সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৪২ — শম, দম, জ্ঞান ও সরলতা: ব্রাহ্মণস্বভাবের অন্তর্গত গুণসমূহ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।৪২।।
শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।৪২।।

অনুবাদঃ শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য-এগুলি ব্রাহ্মণদের স্বভাবজাত কর্ম।

গবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের বিয়াল্লিশতম শ্লোকটি মানুষের অন্তর্গত চরিত্র নির্মাণের এক অসাধারণ দর্শন তুলে ধরে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন কিছু গুণের কথা বলেছেন, যেগুলো একজন জ্ঞানসন্ধানী, আত্মসংযমী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষের স্বভাবের পরিচয় বহন করে। শ্লোকটি হলো “শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ। জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।” অর্থাৎ শম, দম, তপস্যা, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং আস্তিক্য এই গুণসমূহ ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম। এই শ্লোককে শুধু একটি সামাজিক পরিচয়ের সংজ্ঞা হিসেবে দেখলে এর গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের অনেকটাই অনুধাবন করা যায় না। বরং এটি মানুষের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করে জ্ঞান ও সত্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবেও পাঠ করা যায়।

শ্লোকটির প্রথম শব্দ শম। সংস্কৃত শম শব্দটি শম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মূল অর্থ শান্ত হওয়া, প্রশমিত হওয়া এবং শান্ত করা। মানুষের জীবনে শম বলতে বাহ্যিক নীরবতা বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো মনের অস্থিরতা, কামনা, ক্রোধ, উদ্বেগ ও অশান্তিকে প্রশমিত করে অন্তরের মধ্যে একটি স্থিরতা প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে ছুটে বেড়ায়। কখনো অতীতের স্মৃতি তাকে অস্থির করে, কখনো ভবিষ্যতের আশঙ্কা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে এবং কখনো বর্তমানের আকাঙ্ক্ষা তাকে টেনে নিয়ে যায়। শম সেই অস্থিরতার মধ্যেও অন্তরের একটি স্থির কেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার শিক্ষা দেয়। যেমন বাতাসে উত্তাল জলাশয়ে কোনো প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায় না, কিন্তু বাতাস থেমে গেলে জল শান্ত হয় এবং তাতে আকাশের প্রতিচ্ছবি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তেমনি মন যখন শমের মাধ্যমে শান্ত হয় তখন মানুষের মধ্যে সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

এর পরেই এসেছে দম শব্দটি। দম শব্দটি দম্ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা, সংযত করা অথবা বশে আনা। শম ও দম পরস্পর ঘনিষ্ঠ হলেও তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। শম মূলত মনের প্রশমন এবং দম প্রধানত ইন্দ্রিয়ের সংযমকে নির্দেশ করে। মানুষের চোখ সুন্দর বস্তু দেখতে চায়, কান প্রশংসা শুনতে চায়, জিহ্বা সুস্বাদু খাবার চায় এবং শরীর আরাম চায়। এই আকর্ষণগুলোর প্রতি সচেতন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই দম। দম মানে ইন্দ্রিয়কে ধ্বংস করা নয় এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনকে অস্বীকার করাও নয়। বরং ইন্দ্রিয় যেন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করে এবং মানুষ যেন সচেতনভাবে ইন্দ্রিয়কে পরিচালনা করতে পারে সেটিই দমের মূল শিক্ষা। যেমন একটি শক্তিশালী ঘোড়াকে হত্যা না করে লাগাম দিয়ে সঠিক পথে চালানো হয়, তেমনি ইন্দ্রিয়ের শক্তিকেও সংযমের মাধ্যমে সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়।

তৃতীয় গুণ তপঃ। তপঃ শব্দটি তপ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মূল অর্থ উত্তাপ, তাপ দেওয়া বা উত্তপ্ত হওয়া। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় এই তাপ পরবর্তীকালে আত্মশাসন ও সাধনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। যেমন আগুনে উত্তপ্ত হয়ে সোনা তার অশুদ্ধতা দূর করে অধিক নির্মল হয়, তেমনি নিয়ম, সাধনা, আত্মসংযম এবং কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষের চরিত্র পরিশুদ্ধ হয়। তপস্যা বলতে তাই শুধু অরণ্যে গিয়ে কঠোর সাধনা করাকে বোঝায় না। একজন ছাত্র যখন আনন্দের পরিবর্তে অধ্যয়নকে বেছে নেয়, একজন কর্মী যখন অলসতার পরিবর্তে কর্তব্যকে বেছে নেয় এবং একজন সাধক যখন প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সাধনা অব্যাহত রাখেন, তখন প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তপস্যার একটি রূপ প্রকাশিত হয়। তপস্যার গভীর শিক্ষা হলো উচ্চতর উদ্দেশ্যের জন্য নিম্নতর আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা।

এরপর এসেছে শৌচ। শৌচের সঙ্গে সংস্কৃত শুচি শব্দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শুচি অর্থ নির্মল, পবিত্র ও পরিষ্কার। শৌচের বাহ্যিক অর্থ পরিচ্ছন্নতা হলেও এর গভীর অর্থ অনেক বিস্তৃত। শরীর পরিষ্কার রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জীবনযাপনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা বাহ্য শৌচের অন্তর্গত। কিন্তু অন্তরের শৌচ হলো চিন্তা, উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক প্রবণতাকে নির্মল করা। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন হলেও যদি তার অন্তর প্রতারণা, হিংসা, লোভ ও কপটতায় পূর্ণ থাকে, তবে প্রকৃত শৌচ সম্পূর্ণ হয় না। শৌচ তাই এমন এক অন্তর্নির্মলতার প্রতীক যার মধ্যে সত্য স্বচ্ছভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। পরিষ্কার আয়নায় যেমন মুখ স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি নির্মল চিত্তে সত্যও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

এরপর এসেছে ক্ষান্তি। ক্ষান্তি শব্দটি ক্ষম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে সহ্য করা, ক্ষমা করা ও সহিষ্ণুতার ভাব রয়েছে। ক্ষান্তি দুর্বলতার প্রতীক নয়। বরং এটি অন্তরের এক বিশেষ শক্তি। কেউ আমাদের অপমান করলে তার প্রতিশোধ নেওয়া সহজ, কিন্তু সেই অপমানকে নিজের চরিত্রকে কলুষিত করতে না দেওয়া অনেক কঠিন। ক্ষান্তি সেই শক্তির নাম যার মাধ্যমে মানুষ অন্যের ভুলের কারণে নিজের অন্তরকে বিষাক্ত হতে দেয় না। ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। বরং ক্ষমার গভীর অর্থ হলো প্রতিহিংসার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করা। যে ব্যক্তি প্রতিটি আঘাতের উত্তর আঘাত দিয়ে দিতে বাধ্য বোধ করে সে নিজের প্রতিক্রিয়ার দাস হয়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি পরিস্থিতিকে বুঝে, প্রয়োজনীয় ন্যায়বোধ বজায় রেখে এবং অন্তরে বিদ্বেষ জমিয়ে না রেখে এগিয়ে যেতে পারে, তার মধ্যে ক্ষান্তির শক্তি প্রকাশ পায়।

এরপর এসেছে আর্জব। আর্জব শব্দটি ঋজু শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঋজু অর্থ সোজা এবং বক্রতাহীন। চরিত্রের ক্ষেত্রে আর্জব অর্থ সরলতা, অকপটতা এবং কপটতাহীনতা। মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে যখন সামঞ্জস্য থাকে তখন তার চরিত্রে আর্জব প্রকাশ পায়। মনে এক কথা রেখে মুখে অন্য কথা বলা এবং কাজে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করা আর্জবের বিপরীত। আর্জব আমাদের শেখায় নিজের কাছে সত্য থাকতে। পৃথিবীর অন্য সবাইকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও নিজের অন্তরকে দীর্ঘদিন ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আর্জব শুধু সামাজিক সততার গুণ নয়, এটি আত্মসততারও গুণ।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞান ও বিজ্ঞান এই দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। জ্ঞান শব্দটি জ্ঞা ধাতু থেকে এসেছে এবং এর মূল অর্থ জানা, বোঝা ও উপলব্ধি করা। কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে জ্ঞান কেবল তথ্য সংগ্রহের নাম নয়। আত্মা, প্রকৃতি, কর্ম, ধর্ম, নিত্য ও অনিত্য এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাত্ত্বিক উপলব্ধিও জ্ঞানের অন্তর্গত। একজন মানুষ অনেক বই পড়ে অনেক তথ্য জানতে পারেন, কিন্তু সেই তথ্য তার জীবনকে পরিবর্তন না করলে সেই জ্ঞান এখনও বাহ্যিক স্তরে অবস্থান করে।

এই কারণে জ্ঞানের সঙ্গে এসেছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান শব্দটি বিশেষভাবে জ্ঞান বা বিশিষ্ট জ্ঞানের ধারণা বহন করে। এখানে আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান বা সায়েন্স বোঝানো হয় না। সংস্কৃত বিজ্ঞান শব্দের অর্থ প্রসঙ্গ অনুযায়ী বিশেষ জ্ঞান, বিশদ জ্ঞান অথবা উপলব্ধ জ্ঞান হতে পারে। একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, কেউ যদি জানে যে মধু মিষ্টি তাহলে সেটি জ্ঞান। কিন্তু মধুর স্বাদ নিজে অনুভব করা সেই জ্ঞানের প্রত্যক্ষ উপলব্ধির মতো। একইভাবে আত্মা অবিনশ্বর এই কথা শোনা ও জানা জ্ঞান হতে পারে, কিন্তু সেই সত্যকে নিজের অস্তিত্বের গভীরে উপলব্ধি করা বিজ্ঞানের দিকে অগ্রসর হওয়া। এই কারণে জ্ঞান মানুষের বুদ্ধিকে আলোকিত করে এবং বিজ্ঞান সেই আলোকে জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে।

শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো আস্তিক্য। আস্তিক্য শব্দটি আস্তিকের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর গভীরে রয়েছে অস্তিত্বের স্বীকৃতির ধারণা। সংস্কৃত অস্তি অর্থ আছে বা বিদ্যমান। ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আস্তিক শব্দের অর্থের ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও এটি বেদস্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত, কোথাও পরলোক বা অদৃশ্য বাস্তবতার স্বীকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। গীতার এই প্রসঙ্গে আস্তিক্যকে কেবল অন্ধভাবে ঈশ্বরে বিশ্বাস করা হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যথাযথ নয়। বরং এর মধ্যে উচ্চতর সত্য, নৈতিক বাস্তবতা, আত্মা, ধর্ম অথবা পরম অস্তিত্বের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের একটি গভীর ভাব রয়েছে। সত্যসন্ধানী মানুষ কখনো কখনো বলতে পারেন যে তিনি সবকিছু জানেন না। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করতে পারেন যে সত্য অনুসন্ধানযোগ্য এবং দৃশ্যমান জগতের গভীরে আরও কোনো অর্থ বা বাস্তবতা থাকতে পারে। এই অনুসন্ধানী আস্থাও আস্তিক্যের গভীর অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শ্লোকটির শেষাংশ হলো ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্। এখানে ব্রহ্মকর্ম বলতে প্রসঙ্গ অনুযায়ী ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম বোঝানো হয় এবং স্বভাবজ অর্থ নিজের স্বভাব বা প্রকৃতি থেকে জন্ম নেওয়া। এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শ্রীকৃষ্ণ এখানে কেবল কিছু বাহ্যিক নিয়মের তালিকা দিচ্ছেন না। তিনি এমন একটি চরিত্রের কথা বলছেন যার অন্তর্গত প্রকৃতি জ্ঞান, সংযম, শুচিতা, সরলতা ও সত্যসন্ধানের দিকে প্রবণ। অর্থাৎ কোনো গুণকে শুধু বাহ্যিকভাবে অনুশীলন করাই যথেষ্ট নয়। সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সেই গুণগুলি মানুষের চরিত্রের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠা।

এই দৃষ্টিতে পুরো শ্লোকটি একটি অন্তর্গত বিকাশের ধারাও নির্দেশ করে। প্রথমে মনকে শান্ত করতে হবে, তারপর ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে হবে। এরপর আত্মশাসনের মাধ্যমে জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে এবং শৌচের মাধ্যমে অন্তরকে নির্মল করতে হবে। ক্ষান্তির মাধ্যমে প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং আর্জবের মাধ্যমে চিন্তা, বাক্য ও কর্মের মধ্যে সত্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তারপর জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং সেই জ্ঞানকে গভীর উপলব্ধিতে রূপান্তর করতে হবে। সবশেষে উচ্চতর সত্যের প্রতি আস্থা নিয়ে সেই উপলব্ধিকে জীবনের স্বাভাবিক চরিত্রে পরিণত করতে হবে। এই কারণে শ্লোকটি শুধু কয়েকটি গুণের তালিকা নয়, বরং মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির একটি সুন্দর পথরেখা।

আধুনিক জীবনেও এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত গভীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দম আমাদের শেখায় প্রতিটি উত্তেজক কথার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দিতে। মানসিক অস্থিরতার যুগে শম আমাদের শেখায় প্রতিটি চিন্তার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম না করতে। প্রতিযোগিতামূলক জীবনে তপঃ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য আত্মশাসন প্রয়োজন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে ক্ষান্তি আমাদের শেখায় প্রতিটি ভুলের প্রতিশোধ নেওয়া অপরিহার্য নয়। কর্মক্ষেত্রে আর্জব শেখায় কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা উচিত। শিক্ষা আমাদের জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞান সেই জ্ঞানকে জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে। আর আস্তিক্য মানুষের জীবনে একটি বৃহত্তর অর্থের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।

দার্শনিকভাবে দেখলে এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত উন্নতি বাহ্যিক অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধন, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষের বাহ্যিক অবস্থাকে পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু চরিত্রের নির্মলতা, মনের শান্তি, ইন্দ্রিয়সংযম, ক্ষমাশীলতা, সরলতা এবং সত্যের উপলব্ধি মানুষের অন্তর্গত অবস্থাকে পরিবর্তন করে। একজন মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার কত কিছু আছে তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে সে নিজের মনকে কতটা পরিচালনা করতে পারে এবং সত্যের সামনে কতটা নির্মল থাকতে পারে তার উপর।

এই শ্লোককে একটি আয়নার উপমায়ও বোঝা যায়। অশান্ত মন যেন বাতাসে কাঁপতে থাকা জল। সেখানে সত্যের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয় না। অসংযত ইন্দ্রিয় সেই জলে আরও তরঙ্গ সৃষ্টি করে। তপস্যা সেই তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে। শৌচ জলের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনে। ক্ষান্তি বিষাক্ত আবেগকে দূর করে। আর্জব আয়নাকে বাঁকা হতে দেয় না। জ্ঞান মানুষকে বলে কী দেখতে হবে এবং বিজ্ঞান তাকে সেই সত্য সরাসরি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আস্তিক্য তাকে বিশ্বাস দেয় যে এই অনুসন্ধানের একটি গভীর অর্থ আছে। তখন মানুষের কর্ম আর কেবল বাহ্যিক কর্তব্য থাকে না, তা তার অন্তরের স্বভাবের প্রকাশ হয়ে ওঠে।

সবশেষে বলা যায়, “শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ। জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্” শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জীবনের এক অসাধারণ দর্শন। শম আমাদের মনকে শান্ত করে, দম ইন্দ্রিয়কে সংযত করে, তপস্যা চরিত্রকে শক্ত করে, শৌচ অন্তরকে নির্মল করে, ক্ষান্তি হৃদয়কে প্রশস্ত করে, আর্জব চরিত্রকে সত্যনিষ্ঠ করে, জ্ঞান বুদ্ধিকে আলোকিত করে, বিজ্ঞান সেই জ্ঞানকে জীবন্ত উপলব্ধিতে পরিণত করে এবং আস্তিক্য মানুষকে উচ্চতর সত্যের প্রতি আস্থাশীল করে। এই সমস্ত গুণ যখন কৃত্রিম অনুশীলনের সীমা অতিক্রম করে মানুষের স্বভাবের স্বাভাবিক প্রকাশ হয়ে ওঠে, তখন তার জীবন জ্ঞান, সত্য ও আত্মসংযমের পথে অগ্রসর হয়। তাই এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তার জন্মপরিচয়ে নয়, বরং তার চরিত্রের নির্মলতা, জ্ঞানের গভীরতা, আত্মসংযম এবং সত্যের প্রতি তার আন্তরিক অনুসন্ধানে। একজন মানুষ যখন নিজের মনকে শান্ত করতে শেখে, ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, অন্যকে ক্ষমা করতে শেখে, নিজের সঙ্গে সত্য থাকতে শেখে এবং জ্ঞানকে জীবন্ত উপলব্ধিতে রূপান্তর করতে শেখে, তখন তার জীবন ধীরে ধীরে বাহ্যিক সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।:

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি