সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৪৮ — স্বভাবজাত কর্ম ত্যাগ না করার শিক্ষা: ধোঁয়ায় আবৃত আগুনের উপমা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ।সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।৪৮।।
সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ।
সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।৪৮।।

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! সহজাত কর্ম দোষযুক্ত হলেও ত্যাগ করা উচিত নয়। যেহেতু অগ্নি যেমন ধূমের দ্বারা আবৃত থাকে, তেমনই সমস্ত কর্মই দোষের দ্বারা আবৃত থাকে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের আটচল্লিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেত্। সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ। অর্থাৎ হে কৌন্তেয়, নিজের স্বভাবজাত কর্ম ত্রুটিযুক্ত হলেও তা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ সমস্ত কর্মের সূচনাই কোনো না কোনো দোষ দ্বারা আবৃত থাকে, যেমন আগুন ধোঁয়া দ্বারা আবৃত থাকে। এই শ্লোকটি মানুষের কর্তব্য, স্বভাব, কর্ম, অপূর্ণতা এবং আত্মোন্নতির সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। বিশেষ করে সহজং কর্ম এই পদবন্ধটি গীতার কর্মদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এখানে সহজ শব্দটির অর্থ আধুনিক বাংলায় প্রচলিত সরল বা কঠিন নয় এমন অর্থে গ্রহণ করলে শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য ধরা যায় না। সংস্কৃত সহজ শব্দের মূল ভাব হলো যা জন্মের সঙ্গে এসেছে, যা স্বভাবজাত, যা মানুষের প্রকৃতি ও প্রবণতার সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত। তাই সহজং কর্ম বলতে সহজ বা সাধারণ কর্ম নয়, বরং মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকে বোঝানো হয়েছে।

সহজ শব্দটির ভাষাগত উৎপত্তি সংস্কৃত সহ এবং জন ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। সহ অর্থ সঙ্গে এবং জন ধাতুর অর্থ জন্ম নেওয়া বা উৎপন্ন হওয়া। এই দৃষ্টিতে সহজের মৌলিক অর্থ হলো যা জন্মের সঙ্গে এসেছে বা যা স্বভাবতই মানুষের মধ্যে অবস্থান করে। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় সহজ শব্দটি সরল, অনায়াস এবং জটিলতাহীন অর্থেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু গীতার এই শ্লোকে সহজ শব্দটি সেই অর্থে ব্যবহৃত নয়। এখানে এর অর্থ সহজাত বা স্বভাবজাত। একইভাবে কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত। কৃ অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কার্য সম্পন্ন করা। সেই অর্থে কর্ম হলো যা করা হয়। কিন্তু গীতার পরিভাষায় কর্ম কেবল বাহ্যিক কাজ নয়। কর্মের মধ্যে কর্তব্য, দায়িত্ব, আচরণ, সিদ্ধান্ত, উদ্দেশ্য এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে সহজং কর্মের গভীর অর্থ দাঁড়ায় এমন কর্ম যা ব্যক্তির স্বভাব, প্রকৃতি, ক্ষমতা এবং কর্তব্যের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে সম্পর্কিত।

এই শ্লোকে কৌন্তেয় শব্দটিরও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কৌন্তেয় অর্থ কুন্তীর পুত্র। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর মাতৃপরিচয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে যেন তাঁর নিজস্ব পরিচয়, দায়িত্ব এবং অবস্থানের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন। অর্জুন তখন গভীর নৈতিক দ্বন্দ্বে আক্রান্ত। নিজের আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক এবং প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে বলে তাঁর মনে কর্মত্যাগের প্রবল আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বোঝাচ্ছেন যে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া সমস্যার প্রকৃত সমাধান নয়। মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি আসে যখন নিজের কর্তব্য কঠিন হয়ে ওঠে এবং তার সঙ্গে কষ্ট, দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়। কিন্তু সেই কারণে কর্তব্য থেকে সম্পূর্ণ সরে যাওয়া সবসময় সঠিক পথ নয়।

শ্লোকের সদোষমপি পদটি এই বক্তব্যকে আরও গভীর করে। সদোষ অর্থ দোষযুক্ত এবং অপি অর্থ যদিও বা এমনকি। অর্থাৎ নিজের স্বভাবজাত কর্মের মধ্যেও ত্রুটি থাকতে পারে। এখানে গীতা মানবজীবনের একটি অত্যন্ত বাস্তব সত্যকে স্বীকার করেছে। মানুষ যা কিছু করে তা সবসময় সম্পূর্ণ নিখুঁত হয় না। মানুষের জ্ঞান সীমিত, ক্ষমতা সীমিত, পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল এবং কর্মের ফল বহু উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো কর্মপথই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে নিখুঁত কর্মের অপেক্ষায় থাকা মানুষকে কর্মবিমুখ করে তুলতে পারে। গীতা তাই বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে শিক্ষা দেয় যে দোষ থাকা মানেই কর্ম পরিত্যাগ করার কারণ নয়।

ন ত্যজেত্ শব্দবন্ধটি এই শিক্ষার মূল নির্দেশ বহন করে। ত্যজ ধাতুর অর্থ ত্যাগ করা বা পরিত্যাগ করা। ন ত্যজেত্ অর্থ ত্যাগ করা উচিত নয়। এখানে কর্মত্যাগ এবং কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গীতা মানুষকে কর্মহীন হতে বলছে না। বরং কর্মের ফলের প্রতি অহংকার ও আসক্তি পরিত্যাগ করে কর্তব্য পালন করতে বলছে। একজন মানুষ নিজের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধতা দেখতে পেয়ে যদি কাজটিই ছেড়ে দেয়, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করে। কিন্তু যদি সে নিজের কাজের ত্রুটিগুলো উপলব্ধি করে সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করে এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে কর্তব্য পালন করে, তখন সেই কর্মই আত্মোন্নতির পথ হয়ে উঠতে পারে।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ যে উপমাটি দিয়েছেন তা শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর ও গভীর অংশ। তিনি বলেছেন, সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ। অর্থাৎ সকল কর্মারম্ভই দোষ দ্বারা আবৃত থাকে, যেমন আগুন ধোঁয়া দ্বারা আবৃত থাকে। এখানে অগ্নি মানুষের কর্মশক্তি, জ্ঞান, কর্তব্যবোধ এবং সৃষ্টিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে ধোঁয়া হলো কর্মের সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি, অপূর্ণতা এবং অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রতীক। আগুন জ্বললে ধোঁয়া সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু ধোঁয়া আছে বলে আগুনকে অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে কোনো কর্মে ত্রুটি আছে বলেই সেই কর্মের অন্তর্নিহিত মূল্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না।

এই উপমার মধ্যে মানবজীবনের একটি গভীর সত্য নিহিত আছে। পৃথিবীতে এমন কোনো কাজ নেই যা সব দিক থেকে সম্পূর্ণ নিখুঁত। একজন শিক্ষক যতই দক্ষ হন, সব ছাত্রকে একইভাবে সফল করতে পারেন না। একজন চিকিৎসক যতই যত্নবান হন, সব রোগীকে একইভাবে সুস্থ করতে পারেন না। একজন অভিভাবক যতই সচেতন হন, তাঁর লালনপালনের মধ্যেও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। একজন সমাজসেবক যতই আন্তরিক হন, তিনি সমাজের সমস্ত সমস্যা দূর করতে পারেন না। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষকতা, চিকিৎসা, অভিভাবকত্ব বা সমাজসেবা পরিত্যাগ করা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কর্তব্যকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করতে হয়। আগুনের সঙ্গে ধোঁয়া যেমন থাকতে পারে, তেমনি কর্মের সঙ্গে অপূর্ণতাও থাকতে পারে।

গীতার এই শিক্ষা নিখুঁততাবাদের একটি গভীর সংশোধনও বলা যায়। অনেক মানুষ মনে করেন যে কোনো কাজ সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে করতে না পারলে কাজটি না করাই ভালো। এই মানসিকতা মানুষকে ভয়, দ্বিধা এবং কর্মবিমুখতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। গীতা এই অবস্থার বিপরীতে বাস্তববাদী একটি দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। কাজের মধ্যে ত্রুটি থাকবে, কিন্তু ত্রুটির উপস্থিতি কাজের অর্থকে বাতিল করে না। বরং কাজের মধ্য দিয়েই মানুষ ভুল থেকে শেখে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং নিজের দক্ষতা উন্নত করে। তাই অপূর্ণতা সবসময় ব্যর্থতার চিহ্ন নয়। অনেক সময় অপূর্ণতার মধ্য দিয়েই পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহজং কর্ম ধারণাটি মানুষের প্রকৃতি এবং কর্তব্যের সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। গীতার দর্শনে মানুষের কর্ম তার প্রকৃতি বা স্বভাবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষের মধ্যে বিভিন্ন গুণ, প্রবণতা, ক্ষমতা এবং মানসিক বৈশিষ্ট্য থাকে। সেই স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্ম যখন কর্তব্যবোধের সঙ্গে সম্পাদিত হয়, তখন তা আত্মোন্নতির মাধ্যম হতে পারে। এখানে নিজের স্বভাবকে চিনতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের জীবন বা কর্মপথ দেখে নিজের প্রকৃতি অস্বীকার করা সবসময় কল্যাণকর নয়। একজন মানুষের যে ক্ষমতা ও প্রবণতা রয়েছে, সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো তার নিজের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সহজং কর্মকে ইচ্ছামতো যে কোনো কাজের অনুমোদন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। নিজের কোনো ক্ষতিকর প্রবৃত্তিকে স্বভাব বলে দাবি করে অন্যায় করা গীতার শিক্ষার উদ্দেশ্য নয়। স্বভাবজাত কর্মের সঙ্গে কর্তব্য, নৈতিকতা এবং আত্মশুদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। নিজের প্রকৃতিকে চিনে তাকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিশুদ্ধ করে কর্তব্যের পথে পরিচালিত করাই গীতার মূল বক্তব্য। অর্থাৎ স্বভাবের দাস হওয়া নয়, স্বভাবকে যোগের পথে পরিচালিত করাই প্রকৃত সাধনা।

কর্মযোগের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট। কর্মযোগ মানুষকে কর্ম থেকে পালাতে বলে না। বরং কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করতে শেখায়। নিজের কাজের মধ্যে দোষ থাকলেও যদি মানুষ সততা, নিষ্ঠা এবং অনাসক্তির সঙ্গে কাজ করে, তাহলে সেই কর্ম তার অন্তরের পরিশুদ্ধির মাধ্যম হতে পারে। কাজের মাধ্যমে অহংকার বাড়ানো নয়, কাজের মাধ্যমে নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করাই কর্মযোগের লক্ষ্য। এই কারণে সহজং কর্ম শুধু সামাজিক দায়িত্বের কথা বলে না, এটি আধ্যাত্মিক সাধনার কথাও বলে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির একটি গভীর ব্যাখ্যা সম্ভব। দেহ, মন এবং প্রকৃতির স্তরে কর্ম সংঘটিত হয়। কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত আত্মস্বরূপ কর্মের সীমাবদ্ধতার অতীত। মানুষ যখন নিজের সমস্ত পরিচয়কে কেবল কর্মের ফলের সঙ্গে যুক্ত করে, তখন অহংকার ও আসক্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে কর্ম তার কর্তব্যের অংশ এবং সে কর্মের ফলের একমাত্র নিয়ন্তা নয়, তখন তার মধ্যে অনাসক্তি জন্মায়। সেই অনাসক্তি ধীরে ধীরে তাকে আত্মজ্ঞান ও মুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির গুরুত্ব অত্যন্ত আধুনিক। মানুষের মধ্যে ব্যর্থতার ভয় এবং নিখুঁত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় তাকে কাজ শুরু করতে বা কাজ চালিয়ে যেতে বাধা দেয়। মানুষ ভাবে যে ভুল করলে তার মর্যাদা নষ্ট হবে, তাই কাজ না করাই নিরাপদ। কিন্তু গীতার অগ্নি ও ধোঁয়ার উপমা আমাদের শেখায় যে ভুল ও সীমাবদ্ধতা মানবকর্মের স্বাভাবিক অংশ। ভুলকে স্বীকার করে তার মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা উন্নতির পথ। তাই কর্মের মধ্যে থাকা দোষকে অজুহাত না বানিয়ে তাকে আত্মসংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। অগ্নি ভারতীয় সংস্কৃতিতে জ্ঞান, শক্তি, শুদ্ধি, তপস্যা, চেতনা এবং যজ্ঞের প্রতীক। ধোঁয়া সেই আলোক ও শক্তিকে আচ্ছন্ন করা সীমাবদ্ধতার প্রতীক। মানুষের অন্তরেও যেন একটি অগ্নি রয়েছে। সেই অগ্নি হলো তার জ্ঞান, বিবেক, সাহস, কর্তব্যবোধ এবং সৃষ্টিশীল শক্তি। কিন্তু ভয়, অহংকার, অজ্ঞতা, দ্বিধা এবং আসক্তি সেই আগুনকে ধোঁয়ার মতো আবৃত করে রাখে। ধোঁয়া দেখে যদি মানুষ আগুনকে নিভিয়ে দেয়, তবে তার অন্তর্নিহিত শক্তিও নষ্ট হয়ে যায়। তাই আধ্যাত্মিক অর্থে এই শ্লোক আমাদের আহ্বান জানায় নিজের অন্তরের আগুনকে জাগ্রত রাখতে এবং তার চারপাশের ধোঁয়া ধীরে ধীরে দূর করতে।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ অসংখ্য ক্ষেত্রে দেখা যায়। একজন শিক্ষক যদি নিজের শিক্ষাদানের সীমাবদ্ধতা বুঝে আরও ভালোভাবে শেখানোর চেষ্টা করেন, তবে তাঁর কর্ম আত্মোন্নতির পথে পরিণত হয়। একজন লেখক যদি নিজের লেখার দুর্বলতা দেখে লেখালেখি ছেড়ে না দিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করেন, তবে সেই ত্রুটিই একদিন তার উন্নতির কারণ হয়। একজন সমাজসেবক যদি বুঝতে পারেন যে তিনি পুরো সমাজ পরিবর্তন করতে পারবেন না, তবুও একটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন, তবে তাঁর কর্মের মূল্য কমে যায় না। বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আন্তরিকভাবে কর্তব্য পালন করাই কর্মের প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ করে।

শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা মানুষের জীবনের একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের সমাধান করে। আমরা প্রায়ই ভাবি যে ভালো কাজ মানেই নিখুঁত কাজ। কিন্তু গীতা দেখায় যে কর্মের মহত্ত্ব শুধু তার বাহ্যিক নিখুঁততার মধ্যে নেই। কর্মের উদ্দেশ্য, কর্তব্যবোধ, চেতনা এবং অনাসক্তিও তার মূল্য নির্ধারণ করে। তাই একজন মানুষ যদি নিজের স্বভাবজাত কর্তব্যকে চিনে, তার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে, ত্রুটিগুলো সংশোধনের চেষ্টা করে এবং ফলের প্রতি অহংকার না করে কাজ করে, তাহলে তার কর্ম ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেত্ এই বাণী কেবল অর্জুনের যুদ্ধক্ষেত্রের সংকটের জন্য নয়, সমগ্র মানবজীবনের জন্য এক গভীর নির্দেশনা। মানুষের কর্তব্যের পথ সবসময় মসৃণ নয়। সেখানে ভুল থাকবে, সীমাবদ্ধতা থাকবে, দ্বন্দ্ব থাকবে এবং কখনো কখনো ধোঁয়ার মতো অস্পষ্টতাও থাকবে। কিন্তু সেই কারণে নিজের সত্যিকারের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া সমাধান নয়। আগুন যেমন ধোঁয়ায় আবৃত হলেও আগুনই থাকে, তেমনি কর্মের মধ্যে ত্রুটি থাকলেও কর্তব্যের অন্তর্নিহিত মূল্য নষ্ট হয়ে যায় না। তাই জীবনের প্রকৃত শিক্ষা হলো নিজের স্বভাব ও কর্তব্যকে চিনে নেওয়া, কর্মের সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করা, ত্রুটিকে সংশোধন করা, ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করা এবং কর্মকে আত্মোন্নতির পথে ব্যবহার করা। সহজং কর্ম শেষ পর্যন্ত আমাদের শেখায় যে মানুষের মহত্ত্ব নিখুঁত হয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্য, কর্তব্য এবং কল্যাণের পথে অবিচল থাকার মধ্যে নিহিত।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি