ভগবদ্গীতা ১৮.৬৫ — ঈশ্বরে মন, পরম ভক্তি, উপাসনা ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রাপ্তি
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।৬৫।।
অনুবাদঃ তুমি আমাতে চিত্ত অর্পণ কর, আমর ভক্ত হও, আমার পূজা কর এবং আমাকে নমস্কার কর। তা হলে তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় হবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের পঁয়ষট্টিতম শ্লোকটি গীতার ভক্তিতত্ত্বের অন্যতম গভীর ও হৃদয়স্পর্শী ঘোষণা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু। মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োসি মে।” এর সহজ অর্থ হলো, আমাতে মন স্থাপন করো, আমার ভক্ত হও, আমার উপাসনা করো এবং আমাকে প্রণাম করো। তাহলে তুমি অবশ্যই আমাকে লাভ করবে। আমি তোমাকে সত্য বলে প্রতিজ্ঞা করছি, কারণ তুমি আমার প্রিয়। কয়েকটি সংক্ষিপ্ত পদের মধ্যে এই শ্লোক মানুষের মন, হৃদয়, কর্ম, অহংকার, ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক গভীর দর্শনকে ধারণ করে আছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো মন্মনা। সংস্কৃত মন্মনা শব্দটি মূলত মৎ এবং মনস্ ভাবের সমন্বয় থেকে গঠিত। মৎ অর্থ আমার এবং মনস্ অর্থ মন। মনস্ শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত মन् ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ চিন্তা করা, মনন করা, ভাবা বা মানসিকভাবে কোনো বিষয়কে ধারণ করা। বাংলার মন, মনন, মনীষা এবং মননশীলতার মধ্যেও এই একই ভাবধারার প্রতিফলন দেখা যায়। তাই মন্মনা শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো আমাতে মন স্থাপনকারী বা যার মন আমার মধ্যে নিবদ্ধ। কৃষ্ণ যখন বলেন মন্মনা ভব, তখন তিনি কেবল মাঝে মাঝে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করার কথা বলছেন না। তিনি মানুষের চিন্তার কেন্দ্রকে পরিবর্তন করার কথা বলছেন। মানুষের মন সর্বদাই কোনো না কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে থাকে। কখনো অর্থ, কখনো ক্ষমতা, কখনো সম্মান, কখনো ভয়, কখনো ইন্দ্রিয়সুখ এবং কখনো ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিন্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কৃষ্ণের শিক্ষা হলো, এই বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রগুলোর পরিবর্তে পরম সত্যকে জীবনের কেন্দ্রে স্থাপন করা।
মন্মনা শব্দের পর এসেছে ভব। ভব শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে এসেছে। ভূ ধাতুর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা হয়ে ওঠা। তাই ভব অর্থ শুধু কোনো কাজ করা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় পরিণত হওয়া। মন্মনা ভবের গভীর তাৎপর্য হলো, ঈশ্বরকে কেবল চিন্তা করো না, এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠো যার জীবন ঈশ্বরচিন্তায় পরিচালিত হয়। এখানে সাময়িক স্মরণের পরিবর্তে চরিত্রগত রূপান্তরের নির্দেশ রয়েছে। ঈশ্বরস্মরণ যেন জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন আচার না হয়ে জীবনের স্বাভাবিক চেতনা হয়ে ওঠে, এই হলো এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা।
এরপর কৃষ্ণ বলেন মদ্ভক্তো। মদ্ভক্ত শব্দটি মৎ এবং ভক্ত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ভক্ত শব্দটি সংস্কৃত ভজ্ ধাতু থেকে এসেছে। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশগ্রহণ করা, সেবা করা, উপাসনা করা এবং সম্পর্ক স্থাপনের মতো অর্থ রয়েছে। এই কারণে ভক্ত শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু উপাসনাকারী নয়। ভক্ত হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং নিজের জীবনকে সেই সম্পর্কের আলোকে পরিচালিত করেন। মদ্ভক্তো অর্থ আমার ভক্ত হও। কিন্তু এই ভক্তি কেবল বাহ্যিক পূজা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রেম, বিশ্বাস, স্মরণ, শ্রদ্ধা, সেবা এবং আত্মনিবেদন। জ্ঞান যেখানে ঈশ্বরকে জানতে চায়, ভক্তি সেখানে ঈশ্বরকে ভালোবাসতে চায়। তাই মদ্ভক্তো মানুষের হৃদয়কে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬ — সর্বধর্ম ত্যাগ, ঈশ্বরের শরণাগতি ও পরম মুক্তির মহাবাণী
পরবর্তী পদ মদ্যাজী। এটি মৎ এবং যাজী ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। যাজী শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত যজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। যজ্ ধাতুর অর্থ যজ্ঞ করা, পূজা করা, উপাসনা করা, সম্মান করা এবং নিবেদন করা। যজ্ঞ শব্দটিও এই ধাতু থেকেই এসেছে। মদ্যাজী অর্থ আমার উদ্দেশ্যে যজ্ঞকারী হও অথবা আমার উপাসনা করো। তবে গীতার বৃহত্তর দর্শনে যজ্ঞকে শুধু অগ্নিতে আহুতি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। যজ্ঞের গভীর অর্থ হলো নিজের কর্ম, শক্তি, সময় এবং সামর্থ্যকে কোনো বৃহত্তর ও পবিত্র উদ্দেশ্যের জন্য নিবেদন করা। একজন শিক্ষক যখন জ্ঞান বিতরণ করেন, একজন চিকিৎসক যখন মানুষের সেবা করেন, একজন সৎ কর্মী যখন নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন এবং একজন মানুষ যখন নিজের কর্মের ফলকে ব্যক্তিগত অহংকারের সম্পদ হিসেবে না দেখে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন, তখন সেই কর্মও যজ্ঞের ভাব ধারণ করতে পারে। মদ্যাজী তাই মানুষের কর্মজীবনকে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত করে।
এরপর আসে মাং নমস্কুরু। মাং অর্থ আমাকে এবং নমস্কুরু অর্থ আমাকে নমস্কার করো বা প্রণাম করো। নমস্কার শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত নমস্ এবং কৃ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। নমস্ অর্থ নত হওয়া, প্রণতি বা শ্রদ্ধা এবং কৃ অর্থ করা। তাই নমস্কারের আক্ষরিক অর্থ প্রণতি করা। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে নমস্কার শুধু শরীর নত করা নয়। এটি অহংকারকে নত করার প্রতীক। মানুষ সাধারণত নিজেকে কর্তা, নিয়ন্ত্রক এবং নিজের জীবনের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়। নমস্কার সেই অহংকেন্দ্রিকতার সামনে একটি ভিন্ন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। মানুষ স্বীকার করে যে তার চেয়ে বৃহত্তর একটি সত্য রয়েছে এবং সেই সত্যের সামনে তার অহংকারকে নত হতে হবে। এই কারণে প্রণাম ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিতে কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, আত্মসমর্পণের একটি গভীর প্রতীক।
শ্লোকটির পরবর্তী অংশ হলো মামেবৈষ্যসি। এখানে মাম্ অর্থ আমাকে, এব অর্থ অবশ্যই বা আমাকেই এবং এষ্যসি অর্থ তুমি আসবে বা লাভ করবে। এষ্যসি শব্দটি সংস্কৃত ই ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। আধ্যাত্মিক অর্থে মামেবৈষ্যসি বলতে বোঝায় তুমি আমার কাছেই পৌঁছাবে বা আমাকে লাভ করবে। এখানে ঈশ্বরলাভকে জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে ঈশ্বরলাভকে কেবল কোনো বাহ্যিক স্থান অর্জনের মতো বোঝা যথেষ্ট নয়। এটি চেতনার একটি গভীর রূপান্তর। মানুষের মন যখন ঈশ্বরের দিকে স্থির হয়, হৃদয় যখন ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করে, কর্ম যখন নিবেদনে পরিণত হয় এবং অহংকার যখন নত হয়, তখন মানুষের অন্তর্জীবন ধীরে ধীরে ঈশ্বরমুখী হয়ে ওঠে।
এরপর কৃষ্ণ বলেন সত্যং তে প্রতিজানে। সত্য শব্দটি সৎ ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সৎ অর্থ অস্তিত্বশীল, বাস্তব বা সত্য। প্রতিজানে শব্দের মধ্যে প্রতিজ্ঞা বা দৃঢ় অঙ্গীকারের ভাব রয়েছে। কৃষ্ণ এখানে শুধু একটি ধর্মীয় বিধান ঘোষণা করছেন না। তিনি অর্জুনকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বাস দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, আমি তোমাকে সত্য বলে প্রতিজ্ঞা করছি। এই অংশটি শ্লোকটির আবেগময় গভীরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ ঈশ্বর এখানে কেবল একজন বিধানদাতা নন, তিনি একজন আশ্বাসদাতা। সাধক যখন সংশয়, ভয় এবং দুর্বলতার মধ্যে থাকে, তখন ঈশ্বরের এই প্রতিশ্রুতি তাকে আস্থা দেয় যে আন্তরিক ঈশ্বরমুখী জীবন কখনো বৃথা যায় না।
সবশেষে আসে প্রিয়োসি মে। প্রিয় অর্থ প্রিয়, অসি অর্থ তুমি আছ এবং মে অর্থ আমার। অর্থাৎ তুমি আমার প্রিয়। এই কয়েকটি শব্দ সমগ্র শ্লোকটির হৃদয়। কৃষ্ণ অর্জুনকে কেবল কর্তব্য পালন করার নির্দেশ দেননি। তিনি তাকে জানিয়েছেন যে সে তাঁর প্রিয়। এখানে ঈশ্বর ও মানুষের সম্পর্ক কেবল ভয়, শাস্তি বা কর্তব্যের সম্পর্ক নয়। এর গভীরে রয়েছে প্রেম। মানুষ ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যায় কেবল মুক্তি পাওয়ার জন্য নয়, ঈশ্বরের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপনের জন্য। এই কারণে গীতার ভক্তিতত্ত্বে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে প্রেম একটি মৌলিক সত্য।
সমগ্র শ্লোকটিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কৃষ্ণ মানুষের জীবনের চারটি প্রধান স্তরকে একত্রিত করেছেন। মন্মনা মানুষের মনকে ঈশ্বরের দিকে পরিচালিত করে। মদ্ভক্তো হৃদয়কে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করে। মদ্যাজী কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে। মাং নমস্কুরু অহংকারকে ঈশ্বরের সামনে নত করে। অর্থাৎ মন, হৃদয়, কর্ম এবং অহংকারকে একই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে একত্রিত করা হয়েছে। এই কারণে শ্লোকটি কেবল ভক্তির একটি সাধারণ নির্দেশ নয়। এটি মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে রূপান্তরিত করার একটি সাধনাপথ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গভীরতা অসাধারণ। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে কৃষ্ণের আমি ভাবকে পরম ব্রহ্মের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায় এবং ঈশ্বরচিন্তা শেষ পর্যন্ত আত্মস্বরূপের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ঈশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিবেদন করাই তার স্বাভাবিক ধর্ম। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীব পৃথক সত্তা এবং ভক্তির মাধ্যমে জীব ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করে। দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও একটি সাধারণ সত্য এখানে স্পষ্ট। মানুষের সীমিত আত্মকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করাই এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও মন্মনা ভব একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। মানুষ যে বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করে, ধীরে ধীরে তার মূল্যবোধ, অভ্যাস এবং আচরণ সেই বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়। অর্থকে জীবনের কেন্দ্র করলে জীবন অর্থকেন্দ্রিক হয়। ক্ষমতাকে কেন্দ্র করলে জীবন ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়। ভয়কে কেন্দ্র করলে জীবন ভয় দ্বারা পরিচালিত হয়। আর পরম সত্যকে কেন্দ্র করলে মানুষের চিন্তা ও কর্ম ধীরে ধীরে উচ্চতর মূল্যবোধের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই অর্থে মন্মনা হলো মনকে একটি উচ্চতর আদর্শের দিকে প্রশিক্ষিত করার শিক্ষা।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী দৃষ্টিতে এই শ্লোকটিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মন এখানে মানুষের অন্তর্জগতের প্রতীক। ভক্তি প্রতীক হয়ে ওঠে প্রেম ও সম্পর্কের। যজ্ঞ প্রতীক হয়ে ওঠে আত্মনিবেদনের। নমস্কার প্রতীক হয়ে ওঠে অহংকার ত্যাগের। আর প্রিয়োসি মে প্রতীক হয়ে ওঠে ঈশ্বরীয় প্রেমের। মানুষের অন্তরে যে বিচ্ছিন্নতা, অস্থিরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা থাকে, এই শ্লোক তার বিপরীতে একটি ঐক্যবদ্ধ জীবনদর্শন উপস্থাপন করে। চিন্তা, অনুভূতি, কর্ম এবং আত্মবোধ যখন একই পরম সত্যের দিকে পরিচালিত হয়, তখন জীবনের মধ্যে একটি গভীর সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়।
বাস্তব জীবনের একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ যদি কোনো মহান আদর্শকে সত্যিই জীবনের কেন্দ্র করে নেন, তাহলে শুধু সেই আদর্শের কথা চিন্তা করলেই হয় না। তার চিন্তা, ভালোবাসা, কর্ম এবং আচরণও সেই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। একজন সত্যনিষ্ঠ শিক্ষক জ্ঞানের আদর্শকে কেবল শ্রেণিকক্ষে স্মরণ করেন না, নিজের জীবনেও তা প্রকাশ করেন। একজন প্রকৃত সেবক মানুষের সেবাকে শুধু একটি কাজ হিসেবে দেখেন না, বরং নিজের জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। একইভাবে ভক্ত যখন ঈশ্বরকে জীবনের কেন্দ্র করেন, তখন ঈশ্বরস্মরণ তার চিন্তায়, ঈশ্বরপ্রেম তার হৃদয়ে, ঈশ্বরনিবেদন তার কর্মে এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রণতি তার অহংবোধে প্রকাশ পায়।
এইভাবে দেখলে শ্লোকটির মধ্যে একটি গভীর অন্তর্জাগতিক যাত্রা প্রকাশিত হয়। প্রথমে মন ঈশ্বরের দিকে যায়। তারপর হৃদয় ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর কর্ম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। তারপর অহংকার ঈশ্বরের সামনে নত হয়। এই ধারার পরিণতিতে মানুষ ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হয়। তাই মন্মনা থেকে মামেবৈষ্যসি পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক পথ নিহিত রয়েছে। শুরুতে আছে মনকে ঈশ্বরের দিকে ফেরানো এবং শেষে আছে ঈশ্বরলাভের আশ্বাস।
সবচেয়ে গভীর বিষয় হলো, কৃষ্ণ এই শিক্ষার শেষে বলেন তুমি আমার প্রিয়। এর মাধ্যমে সমগ্র সাধনার ভিত্তি হয়ে ওঠে প্রেম। ঈশ্বরকে স্মরণ করা শুধু কর্তব্য নয়। ঈশ্বরকে উপাসনা করা শুধু নিয়ম নয়। কর্মকে নিবেদন করা শুধু আচার নয়। প্রণাম করাও শুধু শারীরিক ভঙ্গি নয়। এগুলোর অন্তর্গত প্রাণ হলো ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেমময় সম্পর্ক। মানুষ যখন নিজের সীমিত অহংকারের কেন্দ্র থেকে সরে এসে পরম সত্যকে জীবনের কেন্দ্র করে, তখন তার চিন্তা পরিশুদ্ধ হয়, হৃদয় কোমল হয়, কর্ম পবিত্র হয় এবং আত্মবোধ গভীর হয়।
অতএব মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু কেবল একটি শ্লোকাংশ নয়। এটি মানুষের সম্পূর্ণ জীবনকে ঈশ্বরমুখী করার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর নির্দেশনা। মন্মনা শেখায় মনকে ঈশ্বরের মধ্যে স্থাপন করতে। ভব শেখায় সেই অবস্থায় সত্যিকারভাবে পরিণত হতে। মদ্ভক্তো শেখায় প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে। মদ্যাজী শেখায় নিজের কর্মকে পবিত্র উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে। মাং নমস্কুরু শেখায় অহংকারকে নত করতে। মামেবৈষ্যসি ঈশ্বরলাভের আশ্বাস দেয়। সত্যং তে প্রতিজানে সেই আশ্বাসকে প্রতিজ্ঞার মর্যাদা দেয়। আর প্রিয়োসি মে ঘোষণা করে যে এই সমগ্র আধ্যাত্মিক যাত্রার গভীরে রয়েছে ঈশ্বরীয় প্রেম।
সবকিছু মিলিয়ে এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত তার মন যে দিকে পরিচালিত হয় সেই দিকেই অগ্রসর হয়। তাই মনকে পরম সত্যের দিকে দাও, হৃদয়কে প্রেমে পূর্ণ করো, কর্মকে নিবেদন করো এবং অহংকারকে নত করো। তখন ঈশ্বরলাভ কোনো দূরবর্তী কল্পনা হয়ে থাকে না। তা মানুষের অন্তরের রূপান্তরের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। কৃষ্ণের শেষ আশ্বাস তাই শুধু অর্জুনের জন্য নয়, ঈশ্বরের সন্ধানী প্রতিটি মানুষের জন্য এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান হয়ে ওঠে। তুমি আমাকে স্মরণ করো, আমাকে ভালোবাসো, তোমার কর্ম আমাকে নিবেদন করো, আমার সামনে অহংকার ত্যাগ করে নত হও। তুমি আমার কাছে আসবে। কারণ তুমি আমার প্রিয়।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬৬ — সর্বধর্ম ত্যাগ, ঈশ্বরের শরণাগতি ও পরম মুক্তির মহাবাণী
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!