ভগবদ্গীতা ১৮.৫৩ — অহংকার, কাম ও ক্রোধ ত্যাগ: নির্মম শান্ত চিত্তে ব্রহ্মভাবের পথে
অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্।
বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।৫৩।।
অনুবাদঃ বিশুদ্ধ বুদ্ধিযুক্ত হয়ে মনকে ধৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করে, শব্দ আদি ইন্দ্রিয় বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করে, রাগও দ্বেষ বর্জন করে, নির্জন স্থানে বাস করে, অল্প আহার করে, দেহ, মন ও বাক্ সংযত করে, সর্বদা ধ্যানযোগে যুক্তহয়ে বৈরাগ্য আশ্রয় করে, অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ, পরিগ্রহ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে, মমত্ব বোধশূন্য শান্তপুরুষ ব্রহ্ম-অনুভবে সমর্থ হন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের তিপ্পান্নতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের কয়েকটি গভীর দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন। শ্লোকটি হলো “অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্। বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।” এই শ্লোকের মধ্যে মানুষের আত্মিক উন্নতির একটি অত্যন্ত গভীর পথনির্দেশ নিহিত রয়েছে। এখানে অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ এবং পরিগ্রহকে কেবল কিছু নৈতিক দোষ হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং এগুলোকে মানুষের চেতনার এমন কিছু প্রবণতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো মানুষকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে বিমুচ্য, নির্মম এবং শান্ত শব্দ তিনটি সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আত্মিক প্রশান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ নির্দেশ করে। শেষ পর্যন্ত এই পথ মানুষকে ব্রহ্মভাব উপলব্ধির উপযুক্ত করে তোলে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অহঙ্কার। সংস্কৃত অহঙ্কার শব্দের মধ্যে অহম্ এবং কার এই দুই ধারণা নিহিত রয়েছে। অহম্ অর্থ আমি এবং কার অর্থ করা বা নির্মাণ করা। সেই অর্থে অহঙ্কারকে বলা যায় আমি ভাবের নির্মাণ। কিন্তু এখানে অহঙ্কার বলতে শুধু নিজেকে বড় মনে করা বোঝানো হয় না। এর গভীর অর্থ হলো নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে ভুলে দেহ, মন, ক্ষমতা, সম্পদ, পদমর্যাদা এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখা। তখন মানুষ মনে করতে শুরু করে আমি কর্তা, আমি ভোগী, আমি শক্তিশালী, আমি শ্রেষ্ঠ এবং আমার ইচ্ছাই শেষ সত্য। এই সীমাবদ্ধ আমি ভাবই ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে আত্মগর্ব এবং পৃথকত্বের বোধকে শক্তিশালী করে।
অহঙ্কারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসে বল। বল শব্দের অর্থ শক্তি বা সামর্থ্য। এই শক্তি শারীরিক হতে পারে, মানসিক হতে পারে, জ্ঞানগত হতে পারে, অর্থনৈতিক হতে পারে কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার রূপ নিতে পারে। শক্তি নিজে কোনো দোষ নয়। বরং শক্তি মানুষের জীবনে সৃষ্টিশীলতার অন্যতম মাধ্যম। একজন শক্তিমান মানুষ দুর্বলকে রক্ষা করতে পারেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন এবং সমাজের কল্যাণ করতে পারেন। কিন্তু যখন শক্তির সঙ্গে অহঙ্কার যুক্ত হয় তখন সেই শক্তি মানুষের আত্মিক উন্নতির পরিবর্তে আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তখন মানুষ মনে করে আমি শক্তিশালী, তাই অন্যদের ওপর আমার অধিকার রয়েছে। এই মানসিকতা থেকেই বল ধীরে ধীরে দর্পের জন্ম দেয়।
দর্প অর্থ গর্ব, আত্মম্ভরিতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা। অহঙ্কার যেখানে বলে আমি, দর্প সেখানে বলে আমি অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। একজন মানুষের জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা যখন তার নিজের কাছে আত্মপরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই পরিচয় থেকে দর্প জন্ম নিতে পারে। দর্প মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সে নিজের সীমাবদ্ধতা দেখতে চায় না এবং অন্যের গুণ স্বীকার করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে জ্ঞান বিনয়ের কারণ না হয়ে অহঙ্কারের কারণ হয়ে ওঠে, সম্পদ দায়িত্বের পরিবর্তে গর্বের কারণ হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতা সেবার পরিবর্তে আধিপত্যের রূপ ধারণ করে।
এরপর শ্লোকে এসেছে কাম। কাম শব্দের মূল অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা ভোগেচ্ছা। মানুষের জীবনে ইচ্ছা থাকা স্বাভাবিক। ইচ্ছা মানুষকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি দেয়। কিন্তু যখন কোনো ইচ্ছা মানুষের স্বাধীনতাকে গ্রাস করে এবং সে মনে করতে শুরু করে যে তার আকাঙ্ক্ষা অবশ্যই পূরণ হতে হবে, তখন সেই ইচ্ছা কামনায় পরিণত হয়। কাম তখন আর সাধারণ ইচ্ছা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে এমন এক আকর্ষণ, যার কাছে মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিতে পারে। সে তখন সুখকে বাহ্যিক বস্তু, ভোগ, সম্মান কিংবা অর্জনের সঙ্গে এক করে দেখে এবং মনে করে আরও কিছু পেলেই সে সম্পূর্ণ হবে।
কামনা যখন বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ক্রোধের জন্ম হয়। ক্রোধ শব্দের অর্থ রাগ, ক্ষোভ বা তীব্র অসন্তোষ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে ক্রোধকে আলাদা একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যায় না। অনেক সময় ক্রোধের পেছনে থাকে অপূর্ণ কামনা এবং আহত অহঙ্কার। মানুষ যখন মনে করে আমার ইচ্ছা পূরণ হওয়া উচিত এবং বাস্তবতা তার বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার মধ্যে বিরক্তি ও ক্ষোভ জন্মায়। যদি সেই ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তা ক্রোধে পরিণত হয়। তাই কাম ও ক্রোধের মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। কাম বলে আমি এটা চাই এবং অহঙ্কার বলে আমার চাওয়াটিই পূরণ হওয়া উচিত। বাস্তবতা যখন সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে তখন ক্রোধ জন্ম নেয়।
শ্লোকটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো পরিগ্রহ। পরিগ্রহ শব্দটি পরি এবং গ্রহ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। পরি অর্থ চারদিকে বা সম্পূর্ণভাবে এবং গ্রহ অর্থ ধরা বা আঁকড়ে ধরা। সেই অর্থে পরিগ্রহের আক্ষরিক ভাব হলো কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে নিজের বলে ধরে রাখা। এর মধ্যে সম্পদ সঞ্চয়, অধিকারবোধ, ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের বলে কোনো কিছু ধরে রাখার মানসিকতা অন্তর্ভুক্ত। তবে পরিগ্রহ শুধু ধনসম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মানুষ তার পদ, সম্মান, সম্পর্ক, মতামত, পরিচয় এমনকি নিজের ধারণাকেও আঁকড়ে ধরতে পারে। তখন তার চেতনা বলে এটি আমার এবং আমি এটি হারাতে পারি না। এই আঁকড়ে ধরার প্রবণতাই তাকে ভয়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং তার অন্তরে অশান্তি সৃষ্টি করে।
এইভাবে শ্লোকটির প্রথম ছয়টি শব্দকে একসঙ্গে দেখলে একটি গভীর মানসিক ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অহঙ্কার মানুষকে বলে আমি কর্তা। বল তাকে নিজের শক্তির কথা মনে করায়। সেই শক্তি যখন আত্মগর্বে রূপ নেয় তখন জন্ম নেয় দর্প। দর্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানুষ আরও বেশি কিছু পেতে চায় এবং সেখানে কামনার সৃষ্টি হয়। কামনা পূরণ না হলে ক্রোধ আসে। আর যা অর্জিত হয়েছে তা হারানোর ভয়ে মানুষ তাকে আঁকড়ে ধরে রাখে এবং জন্ম নেয় পরিগ্রহ। অর্থাৎ অহঙ্কার, দর্প, কাম, ক্রোধ এবং পরিগ্রহ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো মানুষের চেতনার একটি পরস্পর সংযুক্ত বন্ধন ব্যবস্থা।
এই বন্ধন থেকে মুক্তির জন্য শ্রীকৃষ্ণ ব্যবহার করেছেন বিমুচ্য শব্দটি। বিমুচ্য অর্থ মুক্ত হয়ে বা বন্ধন থেকে নিজেকে পৃথক করে। এখানে ত্যাগ বলতে বাহ্যিকভাবে সবকিছু পরিত্যাগ করা বোঝানো হয় না। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃত ত্যাগ হলো আসক্তির ত্যাগ। মানুষ সম্পদ রাখবে, পরিবারকে ভালোবাসবে, কর্ম করবে, সমাজে দায়িত্ব পালন করবে এবং নিজের ক্ষমতাকে ব্যবহার করবে। কিন্তু সেই সমস্ত কিছুকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করবে না। সে বুঝবে যে জীবনের সমস্ত বস্তু, সম্পর্ক এবং ক্ষমতা পরিবর্তনশীল। তাই এগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে, কিন্তু এগুলোর দ্বারা নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না।
এরপর এসেছে নির্মম শব্দটি। আধুনিক বাংলা ভাষায় নির্মম বলতে সাধারণত নিষ্ঠুর বা দয়াহীন বোঝানো হয়। কিন্তু সংস্কৃত নির্মম শব্দের গীতার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি নির্ এবং মম এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। মম অর্থ আমার এবং নির্ অর্থ বিহীন। তাই নির্মম অর্থ আমার ভাব থেকে মুক্ত। এই নির্মমতা কোনো নিষ্ঠুরতা নয়। বরং এটি এমন এক চেতনা যেখানে মানুষ ভালোবাসে কিন্তু অধিকার করে না, দায়িত্ব পালন করে কিন্তু নিজের বলে আঁকড়ে ধরে না এবং সম্পদ ব্যবহার করে কিন্তু সম্পদের দ্বারা নিজের অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে না। একজন মানুষ তার সন্তানকে ভালোবাসতে পারেন কিন্তু সন্তানকে নিজের সম্পত্তি মনে না করেও ভালোবাসতে পারেন। তিনি সম্পদ ব্যবহার করতে পারেন কিন্তু সম্পদকে নিজের অহঙ্কারের পরিচয় না বানিয়েও ব্যবহার করতে পারেন। এই হলো নির্মমতার প্রকৃত তাৎপর্য।
নির্মমতার পরেই এসেছে শান্ত শব্দটি। শান্ত শব্দটি সংস্কৃত শম্ ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ প্রশমিত হওয়া, স্থির হওয়া এবং অস্থিরতা থেকে মুক্ত হওয়া। গীতার শান্তি শুধু বাহ্যিক ঝামেলা না থাকার নাম নয়। প্রকৃত শান্তি হলো অন্তরের সেই অবস্থা যেখানে কামনা, অহঙ্কার, ক্রোধ এবং অধিকারবোধ মানুষের চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। একজন মানুষ বিপদের মধ্যেও শান্ত থাকতে পারেন, কারণ তার শান্তি বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। আবার বাইরে সবকিছু সুন্দর থাকলেও একজন মানুষ অন্তরে অশান্ত হতে পারেন, যদি তার মন কামনা, ভয়, অহঙ্কার এবং পরিগ্রহে পূর্ণ থাকে। তাই গীতার শান্তি মূলত চেতনার একটি গভীর স্বাধীনতা।
এই শান্তির চূড়ান্ত ফল হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে। ব্রহ্মভূয়ায় অর্থ ব্রহ্মভাব লাভের উপযুক্ত হওয়া এবং কল্পতে অর্থ উপযুক্ত হয়ে ওঠা। এখানে ব্রহ্মভাব বলতে অসীম সত্যের সঙ্গে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপের সম্পর্ক উপলব্ধি করার কথা বোঝানো হয়েছে। মানুষের চেতনা যখন অহঙ্কার এবং মমত্বের সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে তখন সে নিজের অস্তিত্বকে সীমিত পরিচয়ের মধ্যে দেখে। কিন্তু যখন সে বুঝতে শেখে যে দেহ, সম্পদ, ক্ষমতা এবং সামাজিক পরিচয় তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়, তখন তার চেতনা বৃহত্তর সত্যের দিকে উন্মুক্ত হয়। এই অন্তর্গত পরিশুদ্ধিই তাকে ব্রহ্মজ্ঞান উপলব্ধির উপযুক্ত করে তোলে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাংখ্য দর্শনে অহঙ্কার হলো প্রকৃতির অন্তঃকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, যার মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের অভিজ্ঞতাকে আমি এবং আমার হিসেবে উপলব্ধি করে। বেদান্তের দৃষ্টিতে অহঙ্কার হলো সীমিত আত্মপরিচয়ের সঙ্গে চৈতন্যের ভুল সম্বন্ধ স্থাপন। মানুষ তখন দেহকে আমি বলে এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত বস্তুসমূহকে আমার বলে ধরে নেয়। এই আমি এবং আমার ধারণার মধ্যেই বন্ধনের মূল নিহিত। যোগদর্শনের দৃষ্টিতে আবার মন যখন বাসনা, আসক্তি এবং ক্রোধে আলোড়িত থাকে তখন চেতনার প্রকৃত স্বরূপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। মন যখন প্রশান্ত হয় তখন আত্মস্বরূপ উপলব্ধির জন্য একটি স্বচ্ছ ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এই শ্লোককে মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও গভীরভাবে বোঝা যায়। একজন মানুষ যদি মনে করেন সবাইকে তাকে সম্মান করতেই হবে তবে তার মধ্যে অহঙ্কার কাজ করছে। যদি তিনি মনে করেন তিনি অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ তবে সেখানে দর্প কাজ করছে। যদি তিনি চান তার প্রত্যেকটি ইচ্ছা পূরণ হোক তবে সেখানে কামনা কাজ করছে। কেউ তার ইচ্ছার বিরোধিতা করলে তিনি রেগে গেলে সেখানে ক্রোধের প্রকাশ ঘটে। আর নিজের ক্ষমতা, সম্পদ বা সম্পর্ক হারানোর ভয়ে সেগুলো আঁকড়ে ধরে রাখলে সেখানে পরিগ্রহ কাজ করছে। এই সমস্ত প্রবণতা শেষ পর্যন্ত মানুষকে বাহ্যিকভাবে সফল হলেও অন্তরে অশান্ত করে তুলতে পারে। গীতার শিক্ষা হলো এই প্রবণতাগুলোকে জোর করে দমন করা নয়, বরং এগুলোর প্রকৃতি বুঝে এগুলোর ওপর নিজের নির্ভরতা কমিয়ে আনা।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন ব্যবসায়ী প্রচুর সম্পদ অর্জন করলেন। সম্পদ অর্জন নিজে কোনো দোষ নয়। কিন্তু তিনি যদি মনে করেন তার সম্পদই তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ, তবে সেখানে অহঙ্কার ও দর্প জন্ম নেয়। তিনি যদি আরও বেশি সম্পদ পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন তবে কামনা তাকে পরিচালিত করছে। কেউ তার ব্যবসায় বাধা দিলে যদি তিনি তীব্র রাগে প্রতিক্রিয়া জানান তবে কামনা ক্রোধে পরিণত হয়েছে। আর অর্জিত সম্পদ হারানোর ভয়ে যদি তিনি সবসময় আতঙ্কিত থাকেন তবে সেখানে পরিগ্রহ কাজ করছে। বিপরীতে তিনি যদি সম্পদকে একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন যে সম্পদ জীবনের একটি উপকরণ মাত্র, তাহলে তিনি সম্পদের অধিকারী হয়েও সম্পদের দাস হন না। এই মানসিক স্বাধীনতাই নির্মমতা এবং শান্তির দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। অহঙ্কার মানুষের মিথ্যা আমি ভাবের প্রতীক। বল মানুষের ক্ষমতার প্রতীক। দর্প সেই ক্ষমতার আত্মমুগ্ধতার প্রতীক। কাম মানুষের অসম্পূর্ণতার অনুভূতি থেকে জন্ম নেওয়া আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ক্রোধ হলো সেই আকাঙ্ক্ষা বাধাপ্রাপ্ত হলে আহত চেতনার প্রতিক্রিয়া। পরিগ্রহ হলো অর্জিত বস্তু ও পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রতীক। আর বিমুচ্য হলো মুক্তির প্রতীক। নির্মম হলো অধিকারবোধ থেকে স্বাধীনতার প্রতীক এবং শান্ত হলো অন্তরের প্রশান্তির প্রতীক। শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে মানুষের সীমিত চেতনা থেকে অসীম সত্যের দিকে উত্তরণের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত বন্ধন বাইরের জগতে নয়, বরং বাইরের জগতের সঙ্গে তার মানসিক সম্পর্কের মধ্যে। সম্পদ নিজে বন্ধন নয়। সম্পদকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র পরিচয় বানানো বন্ধন। ক্ষমতা নিজে বন্ধন নয়। ক্ষমতার কারণে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা বন্ধন। ইচ্ছা নিজে বন্ধন নয়। নিজের ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ হতে হবে এই দাবি বন্ধন। ভালোবাসা নিজে বন্ধন নয়। ভালোবাসার মানুষকে নিজের সম্পত্তি মনে করা বন্ধন। তাই গীতার ত্যাগ মূলত বস্তু ত্যাগের শিক্ষা নয়। এটি আসক্তি, অহঙ্কার এবং মমত্বের বন্ধন ত্যাগের শিক্ষা।
অবশেষে বলা যায়, অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্ এই শ্লোকটি মানুষের আত্মিক বিবর্তনের একটি গভীর মানচিত্র। এখানে প্রথমে মানুষের অন্তরের বন্ধনগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পরে সেগুলো থেকে মুক্তির পথ দেখানো হয়েছে। অহঙ্কার মানুষকে সীমিত আমি ভাবের মধ্যে আবদ্ধ করে। দর্প তাকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতিতে নিয়ে যায়। কামনা তাকে বাহ্যিক অর্জনের পেছনে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। কামনা ব্যর্থ হলে ক্রোধ তাকে অস্থির করে। পরিগ্রহ তাকে অর্জিত বস্তু ও পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে। আর যখন মানুষ এই বন্ধনগুলো থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হতে শেখে তখন তার মধ্যে নির্মমতা জন্ম নেয়। নির্মমতা তাকে নিষ্ঠুর করে না বরং অধিকারবোধ থেকে মুক্ত করে। সেই মুক্ত মন ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং শান্ত চেতনা ব্রহ্মসত্য উপলব্ধির উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
এই কারণে শ্লোকটির মূল শিক্ষা হলো আমি এবং আমার এই দুই সংকীর্ণতার অতিক্রম। মানুষ যখন বলে আমি কর্তা, তখন অহঙ্কার জন্মায়। যখন বলে এটি আমার, তখন পরিগ্রহ জন্মায়। যখন বলে আমার ইচ্ছা পূরণ হতেই হবে, তখন কামনা জন্মায়। আর যখন সেই ইচ্ছা বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন ক্রোধের জন্ম হয়। কিন্তু যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সে জগতের মালিক নয় বরং একজন সচেতন অংশগ্রহণকারী, তখন তার কর্মের মধ্যে দায়িত্ব আসে, জীবনের মধ্যে স্বাধীনতা আসে এবং চেতনার মধ্যে শান্তি আসে। সেই শান্তির মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের গভীরতম স্বরূপের দিকে ফিরে যেতে পারে। এই প্রত্যাবর্তনই গীতার ভাষায় ব্রহ্মভাবের দিকে অগ্রসর হওয়া এবং মানবজীবনের এক গভীরতম আত্মিক সম্ভাবনার প্রকাশ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!