ভগবদ্গীতা ১৮.৪১ — স্বভাবজাত গুণ ও কর্ম: মানুষের প্রবণতা ও কর্তব্যের গভীর সম্পর্ক
ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈ।।৪১।।
অনুবাদঃ হে পরন্তপ! স্বভাবজাত গুণ অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্মসমূহ বিভক্ত হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একচল্লিশতম শ্লোকটি মানুষের স্বভাব, গুণ, কর্ম এবং কর্তব্যের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। শ্লোকটি হলো “ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ। কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ।” অর্থাৎ হে পরন্তপ, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্ম তাদের স্বভাব থেকে উৎপন্ন গুণ অনুসারে পৃথকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। এই শ্লোককে শুধু প্রাচীন সামাজিক শ্রেণিবিভাগের একটি বিবরণ হিসেবে দেখলে এর অন্তর্নিহিত দার্শনিক গভীরতা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না। এর মধ্যে মানুষের প্রকৃতি, প্রবণতা, কর্ম, সামাজিক দায়িত্ব এবং আত্মবিকাশ সম্পর্কে এক গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণ শব্দটি ব্রহ্ম শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর দূরবর্তী ব্যুৎপত্তিগত সম্পর্ক সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে, যার মধ্যে বৃদ্ধি, বিস্তার ও মহত্ত্বের ধারণা রয়েছে। সেই দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো যায় যিনি ব্রহ্ম, জ্ঞান, সত্য ও আত্মঅনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। গীতার পরবর্তী শ্লোকে ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম হিসেবে শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, আর্জব, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং আস্তিক্যের কথা বলা হয়েছে। ফলে এখানে ব্রাহ্মণ ধারণাটিকে কেবল জন্মপরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান, আত্মসংযম, সত্যসন্ধান এবং নৈতিক চরিত্রের প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়।
এরপর এসেছে ক্ষত্রিয় শব্দ। ক্ষত্রিয় শব্দটি ক্ষত্র ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ক্ষত্র বলতে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, শাসন ও রক্ষার শক্তিকে বোঝানো হয়। তাই ক্ষত্রিয় এমন এক কর্মপ্রকৃতির প্রতীক যার মধ্যে সাহস, নেতৃত্ব, শক্তি, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকে। গীতার পরবর্তী অংশে ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম হিসেবে শৌর্য, তেজ, ধৈর্য, দক্ষতা, যুদ্ধে অপলায়ন, দান এবং নেতৃত্বের গুণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষত্রিয়ত্বের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর গভীরে রয়েছে ন্যায় ও দুর্বল মানুষের সুরক্ষার জন্য শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার নৈতিক দায়িত্ব।
শ্লোকে ব্যবহৃত বিশাং শব্দটি বিশ্ শব্দের বহুবচন রূপ। বৈদিক সাহিত্যে বিশ্ শব্দের সঙ্গে জনগোষ্ঠী ও সাধারণ সমাজের ধারণা যুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে এই ধারণা বৈশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। গীতার পরবর্তী শ্লোকে বৈশ্যের কর্ম হিসেবে কৃষি, গো রক্ষা এবং বাণিজ্যের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি, উৎপাদন, সম্পদ সৃষ্টি, বিনিময় এবং জীবিকার ধারাবাহিকতা নিহিত রয়েছে। একটি সমাজ কেবল জ্ঞান ও প্রশাসনের ওপর টিকে থাকতে পারে না। খাদ্য উৎপাদন, সম্পদ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সমাজের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য।
শূদ্রাণাং শব্দটি শূদ্রদের বোঝায়। শূদ্র শব্দটির নির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট ধাতু থেকে এর উৎপত্তি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। গীতার পরবর্তী শ্লোকে শূদ্রের স্বভাবজাত কর্মকে পরিচর্যাত্মক কর্ম বলা হয়েছে। অর্থাৎ সেবা ও কার্যসম্পাদনের সঙ্গে এর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। এখানে সেবাকে হীনতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাস্তব সমাজের প্রতিটি স্তরে সেবামূলক কাজ অপরিহার্য। একজন দক্ষ কারিগর, সেবাকর্মী, প্রযুক্তিবিদ, সহায়ক কর্মী কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী সমাজের কার্যক্রমকে বাস্তব রূপ দেন। তাই প্রতিটি কর্মের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ হলো পরন্তপ। পরন্তপ শব্দটি পর এবং তপের সমন্বয়ে গঠিত। পর অর্থ অন্য বা শত্রু এবং তপ শব্দটি তাপ দেওয়া বা দগ্ধ করার ধারণার সঙ্গে যুক্ত। সেই অর্থে পরন্তপ বলতে শত্রুকে দমনকারী বা শত্রুর শক্তিকে পরাভূতকারী বোঝায়। কৃষ্ণ অর্জুনকে এই নামে সম্বোধন করেছেন। এর মধ্যে কেবল প্রশংসা নেই, বরং অর্জুনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও কর্তব্যের প্রতি একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ভাবও রয়েছে। যে অর্জুন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখেন, তিনিই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের কর্তব্য নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন। তাই পরন্তপ সম্বোধনের মাধ্যমে কৃষ্ণ যেন তার প্রকৃতি ও দায়িত্বকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
কর্মাণি শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম কেন্দ্রীয় শব্দ। কর্ম শব্দটির মূল সংস্কৃত কৃ ধাতু, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কার্য সম্পন্ন করা। গীতায় কর্ম কেবল জীবিকার কাজ নয়। কর্মের মধ্যে আচরণ, কর্তব্য, কার্যকলাপ এবং নৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কাজের ধারণাও রয়েছে। মানুষের চিন্তা, সিদ্ধান্ত এবং কাজ তার জীবনকে গঠন করে। তাই কর্মের প্রকৃতি বোঝা মানে মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃতিকে বোঝা।
প্রবিভক্তানি শব্দের মধ্যে বিশেষভাবে পৃথক করা বা বিভিন্নভাবে বিন্যস্ত করার ধারণা রয়েছে। এই শব্দটি আমাদের বোঝায় যে সমাজে মানুষের কাজ একরকম নয়। প্রত্যেকের ক্ষমতা, প্রবণতা ও দায়িত্ব ভিন্ন হতে পারে। একটি শরীরের চোখ যা করে, হাত তা করে না এবং হাত যা করে, পা তা করে না। কিন্তু এই পার্থক্য কোনো অঙ্গকে অপ্রয়োজনীয় করে না। একইভাবে সমাজের বিভিন্ন কাজের মধ্যে কার্যগত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই পার্থক্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানবিক মর্যাদার উচ্চতা ও নীচতার সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শব্দগুলোর একটি হলো স্বভাব। স্বভাব শব্দটি স্ব এবং ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। স্ব অর্থ নিজের এবং ভাব শব্দটি হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়ার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই স্বভাবের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় নিজের হওয়ার প্রকৃতি। কিন্তু স্বভাব শুধু অভ্যাস নয়। মানুষের মানসিক প্রবণতা, চিন্তার ধরন, আগ্রহ, কর্মশক্তি, নৈতিক প্রবণতা এবং কোনো বিশেষ ধরনের কাজের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণকে বৃহত্তর অর্থে স্বভাবের মধ্যে ধরা যায়।
মানুষের জীবনে স্বভাবের গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ জ্ঞান অনুসন্ধানে আনন্দ পান, কেউ নেতৃত্ব দিতে স্বচ্ছন্দ, কেউ ব্যবসা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, কেউ আবার মানুষের সেবা ও বাস্তব কাজ সম্পাদনে অসাধারণ দক্ষতা দেখান। প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতি এক নয়। একজন মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে যে কাজ সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্য একজনের ক্ষেত্রে সেই কাজ হয়তো স্বাভাবিকভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। তাই নিজের স্বভাবকে বোঝা আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শ্লোকে স্বভাবের সঙ্গে প্রভব শব্দ যুক্ত হয়েছে। প্রভব শব্দের মধ্যে উৎপত্তি, উদ্ভব বা প্রকাশের ধারণা রয়েছে। স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ অর্থ হলো স্বভাব থেকে উৎপন্ন গুণ দ্বারা। এই অংশটি পুরো শ্লোকের দার্শনিক কেন্দ্র। এখানে গুণ শব্দটি সাধারণ অর্থে ভালো গুণ বোঝায় না। সাংখ্য ও গীতার দর্শনে গুণ বলতে প্রকৃতির তিন মৌলিক কার্যশক্তি সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃকে বোঝানো হয়। সত্ত্বের মধ্যে স্বচ্ছতা, জ্ঞান ও সাম্যের প্রবণতা রয়েছে। রজঃ গতিশীলতা, আকাঙ্ক্ষা ও কর্মপ্রবণতার সঙ্গে যুক্ত। তমঃ জড়তা, স্থবিরতা ও অজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই তিন গুণ বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বিভিন্ন অনুপাতে প্রকাশিত হয়। একজন মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও চিন্তার প্রবণতা বেশি হতে পারে। অন্য কারও মধ্যে কর্মশক্তি, সাহস ও নেতৃত্ব প্রবল হতে পারে। আবার কারও মধ্যে বাস্তব কাজ, সেবা বা কারিগরি দক্ষতা বেশি প্রকাশ পেতে পারে। এই ভিন্নতার ভিত্তিতে মানুষের কাজের ধরনও ভিন্ন হতে পারে। গীতার এই ধারণাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ব্যক্তিত্ব, প্রবণতা, আগ্রহ ও দক্ষতার ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যদিও এগুলো একেবারে অভিন্ন নয়।
এই দৃষ্টিতে শ্লোকটির একটি গভীর সূত্র হলো গুণ, স্বভাব এবং কর্মের সম্পর্ক। মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতি বিভিন্ন গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেই গুণের প্রকাশ থেকে তার স্বভাব গড়ে ওঠে এবং সেই স্বভাব তার কর্মপ্রবণতাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ মানুষের বাহ্যিক কাজের পেছনে একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক ও প্রকৃতিগত কাঠামো রয়েছে। এই কারণে গীতা কেবল মানুষকে কী কাজ করতে হবে তা বলছে না। বরং মানুষকে নিজের প্রকৃতি বুঝতে আহ্বান করছে।
এখানে জন্ম এবং স্বভাবের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক ভারতীয় সমাজে বর্ণ ধারণা বহু সময়ে জন্মভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কঠোর জাতিগত কাঠামো সৃষ্টি করেছে। কিন্তু গীতার এই শ্লোকে বিশেষভাবে স্বভাব এবং গুণের কথা বলা হয়েছে। গীতার অন্যত্র গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে বর্ণের কথা বলা হয়েছে। ফলে গীতার দার্শনিক বক্তব্যকে পরবর্তী ঐতিহাসিক জাতিভেদ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখা যথার্থ নয়। শ্লোকটির অভ্যন্তরীণ দর্শনে মানুষের প্রকৃতি, গুণ এবং কর্মের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থ আরও বিস্তৃত। ব্রাহ্মণকে জ্ঞানের শক্তি, ক্ষত্রিয়কে রক্ষার শক্তি, বৈশ্যকে উৎপাদন ও সম্পদ সৃষ্টির শক্তি এবং শূদ্রকে সেবা ও বাস্তব কার্যসম্পাদনের শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। একটি সুস্থ সমাজে এই চার ধরনের শক্তিই প্রয়োজন। জ্ঞান যদি থাকে কিন্তু তাকে রক্ষা করার সাহস না থাকে, তাহলে জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। শক্তি যদি থাকে কিন্তু জ্ঞান ও নৈতিকতা না থাকে, তাহলে শক্তি অত্যাচারে পরিণত হতে পারে। সম্পদ সৃষ্টি না হলে সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। আবার বাস্তব সেবা ও কার্যসম্পাদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকর হতে পারে না।
একটি হাসপাতালের উদাহরণ নিলে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। সেখানে গবেষক ও শিক্ষক জ্ঞান সৃষ্টি করেন। চিকিৎসক ও প্রশাসক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্ব দেন। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও কার্যক্রম সচল রাখে। নার্স, প্রযুক্তিবিদ এবং বিভিন্ন সহায়ক কর্মী দৈনন্দিন সেবাকে বাস্তব রূপ দেন। প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও পুরো ব্যবস্থাটি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিতে প্রবিভক্তানি শব্দটি বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং কার্যগত বৈচিত্র্যের ধারণা বহন করে।
অর্জুনের চরিত্রের সঙ্গে এই শ্লোকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অর্জুন একজন যোদ্ধা। যুদ্ধক্ষেত্রে তার সংকট ছিল কেবল যুদ্ধের ভয় নয়। তার সংকট ছিল কর্তব্য এবং ব্যক্তিগত আবেগের সংঘাত। তিনি নিজের কর্তব্য থেকে সরে যেতে চাইছিলেন। কৃষ্ণ তাকে বারবার তার প্রকৃতি, কর্তব্য এবং কর্মের দিকে ফিরিয়ে আনেন। তাই পরন্তপ সম্বোধন এবং স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ ধারণা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কৃষ্ণ অর্জুনকে তার অন্তর্নিহিত শক্তি ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো মানুষকে নিজের প্রকৃতি চিনতে হবে। অন্যের জীবন অনুকরণ করে নিজের কর্তব্য পালন করা সবসময় শ্রেয় নয়। নিজের শক্তি, প্রবণতা ও নৈতিক দায়িত্বকে উপলব্ধি করে কর্ম করা গীতার কর্মযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তবে নিজের স্বভাবকে অজুহাত বানিয়ে অন্যায় করা গীতার উদ্দেশ্য নয়। প্রকৃত স্বভাব উপলব্ধির সঙ্গে আত্মসংযম, জ্ঞান এবং ধর্মবোধ যুক্ত থাকা আবশ্যক।
এই কারণে গুণকে কেবল শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়। সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ মানবপ্রকৃতির বিভিন্ন কার্যকরী শক্তি। জ্ঞান ও স্বচ্ছতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কর্মশক্তি ও সাহসও প্রয়োজন। বিশ্রাম ও স্থিতিরও জীবনে ভূমিকা রয়েছে। সমস্যাটি তখনই তৈরি হয় যখন কোনো একটি প্রবণতা অজ্ঞতা, আসক্তি বা অসাম্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। গীতার দর্শন তাই মানুষের গুণকে চিনতে এবং ধীরে ধীরে তাদের অতিক্রম করে আত্মজ্ঞান অর্জনের পথও নির্দেশ করে।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো নিজের প্রকৃতিকে বোঝা। একজন মানুষকে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হতে পারে কোন কাজে তার স্বাভাবিক আগ্রহ, কোন কাজে তার দক্ষতা প্রকাশ পায়, কোন কাজ তাকে গভীর তৃপ্তি দেয় এবং কোন কাজ সমাজের জন্য তার শক্তিকে অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে পারে। নিজের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ জীবন দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে। তাই কর্মজীবন নির্বাচন শুধু অর্থ উপার্জনের প্রশ্ন নয়। এটি আত্মপরিচয় ও সামাজিক অবদানের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সবশেষে বলা যায়, “ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ। কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ” শ্লোকটি মানুষের বহুমাত্রিক প্রকৃতি এবং কর্মজীবনের একটি গভীর দর্শন প্রকাশ করে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এখানে চার ধরনের সামাজিক ও কার্যগত ভূমিকার কথা স্মরণ করায়। কিন্তু শ্লোকটির গভীরতম কেন্দ্র নিহিত রয়েছে স্বভাব, গুণ এবং কর্মের পারস্পরিক সম্পর্কে। মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতি তার কর্মপ্রবণতাকে প্রভাবিত করে এবং সঠিক আত্মজ্ঞান সেই কর্মকে ধর্ম ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারে। এই কারণে শ্লোকটি কেবল একটি প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থার বিবরণ নয়। এটি নিজের প্রকৃতিকে চেনা, নিজের কর্তব্য উপলব্ধি করা এবং সেই কর্তব্যকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে সম্পাদন করার এক গভীর আহ্বান। মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব কেবল সে কোন পরিচয়ে জন্মেছে তার মধ্যে নয়, বরং তার স্বভাবকে কতটা জ্ঞান, সংযম, ন্যায় এবং সেবার মাধ্যমে মহৎ কর্মে রূপান্তরিত করতে পেরেছে তার মধ্যেই নিহিত।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!