সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৫৪ — ব্রহ্মভাব, মানসিক প্রশান্তি, আকাঙ্ক্ষামুক্তি ও পরম ভক্তির পথে

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি। সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।।৫৪।।
ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি। 
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।।৫৪।।

অনুবাদঃ ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি কোন কিছুর জন্য শোক করেন না বা আকাঙ্ক্ষা করেন না। তিনি সমস্ত প্রাণীর প্রতি সমদর্শী হয়ে আমার পরা ভক্তি লাভ করেন।

ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের চুয়ান্নতম শ্লোকটি মানুষের আত্মপরিচয়, মানসিক শান্তি, আকাঙ্ক্ষামুক্তি, সমদৃষ্টি এবং পরম ভক্তির এক গভীর সমন্বিত দর্শন প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো “ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি। সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।” এর সরল অর্থ হলো যিনি ব্রহ্মসত্তায় প্রতিষ্ঠিত এবং যাঁর অন্তর প্রসন্ন, তিনি শোক করেন না এবং কোনো কিছুর জন্য আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হন না। তিনি সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি ধারণ করেন এবং তখন আমার পরম ভক্তি লাভ করেন। এই অতি সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের অন্তর্জীবনের একটি সম্পূর্ণ রূপান্তরের পথ নির্দেশ করা হয়েছে। এখানে আত্মজ্ঞান থেকে শুরু করে মানসিক প্রশান্তি, শোক ও আকাঙ্ক্ষার অতিক্রম, সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি এবং শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের প্রতি পরম ভক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একটি সুসংহত আধ্যাত্মিক যাত্রা প্রকাশ পেয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ব্রহ্মভূতঃ। ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত ব্রহ্মন্ থেকে এসেছে এবং এর সঙ্গে বৃহ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে বলে ব্যুৎপত্তিগতভাবে ধরা হয়। বৃহ্ অর্থ বিস্তৃত হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া বা ব্যাপ্ত হওয়া। সেই অর্থে ব্রহ্ম হলো সীমাহীন, সর্বব্যাপী এবং পরম অস্তিত্বের ধারণা। অন্যদিকে ভূত শব্দটি ভূ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। তাই ব্রহ্মভূত শব্দের আক্ষরিক অর্থ ব্রহ্মসত্তায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা ব্রহ্মের উপলব্ধিতে উপনীত হওয়া। এখানে ব্রহ্ম হয়ে যাওয়া বলতে কোনো ব্যক্তির শারীরিকভাবে ঈশ্বর হয়ে যাওয়া বোঝানো হয় না। বরং এর গভীর অর্থ হলো নিজের প্রকৃত সত্তাকে দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং অহংকারের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের বাইরে উপলব্ধি করা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ হিসেবে না দেখে চৈতন্যসত্তা হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করে এবং নিজের অস্তিত্বকে পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে অনুভব করে তখন তার চেতনার মধ্যে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তিত অবস্থাকেই ব্রহ্মভূত বলা যায়।

এই ব্রহ্মভূত অবস্থার পরেই এসেছে প্রসন্নাত্মা শব্দটি। প্রসন্নাত্মা গঠিত হয়েছে প্রসন্ন এবং আত্মা এই দুটি অংশের সমন্বয়ে। প্রসন্ন অর্থ নির্মল, স্বচ্ছ, শান্ত, প্রফুল্ল এবং অনাকুল। আত্মা এখানে কেবল কোনো দেহের মধ্যে অবস্থানকারী আত্মিক সত্তা বোঝায় না, বরং মানুষের অন্তঃসত্তা ও গভীরতম চেতনাকেও নির্দেশ করে। তাই প্রসন্নাত্মা অর্থ এমন এক অন্তরসত্তা যা অস্থিরতা, অহংকার, লোভ, ঈর্ষা, ভয় এবং অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষার কুয়াশা থেকে অনেকটা মুক্ত হয়ে স্বচ্ছ ও শান্ত হয়েছে। প্রসন্নতা এখানে সাময়িক আনন্দের নাম নয়। বাহ্যিক সাফল্যে মানুষ আনন্দিত হতে পারে এবং ব্যর্থতায় বিষণ্ণ হতে পারে। কিন্তু গীতার প্রসন্নাত্মা এমন একটি অন্তর্গত শান্তির কথা বলে যা বাহ্যিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল নয়। যেমন স্বচ্ছ জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তেমনি নির্মল চিত্তে আত্মসত্যও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে ন শোচতি। শোচতি শব্দটি শুচ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ শোক করা, দুঃখ করা বা অনুতপ্ত হওয়া। ন শোচতি অর্থ তিনি শোক করেন না। এর অর্থ এই নয় যে ব্রহ্মজ্ঞানী ব্যক্তি কখনো দুঃখ অনুভব করেন না কিংবা জীবনের কোনো ক্ষতি তাঁকে স্পর্শ করে না। মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি তাঁর মধ্যেও থাকতে পারে। কিন্তু পার্থক্য হলো তিনি দুঃখকে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন না। তিনি জানেন যে জীবনের বাহ্যিক অবস্থা পরিবর্তনশীল। জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয়, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যু প্রকৃতির নিয়মের অন্তর্গত। তাই কোনো পরিবর্তন বা ক্ষতিকে তিনি নিজের চিরন্তন সত্তার ধ্বংস বলে মনে করেন না। এই উপলব্ধি শোককে অস্বীকার করে না বরং শোকের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে পরিবর্তিত করে।

ন কাঙ্ক্ষতি শব্দটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাঙ্ক্ষতি শব্দের অর্থ আকাঙ্ক্ষা করা, প্রত্যাশা করা বা কোনো কিছু পাওয়ার জন্য তীব্রভাবে মনকে চালিত করা। ন কাঙ্ক্ষতি অর্থ তিনি আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ হন না। এখানে সমস্ত ইচ্ছা বা জীবনের সমস্ত লক্ষ্যকে অস্বীকার করা হয়নি। মানুষ জীবনে উন্নতি করতে পারে, জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সমাজের কল্যাণ করতে পারে এবং নিজের কর্তব্য পালন করতে পারে। কিন্তু তার অন্তরের পূর্ণতা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, পদ, অর্থ, সম্মান বা ফলের ওপর নির্ভর করবে না। সাধারণ মানুষ মনে করে কোনো একটি কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জন করলেই তার জীবন সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু একটি আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়ার পর আরেকটি আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এভাবে আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয় না। গীতার ন কাঙ্ক্ষতি এই অনন্ত তৃষ্ণার বন্ধন থেকে মুক্তির কথা বলে। কাজ থাকবে কিন্তু কাজের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মাপকাঠি বানানো হবে না।

ন শোচতি এবং ন কাঙ্ক্ষতি এই দুটি পদ পাশাপাশি বসানোর মধ্যেও গভীর মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। শোক সাধারণত অতীতের সঙ্গে যুক্ত। মানুষ ভাবে যা হারিয়ে গেছে তা কেন হারিয়ে গেল। আকাঙ্ক্ষা সাধারণত ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। মানুষ ভাবে যা এখনো পাইনি তা কবে পাব। একদিকে অতীতের অনুশোচনা এবং অন্যদিকে ভবিষ্যতের প্রত্যাশা মানুষের মনকে বর্তমান মুহূর্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ব্রহ্মভূত ব্যক্তি এই দুই প্রান্তের দোলাচল অতিক্রম করে অস্তিত্বের গভীর সত্যে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি অতীতকে অস্বীকার করেন না এবং ভবিষ্যতের জন্য কর্মও পরিত্যাগ করেন না। কিন্তু তাঁর চেতনা অতীতের শোক কিংবা ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষার দাস হয়ে থাকে না।

এরপর এসেছে সমঃ সর্বেষু ভূতেষু। সম শব্দের অর্থ সমান, ভারসাম্যপূর্ণ, পক্ষপাতহীন এবং সমদর্শী। সর্বেষু অর্থ সকলের মধ্যে এবং ভূতেষু অর্থ সকল জীবের মধ্যে। ভূত শব্দটিও ভূ ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ যে অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাই সমঃ সর্বেষু ভূতেষু অর্থ সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি রাখা। এই সমদৃষ্টি বাস্তব জীবনের সব পার্থক্যকে অস্বীকার করা নয়। মানুষ ও পশু, শিক্ষক ও ছাত্র, পিতা ও সন্তান, শাসক ও নাগরিকের সামাজিক ভূমিকা এক নয়। কিন্তু তাদের অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত মর্যাদা এবং জীবনের মূল্যকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সংকীর্ণ পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। তিনি নিজের সুখকে যেমন মূল্য দেন, অন্যের সুখকেও তেমনই মূল্যবান বলে উপলব্ধি করেন। এই উপলব্ধি থেকেই করুণা, সহমর্মিতা এবং অহিংসার জন্ম হয়।

সমদৃষ্টি তাই শুধু একটি আধ্যাত্মিক ধারণা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক আদর্শও। মানুষ যখন অন্যের মধ্যে নিজের মতোই একটি জীবন্ত সত্তাকে দেখতে শেখে তখন শোষণ, ঘৃণা, হিংসা এবং অহংকারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। অন্যের দুঃখ তখন আর সম্পূর্ণ অপরের দুঃখ থাকে না। অন্যের আনন্দও তখন কেবল প্রতিযোগিতার কারণ হয় না। এইভাবে আত্মজ্ঞান মানুষের চেতনাকে সংকুচিত না করে বরং আরও বিস্তৃত করে। সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে অহংকারী না করে বিনম্র এবং সহানুভূতিশীল করে তোলে।

এই সমদৃষ্টির পরেই শ্লোকে এসেছে মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্। মদ্ভক্তি শব্দটি মৎ এবং ভক্তি থেকে গঠিত। মৎ অর্থ আমার এবং ভক্তি শব্দটি ভজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ নেওয়া, গ্রহণ করা, সেবা করা এবং সম্পর্ক স্থাপনের ভাব রয়েছে। তাই ভক্তি শুধু কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম নয়। ভক্তির মধ্যে প্রেম, শ্রদ্ধা, আত্মনিবেদন, সেবা এবং ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের ধারণা রয়েছে। কৃষ্ণ যখন বলেন মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ তখন তিনি বোঝাচ্ছেন যে এই আত্মজ্ঞান ও সমদৃষ্টির পরিণতি পরম ভক্তি। লভতে অর্থ লাভ করে বা প্রাপ্ত হয় এবং পরাম্ অর্থ সর্বোচ্চ বা পরম। অর্থাৎ এটি সাধারণ ধর্মীয় আবেগ নয় বরং ঈশ্বরের প্রতি এমন এক গভীর প্রেমময় সম্পর্ক যেখানে ব্যক্তির অহংকেন্দ্রিকতা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়।

এই শ্লোকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বিষয় হলো জ্ঞান এবং ভক্তির সম্পর্ক। অনেক সময় মনে করা হয় জ্ঞান ও ভক্তি দুটি আলাদা পথ। কিন্তু এই শ্লোক তাদের মধ্যে গভীর ঐক্য প্রকাশ করে। ব্রহ্মভূত অবস্থায় পৌঁছানোর পর ব্যক্তি শোক ও আকাঙ্ক্ষার বন্ধন থেকে মুক্ত হয় এবং সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি লাভ করে। এই সমদৃষ্টির পরেই পরম ভক্তির উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ প্রকৃত আত্মজ্ঞান মানুষকে অনুভূতিহীন বা শুষ্ক করে না। বরং সত্যিকারের জ্ঞান তাকে আরও গভীর প্রেম ও ঈশ্বরনিষ্ঠার দিকে নিয়ে যেতে পারে। নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে জানার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যখন সমস্ত জীবনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করে তখন তার হৃদয় আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে এবং সেই ব্যাপকতার চূড়ান্ত প্রকাশ হতে পারে ঈশ্বরের প্রতি পরম ভক্তি।

বিভিন্ন বেদান্ত দর্শন এই শ্লোককে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে ব্রহ্মভূত হওয়া আত্মা ও ব্রহ্মের অভেদ উপলব্ধির সঙ্গে যুক্ত। ব্যক্তির সীমিত অহংকারের আড়ালে যে চৈতন্যস্বরূপ রয়েছে তা ব্রহ্মস্বরূপের সঙ্গে অভিন্ন এই উপলব্ধিই মুক্তির মূল। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ও পরমেশ্বরের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য হলেও সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। সেখানে ব্রহ্মসত্তায় প্রতিষ্ঠা মানে পরমেশ্বরের সঙ্গে জীবের চিরন্তন সম্পর্ক উপলব্ধি করা এবং তাঁর প্রতি পরম ভক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। দ্বৈত দর্শনে জীব ও ঈশ্বর চিরতরে পৃথক সত্তা এবং তাই ব্রহ্মভূত হওয়া ঈশ্বর হয়ে যাওয়া নয় বরং ঈশ্বরনিষ্ঠ ও মুক্ত অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। দর্শনগত ব্যাখ্যার এই পার্থক্য সত্ত্বেও একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট থাকে যে মানুষের সীমিত অহংকেন্দ্রিক পরিচয় অতিক্রম করে তার চেতনার উচ্চতর বিকাশ ঘটানোই এই শ্লোকের মূল উদ্দেশ্য।

শ্লোকটিকে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও গভীরভাবে বোঝা যায়। মানুষের মন প্রায়ই দুটি শক্তির মধ্যে দোল খায়। একটি হলো যা হারিয়েছি তার জন্য শোক এবং অন্যটি হলো যা পাইনি তার জন্য আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের মধ্যে আটকে থাকা মানুষ বর্তমান জীবনকে সম্পূর্ণভাবে অনুভব করতে পারে না। সে হয় অতীতের স্মৃতিতে বন্দী থাকে অথবা ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় অস্থির থাকে। প্রসন্নাত্মা এই দোলাচলের বাইরে অন্তরের একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাকে নির্দেশ করে। সেখানে মানুষ নিজের মূল্যকে কোনো একটি সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে এক করে দেখে না। তার জীবনে লক্ষ্য থাকে কিন্তু লক্ষ্য তার অস্তিত্বের একমাত্র পরিচয় হয় না। তার দুঃখ থাকে কিন্তু দুঃখ তার সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করে না। তার কর্ম থাকে কিন্তু কর্মফল তার আত্মমূল্যের একমাত্র ভিত্তি হয়ে ওঠে না।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। ব্রহ্মভূত মানুষকে সীমাবদ্ধ খাঁচা থেকে মুক্ত আকাশে উড়ে যাওয়া পাখির সঙ্গে তুলনা করা যায়। খাঁচা হলো সংকীর্ণ অহংকার এবং আকাশ হলো অসীম চেতনার প্রতীক। প্রসন্নাত্মা একটি নির্মল আয়নার মতো। আয়না যত পরিষ্কার হয় তত স্পষ্টভাবে প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তেমনি মন যত নির্মল হয় আত্মসত্য তত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। আবার ন শোচতি এবং ন কাঙ্ক্ষতি মানুষের মনকে একটি দোলনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। একদিকে অতীতের শোক এবং অন্যদিকে ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা মনকে দোলাতে থাকে। সমদৃষ্টি সেই দোলনার কেন্দ্রে স্থির হয়ে যাওয়ার মতো। তখন মানুষ জীবনের পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও একটি গভীর অন্তর্গত ভারসাম্য অনুভব করতে পারে।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন মানুষ ব্যবসায় বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তিনি দুঃখ পাবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি তিনি মনে করেন যে এই ক্ষতিই তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্বের পরিচয় এবং তাঁর জীবন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে গেছে তবে তিনি শোকের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়বেন। অন্যদিকে যদি তিনি বলেন যে ক্ষতি হয়েছে, এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে, আবার চেষ্টা করতে হবে এবং এই ঘটনা আমার সম্পূর্ণ সত্তাকে সংজ্ঞায়িত করে না তাহলে তাঁর মধ্যে ন শোচতি ভাবের একটি বাস্তব প্রকাশ দেখা যায়। একইভাবে কেউ পদোন্নতি, অর্থ বা সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু যদি মনে করেন নির্দিষ্ট ফল না পাওয়া পর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ মানুষ নন তবে আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আর যদি লক্ষ্যকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন কিন্তু নিজের অন্তরের শান্তিকে ফলের হাতে সমর্পণ না করেন তবে তিনি ন কাঙ্ক্ষতি ভাবের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন।

এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে আকাঙ্ক্ষাহীনতা মানে কর্মহীনতা নয় এবং শোকহীনতা মানে অনুভূতিহীনতা নয়। একজন জ্ঞানী মানুষও দুঃখ অনুভব করতে পারেন, কিন্তু দুঃখের মধ্যে ডুবে নিজের প্রকৃত সত্তাকে হারিয়ে ফেলেন না। তিনি ইচ্ছা রাখতে পারেন, কিন্তু ইচ্ছার দ্বারা নিজের পূর্ণতা নির্ধারণ করেন না। তিনি কর্ম করেন, কিন্তু কর্মফলকে নিজের আত্মপরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি বানান না। তিনি মানুষের পার্থক্য বোঝেন, কিন্তু অন্তর্নিহিত জীবনের মর্যাদাকে অস্বীকার করেন না। এই কারণেই ব্রহ্মভূত অবস্থাকে নিষ্ক্রিয়তা নয় বরং গভীর অন্তর্গত স্বাধীনতার প্রতীক বলা যায়।

সমগ্র শ্লোকটিকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসেবে দেখলে এর সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়। প্রথমে আসে ব্রহ্মভূত হওয়া, অর্থাৎ নিজের প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। তার ফল হয় প্রসন্নাত্মা, অর্থাৎ অন্তরের স্বচ্ছতা ও শান্তি। এই শান্তির ফলে অতীতের শোক এবং ভবিষ্যতের অস্থির আকাঙ্ক্ষা দুর্বল হয়। এরপর ব্যক্তি সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি অর্জন করে। আর এই সমদৃষ্টি শেষ পর্যন্ত তাকে পরম ভক্তির দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের অন্তর থেকে শুরু হয়ে এই যাত্রা সমস্ত জীবের দিকে বিস্তৃত হয় এবং শেষে পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে পূর্ণতা লাভ করে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত মানুষের পরিচয় সম্পর্কে। আমরা সাধারণত নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করি দেহ, পরিবার, পেশা, সম্পদ, সামাজিক অবস্থান, সাফল্য এবং ব্যর্থতার মাধ্যমে। কিন্তু গীতা প্রশ্ন করে এই পরিচয়গুলো কি সত্যিই আমাদের সম্পূর্ণ পরিচয়। দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সম্পদ আসে এবং চলে যায়, সাফল্য ও ব্যর্থতা পর্যায়ক্রমে আসে। তাহলে এমন কী আছে যার ওপর মানুষের গভীরতম পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ব্রহ্মভূত ধারণা সেই অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যায়। এটি মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের বাইরে নিজের চৈতন্যসত্তার দিকে তাকাতে শেখায়।

এই উপলব্ধির ফলেই প্রসন্নতা আসে। কারণ তখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার অস্তিত্ব কোনো একটি ঘটনা দ্বারা সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত নয়। সে বুঝতে পারে যে ক্ষতি জীবনের একটি ঘটনা, কিন্তু জীবন নিজেই ক্ষতি নয়। ব্যর্থতা একটি অভিজ্ঞতা, কিন্তু ব্যর্থতা তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সাফল্য একটি অর্জন, কিন্তু সাফল্য তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত অর্থ নয়। এই উপলব্ধি মানুষকে গভীর ভারসাম্য দেয়। সেই ভারসাম্য থেকেই শোক ও আকাঙ্ক্ষার ওপর স্বাধীনতা আসে।

সবশেষে পরম ভক্তির কথা বলা হয়েছে। এখানে যেন সমগ্র দর্শনের একটি সুন্দর পরিণতি প্রকাশিত হয়েছে। আত্মজ্ঞান যদি সত্য হয় তবে তা মানুষের হৃদয়কে সংকুচিত করবে না। বরং তাকে আরও বিস্তৃত করবে। সে নিজের মধ্যে যে চৈতন্য উপলব্ধি করবে অন্যের মধ্যেও সেই জীবনের মূল্য অনুভব করবে। সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি থেকে জন্ম নেবে করুণা এবং সেই করুণার গভীরতম ভিত্তিতে সে পরম সত্তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করতে পারবে। তখন ভক্তি কোনো বাহ্যিক আচার মাত্র থাকবে না। তা হয়ে উঠবে অস্তিত্বের অন্তর্গত প্রেম।

অতএব ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বাণী নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি গভীর মানচিত্র। ব্রহ্মভূত আমাদের শেখায় নিজের প্রকৃত সত্তাকে অনুসন্ধান করতে। প্রসন্নাত্মা শেখায় অন্তরকে নির্মল ও শান্ত করতে। ন শোচতি শেখায় অতীতের বন্ধন অতিক্রম করতে। ন কাঙ্ক্ষতি শেখায় ভবিষ্যতের অতিরিক্ত তৃষ্ণা থেকে মুক্ত হতে। সমঃ সর্বেষু ভূতেষু শেখায় সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি ও করুণা ধারণ করতে। আর মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্ শেখায় যে এই জ্ঞান, শান্তি ও সমদৃষ্টির পরিণতি হতে পারে পরম ঈশ্বরপ্রেম।

শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক মানুষের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা কি আমাদের হারানো জিনিসের সমষ্টি, নাকি আমাদের আকাঙ্ক্ষিত জিনিসের সমষ্টি, নাকি তারও গভীরে এমন কোনো চিরন্তন সত্তা আছে যা লাভ ও ক্ষতির ঊর্ধ্বে। গীতার উত্তর হলো মানুষের প্রকৃত বিকাশ তখনই শুরু হয় যখন সে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখে। সেই উপলব্ধি অন্তরকে প্রসন্ন করে, শোক ও আকাঙ্ক্ষার বন্ধন শিথিল করে, সকল জীবের প্রতি সমদৃষ্টি সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে পরম ভক্তির দিকে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো নিজের গভীরতম সত্যকে জানো, অন্তরকে নির্মল করো, অতীতের শোক ও ভবিষ্যতের তৃষ্ণার দাস হয়ো না, সকল জীবের মধ্যে জীবনের মর্যাদা উপলব্ধি করো এবং সেই সর্বব্যাপী সত্যের প্রতি প্রেম ও ভক্তিতে নিজেকে সমর্পণ করো। এই পথেই জ্ঞান শান্তিতে পরিণত হয়, শান্তি সমদৃষ্টিতে পরিণত হয় এবং সমদৃষ্টি শেষ পর্যন্ত পরম ভক্তিতে পূর্ণতা লাভ করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি