ভগবদ্গীতা ১৮.৬ — আসক্তি ও ফলত্যাগে কর্তব্যকর্ম: কর্মযোগের শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব
এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।
কর্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্।।৬।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! এই সমস্ত কর্ম আসক্তি ও ফলের আশা পরিত্যাগ করে কর্তব্যবোধে অনুষ্ঠান করা উচিত। ইহাই আমার নিশ্চিত উত্তম অভিমত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ কর্ম, আসক্তি, ফলত্যাগ এবং কর্তব্যের মধ্যে এক গভীর সমন্বয়ের শিক্ষা দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো “এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ। কর্তব্যাণীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্।” এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো, হে পার্থ, এই সমস্ত কর্মও আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্তব্য বলে সম্পাদন করা উচিত। এটিই আমার নিশ্চিত ও শ্রেষ্ঠ মত। এই অল্প কয়েকটি শব্দের মধ্যেই গীতার কর্মযোগের একটি গভীর ও পরিণত দর্শন প্রকাশিত হয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে কর্ম থেকে দূরে সরে যেতে বলেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কর্মের মধ্যেই থেকে মানুষ নিজের মনকে আসক্তি ও ফললোভ থেকে মুক্ত করতে পারে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কর্মাণি। এটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন কর্ম শব্দের বহুবচন রূপ। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কোনো কার্য সম্পন্ন করা। মানুষের সমগ্র জীবনই কোনো না কোনো কর্মের সঙ্গে যুক্ত। চিন্তা করা, কথা বলা, জীবিকা অর্জন করা, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করা, জ্ঞান অর্জন করা, অন্যের উপকার করা এবং নিজের নৈতিক কর্তব্য পালন করা সবই কর্মের অন্তর্ভুক্ত। তাই গীতার কর্মদর্শনে কর্ম কেবল বাহ্যিক কোনো কাজ নয়। মানুষের উদ্দেশ্য, মানসিকতা এবং দায়িত্ববোধও তার কর্মের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই কারণে কর্মকে পরিত্যাগ করা মানে শুধু কাজ বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
এরপর আসে সঙ্গ শব্দটি। সঙ্গের অর্থ সংযোগ, আসক্তি, লেগে থাকা বা কোনো কিছুর সঙ্গে গভীর মানসিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে সঙ্গ বলতে সাধারণ সম্পর্ক বোঝানো হয় না। এখানে বিশেষভাবে বোঝানো হয়েছে কর্ম ও কর্মফলের সঙ্গে এমন এক মানসিক আসক্তি, যার কারণে মানুষ নিজের শান্তি, আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্থিতি সম্পূর্ণভাবে ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে। একজন মানুষ যখন মনে করে যে তার সাফল্যই তার মূল্য, তার সম্পদই তার পরিচয়, তার প্রশংসাই তার মর্যাদা এবং তার ব্যর্থতাই তার অস্তিত্বের পরাজয়, তখন সে কর্মের সঙ্গে গভীর আসক্তিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই আসক্তিই মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি বলেননি কর্ম ত্যাগ করতে। তিনি বলেছেন সঙ্গং ত্যক্ত্বা, অর্থাৎ আসক্তি ত্যাগ করে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গভীর। কর্মকে ত্যাগ করা এবং কর্মের প্রতি আসক্তিকে ত্যাগ করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ তার কর্তব্য পালন করবে, কাজ করবে, চেষ্টা করবে এবং নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য ব্যবহার করবে। কিন্তু সেই কাজের সঙ্গে নিজের অহংকারকে এমনভাবে যুক্ত করবে না যে ফলাফল তার মানসিক শান্তির একমাত্র ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। বাহ্যিকভাবে সে কর্মরত থাকবে, কিন্তু অন্তরে থাকবে অনাসক্তি। এই অবস্থাই গীতার কর্মযোগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আদর্শ।
শ্লোকে ফলানি শব্দটিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফল বলতে সাধারণভাবে কোনো কর্মের পরিণাম বা ফলাফল বোঝায়। কিন্তু গীতার দর্শনে কর্মফল বলতে শুধু অর্থ, সম্পদ বা সাফল্য বোঝানো হয় না। এর মধ্যে রয়েছে প্রশংসা, সম্মান, প্রতিপত্তি, বিজয়, লাভ, সামাজিক স্বীকৃতি এবং নিজের প্রত্যাশিত যেকোনো ফল। মানুষ সাধারণত কাজ করার সময় ফলের কথা চিন্তা করে। সে মনে করে আমি এই কাজটি করলে কী পাব। এই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ধীরে ধীরে কর্মকে স্বার্থের সঙ্গে আবদ্ধ করে। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো ফলের অস্তিত্ব অস্বীকার করা নয়, বরং ফলের প্রতি এমন আসক্তি ত্যাগ করা যাতে ফলাফল মানুষের কর্তব্যবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
ফলত্যাগের অর্থ তাই কখনোই এই নয় যে মানুষ নিজের কাজের ফলাফল সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে। বরং এর অর্থ হলো মানুষ তার কর্তব্যকে ফলের তুলনায় উচ্চতর স্থানে স্থাপন করবে। একজন ছাত্র পড়াশোনা করবে। সে ভালো ফলাফল কামনা করতেই পারে। কিন্তু তার সমস্ত আত্মমর্যাদা যদি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে, তবে সে উদ্বেগ ও ভয়ের দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে সে যদি মনে করে আমার কর্তব্য হলো আন্তরিকভাবে পড়াশোনা করা, জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া, তাহলে তার মন অনেক বেশি স্থির থাকবে। ফলাফল তখন তার জীবনের একটি অংশ হবে, তার সমগ্র পরিচয় হবে না।
এই প্রসঙ্গে কর্তব্যাণি শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কর্তব্য শব্দটি কৃ ধাতু থেকে গঠিত এবং এর অর্থ যা করা উচিত, যা সম্পাদন করা নৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় বা যা করণীয়। গীতার দৃষ্টিতে কর্তব্য হলো এমন কর্ম যা ন্যায়, ধর্ম, দায়িত্ব ও বৃহত্তর কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। কর্তব্যের ভিত্তি হলো নিজের ব্যক্তিগত লাভ নয়, বরং সঠিক কাজ করার উপলব্ধি। একজন শিক্ষক জ্ঞান দান করেন, একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করেন, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, একজন অভিভাবক সন্তানের যত্ন নেন এবং একজন নাগরিক সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কাজের প্রকৃত মহত্ত্ব তখনই প্রকাশ পায় যখন ব্যক্তি শুধু নিজের লাভের কথা না ভেবে কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করেন।
নিশ্চিতং মতম্ উত্তমম্ এই অংশে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বক্তব্যের দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। মত অর্থ চিন্তা, অভিমত বা সিদ্ধান্ত। নিশ্চিত মত হলো সুস্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত। উত্তম অর্থ শ্রেষ্ঠ বা সর্বোৎকৃষ্ট। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ এখানে কেবল একটি সাধারণ পরামর্শ দিচ্ছেন না। তিনি কর্ম ও ত্যাগের প্রকৃত সমন্বয় সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত প্রকাশ করছেন। সেই সিদ্ধান্ত হলো কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মের প্রতি আসক্ত হওয়া যাবে না এবং ফলকে নিজের অহংকারের বিষয় বানানো যাবে না।
এই শিক্ষার মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত আছে। মানুষের নিয়ন্ত্রণ সীমিত, কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষা অসীম। মানুষ নিজের চেষ্টা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু ফলাফলের সমস্ত কারণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একজন কৃষক জমি প্রস্তুত করতে পারেন, বীজ বপন করতে পারেন, পানি দিতে পারেন এবং যত্ন নিতে পারেন। কিন্তু বৃষ্টি, আবহাওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অসংখ্য অন্যান্য কারণ তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই কৃষকের প্রকৃত কর্তব্য হলো নিজের কাজ যথাসম্ভব সঠিকভাবে করা। ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তার কর্মক্ষমতাকে নষ্ট করতে পারে। এই সত্য মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
মানুষের মানসিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষার গভীর প্রভাব রয়েছে। যখন একজন মানুষ নিজের সমস্ত সুখকে ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে, তখন বর্তমান মুহূর্ত তার কাছে অস্থির হয়ে ওঠে। সে ভাবে যখন আমি সফল হব তখন সুখী হব, যখন সবাই আমাকে স্বীকৃতি দেবে তখন শান্তি পাব, যখন আমার প্রত্যাশা পূর্ণ হবে তখন জীবন সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু এই মানসিকতা মানুষকে বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। গীতার কর্মদর্শন তাকে বর্তমানের কর্তব্যের মধ্যে ফিরিয়ে আনে। মানুষকে বলা হয় নিজের কাজকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সম্পাদন করতে এবং ফলাফলের ওপর অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা কমাতে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মযোগ আসলে একটি গভীর মানসিক স্বাধীনতার শিক্ষা। সাধারণ মানুষ মনে করে স্বাধীনতা মানে নিজের ইচ্ছামতো সবকিছু পাওয়া। গীতা এর চেয়েও গভীর একটি স্বাধীনতার কথা বলে। প্রকৃত স্বাধীনতা হলো এমন অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ফলাফল আমার ইচ্ছামতো না হলেও আমি আমার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হব না। প্রশংসা পেলেও আমি অহংকারী হব না এবং নিন্দা পেলেও ভেঙে পড়ব না। সাফল্য এলে আমি নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবব না এবং ব্যর্থতা এলে নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করব না। এই সমত্ববোধই কর্মযোগের অন্তর্নিহিত শক্তি।
এই শিক্ষাকে একটি তীরন্দাজের উদাহরণ দিয়ে সহজভাবে বোঝা যায়। একজন তীরন্দাজের কাজ হলো লক্ষ্য নির্ধারণ করা, ধনুক প্রস্তুত করা, নিজের শরীর ও মনকে স্থির করা এবং যথাসম্ভব নিখুঁতভাবে তীর ছোড়া। তীর ছোড়ার পর তার ফলাফলে আরও অনেক বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তার প্রকৃত দক্ষতা হলো তীর ছোড়ার আগে পূর্ণ প্রস্তুতি এবং তীর ছোড়ার সময় পূর্ণ একাগ্রতা। তীর ছোড়ার পরে ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ তার পরবর্তী কর্মকে দুর্বল করে দিতে পারে। মানুষের জীবনেও একই সত্য কাজ করে। আমাদের কর্তব্য হলো যথাসাধ্য সৎ ও দক্ষভাবে কাজ করা। ফলাফলকে জীবনের একমাত্র বিচারক বানানো নয়।
এই শ্লোকের মধ্যে ত্যাগের ধারণাটিও নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সাধারণভাবে ত্যাগ বলতে মানুষ কোনো বস্তু, সম্পদ বা কাজ ছেড়ে দেওয়াকে বোঝে। কিন্তু গীতার ত্যাগ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। এখানে ত্যাগ মূলত অন্তরের আসক্তির ত্যাগ। একজন মানুষ সংসারে থেকেও ত্যাগী হতে পারেন, যদি তিনি নিজের কর্তব্য পালন করেন কিন্তু লোভ, অহংকার ও ফলের প্রতি অন্ধ আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত না হন। আবার কেউ বাহ্যিকভাবে অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েও অন্তরে আসক্ত থাকতে পারেন। তাই প্রকৃত ত্যাগ বাহ্যিক অবস্থার চেয়ে চেতনার অবস্থার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের অহংবোধকে প্রশ্ন করে। মানুষ সাধারণত ভাবে আমি কর্তা, আমি অর্জনকারী এবং আমি ফলের অধিকারী। এই আমি বোধ যত প্রবল হয়, কর্মের বন্ধনও তত শক্তিশালী হয়। কিন্তু অনাসক্ত কর্মের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারে যে তার কর্ম বৃহত্তর একটি বিশ্বব্যবস্থার অংশ। সে নিজের কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু সমস্ত কৃতিত্ব নিজের অহংকারের সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে না। এই চেতনা মানুষকে বিনয়ী, স্থির এবং অন্তর্মুখী করে।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে কর্ম হলো জীবনের পথ, সঙ্গ হলো পথের সঙ্গে অতিরিক্ত আসক্তি, ফল হলো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা এবং কর্তব্য হলো বর্তমান মুহূর্তে সঠিক কাজের আহ্বান। মানুষ প্রায়ই ভবিষ্যতের ফলের চিন্তায় বর্তমানের কাজকে হারিয়ে ফেলে। গীতার এই শিক্ষা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে আমাদের হাতে নেই, কিন্তু বর্তমানের সৎ কর্ম অনেকাংশে আমাদের হাতে রয়েছে। তাই জীবনের প্রকৃত সাধনা হলো বর্তমানের কর্তব্যকে পূর্ণতার সঙ্গে সম্পাদন করা।
এই শিক্ষা আধুনিক জীবনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কর্মক্ষেত্রে একজন মানুষ পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি বা প্রশংসার প্রত্যাশায় কাজ করতে পারেন। এগুলো স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু যদি এগুলোর অনুপস্থিতিতে তিনি নিজের কাজের অর্থ হারিয়ে ফেলেন, তবে তার কর্মজীবন ক্রমাগত হতাশার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে একজন শিল্পী যদি শুধু মানুষের প্রশংসার জন্য সৃষ্টি করেন, তবে তার সৃষ্টিশীলতা বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একজন গবেষক যদি শুধু পুরস্কারের জন্য গবেষণা করেন, তবে জ্ঞানের প্রতি তার প্রকৃত অনুসন্ধিৎসা দুর্বল হতে পারে। কিন্তু যদি প্রত্যেকে নিজের কর্তব্য ও কাজের অন্তর্নিহিত মূল্যকে গুরুত্ব দেন, তাহলে কর্ম আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অতএব এই শ্লোকের প্রকৃত শিক্ষা কর্মবিমুখতা নয়, কর্মের পরিশুদ্ধি। এখানে কর্মকে ত্যাগ করা হয় না, কর্মের সঙ্গে যুক্ত অহংকার ও অন্ধ ফললোভকে ত্যাগ করা হয়। ফলকে অস্বীকার করা হয় না, ফলের ওপর নিজের সম্পূর্ণ মানসিক অস্তিত্ব নির্ভরশীল করা হয় না। জীবন থেকে দায়িত্ব সরিয়ে নেওয়া হয় না, বরং দায়িত্বকে আরও পবিত্র করা হয়। মানুষকে বলা হয় নিজের কাজকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করতে এবং সেই কর্তব্যকে সততা, নিষ্ঠা ও অনাসক্তির সঙ্গে সম্পাদন করতে।
সবশেষে বলা যায়, “এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ। কর্তব্যাণীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্” শ্লোকটি মানুষের কর্মজীবন ও অন্তর্জীবনের মধ্যে একটি গভীর সেতুবন্ধন তৈরি করে। কর্ম আমাদের জীবনকে পরিচালিত করে, কর্তব্য আমাদের নৈতিক দিশা দেয়, অনাসক্তি আমাদের মানসিক স্বাধীনতা দেয় এবং ফলত্যাগ আমাদের অহংকার ও উদ্বেগ থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে। শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে জীবনের মহত্ত্ব শুধু আমরা কত কিছু অর্জন করেছি তার মধ্যে নয়, বরং আমরা কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের কর্তব্য পালন করেছি তার মধ্যেও নিহিত। প্রকৃত ত্যাগ কর্ম ছেড়ে দেওয়া নয়, কর্মের মধ্যে থেকেও আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করা। প্রকৃত কর্মযোগ হলো এমনভাবে কাজ করা যাতে হাতে থাকে কর্ম, মনে থাকে কর্তব্য এবং অন্তরে থাকে অনাসক্তি। এই অবস্থাতেই কর্ম ধীরে ধীরে বন্ধন থেকে সাধনায় এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে আত্মোন্নতির পথে রূপান্তরিত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!