ভগবদ্গীতা ১৮.৩৬ — অভ্যাস, আনন্দ ও দুঃখের অবসান: সুখের ত্রিবিধ তত্ত্বের সূচনা
সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ।
অভ্যাসাদ্ রমতে যত্র দুঃখান্তং চ নিগচ্ছতি।।৩৬।।
অনুবাদঃ হে ভরতর্ষভ! এখন তুমি আমার কাছে ত্রিবিধ সুখের বিষয় শ্রবণ কর। বদ্ধ জীব পুনঃ পুনঃ অভ্যাসের দ্বারা সেই সুখে রমণ করে এবং যার দ্বারা সমস্ত দুঃখের অন্তলাভ করে থাকে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ছত্রিশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সুখের এক গভীর ও বহুমাত্রিক তত্ত্বের দিকে নিয়ে যান। শ্লোকটি হলো “সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ। অভ্যাসাদ্ রমতে যত্র দুঃখান্তং চ নিগচ্ছতি।” এর সরল অর্থ হলো, হে ভরতশ্রেষ্ঠ, এখন আমার কাছ থেকে সেই তিন প্রকার সুখের কথা শোন, যে সুখে অভ্যাসের মাধ্যমে মানুষ আনন্দ লাভ করে এবং যার পরিণতিতে দুঃখের অন্তে উপনীত হয়। এই শ্লোককে শুধু সুখের একটি সাধারণ সংজ্ঞা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। এখানে সুখের সঙ্গে অভ্যাস, আনন্দ, চেতনার পরিবর্তন এবং দুঃখের অবসানের যে সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে, তা ভারতীয় দর্শনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রকাশ করে।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সুখ। সংস্কৃত সুখ শব্দটি সাধারণভাবে আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য, প্রশান্তি এবং অনুকূল অনুভূতিকে বোঝায়। ভারতীয় ঐতিহ্যে সু এবং খ এই দুই অংশের মাধ্যমে সুখের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা করা হয়। সু অর্থ ভালো, শুভ, সুন্দর বা অনুকূল এবং খ অর্থ স্থান বা অবকাশ। এই ব্যাখ্যার আলোকে সুখ এমন একটি অবস্থার প্রতীক যেখানে চলাচল সহজ, যেখানে বাধা কম এবং যেখানে জীবন স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে। তবে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ব্যুৎপত্তিকে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে গ্রহণ না করে ভারতীয় ব্যাখ্যা পরম্পরার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থবোধক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। গীতার আলোচনায় সুখ কেবল বাহ্যিক আরাম বা ইন্দ্রিয়সন্তুষ্টি নয়। এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যার প্রকৃতি এবং পরিণতি মানুষের অন্তর্জীবনকে পরিবর্তিত করতে পারে।
সুখ শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে তার বিপরীত শব্দ দুঃখের কথাও মনে রাখতে হয়। ভারতীয় দর্শনে দুঃখ শুধু কান্না, শারীরিক ব্যথা বা কোনো বাহ্যিক বিপর্যয়ের নাম নয়। দুঃখের মধ্যে রয়েছে মানসিক অশান্তি, আকাঙ্ক্ষার চাপ, ভয়, মোহ, আসক্তি, বিচ্ছেদ, হতাশা এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সৃষ্ট অন্তর্দহন। তাই গীতায় দুঃখান্ত শব্দটি যখন ব্যবহৃত হয়েছে, তখন তা কেবল একটি নির্দিষ্ট কষ্টের শেষ বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে দুঃখের মূল কারণগুলি মানুষের চেতনাকে আর আগের মতো আবদ্ধ করে রাখতে পারে না।
শ্লোকে ত্রিবিধ শব্দটি সুখের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। ত্রি অর্থ তিন এবং বিধ অর্থ প্রকার বা ধরন। অর্থাৎ সুখ তিন প্রকার। গীতার পরবর্তী শ্লোকগুলিতে এই তিন প্রকার সুখকে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর ফলে বোঝা যায় যে গীতার কাছে সব সুখ সমান নয়। মানুষ কোনো কিছুতে আনন্দ পেলেই সেই আনন্দকে সর্বোচ্চ বা কল্যাণকর সুখ বলা যায় না। কোনো আনন্দ তাৎক্ষণিকভাবে মধুর হলেও তার পরিণতি দুঃখকর হতে পারে। আবার কোনো আনন্দের সূচনা কঠিন হলেও তার দীর্ঘমেয়াদি ফল গভীর শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তাই সুখকে বিচার করার জন্য শুধু বর্তমান অনুভূতি নয়, তার উৎপত্তি, প্রকৃতি এবং পরিণতিও বিবেচনা করতে হয়।
শ্লোকে কৃষ্ণ বলেন শৃণু, অর্থাৎ শোনো। এই একটি শব্দের মধ্যেও ভারতীয় জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশিত হয়েছে। শৃণু শব্দটি শ্রু ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ শোনা। এখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে শুধু কোনো মতবাদ গ্রহণ করতে বলছেন না। তিনি তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে এবং বোঝার আহ্বান জানাচ্ছেন। ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরায় শ্রবণ জ্ঞানলাভের একটি মৌলিক ধাপ। সত্য উপলব্ধির পূর্বে সত্যকে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করতে হয়। তাই শৃণু শব্দটি শুধু শ্রবণের নির্দেশ নয়, বরং জ্ঞানগ্রহণের জন্য মনকে প্রস্তুত করার আহ্বান।
এরপর কৃষ্ণ অর্জুনকে ভরতর্ষভ বলে সম্বোধন করেছেন। ভরতর্ষভ শব্দটি ভরত এবং ঋষভের সমন্বয়ে গঠিত। ভরত হলো অর্জুনের বংশপরিচয় এবং ঋষভ অর্থ শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট। তাই ভরতর্ষভ অর্থ ভরতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই সম্বোধনের মধ্যে কেবল স্নেহ নয়, একটি গভীর প্রত্যাশাও রয়েছে। কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তুমি এমন একজন ব্যক্তি যার উচিত সুখের প্রকৃত মূল্য বিচার করা। মানুষের জীবনে সুখের প্রকৃতি সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা তার চরিত্র, কর্ম এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে প্রভাবিত করবে। তাই সুখ সম্পর্কে অন্ধ আকাঙ্ক্ষা নয়, বিচক্ষণ বিচার প্রয়োজন।
এই শ্লোকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শব্দগুলির একটি হলো অভ্যাস। সংস্কৃত অভ্যাস শব্দটি পুনঃপুন চর্চা, অনুশীলন, সাধনা এবং ধারাবাহিক প্রয়াসকে বোঝায়। অভ্যাস শব্দের মধ্যে কোনো কাজ বারবার করার ধারণা নিহিত রয়েছে। মানুষের জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে অভ্যাস তার চরিত্র নির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। একজন মানুষ একবার যা করে তার প্রভাব সীমিত হতে পারে, কিন্তু একই কাজ বারবার করলে তা ধীরে ধীরে তার স্বভাবের অংশ হয়ে ওঠে। এই কারণে অভ্যাস শুধু কোনো কাজের পুনরাবৃত্তি নয়, এটি মানুষের মন ও চরিত্রকে গঠন করার একটি শক্তিশালী প্রক্রিয়া।
কৃষ্ণ বলেন অভ্যাসাদ্ রমতে। অর্থাৎ অভ্যাসের মাধ্যমে মানুষ আনন্দ লাভ করে। এখানে রমতে শব্দটি এসেছে রম ধাতু থেকে। রম অর্থ আনন্দ করা, আনন্দে অবস্থান করা, কোনো কিছুর মধ্যে প্রফুল্লভাবে নিমগ্ন হওয়া। এই শব্দটি শ্লোকটির মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা প্রকাশ করে। মানুষ প্রথমে যে কাজকে কঠিন মনে করে, নিয়মিত চর্চার ফলে একসময় সেই কাজেই আনন্দ পেতে শুরু করতে পারে। একজন ছাত্র প্রথমে পড়াশোনাকে কষ্টকর মনে করতে পারে। একজন সাধক প্রথমে ধ্যানকে কঠিন মনে করতে পারেন। একজন শিল্পী প্রথমে একই সুর বা একই রেখা বারবার অনুশীলন করতে বিরক্ত হতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফলে সেই কাজের মধ্যে এমন আনন্দ জন্মায় যা বাহ্যিক পুরস্কারের উপর নির্ভর করে না।
এই কারণেই অভ্যাস মানুষের সুখের ধারণাকেও পরিবর্তন করতে পারে। আজ যে কাজ আমাদের কাছে কষ্টকর, নিয়মিত অনুশীলনের ফলে আগামী দিনে সেটিই আনন্দের উৎস হতে পারে। ভোরে ওঠা প্রথমে কঠিন হতে পারে, কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেলে ভোরের নীরবতা আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। নিয়মিত ব্যায়াম প্রথমে শরীরের জন্য কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু পরে সুস্থতার অনুভূতি নিজেই আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধ্যান প্রথমে অস্থির মনকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে, কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনের ফলে অন্তরের স্থিরতা আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে। এই বাস্তব সত্যের মধ্যেই গীতার অভ্যাসতত্ত্বের অসাধারণ শক্তি প্রকাশ পায়।
এরপর আসে যত্র শব্দটি, যার অর্থ যেখানে বা যে অবস্থায়। এখানে কোনো বাহ্যিক স্থানের কথা বলা হচ্ছে না। এটি মূলত একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার দিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ এমন একটি অবস্থায় যেখানে মানুষ অভ্যাসের মাধ্যমে আনন্দ লাভ করে। এই অবস্থাটি ধীরে ধীরে মানুষের স্বভাবের অংশ হয়ে যায়। তখন আনন্দের জন্য বাইরের অসংখ্য উত্তেজনা বা ভোগের প্রয়োজন হয় না। মন নিজেই এমন কিছুতে আনন্দ খুঁজে পেতে শেখে যা তাকে অন্তর থেকে উন্নত করে।
শ্লোকের শেষ অংশে বলা হয়েছে দুঃখান্তং চ নিগচ্ছতি। দুঃখান্ত অর্থ দুঃখের অন্ত এবং নিগচ্ছতি অর্থ উপনীত হয় বা পৌঁছে যায়। এই দুই শব্দ একত্রে একটি গভীর আধ্যাত্মিক যাত্রার কথা বলে। এমন সুখের কথা বলা হচ্ছে যার পরিণতি দুঃখের অবসান। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। কোনো আনন্দ যদি শুধু কিছু সময়ের জন্য দুঃখ ভুলিয়ে রাখে, তবে তা দুঃখের প্রকৃত অবসান নয়। প্রকৃত সুখ এমন হওয়া উচিত যা মানুষের দুঃখের কারণগুলিকে ক্রমশ দুর্বল করে। যদি কোনো আনন্দ মানুষকে আরও আসক্ত, অস্থির এবং নির্ভরশীল করে তোলে, তবে সেই আনন্দের প্রকৃতি প্রশ্নের মুখে পড়ে। কিন্তু যে আনন্দ আত্মসংযম, জ্ঞান, সাধনা ও অন্তরের স্থিতি বৃদ্ধি করে, তা মানুষকে দুঃখের বন্ধন থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে।
এই দৃষ্টিতে গীতার সুখতত্ত্ব অত্যন্ত গভীর। সাধারণত মানুষ সুখকে তাৎক্ষণিক অনুভূতি দিয়ে বিচার করে। যে জিনিস এখন আনন্দ দেয়, মানুষ সেটিকেই সুখ মনে করে। কিন্তু কৃষ্ণের বক্তব্য হলো, সুখের প্রকৃত মূল্য তার বর্তমান স্বাদে নয়, তার পরিণতিতে। কোনো কাজ প্রথমে অত্যন্ত আনন্দদায়ক হতে পারে, কিন্তু পরে তার ফল হতে পারে অশান্তি, আসক্তি এবং দুঃখ। আবার কোনো কাজ প্রথমে কঠিন ও কষ্টকর হতে পারে, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে শান্তি, জ্ঞান এবং মুক্তি। তাই গীতা আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দের পরিবর্তে পরিণামমুখী সুখের দিকে তাকাতে শেখায়।
এই বিষয়টি পরবর্তী শ্লোকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আরও পরিষ্কার হয়। অষ্টাদশ অধ্যায়ের পরবর্তী শ্লোকে সাত্ত্বিক সুখ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে তার শুরু বিষের মতো মনে হলেও পরিণামে তা অমৃতের মতো হয়ে ওঠে। এর বিপরীতে রাজসিক সুখের শুরু অমৃতের মতো হলেও পরিণামে তা বিষের মতো হতে পারে। এর মাধ্যমে গীতা সুখ বিচার করার একটি গভীর নীতি প্রদান করে। কোনো কিছু শুরুতে কতটা আনন্দদায়ক তা নয়, শেষ পর্যন্ত তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যোগদর্শনের আলোকে অভ্যাস শব্দটির তাৎপর্য আরও গভীর। যোগের সাধনায় মনকে স্থির ও সংযত করার জন্য নিয়মিত অভ্যাস অপরিহার্য। মন স্বভাবতই নানা বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। কিন্তু ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে তাকে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট দিকে স্থাপন করা যায়। এই কারণে অভ্যাস শুধু আচরণের পুনরাবৃত্তি নয়, চেতনার পুনর্গঠন। মানুষ যাকে বারবার চিন্তা করে, যেভাবে বারবার আচরণ করে এবং যে ধরনের অনুভূতিকে বারবার গ্রহণ করে, তার মন ধীরে ধীরে সেই দিকেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই ধারণার গভীরতা রয়েছে। পুনরাবৃত্ত আচরণ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং পরিচিতি মানসিক প্রতিরোধ কমাতে সাহায্য করে। ফলে যে কাজ প্রথমে সচেতন প্রচেষ্টা দাবি করে, পরে তা তুলনামূলক স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই ভালো অভ্যাস তৈরি করতে সময় লাগে এবং খারাপ অভ্যাস ভাঙতেও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। গীতার ভাষায় বলা যায়, অভ্যাস মানুষের রুচি ও আনন্দের দিককে পরিবর্তন করতে পারে।
প্রতীকী দৃষ্টিতে অভ্যাসকে একটি পথের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি অচেনা জায়গায় প্রথমবার হাঁটলে কোনো পথ স্পষ্ট থাকে না। কিন্তু একই পথে বারবার চললে সেখানে একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি হয়। মানুষের মনও তেমন। ক্রোধকে বারবার অনুসরণ করলে ক্রোধের পথ শক্ত হয়। ভয়কে বারবার গ্রহণ করলে ভয়ের প্রবণতা শক্তিশালী হয়। আবার সত্য, ধৈর্য, সংযম, জ্ঞান এবং ধ্যানকে বারবার চর্চা করলে সেগুলিও চেতনার স্বাভাবিক পথ হয়ে ওঠে। তাই অভ্যাস আসলে ভবিষ্যৎ চরিত্রের বীজ।
এই শ্লোকের মধ্যে সুখকে আলো এবং দুঃখকে অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করলেও তার তাৎপর্য সহজে বোঝা যায়। অন্ধকার থেকে পালিয়ে গেলে অন্ধকারের অবসান হয় না। আলো জ্বালাতে হয়। একইভাবে দুঃখকে সাময়িকভাবে ভুলে যাওয়া দুঃখের অবসান নয়। এমন চেতনা গড়ে তুলতে হয় যা দুঃখের কারণকে অতিক্রম করতে সক্ষম। সেই চেতনা গড়ে ওঠে জ্ঞান, আত্মসংযম, সাধনা এবং ধারাবাহিক অভ্যাসের মাধ্যমে।
বাস্তব জীবনে একজন সংগীতশিল্পীর জীবন এর সুন্দর উদাহরণ। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রথম কোনো বাদ্যযন্ত্র শেখে, তখন একই সুর বারবার বাজানো তার কাছে একঘেয়ে ও কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন অনুশীলন করতে করতে একসময় তার আঙুল নিজে থেকেই সঠিক স্থানে চলে যায়। তখন অনুশীলন আর শুধু পরিশ্রম থাকে না, তা আনন্দে পরিণত হয়। একইভাবে একজন ধ্যানসাধকের কাছে প্রথমদিকে স্থির হয়ে বসা কঠিন হতে পারে। চিন্তা, অস্থিরতা এবং বিরক্তি তাকে বিচলিত করতে পারে। কিন্তু নিয়মিত সাধনার ফলে মন ধীরে ধীরে স্থির হতে শেখে এবং সেই স্থিরতাই আনন্দের কারণ হয়ে ওঠে।
এখানে গীতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সব আনন্দ প্রকৃত সুখ নয়। কোনো কিছু তাৎক্ষণিকভাবে আনন্দদায়ক হলেই তা কল্যাণকর হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণ অনেক সময় মানুষকে এমন আনন্দের দিকে নিয়ে যেতে পারে যার পরিণতি আসক্তি এবং অশান্তি। আবার আত্মসংযম, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানচর্চা প্রথমে কঠিন হলেও তার পরিণতি হতে পারে গভীর শান্তি। তাই সুখকে বিচার করতে হলে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে আমি এখন কী অনুভব করছি তার পাশাপাশি এই অনুভূতি আমাকে ভবিষ্যতে কোথায় নিয়ে যাবে।
এই শ্লোক আমাদের নিজের জীবন সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কোন জিনিসে আনন্দ পাই। আমার আনন্দ কি কোনো সচেতন সাধনার ফল, নাকি কেবল ইন্দ্রিয়ের তাৎক্ষণিক আকর্ষণ। আমার যে অভ্যাসগুলি আমাকে আনন্দ দেয়, সেগুলি কি আমাকে আরও স্বাধীন করছে, নাকি আরও নির্ভরশীল করে তুলছে। আমার সুখ কি দুঃখকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখছে, নাকি দুঃখের মূল কারণকে দুর্বল করছে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে পারলেই গীতার সুখতত্ত্ব আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির গঠন অত্যন্ত সুন্দর। শ্লোকের সূচনা হয়েছে সুখ শব্দ দিয়ে এবং শেষ হয়েছে দুঃখান্তে পৌঁছানোর ধারণা দিয়ে। মাঝখানে রয়েছে অভ্যাস এবং আনন্দের সম্পর্ক। যেন একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ সুখের সন্ধান করে, অভ্যাসের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জীবনপথ গড়ে তোলে, সেই পথের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায় এবং শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে দুঃখের বন্ধন ক্ষীণ হয়ে আসে।
সবশেষে বলা যায়, “সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ” শ্লোকটি মানুষের সুখের ধারণাকে গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করতে আহ্বান জানায়। সুখ কেবল ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি নয়, সুখ কেবল মুহূর্তের আনন্দ নয় এবং সুখ কেবল বাহ্যিক আরামের নামও নয়। প্রকৃত সুখের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অন্তর্গত প্রকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির দ্বারা। অভ্যাস সেই সুখের চেতনাকে গড়ে তোলে, রমতে সেই অভ্যাসের মধ্যে জন্ম নেওয়া আনন্দকে প্রকাশ করে এবং দুঃখান্ত সেই আনন্দের সর্বোচ্চ পরিণতির দিকে নির্দেশ করে। গীতার এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ তার অভ্যাসের দ্বারা নিজের আনন্দের প্রকৃতি গঠন করতে পারে। যে অভ্যাস তাকে অস্থিরতা, আসক্তি ও মোহের দিকে নিয়ে যায়, তা বাহ্যিকভাবে আনন্দদায়ক হলেও শেষ পর্যন্ত দুঃখের কারণ হতে পারে। আর যে অভ্যাস তাকে জ্ঞান, সংযম, স্থিরতা এবং আত্মসচেতনতার দিকে নিয়ে যায়, তা প্রথমে কঠিন হলেও ধীরে ধীরে গভীর আনন্দের উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো, যে জিনিস আজ আমাদের আনন্দ দেয় এবং যে জিনিস শেষ পর্যন্ত আমাদের সত্যিকারের সুখী করে, এই দুটি সবসময় এক নয়। গীতা আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দের পেছনে ছুটতে নয়, বরং এমন সুখের সন্ধান করতে শেখায় যার পরিণতিতে মানুষের অন্তর মুক্ত হয় এবং দুঃখের বন্ধন ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!