ভগবদ্গীতা ১৮.৪ — ত্যাগের প্রকৃতি ও তিন প্রকার ত্যাগের গভীর তত্ত্ব
নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।
ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সংপ্রকীর্তিতঃ।।৪।।
অনুবাদঃ হে ভরতসত্তম! ত্যাগ সম্বন্ধে আমার নিশ্চয় সিদ্ধান্ত শ্রবণ কর। হে পুরুষব্যাঘ্র! শাস্ত্রে ত্যাগও তিন প্রকার বলে কীর্তিত হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রকৃতি সম্পর্কে অর্জুনকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছেন। শ্লোকটি হলো
এর সহজ অর্থ হলো, হে ভরতশ্রেষ্ঠ, ত্যাগ সম্পর্কে আমার নিশ্চিত সিদ্ধান্ত তুমি শোন। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, ত্যাগও তিন প্রকার বলে সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে। এই ছোট্ট শ্লোকটির মধ্যে ত্যাগ সম্পর্কে গীতার একটি অত্যন্ত গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। সাধারণভাবে আমরা ত্যাগ বলতে কোনো কিছু ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা কিংবা কোনো বস্তু বা সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়াকে বুঝি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা অনুযায়ী ত্যাগের প্রকৃত অর্থ কেবল বাহ্যিকভাবে কোনো কিছু পরিত্যাগ করা নয়। ত্যাগের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে মানুষের অন্তরের ভাব, উদ্দেশ্য, আসক্তি এবং কর্মফলের প্রতি তার মানসিক অবস্থার ওপর।
ত্যাগ শব্দটি সংস্কৃত ত্যাগ শব্দ থেকে এসেছে এবং এর মূল সম্পর্ক সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতুর সঙ্গে। ত্যজ্ ধাতুর অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া, পরিত্যাগ করা, বর্জন করা কিংবা কোনো কিছু থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করা। এই ধাতু থেকেই ত্যাগ শব্দের উৎপত্তি। আক্ষরিক অর্থে ত্যাগ হলো পরিত্যাগ বা ছেড়ে দেওয়ার ভাব। কিন্তু গীতার দর্শনে এই শব্দটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ লাভ করেছে। এখানে ত্যাগ মানে শুধু কোনো বস্তু বা কর্মকে ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের কর্মের সঙ্গে যে আসক্তি, অহংকার এবং ফলের প্রত্যাশা যুক্ত হয়ে থাকে, সেই মানসিক বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই ত্যাগের গভীর অর্থ।
শ্রীকৃষ্ণ শ্লোকের শুরুতেই বলেছেন নিশ্চয়ং শৃণু মে। অর্থাৎ আমার কাছ থেকে এই বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত শোনো। এখানে নিশ্চয় শব্দের মধ্যে দৃঢ়তা, স্থিরতা এবং সন্দেহমুক্ত জ্ঞানের ভাব রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ যেন বোঝাতে চাইছেন যে ত্যাগ সম্পর্কে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মত থাকতে পারে, কিন্তু তিনি এখন ত্যাগের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। শৃণু শব্দের অর্থ শোনো। এটি শুধু কানে শোনার কথা নয়। এর মধ্যে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করার আহ্বান রয়েছে। অর্থাৎ ত্যাগের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে হলে কেবল শব্দ শোনা যথেষ্ট নয়, তার অন্তর্নিহিত অর্থও উপলব্ধি করতে হবে।
শ্লোকে ভরতসত্তম এবং পুরুষব্যাঘ্র এই দুটি সম্বোধনও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভরতসত্তম অর্থ ভরতবংশীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। পুরুষব্যাঘ্র অর্থ পুরুষদের মধ্যে বাঘ বা শ্রেষ্ঠ পুরুষ। এই ধরনের সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের শক্তি, সাহস এবং নৈতিক সামর্থ্যকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও তাঁর মধ্যে সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই তাঁকে এমন একটি জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে যা শুধু যুদ্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং সমগ্র মানবজীবনের কর্ম ও ত্যাগের ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।
শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সংপ্রকীর্তিতঃ। এখানে বলা হয়েছে যে ত্যাগ তিন প্রকার। ত্রিবিধ শব্দের অর্থ তিন প্রকার এবং সংপ্রকীর্তিত শব্দের অর্থ সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত বা বিশদভাবে বর্ণিত। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগকে এমন কোনো একক ধারণা হিসেবে দেখছেন না যার প্রতিটি রূপ সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। মানুষের মানসিক গুণ এবং উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে ত্যাগের প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়। পরবর্তী শ্লোকগুলিতে এই তিন প্রকার ত্যাগকে সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সন্ন্যাস এবং ত্যাগের পার্থক্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাহ্যিকভাবে সংসার, সম্পদ বা কর্ম পরিত্যাগ করাকে অনেক সময় ত্যাগ বলে মনে করা হয়। কিন্তু গীতার শিক্ষা আরও গভীরে যায়। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু ত্যাগ করেও যদি তার মনে সেই বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা, অহংকার বা আসক্তি বজায় থাকে, তবে তার বাহ্যিক ত্যাগ প্রকৃত অন্তরের ত্যাগ হয়ে ওঠে না। আবার একজন মানুষ সংসারের মধ্যে থেকে নিজের কর্তব্য পালন করেও কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করতে পারেন। এই কারণে গীতার ত্যাগ কর্মবিমুখতার শিক্ষা নয়। এটি কর্মের মধ্যে থেকেও মানসিকভাবে মুক্ত থাকার শিক্ষা।
ত্যাগের প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আমি কী ত্যাগ করছি। কিন্তু গীতার আলোকে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আমি কেন ত্যাগ করছি। একজন মানুষ যদি কষ্টের ভয়ে নিজের কর্তব্য পরিত্যাগ করেন, তবে বাহ্যিকভাবে সেটি ত্যাগের মতো হলেও তার মধ্যে ভয় এবং স্বার্থ কাজ করছে। আবার কেউ যদি নিজের কর্তব্যকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে অজ্ঞতার কারণে কর্ম থেকে সরে যান, সেটিও প্রকৃত জ্ঞাননির্ভর ত্যাগ নয়। অন্যদিকে একজন মানুষ যদি নিজের কর্তব্য পালন করেন কিন্তু কর্মের ফল নিয়ে অহংকার, লোভ বা অতিরিক্ত প্রত্যাশা না রাখেন, তাহলে তাঁর কর্মের মধ্যে ত্যাগের সত্য প্রকাশ পায়।
সাত্ত্বিক ত্যাগের ক্ষেত্রে মানুষ কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগ করেন না। তিনি জানেন যে জীবনে কিছু দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের সঙ্গে ব্যক্তিগত লাভের অন্ধ আকাঙ্ক্ষা যুক্ত করেন না। তিনি কর্ম করেন নিষ্ঠার সঙ্গে, কিন্তু ফলের প্রতি নিজের অস্তিত্বকে নির্ভরশীল করে তোলেন না। রাজসিক ত্যাগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কষ্ট, পরিশ্রম বা অসুবিধার ভয় ত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তামসিক ত্যাগের ক্ষেত্রে অজ্ঞানতা ও মোহ মানুষের কর্তব্যবোধকে আচ্ছন্ন করে। ফলে সে যা করা উচিত তা পরিত্যাগ করে। এই তিনটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য দেখিয়ে গীতা বোঝায় যে শুধু বাহ্যিক আচরণ দেখে ত্যাগের মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। ত্যাগের অন্তর্নিহিত চেতনা বুঝতে হয়।
গীতার ত্যাগের ধারণার সঙ্গে কর্মযোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কর্মযোগ মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলে না। বরং নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে শেখায়। একজন কৃষক জমি চাষ করবেন, একজন শিক্ষক শিক্ষা দেবেন, একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করবেন, একজন পিতা সন্তানের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করবেন এবং একজন কর্মী নিজের কাজ আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পন্ন করবেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের মানসিক অবস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। কেউ কর্মের ফল না পাওয়ায় ভেঙে পড়তে পারেন, কেউ প্রশংসা না পেয়ে হতাশ হতে পারেন, আবার কেউ নিজের কর্তব্যকে যথাসাধ্য সম্পন্ন করে ফলকে বৃহত্তর নিয়মের হাতে সমর্পণ করতে পারেন। শেষের অবস্থাটিই ত্যাগের গভীর চেতনাকে প্রকাশ করে।
এই কারণে ত্যাগকে শুধু কিছু হারিয়ে ফেলার ধারণা হিসেবে দেখলে গীতার মূল শিক্ষা বোঝা যায় না। ত্যাগ আসলে অন্তরের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। যে মানুষ কোনো বস্তু ছাড়া থাকতে পারেন না, তিনি সেই বস্তুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যে ব্যক্তি প্রশংসা না পেলে নিজের মূল্য হারিয়ে ফেলেন, তিনি প্রশংসার ওপর নির্ভরশীল। যে ব্যক্তি ব্যর্থতাকে নিজের অস্তিত্বের পরিচয় মনে করেন, তিনি ব্যর্থতার দ্বারা আবদ্ধ। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কর্তব্য পালন করেন এবং ফলাফলকে নিজের আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানান না, তিনি ধীরে ধীরে মানসিক স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যান। এই অর্থে ত্যাগ হলো বন্ধন থেকে মুক্তির একটি পথ।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও ত্যাগের গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষের বন্ধনের অন্যতম কারণ হলো নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলভাবে চিনে নেওয়া। মানুষ মনে করে আমি কর্তা, আমিই ভোক্তা, এটি আমার, আমিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করি। এই অহংবোধ থেকেই আসক্তি এবং কর্মফলের প্রতি আকর্ষণ জন্ম নেয়। ত্যাগ তখন কেবল বস্তু পরিত্যাগ নয়। ত্যাগ হলো সেই অহংকারপূর্ণ কর্তৃত্ববোধকে শিথিল করা, যার ফলে মানুষ কর্মের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে ফেলে। কর্ম চলবে, কিন্তু কর্মের অহংকার মানুষকে আবদ্ধ করবে না।
মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও ত্যাগের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মানসিক অস্থিরতার একটি কারণ হলো এমন ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা যা সম্পূর্ণভাবে তার হাতে নেই। মানুষ চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ফলাফল নিজের ইচ্ছামতো ঘটাতে পারে না। সে নিজের পরিশ্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু অন্য মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে নিজের কর্তব্য পালন করতে পারে, কিন্তু জীবনের সমস্ত পরিস্থিতি নিজের ইচ্ছামতো সাজাতে পারে না। এই সত্য উপলব্ধি করলে মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও উদ্বেগ কমতে পারে। তাই ত্যাগের একটি ব্যবহারিক অর্থ হলো নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম কাজ করা এবং যে বিষয় নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তা নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক দাসত্বে না জড়ানো।
একজন কৃষকের কথা চিন্তা করা যায়। তিনি জমি প্রস্তুত করেন, বীজ বপন করেন, সেচ দেন এবং আগাছা পরিষ্কার করেন। কিন্তু বৃষ্টি, আবহাওয়া, রোগবালাই এবং প্রকৃতির অসংখ্য বিষয় তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে না। যদি তিনি নিজের সব কর্তব্য সম্পন্ন করার পরও প্রতিটি মুহূর্তে শুধু ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে তাঁর মন অস্থির হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর হাতে রয়েছে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম, আর ফলাফল নির্ভর করে বৃহত্তর অনেক নিয়মের ওপর, তাহলে তাঁর কর্মে আন্তরিকতা থাকবে এবং মনে তুলনামূলকভাবে শান্তি আসবে। এই উদাহরণটি গীতার ত্যাগের ভাবকে সহজভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
ত্যাগের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে ত্যাগ প্রায়ই আত্মবিসর্জন, বৃহত্তর কল্যাণ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ অতিক্রম করার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু গীতার ত্যাগ আরও সূক্ষ্ম একটি প্রতীক বহন করে। এটি মানুষের অহংকার ত্যাগের প্রতীক, লোভ ত্যাগের প্রতীক, অতিরিক্ত প্রত্যাশা ত্যাগের প্রতীক এবং নিজের ইচ্ছাকে সমগ্র জীবনের একমাত্র সত্য মনে করার প্রবণতা ত্যাগের প্রতীক। তাই ত্যাগকে বলা যায় অন্তরের এমন একটি পরিবর্তন যার মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনকে আঁকড়ে ধরার পরিবর্তে জীবনের সঙ্গে সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করতে শেখে।
গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত ত্যাগ মানে সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। ধন থাকতে পারে, পরিবার থাকতে পারে, কর্ম থাকতে পারে, সামাজিক দায়িত্ব থাকতে পারে, সাফল্য আসতে পারে এবং ব্যর্থতাও আসতে পারে। কিন্তু মানুষের অন্তর যেন এগুলোর দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়। সম্পদ থাকবে কিন্তু সম্পদের দাসত্ব থাকবে না। সম্পর্ক থাকবে কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে অন্ধ অধিকারবোধ থাকবে না। কর্ম থাকবে কিন্তু কর্মফলের অহংকার থাকবে না। সাফল্য আসবে কিন্তু সাফল্যই নিজের পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি হবে না। ব্যর্থতা আসবে কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্বের পরিচয় মনে করা হবে না। এই অন্তর্গত স্বাধীনতাই ত্যাগের প্রকৃত সৌন্দর্য।
১৮.৪ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তাই ত্যাগকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করেননি। তিনি বলেননি যে যে কোনো ধরনের পরিত্যাগই পবিত্র। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন যে ত্যাগও তিন প্রকার। এর মাধ্যমে তিনি মানুষের বাহ্যিক কাজের পাশাপাশি তার অন্তরের উদ্দেশ্যকে বিচার করার শিক্ষা দিয়েছেন। একই কাজ একজন মানুষ জ্ঞান থেকে করতে পারেন, আরেকজন স্বার্থ থেকে করতে পারেন এবং তৃতীয়জন অজ্ঞতা থেকে করতে পারেন। বাহ্যিক কাজ একই হলেও তাদের অন্তর্নিহিত মূল্য এক নয়। তাই গীতার দৃষ্টিতে মানুষের কাজের বিচার করতে হলে তার কর্মের সঙ্গে তার চেতনার সম্পর্কও বুঝতে হবে।
শেষ পর্যন্ত ত্যাগ শব্দটি আমাদের একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করায়। জীবনে আমরা কী কী ছেড়েছি, সেই হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের ভিতরে কোন কোন আসক্তি এখনও অটুট রয়েছে। আমরা হয়তো অনেক বস্তু ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারি না। আমরা হয়তো অনেক ভোগ ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু অহংকার ছাড়তে পারি না। আমরা হয়তো বাহ্যিকভাবে সরল জীবনযাপন করতে পারি, কিন্তু মনে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা ধরে রাখতে পারি। তাই প্রকৃত ত্যাগ হলো অন্তরের পরিবর্তন।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ মানে সবকিছু ছেড়ে দেওয়া নয়। ত্যাগ মানে নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। ত্যাগ মানে জীবনের প্রতি অনাসক্ত উদাসীনতা নয়। বরং ত্যাগ হলো কর্তব্য পালন করতে করতে অহংকার, আসক্তি এবং কর্মফলের প্রতি অন্ধ নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়া। মানুষের হাতে কর্ম আছে, কিন্তু সব ফল তার হাতে নেই। তাই নিজের কর্তব্যকে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করাই গীতার ত্যাগের গভীর পথ। এই কারণে নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম শুধু একটি শাস্ত্রীয় ঘোষণা নয়। এটি মানুষের অন্তরের স্বাধীনতার দিকে একটি আহ্বান। আর ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সংপ্রকীর্তিতঃ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ত্যাগের বাহ্যিক রূপের চেয়ে তার অন্তর্নিহিত চেতনাই আসল। প্রকৃত ত্যাগ শেষ পর্যন্ত কোনো কিছু হারানোর নাম নয়। প্রকৃত ত্যাগ হলো আসক্তির বন্ধন অতিক্রম করে নিজের কর্তব্য, নিজের বিবেক এবং নিজের গভীরতম সত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!