ভগবদ্গীতা ১৮.৪৯ — অনাসক্তি, আত্মসংযম ও নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি: কর্মবন্ধন থেকে মুক্তির পথ
অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ।
নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেনাধিগচ্ছতি।।৪৯।।
অনুবাদঃ জড় বিষয়ে আসক্তিশূন্য বুদ্ধি, সংযতচিত্ত ও ভোগস্পৃহাশূন্য ব্যক্তি স্বরূপত কর্ম ত্যাগপূর্বক নৈষ্কর্মরূপ পরম সিদ্ধি লাভ করেন।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ঊনপঞ্চাশতম শ্লোক মানবজীবনের কর্ম, আসক্তি, আত্মসংযম, আকাঙ্ক্ষা, সন্ন্যাস এবং মুক্তির মধ্যে গভীর সম্পর্ককে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকে বলা হয়েছে, অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ। নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেনাধিগচ্ছতি। অর্থাৎ যিনি সর্বত্র অনাসক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন, যিনি নিজের অন্তঃকরণকে জয় করেছেন এবং যার স্পৃহা বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিলুপ্ত হয়েছে, তিনি সন্ন্যাসের মাধ্যমে পরম নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি লাভ করেন। এই শ্লোককে শুধু কর্মত্যাগের শিক্ষা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো মানুষ কীভাবে কর্মের মধ্যেই থেকে কর্মের বন্ধন অতিক্রম করতে পারে এবং কীভাবে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও অন্তরের স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো অসক্তবুদ্ধিঃ। অসক্ত শব্দটি সংস্কৃত সক্ত শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সক্ত শব্দের মূল ভাব হলো কোনো কিছুর সঙ্গে লেগে থাকা, সংযুক্ত হওয়া বা আঁকড়ে ধরা। এর সঙ্গে নিষেধসূচক অ যুক্ত হলে অসক্ত অর্থ দাঁড়ায় যা কোনো কিছুর সঙ্গে বন্ধনের মতো লেগে নেই। বুদ্ধি শব্দটি সংস্কৃত বুধ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। বুধের মূল ভাব হলো জাগ্রত হওয়া, জানা, উপলব্ধি করা এবং সত্যকে চিনতে পারা। তাই বুদ্ধি এখানে শুধু সাধারণ বুদ্ধিমত্তা নয়। এটি মানুষের বিচারশক্তি, বিবেচনাশক্তি এবং সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করার অন্তর্দৃষ্টি। অসক্তবুদ্ধি বলতে সেই বিচারশক্তিকে বোঝানো হয়েছে যা কোনো বস্তু, ব্যক্তি, সাফল্য, ব্যর্থতা, প্রশংসা বা ফলের সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে যায় না যে তার স্বাধীন বিচারশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
অনাসক্তি শব্দটির অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। অনাসক্তি উদাসীনতা নয় এবং ভালোবাসার বিপরীতও নয়। একজন অনাসক্ত মানুষ কোনো কাজের প্রতি যত্নহীন হন না। বরং তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। পার্থক্য হলো তিনি কাজের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি বানান না। তিনি সাফল্য চাইতে পারেন কিন্তু সাফল্যের দাস হন না। তিনি ব্যর্থতাকে মেনে নিতে পারেন কিন্তু ব্যর্থতাকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করেন না। তিনি ভালোবাসতে পারেন কিন্তু ভালোবাসার মধ্যে অতিরিক্ত অধিকারবোধ সৃষ্টি করেন না। তাই অসক্তবুদ্ধি হলো এমন একটি মানসিক স্বাধীনতা যেখানে মানুষ জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে কিন্তু জগতের বস্তু ও ফল তার অন্তরের উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
এরপর এসেছে সর্বত্র শব্দটি। সর্বত্র অর্থ সব জায়গায় এবং সব অবস্থায়। কিন্তু এই শ্লোকে এর অর্থ কেবল স্থানগত নয়। সুখে, দুঃখে, লাভে, ক্ষতিতে, সম্মানে, অপমানে, সাফল্যে, ব্যর্থতায় এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিতে যার অনাসক্ত বুদ্ধি একইভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে তাকেই সর্বত্র অসক্তবুদ্ধি বলা যায়। নির্দিষ্ট একটি পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু জীবনের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যেও অন্তরের ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক গভীর সাধনার বিষয়। তাই সর্বত্র শব্দটি নির্দেশ করে যে অনাসক্তি কোনো সাময়িক মানসিক অবস্থা নয়। এটি জীবনের একটি স্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি।
এরপর এসেছে জিতাত্মা। জিতাত্মা শব্দটি জিত এবং আত্মা এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। জিত শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত জি ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ জয় করা। আত্মা শব্দটি সংস্কৃত সাহিত্যে বহুমাত্রিক অর্থ বহন করে। প্রসঙ্গভেদে এটি আত্মসত্তা, অন্তঃসত্তা, মন অথবা ব্যক্তির অন্তর্গত সত্তাকে বোঝাতে পারে। এই শ্লোকে জিতাত্মা বলতে মূলত সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যিনি নিজের মন, ইন্দ্রিয়প্রবণতা এবং আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানে নিজের আত্মাকে পরাজিত করার কথা বলা হচ্ছে না। বরং নিম্নতর প্রবৃত্তি ও অস্থির মনকে নিজের বিবেক ও জ্ঞানের অধীনে নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।
মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম অনেক সময় বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নয়, নিজের ভেতরের সঙ্গে। একজন মানুষ অন্যদের উপর ক্ষমতা অর্জন করেও নিজের ক্রোধ, লোভ, ঈর্ষা বা অহংকারের কাছে পরাজিত হতে পারেন। আবার এমন একজন মানুষও আছেন যিনি বাহ্যিকভাবে সাধারণ জীবনযাপন করেও নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। গীতার দৃষ্টিতে দ্বিতীয় ব্যক্তিই প্রকৃত অর্থে জিতাত্মা। কারণ বাইরের জগতকে জয় করার চেয়ে নিজের মনকে জয় করা অধিক কঠিন। যে ব্যক্তি নিজের মনকে নিজের বিবেকের অধীনে আনতে পারেন, তিনি ধীরে ধীরে বাহ্যিক পরিস্থিতির উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হতে শুরু করেন।
এরপর এসেছে বিগতস্পৃহঃ। বিগত শব্দটি vi এবং গত এই ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। গত শব্দের মূল ধাতু গম যার অর্থ যাওয়া। বিগত অর্থ যা চলে গেছে বা দূরে সরে গেছে। স্পৃহা শব্দের মূল ভাব হলো তীব্র আকাঙ্ক্ষা, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ব্যাকুলতা বা প্রবল তৃষ্ণা। তাই বিগতস্পৃহ অর্থ যার তীব্র স্পৃহা দূরীভূত হয়েছে। এখানে আবারও একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। গীতা মানুষের সমস্ত ইচ্ছাকে ধ্বংস করার কথা বলছে না। জীবনে কর্তব্য পালনের ইচ্ছা, জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা, অন্যের কল্যাণের ইচ্ছা বা নিজের উৎকর্ষ সাধনের ইচ্ছা স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে মহৎ। যে স্পৃহা মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে তা হলো এমন তীব্র ফলতৃষ্ণা যেখানে নির্দিষ্ট ফল না পেলে নিজের শান্তি ও আত্মমূল্য নষ্ট হয়ে যায়।
এই কারণে সাধারণ ইচ্ছা এবং স্পৃহার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একজন ছাত্র বলতে পারেন তিনি ভালো ফল করতে চান। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন ভালো ফল না হলে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং তাঁর জীবনের কোনো মূল্য নেই, তখন ফলের সঙ্গে তাঁর আত্মপরিচয়ের বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। একজন কর্মী নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে উন্নতি চাইতে পারেন। কিন্তু যদি পদোন্নতি না পাওয়াকে তিনি নিজের অস্তিত্বের অপমান মনে করেন, তখন তাঁর মধ্যে ফলাসক্তি জন্ম নিয়েছে। গীতার শিক্ষা হলো চেষ্টা ত্যাগ করা নয়, বরং ফলের সঙ্গে নিজের অন্তর্গত শান্তিকে এমনভাবে বেঁধে না ফেলা যাতে ফলের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অস্তিত্বও ভেঙে পড়ে।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর ধারণাগুলোর একটি হলো নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি। নৈষ্কর্ম্য শব্দটি কর্মের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্ম শব্দের মূল ধাতু কৃ যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। কিন্তু নৈষ্কর্ম্যকে কেবল কর্মহীনতা হিসেবে বোঝা গীতার দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নৈষ্কর্ম্য হলো কর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত অবস্থা। অর্থাৎ কাজ থাকবে কিন্তু সেই কাজের সঙ্গে যে অহংকার, ফলের আকাঙ্ক্ষা এবং কর্তা হিসেবে নিজের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি যুক্ত হয়, সেই বন্ধন থাকবে না। তাই নৈষ্কর্ম্য মানে কাজ না করা নয়। নৈষ্কর্ম্য হলো কাজ করতে করতে কর্মের দ্বারা অন্তরে আবদ্ধ না হওয়া।
সিদ্ধি শব্দের মূল অর্থ হলো সম্পূর্ণতা, সফলতা বা কোনো অবস্থায় পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি তাই কর্মের বন্ধন অতিক্রম করার পূর্ণতা। এর সঙ্গে পরম শব্দটি যুক্ত হয়েছে। পরম অর্থ সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত। ফলে পরম নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি বলতে এমন একটি সর্বোচ্চ অন্তর্গত অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যেখানে মানুষ কর্মের প্রয়োজনীয়তা থেকে পালিয়ে যায় না, কিন্তু কর্মফলের দ্বারা নিজের চেতনার স্বাধীনতা হারায় না।
এই অবস্থায় সন্ন্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্ন্যাস শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ভাবের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে স্থাপন করা, সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা এবং সমর্পণের ধারণা রয়েছে। সাধারণভাবে সন্ন্যাস বলতে সংসারত্যাগ বা বাহ্যিক কর্মত্যাগ বোঝানো হলেও গীতার এই শিক্ষার গভীর অর্থ কেবল বাহ্যিক জীবন পরিত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে সন্ন্যাস হলো কর্মের সঙ্গে অহংকারপূর্ণ সম্পর্কের ত্যাগ, ফলের উপর অতিরিক্ত অধিকারবোধের ত্যাগ এবং আমি কর্তা এই অহংবোধের ক্রমশ ক্ষয়। মানুষ কাজ করবে কিন্তু নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে কাজের ফলের সঙ্গে এক করে ফেলবে না। এই অন্তর্গত ত্যাগই সন্ন্যাসের গভীর অর্থ।
অধিগচ্ছতি শব্দটির অর্থ পৌঁছানো, অর্জন করা বা উপলব্ধি করা। এর ফলে বোঝা যায় যে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি কোনো বাহ্যিক বস্তু অর্জনের মতো বিষয় নয়। এটি একটি অন্তর্গত অবস্থায় পৌঁছানোর বিষয়। মানুষ ধীরে ধীরে নিজের বুদ্ধিকে অনাসক্ত করে, নিজের মনকে জয় করে এবং স্পৃহা থেকে মুক্ত হয়ে যখন কর্মের সঙ্গে তার অহংকেন্দ্রিক সম্পর্ক ত্যাগ করতে শেখে, তখন সে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধির দিকে এগিয়ে যায়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। কর্মযোগের দৃষ্টিতে মানুষকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলা হয় না। বরং কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করতে বলা হয়। কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ নিষ্ঠা থাকবে কিন্তু ফলের উপর নিজের মানসিক অস্তিত্বের নির্ভরতা থাকবে না। এই অবস্থায় কর্ম মানুষের বন্ধনের কারণ না হয়ে আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে। মানুষ কাজ করতে করতে নিজের অহং, আকাঙ্ক্ষা এবং ফলনির্ভর মানসিকতা সম্পর্কে সচেতন হতে শেখে।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের আরেকটি গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অজ্ঞতার কারণে মানুষ নিজেকে কর্মের কর্তা এবং কর্মফলের ভোক্তা হিসেবে মনে করে। সে ভাবে আমি কাজ করছি, আমি ফল পাব এবং সেই ফল আমার সুখ বা দুঃখ নির্ধারণ করবে। এই কর্তা ও ভোক্তার অহংবোধই কর্মবন্ধনের একটি প্রধান কারণ। আত্মজ্ঞান গভীর হলে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার প্রকৃত আত্মসত্তা কর্মের পরিবর্তনশীল প্রবাহের অতীত। এই উপলব্ধির ফলে কর্ম চললেও তার সঙ্গে আত্মপরিচয়ের বন্ধন দুর্বল হয়। এই অর্থে নৈষ্কর্ম্য হলো আত্মার প্রকৃত স্বাধীনতার উপলব্ধি।
ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য রয়েছে। একজন ভক্ত তার কর্মের ফল নিজের জন্য জমা না করে ঈশ্বরের উদ্দেশে সমর্পণ করতে পারেন। তখন কর্মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অহং নয়, ঈশ্বরের প্রতি কর্তব্য ও সমর্পণ। নিজের শ্রমকে ঈশ্বরের উদ্দেশে নিবেদন করার ফলে কর্মের ফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ কমে এবং কর্ম নিজেই উপাসনার রূপ গ্রহণ করতে পারে। এই অবস্থায় সন্ন্যাস কেবল ত্যাগ নয়, সমর্পণও।
প্রতীকী দৃষ্টিতে এই শ্লোকের সঙ্গে পদ্মের উপমা বিশেষভাবে মানানসই। পদ্ম জলের মধ্যে জন্মায় এবং জলের মধ্যেই অবস্থান করে, কিন্তু তার পাতা জলের সঙ্গে এমনভাবে একীভূত হয় না যে জল তাকে নিজের মধ্যে বিলীন করে দেয়। তেমনি একজন মানুষ সমাজে থাকবে, পরিবারে থাকবে, কর্মক্ষেত্রে থাকবে এবং জীবনের নানা দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু তার অন্তর যেন সেইসব বিষয়ের দাস হয়ে না যায়। জগৎকে ছেড়ে দেওয়া নয়, জগতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি পরিবর্তন করাই অনাসক্তির মূল শিক্ষা।
আরেকটি সুন্দর উপমা হতে পারে একজন দক্ষ অভিনেতা। একজন অভিনেতা মঞ্চে রাজা, ভিখারি, যোদ্ধা বা সাধারণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রবেশ করেন এবং অভিনয়কে যথাসম্ভব বাস্তব করে তোলেন। কিন্তু অভিনয় শেষ হলে তিনি জানেন যে চরিত্রটি তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়। একইভাবে একজন জ্ঞানী মানুষ জীবনের বিভিন্ন ভূমিকা যথাসাধ্য পালন করেন। তিনি পিতা হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, কর্মী হতে পারেন, ব্যবসায়ী হতে পারেন বা সমাজের একজন সাধারণ সদস্য হতে পারেন। কিন্তু তিনি জানেন যে তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব কোনো একটি ভূমিকা বা কর্মফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অন্তর্গত দূরত্বই অনাসক্তির একটি গভীর প্রতীক।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের মানুষ সাফল্য, অর্থ, সামাজিক মর্যাদা, প্রশংসা এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে বসবাস করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের প্রশংসা বা স্বীকৃতিও অনেক সময় মানুষের আত্মমূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে বাহ্যিক সাফল্য এলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং ব্যর্থতা এলে আত্মমূল্য ভেঙে পড়ে। গীতার এই শ্লোক মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মূল্য কেবল তার অর্জনের মধ্যে নিহিত নয়। কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা দরকার, কিন্তু ফলকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বানানো উচিত নয়। এতে কর্মের গুণমানও বাড়ে এবং মানসিক স্বাধীনতাও বৃদ্ধি পায়।
একজন শিক্ষক যদি কেবল প্রশংসার জন্য শিক্ষা দেন, তাহলে ছাত্রের সাফল্য ও ব্যর্থতা তাঁর অহংকে ক্রমাগত প্রভাবিত করবে। কিন্তু একজন শিক্ষক যদি জ্ঞান দেওয়াকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ছাত্রের কল্যাণকে সামনে রাখেন, তাহলে তাঁর কাজের মধ্যে অনাসক্তির একটি রূপ দেখা যায়। একইভাবে একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করবেন নিষ্ঠার সঙ্গে, কিন্তু প্রতিটি ফলাফলকে নিজের ব্যক্তিগত অহংকারের সঙ্গে যুক্ত করবেন না। একজন ছাত্র অধ্যবসায়ের সঙ্গে পড়াশোনা করবে, কিন্তু একটি পরীক্ষার ফলকে নিজের সম্পূর্ণ মূল্য হিসেবে গ্রহণ করবে না। একজন অভিভাবক সন্তানের কল্যাণ চাইবেন, কিন্তু সন্তানের জীবনকে নিজের ইচ্ছার সম্পূর্ণ অধীন করতে চাইবেন না। এসব ক্ষেত্রেই গীতার অনাসক্তির শিক্ষা বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো ভালোবাসা এবং আসক্তির পার্থক্য। আসক্তি অনেক সময় বলে আমি তোমাকে চাই কারণ তুমি আমার ইচ্ছা পূরণ করবে। ভালোবাসা বলে তোমার কল্যাণ চাই, যদিও তোমাকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে চাই না। আসক্তির মধ্যে অধিকারবোধ শক্তিশালী হয় এবং ভালোবাসার মধ্যে স্বাধীনতার প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পায়। তাই অনাসক্তি ভালোবাসাকে ধ্বংস করে না। বরং ভালোবাসাকে অধিক নির্মল করতে সাহায্য করতে পারে।
সমগ্র শ্লোকটির দিকে তাকালে একটি সুন্দর অন্তর্গত ক্রম দেখা যায়। প্রথমে আসে অসক্তবুদ্ধি। মানুষকে তার বিচারশক্তিকে ফলের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে। এরপর আসে জিতাত্মা। তাকে নিজের মন ও প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তারপর আসে বিগতস্পৃহ। তার মধ্যে ফল পাওয়ার তীব্র তৃষ্ণা ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে। এরপর সন্ন্যাসের মাধ্যমে সে কর্মের সঙ্গে অহংকারপূর্ণ সম্পর্ক ত্যাগ করবে। এর পরিণতিতে আসে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি। অর্থাৎ কর্মের মধ্যে থেকেও কর্মের বন্ধনের অতীত এক অন্তর্গত স্বাধীনতা।
এই কারণে শ্লোকটি কোনো নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষা দেয় না। বরং এটি সক্রিয় অথচ অন্তরে স্বাধীন মানুষের আদর্শ তুলে ধরে। হাত কর্মে নিযুক্ত থাকবে কিন্তু মন ফলের দাস হবে না। মানুষ দায়িত্ব পালন করবে কিন্তু দায়িত্বের ফলকে নিজের অহংকারের সম্পূর্ণ পরিচয় বানাবে না। সে ভালোবাসবে কিন্তু ভালোবাসার মধ্যে অতিরিক্ত অধিকারবোধ সৃষ্টি করবে না। সে সাফল্য গ্রহণ করবে কিন্তু সাফল্যের দ্বারা নিজের প্রকৃত সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করবে না। সে ব্যর্থতার মুখোমুখি হবে কিন্তু ব্যর্থতার কারণে নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করবে না।
সবশেষে বলা যায়, অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ এই অংশটি মানুষের অন্তর্গত পরিণতির তিনটি স্তম্ভকে প্রকাশ করে। অসক্তবুদ্ধি মানুষকে বাহ্যিক ফলের বন্ধন থেকে মুক্ত করে। জিতাত্মা তাকে নিজের মন ও প্রবৃত্তির উপর কর্তৃত্ব শেখায়। বিগতস্পৃহ তাকে তীব্র আকাঙ্ক্ষার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে। আর সন্ন্যাসের মাধ্যমে এই অন্তর্গত ত্যাগ পরিণত হয় নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিতে। এখানে নৈষ্কর্ম্য কোনো কাজ না করার অবস্থা নয়। এটি এমন এক চেতনার অবস্থা যেখানে মানুষ কর্ম করে কিন্তু কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো জগতকে পরিত্যাগ করে নয়, বরং জগতের মধ্যে থেকেও অন্তরের আসক্তি অতিক্রম করে স্বাধীন হওয়া। মানুষের হাত কর্মে থাকবে, হৃদয়ে থাকবে সমর্পণ, বুদ্ধিতে থাকবে বিবেক এবং অন্তরে থাকবে স্বাধীনতা। এই সমন্বয়ই গীতার কর্মযোগকে নৈষ্কর্ম্যের মহত্তর সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!