ভগবদ্গীতা ১৮.৪৫ — নিজ কর্মে নিষ্ঠা ও আত্মোন্নতি: কর্মের মধ্য দিয়ে সিদ্ধিলাভের পথ
স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ।
স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু।।৪৫।।
অনুবাদঃ নিজ নিজ কর্মে নিরত মানুষ সিদ্ধি লাভ করে থাকে। স্বীয় কর্মে যুক্ত মানুষ যেভাবে সিদ্ধি লাভ করে, তা শ্রবণ কর।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের পঁয়তাল্লিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানবজীবনের কর্ম, কর্তব্য, নিষ্ঠা এবং পরিপূর্ণতার মধ্যে এক গভীর সম্পর্কের কথা বলেছেন। শ্লোকটি হলো স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ। স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু।। এর সহজ অর্থ হলো মানুষ নিজ নিজ কর্মে গভীরভাবে নিবিষ্ট থেকে পরিপূর্ণ সিদ্ধি লাভ করে। নিজের কর্মে নিবিষ্ট হয়ে মানুষ কীভাবে সেই সিদ্ধি অর্জন করে তা শোনো। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানবজীবনের উদ্দেশ্য, কর্মের মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং আত্মোন্নতির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো স্বে স্বে। সংস্কৃত স্ব শব্দের অর্থ নিজের, নিজস্ব বা আপন। স্বে স্বে বলতে বোঝায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে বা প্রত্যেকে নিজের নিজের অবস্থানে। এই পুনরুক্তির মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। মানুষ একে অপরের মতো নয়। প্রত্যেকের স্বভাব, যোগ্যতা, প্রবণতা, ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং জীবন পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই প্রত্যেকের জীবনপথও একই রকম হতে পারে না। কৃষ্ণ এখানে সকল মানুষকে একই ধরনের কর্ম করতে বলেননি। বরং প্রত্যেককে নিজের প্রকৃতি ও কর্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার শিক্ষা দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য এবং নিজের জীবনপথকে গ্রহণ করার এক গভীর দার্শনিক আহ্বান রয়েছে।
এরপর এসেছে কর্মণি শব্দটি। কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে। কৃ ধাতুর মূল অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কার্য সম্পন্ন করা। কর্মণি শব্দের অর্থ কর্মে, কর্তব্যে অথবা কর্মের মধ্যে। কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে কর্ম বলতে শুধু জীবিকা বা পেশাগত কাজ বোঝালে এর গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। কর্মের মধ্যে মানুষের কর্তব্য, দায়িত্ব, স্বভাবজাত প্রবণতা এবং জীবনের বাস্তব ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষ যে কাজের মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং সমাজ ও জীবনের বৃহত্তর ব্যবস্থায় অবদান রাখে, সেই কাজই তার কর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
এরপর এসেছে অভিরত শব্দটি। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কৃষ্ণ শুধু কর্ম করার কথা বলেননি। তিনি কর্মে অভিরত হওয়ার কথা বলেছেন। অভিরত শব্দের মধ্যে গভীরভাবে নিবিষ্ট হওয়া, অনুরক্ত হওয়া, আনন্দের সঙ্গে কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং সেই কাজের মধ্যে মনকে স্থাপন করার ভাব রয়েছে। একজন মানুষ কোনো কাজ করতে পারে বাধ্য হয়ে এবং আরেকজন একই কাজ করতে পারে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে। বাহ্যিকভাবে তাদের কাজ একই হলেও অন্তরের অবস্থার দিক থেকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিরত হওয়া মানে কেবল কাজ সম্পন্ন করা নয়। এর অর্থ হলো নিজের চেতনা, মনোযোগ এবং আন্তরিকতাকে কর্মের সঙ্গে যুক্ত করা।
এই অবস্থান থেকেই আসে সংসিদ্ধি শব্দটি। সংসিদ্ধি গঠিত হয়েছে সম্ এবং সিদ্ধি ভাব থেকে। সিদ্ধি শব্দের মূলের মধ্যে রয়েছে সিদ্ধ হওয়া, সম্পন্ন হওয়া, সফল হওয়া এবং পূর্ণতা লাভ করার ধারণা। সম্ উপসর্গ সেই পূর্ণতার ভাবকে আরও গভীর করে। তাই সংসিদ্ধি বলতে শুধু বাহ্যিক সাফল্য বোঝানো যথেষ্ট নয়। এটি এমন এক পরিপূর্ণতার ধারণা যেখানে মানুষের কর্ম তার চরিত্র, চেতনা এবং জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে একটি গভীর সামঞ্জস্য লাভ করে। অর্থাৎ গীতার সিদ্ধি কেবল অর্থ, খ্যাতি, পদ বা সামাজিক সাফল্য নয়। সিদ্ধি হলো নিজের কর্মকে যথার্থভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে অন্তরের বিকাশ এবং জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
লভতে শব্দটি এসেছে লাভ বা প্রাপ্তির ধারণা থেকে। মানুষ সংসিদ্ধি লাভ করে। কিন্তু এখানে লাভ শব্দটির অর্থ কোনো বস্তু অর্জন করার মতো সরল নয়। সিদ্ধি এমন কোনো বাহ্যিক সম্পদ নয় যা বাজার থেকে কেনা যায়। এটি কর্মের মধ্যে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। নিষ্ঠা, আত্মসংযম, সততা, দক্ষতা এবং কর্তব্যবোধের মাধ্যমে মানুষের চেতনা পরিণত হয়। তাই সিদ্ধি এক অর্থে কর্মের ফল হলেও তার গভীরতর অর্থ হলো কর্মের মাধ্যমে কর্তার নিজের রূপান্তর।
শ্লোকে নরঃ শব্দটি মানুষের প্রতি নির্দেশ করে। অর্থাৎ এই শিক্ষা কেবল কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য নয়। মানুষের জীবনের সঙ্গে কর্ম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কেউ শিক্ষক, কেউ কৃষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ শিল্পী, কেউ গবেষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ গৃহস্থ এবং কেউ সমাজসেবক। প্রত্যেকের কাজের বাহ্যিক রূপ আলাদা হলেও প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ সত্য প্রযোজ্য। নিজের কর্মকে যদি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে সম্পাদন করা যায়, তাহলে সেই কর্মই আত্মোন্নতির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় অংশে এসেছে স্বকর্মনিরতঃ শব্দটি। স্বকর্ম অর্থ নিজের কর্ম এবং নিরত অর্থ কোনো কাজে সম্পূর্ণভাবে নিযুক্ত বা নিমগ্ন। স্বকর্মনিরতঃ তাই এমন একজন মানুষকে নির্দেশ করে যিনি নিজের কর্তব্যের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষকে অন্যের জীবন অনুকরণ করে নিজের মূল্য নির্ধারণ করতে বলা হয়নি। বরং নিজের কর্মকে উপলব্ধি করে তার মধ্যে উৎকর্ষ সাধন করতে বলা হয়েছে। অন্যের বাহ্যিক সাফল্যের দিকে তাকিয়ে নিজের কাজকে তুচ্ছ মনে করা মানুষের অন্তরের শক্তিকে দুর্বল করে। নিজের কর্মের মর্যাদা উপলব্ধি করে সেটিকে যথাসম্ভব উৎকৃষ্টভাবে সম্পন্ন করাই গীতার এই শিক্ষার অন্যতম দিক।
সিদ্ধি শব্দটি শ্লোকে আবার এসেছে। এর পুনরাবৃত্তি বোঝায় যে কর্মের উদ্দেশ্য শুধু বাহ্যিক ফল অর্জন নয়। কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের একটি বৃহত্তর পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। আধুনিক জীবনে আমরা সাধারণত সাফল্যকে অর্থ, পদ, জনপ্রিয়তা, পুরস্কার এবং সামাজিক মর্যাদার মাধ্যমে বিচার করি। কিন্তু গীতার সিদ্ধির ধারণা তার চেয়ে অনেক গভীর। একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে খুব বেশি সাফল্য না পেলেও যদি সে নিজের কর্তব্য সততার সঙ্গে পালন করে, নিজের চরিত্রকে উন্নত করে এবং নিজের অন্তরের শক্তিকে বিকশিত করে, তবে সে গভীর অর্থে সিদ্ধির পথে অগ্রসর হতে পারে।
যথা শব্দের অর্থ যেভাবে বা যে উপায়ে। আর বিন্দতি অর্থ লাভ করে, অর্জন করে বা উপলব্ধি করে। তচ্ছৃণু অর্থ তা শোনো। অর্থাৎ কৃষ্ণ প্রথমে একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন যে মানুষ নিজের কর্মে নিবিষ্ট হয়ে সিদ্ধি লাভ করতে পারে। এরপর তিনি সেই সিদ্ধি অর্জনের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করার জন্য শ্রোতাকে প্রস্তুত করছেন। এর পরবর্তী শ্লোকেই তিনি বলেন যে মানুষ নিজের কর্মের মাধ্যমে সেই পরম সত্যের উপাসনা করতে পারে যাঁর কাছ থেকে সমস্ত জীবের উৎপত্তি এবং যিনি সমগ্র জগতকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন। ফলে অষ্টাদশ অধ্যায়ের এই অংশে কর্ম কেবল সামাজিক কর্তব্য নয় বরং আধ্যাত্মিক সাধনার রূপ লাভ করে।
এই শ্লোকের দার্শনিক গুরুত্ব এখানেই যে এটি কর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ স্থাপন করে না। সাধারণ ধারণায় মনে হতে পারে যে আধ্যাত্মিকতার জন্য সংসার ও কর্ম ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু গীতার কর্মযোগের শিক্ষা অনেক গভীর। এখানে কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে কর্মকে শুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। মানুষ যে কাজের মধ্যে রয়েছে, সেই কাজের মধ্যেই যদি সে কর্তব্যবোধ, সততা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ঈশ্বরচেতনা নিয়ে কাজ করতে পারে, তাহলে সেই কর্মই তার আত্মোন্নতির পথ হয়ে উঠতে পারে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে কর্ম মানুষের চিত্তকে শুদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কর্ম নিজে চূড়ান্ত আত্মজ্ঞান নয়, কিন্তু নিষ্কাম ও কর্তব্যনিষ্ঠ কর্ম মানুষের অন্তরকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে পারে যাতে সে আত্মসত্য উপলব্ধির যোগ্য হয়। এই দৃষ্টিতে স্বকর্মের যথাযথ সাধনা চিত্তশুদ্ধির পথ। আর চিত্তশুদ্ধি জ্ঞানপ্রাপ্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে ভক্তির দৃষ্টিতে নিজের কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদন করা যায়। তখন কর্ম শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম থাকে না। তা হয়ে ওঠে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত সেবা। একই কাজ তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন আধ্যাত্মিক অর্থ লাভ করে।
স্বকর্মকে কেবল আধুনিক অর্থে চাকরি বা পেশা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গীতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্বকর্ম মানুষের স্বভাব, যোগ্যতা, প্রবণতা এবং কর্তব্যের সঙ্গে যুক্ত। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষা দেওয়াকে শুধু বেতন পাওয়ার উপায় হিসেবে দেখেন, তাহলে তার কর্মের একটি সীমিত অর্থ থাকে। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন যে জ্ঞান বিতরণ তার কর্তব্য এবং সেই কাজের মাধ্যমে তিনি মানুষের জীবনকে উন্নত করতে পারেন, তাহলে একই কর্ম গভীর অর্থ লাভ করে। একজন চিকিৎসক যদি চিকিৎসাকে শুধু পেশা হিসেবে দেখেন, তার অভিজ্ঞতা একরকম। কিন্তু রোগীর সেবাকে যদি মানবিক কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন, তাহলে তার কর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়।
এই কারণেই অভিরত শব্দটি এত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে কর্মের প্রতি মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিল্পী যখন শিল্প সৃষ্টি করেন, একজন কৃষক যখন জমি চাষ করেন, একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে শিক্ষা দেন কিংবা একজন গবেষক যখন সত্য অনুসন্ধান করেন, তখন তাদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা। কিন্তু প্রত্যেকে যদি নিজের কর্মের মধ্যে সম্পূর্ণ মনোযোগ, নিষ্ঠা এবং সততা স্থাপন করেন, তাহলে তাদের কর্ম আত্মবিকাশের পথ হয়ে উঠতে পারে। কর্ম তখন শুধু ফল উৎপাদন করে না। কর্ম কর্তার চরিত্রও নির্মাণ করে।
এই শ্লোকের একটি সুন্দর প্রতীকী অর্থ পাওয়া যায় কৃষকের উপমায়। প্রত্যেক মানুষের জীবন যেন একটি নিজস্ব ক্ষেত্র। অন্যের ক্ষেত্র কত উর্বর, অন্যের ফসল কত সুন্দর অথবা অন্যের জীবন কত সফল তা দেখে নিজের ক্ষেত্রের যত্ন না নিলে নিজের জমি অনাবাদি থেকে যায়। কিন্তু নিজের জমিতে যত্ন নিয়ে বীজ বপন করা, নিয়মিত পরিচর্যা করা এবং ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা হলে একদিন ফসল আসে। তেমনই মানুষের নিজের কর্মক্ষেত্রেও নিষ্ঠা, ধৈর্য এবং সাধনার প্রয়োজন। অন্যের জীবন অনুকরণ করে নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করার মধ্যে পরিপূর্ণতা নেই। নিজের সামর্থ্যকে উপলব্ধি করে নিজের পথকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সত্যিকারের বিকাশ।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক দিকও গভীর। মানুষ যখন নিজের কর্মকে অর্থপূর্ণ বলে অনুভব করে, তখন তার কাজের সঙ্গে আত্মপরিচয়ের একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে শুধু কাজ সম্পন্ন করে না, কাজের মাধ্যমে নিজেকেও নির্মাণ করে। নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ নির্বাচন করা, সেই কাজে দক্ষতা অর্জন করা, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ধীরে ধীরে উৎকর্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানুষের আত্মবিশ্বাস ও অন্তর্গত শক্তিকে বৃদ্ধি করতে পারে। এই অর্থে স্বকর্ম শুধু বাহ্যিক দায়িত্ব নয়। এটি আত্মপরিচয় নির্মাণেরও একটি ক্ষেত্র।
সিদ্ধি এবং সাধারণ সাফল্যের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ সাফল্য বাইরের চোখে দৃশ্যমান। কেউ কত অর্থ উপার্জন করেছে, কত বড় পদ পেয়েছে বা কত জনপ্রিয় হয়েছে তা সহজেই মাপা যায়। কিন্তু সিদ্ধি অনেক বেশি অন্তর্গত। একজন মানুষ নিজের কাজের মধ্যে কতটা সততা অর্জন করেছে, কতটা আত্মসংযমী হয়েছে, কতটা দক্ষ হয়েছে, কতটা মানবিক হয়েছে এবং নিজের কর্তব্য পালনের মাধ্যমে কতটা পরিণত হয়েছে তা বাহ্যিক পরিমাপে ধরা যায় না। তাই গীতার সিদ্ধি মানুষের অন্তরের পরিপূর্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই শ্লোক আমাদের তুলনার প্রবণতা সম্পর্কেও গভীর শিক্ষা দেয়। আধুনিক জীবনে মানুষ প্রায়ই অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে বিচার করে। একজনের অর্থ আছে, অন্যজনের খ্যাতি আছে, কেউ দ্রুত সফল হয়েছে, কেউ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এই তুলনা মানুষের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। গীতার স্বে স্বে কর্মণি ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রত্যেক মানুষের পথ আলাদা। অন্যের পথের বাহ্যিক ফল দেখে নিজের পথকে মূল্যহীন মনে করা উচিত নয়। নিজের কর্মকে যত্ন, নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে সম্পন্ন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই শিক্ষা স্থবিরতার শিক্ষা নয়। স্বকর্মের অর্থ এমন কোনো অবস্থাকে আঁকড়ে থাকা নয় যা মানুষের প্রকৃতি, বিবেক বা উন্নতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং নিজের প্রকৃত ক্ষমতা, প্রবণতা এবং কর্তব্যকে চিনে তাকে উৎকর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়াই এর গভীর উদ্দেশ্য। নিজের কর্মকে ভালোভাবে করা মানে নিজের মধ্যে থাকা সম্ভাবনাকে বিকশিত করা। তাই স্বকর্ম আত্মপরিচয়েরও একটি অনুসন্ধান।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতার এই শ্লোক মানুষের সামনে কর্মকে নতুনভাবে দেখার একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। কাজ শুধু জীবিকা নয়, কাজ চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্র। কাজ শুধু ফল পাওয়ার উপায় নয়, কাজ আত্মোন্নতির মাধ্যম। নিজের কর্ম শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, তা আধ্যাত্মিক সাধনাতেও পরিণত হতে পারে। স্বে স্বে আমাদের নিজের পথের কথা মনে করিয়ে দেয়। কর্মণি আমাদের কর্তব্যের কথা স্মরণ করায়। অভিরতঃ আমাদের নিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। স্বকর্মনিরতঃ আমাদের নিজের কর্মের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হতে আহ্বান জানায়। আর সিদ্ধি ও সংসিদ্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নিষ্ঠাপূর্ণ কর্মের চূড়ান্ত মূল্য শুধু বাহ্যিক সাফল্যে নয়, মানুষের অন্তর্গত পরিপূর্ণতায়।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা তাই হলো মানুষকে অন্য কারও মতো হওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি নিজস্ব ক্ষেত্র রয়েছে, একটি নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে এবং নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার একটি নিজস্ব পথ রয়েছে। সেই পথকে অবহেলা না করে যদি মানুষ নিজের কর্মকে সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা এবং আত্মনিবেদনের সঙ্গে সম্পন্ন করে, তাহলে সাধারণ কর্মও ধীরে ধীরে সাধনায় পরিণত হয়। আর যখন কর্ম সাধনায় পরিণত হয়, তখন জীবনের প্রতিটি দায়িত্বই আত্মোন্নতির একটি সুযোগ হয়ে ওঠে। এই অর্থেই ভগবদ্গীতার শিক্ষা আমাদের বলে যে সিদ্ধি কোনো দূরের রহস্যময় অর্জন নয়। নিজের কর্তব্যকে গভীরভাবে গ্রহণ করে, নিজের কর্মকে শুদ্ধ করে এবং সেই কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের অন্তরকে পরিণত করাই সিদ্ধির পথে মানুষের প্রকৃত যাত্রা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!