তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে মদ বা অহংকার জন্মায়। নিদ্রা বা জড়তা এই সমস্ত অবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। ফলে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত, অতীত নিয়ে শোকগ্রস্ত, বর্তমান নিয়ে বিষণ্ণ এবং নিজের সম্পর্কে অহংকারপূর্ণ হয়ে পড়ে। তামসিক ধৃতি এই সমগ্র মানসিক চক্রকে ধরে রাখে।
এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি মানচিত্রের মতো। স্বপ্ন বা নিদ্রা এখানে চেতনার আচ্ছাদনের প্রতীক। ভয় ভবিষ্যতের অন্ধকারের প্রতীক। শোক অতীতের বন্ধনের প্রতীক। বিষাদ বর্তমানের শক্তিহীনতার প্রতীক। মদ অহংকারের প্রতীক। আর ধৃতি হলো সেই মানসিক শক্তি, যা এই অবস্থাগুলোকে ধরে রাখতে পারে। তামস হলো সেই অন্ধকার, যেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত সম্ভাবনাকে দেখতে পায় না।
এই শিক্ষার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সত্য রয়েছে। দুঃখ পাওয়া অপরাধ নয়। ভয় অনুভব করাও অপরাধ নয়। শোকও মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। বিশ্রাম নেওয়াও প্রয়োজনীয়। নিজের সাফল্যে আনন্দ পাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন মানুষ এসব অনুভূতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে তাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। গীতার শিক্ষা অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয়। বরং অনুভূতির প্রতি অন্ধ আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া। ভয় আসতে পারে, কিন্তু ভয়ের দাস হওয়া যাবে না। শোক আসতে পারে, কিন্তু শোককে নিজের পরিচয় বানানো যাবে না। বিষাদ আসতে পারে, কিন্তু বিষাদের কাছে নিজের কর্মশক্তি সমর্পণ করা যাবে না। অহংকার আসতে পারে, কিন্তু তাকে নিজের সত্য স্বরূপ বলে গ্রহণ করা যাবে না।
এই কারণে শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন হতে পারে, আমি কতটা দৃঢ় তা নয়, বরং আমার দৃঢ়তা আমাকে কীসের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। মানুষ সাধারণত নিজের ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ়তার জন্য গর্ব করে। কিন্তু গীতা আমাদের আরও গভীরভাবে নিজের দিকে তাকাতে শেখায়। যদি আমার দৃঢ়তা আমাকে সত্য, কর্তব্য, সংযম ও আত্মজ্ঞান অনুসন্ধানে স্থির রাখে, তাহলে সেই দৃঢ়তা কল্যাণকর। যদি তা আমাকে ফলের আকাঙ্ক্ষায় বেঁধে রাখে, তাহলে তা রাজসিক। আর যদি তা আমাকে অলসতা, ভয়, শোক, বিষাদ ও অহংকারের মধ্যে আটকে রাখে, তাহলে তা তামসিক।
অতএব “যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ” শ্লোকটি মানুষের বাহ্যিক আচরণের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত মানসিক অবস্থার গভীরে প্রবেশ করে। এটি আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত বন্ধন অনেক সময় বাইরে নয়, ভিতরে। যে মানুষ নিজের দুর্বলতাকে চিনতে পারে এবং তার ঊর্ধ্বে উঠতে চায়, তার জন্য ধৃতি মুক্তির সহায়ক হতে পারে। কিন্তু যে মানুষ নিজের ভয়, শোক, বিষাদ, অহংকার ও জড়তাকে আঁকড়ে ধরে রাখে, তার ধৃতিই বন্ধনের কারণ হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের শক্তির মূল্য তার দৃঢ়তার পরিমাণে নয়, তার দিকনির্দেশে। যে শক্তি মানুষকে জাগ্রত করে, সত্যের দিকে নিয়ে যায় এবং কর্তব্যে প্রতিষ্ঠিত করে, সেই শক্তি সাত্ত্বিক। যে শক্তি মানুষকে আকাঙ্ক্ষা ও ফলের বন্ধনে আবদ্ধ করে, তা রাজসিক। আর যে শক্তি মানুষকে নিজের অজ্ঞানতা, ভয়, শোক, বিষাদ ও অহংকারের মধ্যে আটকে রাখে, সেটিই তামসী ধৃতি। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত, আমি কী ধরে আছি এবং কেন ধরে আছি। কারণ মানুষ যে বিষয়কে দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করে, একসময় সেই বিষয়ই তার চিন্তা, অভ্যাস এবং চরিত্রের অংশ হয়ে ওঠে। সত্যকে ধারণ করলে মানুষ জাগ্রত হয়, কর্তব্যকে ধারণ করলে মানুষ শক্তিশালী হয়, আর অজ্ঞানতাকে ধারণ করলে মানুষ নিজের মধ্যেই বন্দী হয়ে যায়। এই গভীর সত্যের কারণেই শ্রীকৃষ্ণের এই শ্লোক আজও মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মশুদ্ধি এবং আত্মোন্নতির জন্য এক অসাধারণ দার্শনিক নির্দেশনা হয়ে আছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!