ভগবদ্গীতা ১৮.৩৯ — নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদজাত মোহ: তামসিক সুখের প্রকৃতি
যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ।
নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তত্তামসমুদাহৃতম্।।৩৯।।
অনুবাদঃ যে সুখ প্রথমে ও শেষে আত্মার মোহজনক এবং যা নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ থেকে উৎপন্ন হয়, তা তামসিক সুখ বলে কথিত হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ঊনচল্লিশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের সুখের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, “যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ। নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তত্তামসমুদাহৃতম্।” অর্থাৎ যে সুখ প্রথম অবস্থায় এবং পরবর্তী পরিণামেও আত্মাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে এবং যা নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ থেকে উৎপন্ন হয়, সেই সুখকে তামসিক সুখ বলা হয়েছে। এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের আনন্দের প্রকৃতি, তার মানসিক দুর্বলতা, কর্মবিমুখতা, আত্মবিস্মৃতি এবং জীবনের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল সুখকে ভালো বা মন্দ হিসেবে বিচার করেননি, বরং সুখ কোথা থেকে আসে, মানুষের চেতনার ওপর তার কী প্রভাব পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়, সেই সমগ্র প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করেছেন।
সুখ শব্দটি সংস্কৃত ভাষার একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। প্রচলিত ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যায় সু এবং খ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে সুখ শব্দের গঠন ব্যাখ্যা করা হয়। সু অর্থ শুভ, সুন্দর, অনুকূল বা কল্যাণকর এবং খ অর্থ অবকাশ বা অনুকূল অবস্থানের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রাচীন ব্যাখ্যায় বিবেচিত হয়েছে। সেই দৃষ্টিতে সুখ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে অস্তিত্ব স্বচ্ছন্দ ও অনুকূলভাবে প্রবাহিত হয়। তবে গীতার আলোচনায় সুখ কেবল ইন্দ্রিয়ের আনন্দ বা সাময়িক আরাম নয়। এখানে সুখের গুণগত প্রকৃতি বিচার করা হয়েছে। মানুষ কোনো কিছু উপভোগ করছে বলেই সেটি প্রকৃত অর্থে কল্যাণকর সুখ হয়ে যায় না। কোনো আনন্দ মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, আবার কোনো আনন্দ তাকে দুর্বলতা, জড়তা ও আত্মবিস্মৃতির মধ্যে আবদ্ধ করতে পারে। তাই গীতার দৃষ্টিতে সুখকে তার অনুভূতির তীব্রতা দিয়ে নয়, তার উৎস, প্রকৃতি ও পরিণাম দিয়ে বিচার করতে হয়।
শ্লোকটির শুরুতে ব্যবহৃত যদগ্রে শব্দটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অগ্র শব্দের অর্থ হলো প্রথম, সামনে বা শুরু। অগ্রে অর্থ শুরুতে বা প্রাথমিক অবস্থায়। এর সঙ্গে অনুবন্ধে শব্দটি যুক্ত হয়েছে। অনুবন্ধ শব্দটি অনু এবং বন্ধ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অনু অর্থ অনুসরণ করে বা পরে এবং বন্ধ অর্থ সংযোগ বা বন্ধন। ফলে অনুবন্ধ বলতে পরবর্তী সংযোগ, ফল বা পরিণামের ধারণা বোঝায়। শ্রীকৃষ্ণ যখন অগ্রে এবং অনুবন্ধে এই দুটি ধারণাকে পাশাপাশি রেখেছেন, তখন তিনি সুখ বিচার করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড প্রদান করেছেন। কোনো কিছু এখন ভালো লাগছে কি না, সেটিই তার সম্পূর্ণ মূল্যায়ন নয়। সেই আনন্দের পরবর্তী ফল কী হবে, সেটিও দেখতে হবে। বর্তমানের অনুভূতি এবং ভবিষ্যতের পরিণামকে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই সুখের প্রকৃত স্বরূপ বোঝা সম্ভব।
এই শিক্ষাটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন মানুষ কোনো কাজ না করে বিশ্রাম নিলে প্রথমে তার ভালো লাগতে পারে। দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকা, কোনো দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাজ পিছিয়ে দেওয়া কিংবা নিজের দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করা অনেক সময় তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়। কিন্তু সেই স্বস্তির পরিণামে যদি কর্মশক্তি কমে যায়, কর্তব্য অসম্পূর্ণ থাকে, আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয় এবং জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় হয়, তাহলে সেই আনন্দকে প্রকৃত কল্যাণকর সুখ বলা যায় না। গীতার ভাষায় এই ধরনের সুখ তামসিক সুখের দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ সুখের সত্যতা নির্ভর করে শুধু এই মুহূর্তে আমরা কী অনুভব করছি তার ওপর নয়, বরং সেই অনুভূতি আমাদের অস্তিত্বকে কোন দিকে পরিচালিত করছে তার ওপরও।
শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মোহনম্। এটি মুহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে বিভ্রান্তি, মোহ ও বাস্তবতা সম্পর্কে অস্পষ্টতার ধারণা রয়েছে। মোহনম্ অর্থ হলো যা মোহ সৃষ্টি করে বা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে। তামসিক সুখের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই। ক্ষতিকর বিষয় সবসময় মানুষের কাছে ক্ষতিকর বলে অনুভূত হয় না। অনেক সময় কোনো অভ্যাস মানুষকে সাময়িক আনন্দ দেয় এবং সেই আনন্দের কারণে সে তার প্রকৃত ক্ষতিকর দিক দেখতে পায় না। তখন আনন্দটি শুধু আনন্দ থাকে না, বরং বাস্তবতা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। মানুষ নিজের দুর্বলতাকে সুখ বলে মনে করতে শুরু করে এবং যে অভ্যাস তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে, সেটিকেই নিজের স্বস্তির আশ্রয় বলে মনে করে। এই অবস্থাই মোহের গভীর প্রকাশ।
আত্মনঃ শব্দটির অর্থও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আত্মন্ শব্দটি সংস্কৃত দর্শনে অত্যন্ত বিস্তৃত অর্থ বহন করে। কখনো এটি আত্মসত্তা, কখনো ব্যক্তি, কখনো অন্তঃকরণ এবং কখনো পরমার্থিক আত্মার ধারণা প্রকাশ করে। এই শ্লোকে আত্মনঃ বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝানো হয়েছে যার চেতনা ও জীবনের ওপর সুখের প্রভাব পড়ে। ফলে তামসিক সুখ শুধু শরীরকে আরাম দেওয়ার বিষয় নয়। এটি মানুষের চিন্তা, বিচারবুদ্ধি, কর্মশক্তি ও আত্মসচেতনতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। যে সুখ মানুষকে নিজের প্রকৃত কল্যাণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেই সুখের মধ্যে বাহ্যিক আরাম থাকলেও অন্তর্নিহিতভাবে তা আত্মবিকাশের প্রতিবন্ধক।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ তামসিক সুখের উৎস হিসেবে নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদের কথা বলেছেন। নিদ্রা স্বাভাবিকভাবে জীবনের জন্য অপরিহার্য। যথাযথ ঘুম শরীর ও মনের বিশ্রাম দেয় এবং কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনে। তাই গীতায় সাধারণ ঘুমকে নিন্দা করা হয়নি। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয় যখন নিদ্রা কর্তব্য থেকে পালানোর মাধ্যম হয়ে ওঠে। যখন একজন মানুষ জানে যে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা উচিত, কিন্তু সে শুধু কাজটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ঘুমকে আশ্রয় নেয়, তখন নিদ্রা আর স্বাভাবিক বিশ্রাম থাকে না। তা তামসিক প্রবণতার বাহন হয়ে ওঠে।
আলস্য শব্দের মধ্যে রয়েছে কর্মে অনীহা, উদ্যোগের অভাব এবং জড়তার প্রবণতা। আলস্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি সবসময় মানুষের কাছে কষ্টকর বলে মনে হয় না। বরং আলস্য অনেক সময় অত্যন্ত আরামদায়ক বলে মনে হয়। মানুষ ভাবে আজ কাজটি না করলেও চলবে, পরে করা যাবে। কিন্তু সেই পরে ধীরে ধীরে আরও পরে পরিণত হয় এবং কাজ জমতে থাকে। ফলে উদ্বেগ বাড়ে, আত্মবিশ্বাস কমে এবং আবার কাজ এড়িয়ে যেতে ইচ্ছা করে। এভাবে আলস্য নিজের জন্য একটি বন্ধ চক্র সৃষ্টি করে। প্রথমে যে বিশ্রাম স্বস্তি দিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতাকে দুর্বল করে।
প্রমাদ শব্দটি আরও গভীর। প্রমাদ বলতে শুধু ভুল করা বোঝায় না। এর মধ্যে অসতর্কতা, অবহেলা, কর্তব্যে গাফিলতি এবং নিজের প্রকৃত কল্যাণ সম্পর্কে সচেতন না থাকার ধারণা রয়েছে। একজন মানুষ যদি কোনো কাজের ক্ষতিকর দিক জানার পরও সচেতনভাবে তাকে অবহেলা করে, তবে সেখানে প্রমাদের উপস্থিতি দেখা যায়। প্রমাদ হলো এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ নিজের পতনের কারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ নয়, কিন্তু সেই জ্ঞানকে কার্যকর করার মতো সতর্কতাও তার মধ্যে থাকে না। তাই প্রমাদকে তামসিকতার একটি গভীর প্রকাশ বলা যায়।
নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদকে একসঙ্গে দেখলে তামসিক সুখের একটি ধারাবাহিক মানসিক প্রক্রিয়া স্পষ্ট হয়। অতিরিক্ত নিদ্রা চেতনাকে ভারী করতে পারে, আলস্য কর্মশক্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং প্রমাদ মানুষকে কর্তব্য ও আত্মকল্যাণ সম্পর্কে অসতর্ক করে তুলতে পারে। এরপর মানুষ এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাতে পারে যেখানে নিজের জড়তাকেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। তখন উন্নতির আকাঙ্ক্ষা কমে যায় এবং স্থবির অবস্থার মধ্যেই এক ধরনের আরাম অনুভূত হয়। এই আরামই তামসিক সুখের মূল বৈশিষ্ট্য।
তামস শব্দের আক্ষরিক অর্থ অন্ধকার। সাংখ্য দর্শনে তমস হলো প্রকৃতির তিন গুণের একটি। সত্ত্ব স্বচ্ছতা ও প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত, রজঃ গতি ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তমস জড়তা, অন্ধকার, আবরণ ও অজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তামসিক সুখ তাই এমন সুখ যা চেতনার আলোকে প্রসারিত করার পরিবর্তে তাকে আচ্ছন্ন করে। এখানে অন্ধকার বলতে কেবল বাহ্যিক অন্ধকার বোঝানো হয় না। এটি এমন এক অন্তর্গত অন্ধকার যেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত অবস্থাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পারে না। সে নিজের অভ্যাস, দুর্বলতা ও কর্মবিমুখতার প্রকৃত পরিণাম বুঝতে পারে না।
গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে সুখকে তিনটি গুণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সাত্ত্বিক সুখ শুরুতে বিষের মতো মনে হলেও পরিণামে অমৃতের মতো হয়। কারণ আত্মসংযম, সাধনা, জ্ঞান ও শৃঙ্খলার শুরুতে কষ্ট থাকতে পারে, কিন্তু তার ফল গভীর কল্যাণ। রাজসিক সুখ শুরুতে অমৃতের মতো মনে হয় কিন্তু পরিণামে বিষের মতো হতে পারে। কারণ ইন্দ্রিয়সুখ, আকাঙ্ক্ষা ও ভোগ প্রথমে অত্যন্ত আনন্দদায়ক হলেও তার অতিরিক্ততা পরবর্তীতে অশান্তি ও বন্ধনের কারণ হতে পারে। তামসিক সুখের ক্ষেত্রে শুরু এবং পরিণাম উভয় ক্ষেত্রেই মোহ ও জড়তার প্রাধান্য থাকে। এই তুলনা থেকে বোঝা যায় যে গীতার দৃষ্টিতে সুখের সত্যতা তার তাৎক্ষণিক আনন্দের মধ্যে নয়, বরং তার চেতনা নির্মাণের ক্ষমতার মধ্যে নিহিত।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোক মানুষের একটি মৌলিক দুর্বলতার দিকে নির্দেশ করে। মানুষ প্রায়ই বর্তমানের আনন্দকে ভবিষ্যতের কল্যাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এখন যে কাজটি আরাম দিচ্ছে, মানুষ তার দিকে সহজেই আকৃষ্ট হয়। যে কাজটি এখন কঠিন কিন্তু ভবিষ্যতে উন্নতি আনবে, সেটিকে এড়িয়ে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আত্মবিকাশের পথে অনেক মূল্যবান বিষয়ের শুরু কঠিন। জ্ঞান অর্জন, শৃঙ্খলা গঠন, নৈতিক জীবন, সাধনা এবং আত্মসংযমের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আরামের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হয়। এই দৃষ্টিতে গীতার শিক্ষা হলো বর্তমানের অনুভূতির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে তার গভীর পরিণামকে বিবেচনা করা।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের একটি গভীর ব্যাখ্যা করা যায়। আত্মা স্বরূপত চৈতন্য এবং জ্ঞানময়। কিন্তু অবিদ্যার কারণে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে। তামসিক সুখ সেই আত্মবিস্মৃতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। যখন মানুষ চেতনার বিকাশের পরিবর্তে অচেতনতা, জড়তা ও পালানোর মধ্যে স্বস্তি খোঁজে, তখন তার প্রকৃত আত্মস্বরূপের অনুসন্ধান দুর্বল হয়। ফলে মোহ কেবল কোনো বাহ্যিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ নয়, নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞতাও হতে পারে।
যোগদর্শনের আলোকে তামসিক সুখকে চিত্তের জড়তা বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করা যায়। যোগের উদ্দেশ্য চিত্তকে স্থির, স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত করা। কিন্তু নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ যদি অতিরিক্তভাবে চেতনাকে আচ্ছন্ন করে, তাহলে মন নিজের প্রকৃত গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা হারায়। ফলে আত্মসচেতনতা ও সংযম দুর্বল হয়। এই কারণে তামসিক সুখ আধ্যাত্মিক অগ্রগতির সহায়ক নয়। এটি মানুষকে নিজের ভেতরের সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে স্থবিরতার মধ্যে ধরে রাখতে পারে।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও রয়েছে। মানুষ প্রায়ই তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কঠিন কাজ এখন করলে পরিশ্রম করতে হবে, কিন্তু কাজটি পিছিয়ে দিলে এখনই স্বস্তি পাওয়া যায়। তাই কাজ এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে সাময়িক সুখ সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরে কাজ জমে গেলে উদ্বেগ ও অপরাধবোধ বাড়তে পারে। গীতার অগ্রে এবং অনুবন্ধে ধারণাকে এই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মানুষকে শুধু বর্তমান অনুভূতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভবিষ্যতের ফলও বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
একজন ছাত্রের উদাহরণ নিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। পরীক্ষার আগে তার পড়াশোনা করা দরকার। কিন্তু সে পড়ার পরিবর্তে বলে যে একটু বিশ্রাম নেবে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি সেই বিশ্রাম ধীরে ধীরে দীর্ঘ ঘুম, বিনোদন, কাজ পিছিয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা না করার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে প্রথমের আরাম তার প্রকৃত কল্যাণের বিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। এখানে যে আনন্দ তাকে কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিল, সেটিই তামসিক সুখের প্রকৃতি বোঝার একটি সহজ উদাহরণ।
তামসিক সুখকে কাদার মধ্যে শুয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একজন মানুষ ক্লান্ত হয়ে কাদায় শুয়ে পড়ল এবং প্রথমে আরাম পেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সে বুঝল যে কাদা তাকে শুধু আরাম দেয়নি, তাকে আটকে দিয়েছে। তার উঠতে কষ্ট হচ্ছে। তামসিক সুখও অনেক সময় এমন। এটি মানুষকে এমন একটি আরাম দেয় যা তাকে মুক্ত করে না, বরং তার বন্ধনকে আরামদায়ক করে তোলে। এই কারণেই মোহনম্ শব্দটি এত গভীর। যে জিনিস মানুষকে আটকে রাখছে, মানুষ কখনও কখনও সেই জিনিসকেই নিজের আশ্রয় বলে মনে করতে শুরু করে।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও তামসিক সুখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একে বলা যায় স্বস্তির ছদ্মবেশে আত্মবিস্মৃতি। অন্ধকার ঘরে চোখ বিশ্রাম পেতে পারে, কিন্তু দৃষ্টি প্রসারিত হয় না। ভারী কম্বল শরীরকে উষ্ণ রাখে, কিন্তু অতিরিক্ত হলে চলাফেরা বন্ধ করে দেয়। স্থির জল কিছু সময় শান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু প্রবাহ না থাকলে সেখানে স্থবিরতা জন্ম নিতে পারে। তামসিক সুখও তেমন। তার বাহ্যিক রূপ শান্তি বা আরামের মতো হলেও তার অন্তর্গত প্রবণতা মানুষকে স্থবির করে রাখতে পারে।
এই শ্লোক আমাদের সুখকে প্রত্যাখ্যান করতে শেখায় না। বরং সুখকে বিচার করতে শেখায়। আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে কোনো আনন্দ আমাদের চেতনাকে প্রসারিত করছে কি না, কর্মশক্তি বাড়াচ্ছে কি না, কর্তব্য পালনে সাহায্য করছে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের আরও স্বাধীন ও পরিণত মানুষ করে তুলছে কি না। যে আনন্দ আমাদের শক্তিশালী করে, সচেতন করে এবং কল্যাণের পথে এগিয়ে দেয়, তার মূল্য একরকম। আর যে আনন্দ আমাদের দুর্বলতা, অলসতা ও আত্মবিস্মৃতির মধ্যে আবদ্ধ রাখে, তার মূল্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই কারণে “যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ” শ্লোকটি শুধু তামসিক সুখের একটি সংজ্ঞা নয়। এটি সুখ বিচার করার একটি গভীর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মানদণ্ড। জীবনে কোনো কিছু ভালো লাগছে বলেই সেটি আমাদের জন্য ভালো নয়। কোনো কিছু কষ্টকর বলেই সেটি অকল্যাণকর নয়। অনেক সময় শৃঙ্খলার শুরুতে কষ্ট থাকে কিন্তু তার পরিণামে স্বাধীনতা আসে। আবার অনেক সময় জড়তার শুরুতে আরাম থাকে কিন্তু তার পরিণামে বন্ধন আসে। তাই মানুষের প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো বর্তমানের অনুভূতি অতিক্রম করে ভবিষ্যতের সত্যকে দেখতে শেখা।
সর্বশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা মানুষের সুখ সম্পর্কে একটি গভীর সতর্কবাণী। সব আনন্দ মুক্তি দেয় না, সব স্বস্তি শান্তি নয় এবং সব আরাম কল্যাণকর নয়। নিদ্রা, আলস্য ও প্রমাদ থেকে জন্ম নেওয়া যে সুখ মানুষের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে, তাকে তামসিক সুখ বলা হয়। এর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এটি নিজের প্রকৃত রূপকে আড়াল করে। মানুষ তখন নিজের জড়তাকেই শান্তি, নিজের কর্মবিমুখতাকেই বিশ্রাম এবং নিজের আত্মবিস্মৃতিকেই সুখ বলে মনে করতে পারে। গীতার শিক্ষা তাই আমাদের শেখায় সুখকে শুধু অনুভব করতে নয়, তাকে পরীক্ষা করতেও। আজ যে আনন্দ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং আগামী দিনে আমি সেই আনন্দের কারণে কেমন মানুষ হয়ে উঠব, এই প্রশ্নের মধ্যেই তামসিক সুখ থেকে মুক্তির পথ নিহিত রয়েছে। সত্যিকারের সুখ সেই সুখ যা চেতনাকে উজ্জ্বল করে, কর্মকে অর্থপূর্ণ করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং মানুষকে তার উচ্চতর সত্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!