ভগবদ্গীতা ১৮.৩৭ — প্রথমে বিষ, পরিণামে অমৃত: সাত্ত্বিক সুখের গভীর তত্ত্ব
যত্তদগ্রে বিষমিব পরিণামেহমৃতোপমম্।
তৎসুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্।।৩৭।।
অনুবাদঃ যে সুখ প্রথমে বিষের মতো কিন্তু পরিণামে অমৃততুল্য এবং আত্মনিষ্ঠ বুদ্ধির নির্মলতা থেকে জাত, সেই সুখ সাত্ত্বিক বলে কথিত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের সপ্তত্রিংশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ সাত্ত্বিক সুখের এক গভীর ও অনন্য সংজ্ঞা দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো “যত্তদগ্রে বিষমিব পরিণামে অমৃতোপমম্। তৎসুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্।” এর সরল অর্থ হলো যে সুখ প্রথমে বিষের মতো মনে হয় কিন্তু পরিণামে অমৃতের মতো হয়ে ওঠে এবং যা আত্মবুদ্ধির প্রসন্নতা থেকে জন্ম নেয়, সেই সুখকে সাত্ত্বিক সুখ বলা হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের সুখ সম্পর্কে এমন একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে যা কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য নয়, বরং শিক্ষা, কর্ম, নৈতিকতা, আত্মসংযম, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “যৎ”। এর অর্থ যে বা যা। এর সঙ্গে “তৎ” শব্দটি যুক্ত হয়ে একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে। অর্থাৎ যে সুখের কথা বলা হচ্ছে, সেই সুখেরই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথম অবস্থায় তার স্বরূপ একরকম এবং পরিণত অবস্থায় তার ফল সম্পূর্ণ অন্যরকম। এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য বোঝাতেই শ্রীকৃষ্ণ “অগ্রে” এবং “পরিণামে” শব্দ ব্যবহার করেছেন। “অগ্রে” অর্থ প্রথমে বা প্রারম্ভে এবং “পরিণামে” অর্থ শেষ ফল হিসেবে বা চূড়ান্ত অবস্থায়। এই দুটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে গীতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো কাজ বা অভিজ্ঞতাকে কেবল তার বর্তমান অনুভূতির দ্বারা বিচার করা উচিত নয়। তার দীর্ঘমেয়াদি ফলও বিবেচনা করতে হবে।
“বিষমিব” শব্দটি এসেছে বিষ এবং ইব থেকে। বিষ অর্থ বিষ এবং ইব অর্থ মতো বা ন্যায়। অর্থাৎ প্রথমে সেই সুখ বিষের মতো মনে হয়। এখানে প্রকৃত বিষ বোঝানো হয়নি। এটি একটি শক্তিশালী উপমা। বিষ সাধারণত তিক্ত, অপ্রিয় এবং ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়। তেমনি যে কাজ বা সাধনা মানুষকে নিজের দুর্বলতা, অলসতা, আসক্তি এবং ইন্দ্রিয়ের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, তা প্রথমে অস্বস্তিকর বলে মনে হতে পারে। নিজের অভ্যাস পরিবর্তন করা, নিয়মিত অধ্যয়ন করা, ধ্যান করা, সত্য কথা বলা, রাগ সংযত করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কিংবা কোনো ভালো লক্ষ্যের জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করা প্রথম মুহূর্তে আনন্দদায়ক নাও হতে পারে। কিন্তু সেই প্রাথমিক অস্বস্তিই পরবর্তীতে গভীর কল্যাণের কারণ হতে পারে।
এর বিপরীতে “অমৃতোপমম্” শব্দটি এসেছে অমৃত এবং উপম থেকে। অমৃত অর্থ যা মৃত্যুর অতীত, অমরত্বের প্রতীক এবং দেবীয় সুধার প্রতিরূপ। উপম অর্থ সদৃশ বা তুলনীয়। তাই অমৃতোপম অর্থ অমৃতের মতো। এখানে অমৃত কোনো সাধারণ পানীয় নয়। এটি প্রতীক হয়ে উঠেছে স্থায়ী শান্তি, আত্মতৃপ্তি, জ্ঞান, মুক্তি এবং অন্তরের নির্মলতার। শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য হলো যে সত্যিকারের উন্নতিমুখী সুখের চূড়ান্ত ফল এমন এক অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে যেখানে মানুষের আনন্দ আর কেবল বাহ্যিক কোনো বস্তু বা ইন্দ্রিয়ের ওপর নির্ভর করে না। তার ভিতরে এক ধরনের স্থিরতা এবং প্রশান্তি জন্ম নেয়।
এখানে “বিষ” এবং “অমৃত” শব্দ দুটি শ্লোকটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। বিষ প্রতীক হয়ে উঠেছে প্রাথমিক কষ্টের। অমৃত প্রতীক হয়ে উঠেছে চূড়ান্ত কল্যাণের। মানুষের জীবনে এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে যেখানে শুরুটা কঠিন কিন্তু শেষটা সুন্দর। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতিদিন নিয়ম করে পড়াশোনা করে তখন তার কাছে খেলাধুলা বা বিনোদনের তুলনায় পড়াশোনা অনেক সময় কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু জ্ঞান অর্জনের পরে যে আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা এবং স্বাধীনতা সে লাভ করে তা দীর্ঘমেয়াদে গভীর আনন্দ দেয়। একজন মানুষ যখন নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে তখন প্রথমদিকে নিজের আবেগকে দমন করা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে সে যখন সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে এবং নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে তখন সেই আত্মসংযমই তার জীবনে শান্তি এনে দেয়।
এই কারণে গীতার “সুখ” ধারণাকে কেবল আনন্দের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। সংস্কৃত “সুখ” শব্দের অর্থ আনন্দ, স্বস্তি, তৃপ্তি এবং প্রশান্তি হলেও গীতার প্রসঙ্গে সুখ একটি বৃহত্তর অস্তিত্বগত অবস্থাকে নির্দেশ করে। মানুষ কোনো বস্তু পেয়ে আনন্দিত হতে পারে, কোনো ইন্দ্রিয়সুখ অনুভব করতে পারে অথবা কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার কারণে মুহূর্তের জন্য উচ্ছ্বসিত হতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দ যদি পরবর্তীতে তাকে আরও অস্থির, আসক্ত বা দুর্বল করে তোলে তাহলে তা প্রকৃত কল্যাণকর সুখ নয়। সাত্ত্বিক সুখের ক্ষেত্রে বিচারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সুখের মান নির্ধারিত হয় তার পরিণাম দ্বারা।
“সাত্ত্বিকম্” শব্দটি এসেছে সত্ত্ব থেকে। সত্ত্ব গীতার ত্রিগুণতত্ত্বের একটি প্রধান ধারণা। সত্ত্বের সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, ভারসাম্য, নির্মলতা এবং আলোকিত চেতনা। তাই সাত্ত্বিক সুখ এমন সুখ যা মানুষের চেতনাকে আরও স্বচ্ছ করে, বুদ্ধিকে আরও স্থির করে এবং জীবনকে আরও সুশৃঙ্খল করে। এই সুখ মানুষকে অন্ধ আসক্তির দিকে ঠেলে দেয় না। বরং সে নিজের মন, ইন্দ্রিয় এবং আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে শেখে। ফলে সাত্ত্বিক সুখের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি জ্ঞান ও আত্মনিয়ন্ত্রণও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
শ্লোকটির শেষ অংশ “আত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্” বিশেষভাবে গভীর। “আত্মবুদ্ধি” শব্দটি আত্মা এবং বুদ্ধির সমন্বয়ে গঠিত। বুদ্ধি শব্দটি সংস্কৃত “বুধ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ জাগ্রত হওয়া, জানা বা উপলব্ধি করা। তাই বুদ্ধি হলো বিচার করার, বোঝার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি। আত্মবুদ্ধি বলতে কেবল নিজের ব্যক্তিগত মতামত বোঝানো হয় না। এখানে আত্মতত্ত্বমুখী বুদ্ধি বা নিজের গভীরতর সত্তা সম্পর্কে স্বচ্ছ উপলব্ধিকে বোঝানো হয়েছে। আর “প্রসাদ” অর্থ নির্মলতা, প্রশান্তি, প্রসন্নতা এবং স্বচ্ছতা। “জম্” অর্থ জন্মানো বা উৎপন্ন হওয়া। ফলে আত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্ অর্থ হলো আত্মতত্ত্বমুখী বুদ্ধির প্রসন্নতা থেকে যে সুখের জন্ম হয়।
এই অংশটি শ্লোকটির মূল দর্শনকে প্রকাশ করে। সত্যিকারের সাত্ত্বিক সুখের উৎস বাহ্যিক বস্তু নয়, বরং অন্তরের স্বচ্ছতা। সাধারণ মানুষ মনে করে কোনো বস্তু অর্জন করলে সে সুখী হবে। অর্থাৎ সুখের উৎসকে সে নিজের বাইরে খোঁজে। কিন্তু গীতা মানুষের দৃষ্টি ভিতরের দিকে ফিরিয়ে দেয়। যখন বুদ্ধি স্বচ্ছ হয়, যখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষা ও দুর্বলতাকে বুঝতে শেখে, যখন তার জীবন সত্য, সংযম ও জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হয় তখন তার অন্তরে যে প্রশান্তি জন্ম নেয় সেটিই গভীরতর সুখ।
এই দর্শন আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে মানুষ তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন, অপ্রয়োজনীয় ভোগ এবং দ্রুত পুরস্কারের সংস্কৃতি মানুষকে এমন এক মানসিকতার দিকে নিয়ে যেতে পারে যেখানে সে এখন কী আনন্দ পাচ্ছে সেটাকেই জীবনের প্রধান মানদণ্ড মনে করে। কিন্তু গীতার এই শ্লোক প্রশ্ন করে সেই আনন্দের পরিণতি কী। কোনো অভ্যাস যদি এখন আনন্দ দেয় কিন্তু পরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে তাহলে তার প্রকৃতি বিচার করতে হবে। আবার কোনো কাজ যদি এখন পরিশ্রম দাবি করে কিন্তু ভবিষ্যতে জ্ঞান, স্বাস্থ্য, আত্মনির্ভরতা ও মানসিক শান্তি এনে দেয় তাহলে তার প্রাথমিক কষ্টকে নেতিবাচক বলে বিবেচনা করা উচিত নয়।
শিক্ষাজীবন এই দর্শনের একটি সহজ উদাহরণ। একজন ছাত্র যখন প্রতিদিন নিয়ম করে পড়াশোনা করে তখন তাকে অনেক সময় তাৎক্ষণিক আনন্দের কিছু সুযোগ ত্যাগ করতে হয়। অন্যরা যখন বিনোদনে ব্যস্ত তখন সে নিজের ভবিষ্যতের জন্য পরিশ্রম করে। সেই মুহূর্তে পড়াশোনা তার কাছে কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অর্জিত জ্ঞান এবং দক্ষতা তাকে যে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতা দেয় তা অনেক গভীর। একইভাবে শরীরচর্চা প্রথমে ক্লান্তিকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য তা মূল্যবান হতে পারে। ধ্যানের শুরুতে মন স্থির করা কঠিন হলেও নিয়মিত অনুশীলনের ফলে মানসিক স্বচ্ছতা এবং প্রশান্তি জন্মাতে পারে। সত্য কথা বলার ক্ষেত্রে কখনো তাৎক্ষণিক অসুবিধা দেখা দিতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যনিষ্ঠা মানুষের চরিত্রে যে দৃঢ়তা তৈরি করে তা অমূল্য।
এই শ্লোকের নৈতিক শিক্ষা হলো মানুষকে বর্তমান অনুভূতির দাস না হয়ে পরিণামের দিকে তাকাতে হবে। রাগের সময় কঠিন কথা বলা সহজ এবং তাৎক্ষণিকভাবে মনে হতে পারে যে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করে স্বস্তি পাওয়া গেছে। কিন্তু পরে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে এবং অনুতাপ জন্মাতে পারে। বিপরীতে রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত করা কঠিন। তবু সেই সংযম ভবিষ্যতে সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে এবং নিজের চরিত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই সাত্ত্বিক সুখের পথে প্রথমে যে কষ্ট আসে তা আসলে আত্মগঠনের কষ্ট।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি মানুষের সুখের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। সাধারণভাবে সুখকে তাৎক্ষণিক আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এখানে সুখকে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন ভালো লাগা এবং সত্যিকার অর্থে ভালো থাকা এক বিষয় নয়। মানুষ কোনো কিছু পেয়ে আনন্দিত হতে পারে কিন্তু সেই আনন্দ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত সুখ মানুষের চেতনাকে উন্নত করে। যে সুখ মানুষকে আরও স্বাধীন, স্বচ্ছ, স্থির এবং আত্মসচেতন করে সেটিই সাত্ত্বিক সুখের কাছাকাছি।
সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির সৌন্দর্য অসাধারণ। মাত্র কয়েকটি শব্দের মধ্যে বিষ এবং অমৃতের মতো বিপরীত দুটি প্রতীককে পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে। এই বৈপরীত্যের মাধ্যমে মানবজীবনের একটি চিরন্তন সত্য প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের অনেক মূল্যবান অর্জনের শুরুতে কষ্ট থাকে। শিশুর হাঁটা শেখার মধ্যে পড়ে যাওয়া আছে, শিক্ষার মধ্যে পরিশ্রম আছে, চরিত্র গঠনের মধ্যে আত্মসংযম আছে এবং আত্মজ্ঞান লাভের পথে নিজের অজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আছে। তাই প্রাথমিক কষ্টকে সবসময় ব্যর্থতা বলে মনে করা যায় না।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও গভীর। মানুষের মন সাধারণত ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের দিকে ছুটে যায়। বাহ্যিক আনন্দের প্রতি আকর্ষণ তাকে বারবার নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন ভোগের সন্ধানে নিয়ে যায়। কিন্তু আত্মজ্ঞানমুখী জীবন মানুষকে সেই প্রবাহের বিপরীতে দাঁড়াতে শেখায়। ধ্যান, আত্মপর্যবেক্ষণ, সংযম এবং সত্য অনুসরণের মাধ্যমে যখন বুদ্ধি নির্মল হয় তখন মানুষের সুখের ধারণাও পরিবর্তিত হয়। সে আর কেবল বাইরের জগতের কাছ থেকে সুখ প্রত্যাশা করে না। তার ভিতরের প্রশান্তিই ধীরে ধীরে সুখের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। এই অবস্থাই “আত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্” কথাটির গভীরতম তাৎপর্য।
এই শ্লোক আমাদের জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারবোধ প্রদান করে। কোনো কাজ শুরু করার আগে শুধু এই প্রশ্ন করা যথেষ্ট নয় যে এটি এখন আমার ভালো লাগছে কি না। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এটি আমাকে ভবিষ্যতে কী বানাবে। যে অভ্যাস আমাকে এখন আনন্দ দেয় কিন্তু ধীরে ধীরে দুর্বল করে, তার প্রকৃতি বিচার করা দরকার। আবার যে অনুশীলন এখন কঠিন কিন্তু আমাকে জ্ঞানী, সংযমী, সুস্থ, স্বাধীন ও শান্ত করে তোলে তার মূল্য বুঝতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষার বাইরে নিয়ে গিয়ে পরিণত জীবনের দিকে পরিচালিত করে।
সবশেষে বলা যায়, “যত্তদগ্রে বিষমিব পরিণামে অমৃতোপমম্” শুধু সাত্ত্বিক সুখের সংজ্ঞা নয়, এটি মানুষের জীবন পরিচালনার একটি গভীর নীতি। এখানে “বিষ” হলো প্রাথমিক কষ্ট, “অমৃত” হলো চূড়ান্ত শান্তি এবং “আত্মবুদ্ধিপ্রসাদ” হলো সেই অন্তর্গত স্বচ্ছতা যার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃত সুখকে উপলব্ধি করতে পারে। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে জীবনের সত্যিকারের আনন্দ সবসময় সহজ বা তাৎক্ষণিক হয় না। কখনো কখনো গভীর সুখের দরজা খুলতে হলে প্রথমে কষ্ট, সংযম এবং অধ্যবসায়ের পথ অতিক্রম করতে হয়। যে মানুষ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে সে ধীরে ধীরে বাহ্যিক ভোগের পেছনে ছুটে বেড়ানো থেকে সরে এসে অন্তরের শান্তিকে মূল্য দিতে শেখে। তাই গীতার এই শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। যা প্রথমে কঠিন অথচ শেষে মানুষকে সত্য, জ্ঞান, স্বাধীনতা এবং আত্মপ্রসন্নতার দিকে নিয়ে যায়, সেই পথের কষ্টকে বিষ বলে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। কারণ সেই কষ্টের পরিণামই একদিন অমৃতের মতো মধুর হয়ে উঠতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!