সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৭ — কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগের তামসিকতা ও মোহজাত ত্যাগের প্রকৃতি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
নিয়মতস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে।মোহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।৭।।
নিয়মতস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে।
মোহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।৭।।

অনুবাদঃ কিন্তু নিত্যকর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়। মোহবশত তার ত্যাগ হলে, তাকে তামসিক ত্যাগ বলা হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রকৃতি এবং কর্তব্যকর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটির প্রচলিত পাঠ হলো “নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে। মোহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।” এর সরল অর্থ হলো নির্ধারিত কর্তব্যকর্ম ত্যাগ করা যথার্থ নয় এবং মোহের কারণে সেই কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগ করাকে তামসিক ত্যাগ বলা হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের কর্মজীবন, নৈতিক দায়িত্ব, আত্মসংযম, ত্যাগ, জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো নিয়ত। সংস্কৃত নিয়ত শব্দের মধ্যে নির্ধারিত, বিধিবদ্ধ, নিয়মিত এবং কর্তব্যের ধারণা নিহিত রয়েছে। নিয়ত কর্ম বলতে এমন কর্মকে বোঝায় যা মানুষের জীবনের অবস্থান, দায়িত্ব এবং নৈতিক কর্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ একা বাস করে না। পরিবার, সমাজ, পেশা, রাষ্ট্র এবং বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের মধ্য থেকেই বিভিন্ন কর্তব্যের জন্ম হয়। একজন পিতার যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, একজন শিক্ষকের যেমন শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি প্রত্যেক মানুষের নিজের বিবেক ও মানবিকতার প্রতিও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাই নিয়ত কর্ম কেবল কোনো বাহ্যিক কাজ নয়। এটি মানুষের নৈতিক অস্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এরপর এসেছে সন্ন্যাস শব্দটি। সন্ন্যাস শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে স্থাপন করা, সমর্পণ করা বা পরিত্যাগ করার ভাব রয়েছে। সাধারণভাবে সন্ন্যাস বলতে সংসার ত্যাগ বা কর্মজীবন থেকে সরে যাওয়াকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দর্শনে সন্ন্যাসের অর্থ কেবল বাহ্যিকভাবে কাজ বন্ধ করে দেওয়া নয়। মানুষ বাহ্যিক কাজ ছেড়ে দিলেও তার অন্তরে যদি কামনা, অহংকার, ভোগের আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের স্বার্থের চিন্তা থেকে যায়, তাহলে শুধু কর্মত্যাগ তাকে প্রকৃত অর্থে মুক্ত করে না। গীতার আলোচনায় তাই বাহ্যিক কর্মের পরিবর্তনের চেয়ে অন্তরের আসক্তির পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে। কৃ অর্থ করা। সেই অর্থে কর্ম হলো যা করা হয়। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে কর্মের অর্থ কেবল দৈহিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিন্তা, বাক্য এবং আচরণও কর্মের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ প্রতিনিয়ত কর্মের মাধ্যমে নিজের জীবন গঠন করে এবং নিজের চরিত্রের প্রকাশ ঘটায়। তাই কর্মকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা সহজ নয়। জীবনের সঙ্গে কর্ম অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। প্রশ্ন হলো কর্ম থাকবে কি থাকবে না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো মানুষ কোন মানসিকতা নিয়ে কর্ম করছে।

এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে নিয়ত কর্মের সন্ন্যাস যথার্থ নয়। এর অর্থ এই নয় যে জীবনের কোনো পর্যায়ে কোনো কর্মই ত্যাগ করা যায় না। বরং বক্তব্যটি হলো কর্তব্যকর্মকে অজ্ঞতা, ভয়, আলস্য, বিরক্তি অথবা ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে পরিত্যাগ করা আধ্যাত্মিক ত্যাগ নয়। একজন মানুষ যদি নিজের দায়িত্ব কঠিন মনে করে সেই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যায় এবং সেই পালিয়ে যাওয়াকে ত্যাগ বলে মনে করে, তাহলে তার ত্যাগের বাহ্যিক রূপ থাকতে পারে কিন্তু অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা থাকে না।

এখানেই মোহ শব্দটির গুরুত্ব প্রকাশ পায়। মোহ এসেছে সংস্কৃত মুহ্ ধাতু থেকে। এর মধ্যে বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধির আচ্ছন্নতা এবং সত্যকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারার ভাব রয়েছে। মোহ মানুষের দৃষ্টিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে সে কখনো কর্তব্যকে বোঝা মনে করে এবং কর্তব্য থেকে পালানোকে স্বাধীনতা মনে করে। কখনো সে নিজের ভয়কে জ্ঞান বলে মনে করে এবং নিজের দুর্বলতাকে বৈরাগ্য বলে মনে করে। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই মোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

এই মোহের কারণে যে ত্যাগ সৃষ্টি হয়, শ্রীকৃষ্ণ তাকে তামসিক বলেছেন। তামস শব্দটি তমসের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তমসের মৌলিক অর্থ অন্ধকার। ভারতীয় দর্শনে তমস শুধু বাহ্যিক অন্ধকার নয়। এটি অজ্ঞানতা, জড়তা, আলস্য, অবিবেক, অস্পষ্টতা এবং চেতনার অবনতির প্রতীক। তাই তামসিক ত্যাগ হলো এমন ত্যাগ যেখানে জ্ঞান নেই, সুস্পষ্ট বিবেচনা নেই এবং কর্তব্যের প্রকৃত উপলব্ধি নেই। মানুষ কোনো কাজের গভীর তাৎপর্য না বুঝে, কেবল তার কষ্টকর দিক দেখে বা নিজের স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে সেটিকে ছেড়ে দেয়। এই ধরনের ত্যাগ বাহ্যিকভাবে যতই মহৎ মনে হোক, তার অন্তরে অজ্ঞতার ছায়া থাকতে পারে।

শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা হলো কর্ম ত্যাগ করা এবং কর্মের বন্ধন ত্যাগ করা এক বিষয় নয়। মানুষ একটি কাজ ছেড়ে দিয়েও সেই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত কামনা, অহংকার অথবা ভয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে। আবার একজন মানুষ একই কাজ সম্পাদন করতে করেও কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারে। এই দ্বিতীয় অবস্থাই গীতার কর্মযোগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এখানে বাহ্যিক কর্মের পরিবর্তনের চেয়ে কর্মের প্রতি অন্তরের সম্পর্কের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একজন কৃষকের কথা ভাবা যায়। কৃষকের কর্তব্য হলো জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন করা, সেচ দেওয়া এবং যত্ন নেওয়া। কিন্তু ফসল শেষ পর্যন্ত কেমন হবে তা সম্পূর্ণভাবে তার হাতে নেই। যদি সে ফলাফল অনিশ্চিত বলে বীজ বপন করতেই অস্বীকার করে, তবে সে নিজের কর্তব্য থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু যদি সে নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজ করে এবং ফলাফল সম্পর্কে অহংকার বা অতিরিক্ত ভয়ের মধ্যে না থাকে, তাহলে তার কর্মের প্রকৃতি ভিন্ন হয়ে যায়। এই উপমার মাধ্যমে বোঝা যায় যে কর্মের ফল নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও কর্তব্যকর্ম পালন করা মানুষের হাতে থাকে।

মানবজীবনের বহু ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রযোজ্য। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাদানের দায়িত্ব কঠিন বলে শিক্ষার্থীদের প্রতি নিজের কর্তব্য ভুলে যান, একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবা কষ্টকর বলে দায়িত্ব থেকে সরে যান, একজন অভিভাবক যদি সন্তানের লালনপালনকে বোঝা মনে করে দায়িত্ব এড়িয়ে যান অথবা একজন নাগরিক যদি সমাজের প্রতি নিজের নৈতিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করেন, তাহলে তাদের এই কর্মত্যাগকে সবসময় আধ্যাত্মিক ত্যাগ বলা যায় না। কারণ কর্মটি ত্যাগ করার পেছনে যদি জ্ঞান ও বিবেকের পরিবর্তে ভয়, আলস্য, স্বার্থপরতা অথবা মোহ কাজ করে, তাহলে সেটি তামসিকতার দিকে চলে যায়।

এই শ্লোকের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মানুষ অনেক সময় নিজের দুর্বলতাকে মহৎ আদর্শের ভাষায় প্রকাশ করে। সে বলতে পারে যে সে জগতের প্রতি অনাসক্ত হয়ে গেছে, অথচ বাস্তবে হয়তো সে ব্যর্থতার ভয়ে কাজটি ছেড়ে দিয়েছে। কেউ বলতে পারে যে সে কোনো কিছুর প্রতি আকৃষ্ট নয়, অথচ বাস্তবে সে দায়িত্বের চাপ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নিজের মনকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। আমি কি সত্যিই আসক্তি ত্যাগ করছি, নাকি আমি দায়িত্ব থেকে পালাচ্ছি। আমি কি জ্ঞানের কারণে সরে যাচ্ছি, নাকি মোহের কারণে সরে যাচ্ছি। আমি কি কর্তব্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হচ্ছি, নাকি কর্তব্যবোধই হারিয়ে ফেলছি। এই আত্মজিজ্ঞাসা শ্লোকটির অন্যতম গভীর শিক্ষা।

দার্শনিকভাবে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীনতা সম্পর্কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। প্রকৃত স্বাধীনতা সব দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়ার নাম নয়। বরং মানুষ যখন নিজের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সেই কর্তব্য সম্পাদন করার সময় অহংকার, কামনা ও ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তখনই তার স্বাধীনতা গভীরতর হয়। বাহ্যিকভাবে কাজ না করা সহজ হতে পারে, কিন্তু কর্মের মধ্যেই থেকে নিজের অহংকার ও আসক্তিকে অতিক্রম করা অনেক কঠিন। সেই কঠিন পথই গীতার কর্মদর্শনকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে তামসিকতা চেতনার একটি নিম্নগামী প্রবণতা। সত্ত্ব যেখানে জ্ঞান, স্বচ্ছতা এবং সাম্যকে প্রকাশ করে এবং রজঃ যেখানে আকাঙ্ক্ষা, কর্মপ্রবণতা ও অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে তমস অজ্ঞানতা, জড়তা এবং অবিবেকের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই মোহজাত কর্মত্যাগকে তামসিক বলা অত্যন্ত অর্থপূর্ণ। কারণ সেখানে কর্মের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করার পরিবর্তে অন্ধকারাচ্ছন্ন বিচারবোধ কাজ করে।

বেদান্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের বন্ধনের অন্যতম কারণ হলো কর্তার অহংকার এবং কর্মফলের প্রতি আসক্তি। মানুষ মনে করে আমি করছি এবং আমিই এর ফল পাব। এই আমিত্ব ও ফলের আকাঙ্ক্ষা তার চেতনাকে কর্মের সঙ্গে শক্তভাবে আবদ্ধ করে। কিন্তু বাহ্যিক কর্ম ত্যাগ করলেই এই অহংকার দূর হয় না। তাই প্রকৃত পরিবর্তন ঘটতে হয় অন্তরে। কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মের মাধ্যমে নিজের অহংকারকে বাড়িয়ে তোলা যাবে না। কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু ফলাফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি গভীর। কর্ম এখানে জীবনের দায়িত্বের প্রতীক। মোহ মানুষের অন্তরের অন্ধকারের প্রতীক। ত্যাগ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আর তামসিক ত্যাগ সেই অবস্থার প্রতীক যেখানে মানুষ মুক্তি চাইতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজের দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই অর্থে শ্লোকটি শুধু প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষার অংশ নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতের একটি চিরন্তন নাটককে প্রকাশ করে। মানুষ একদিকে স্বাধীন হতে চায় এবং অন্যদিকে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চায়। কিন্তু এই দুই বিষয় সবসময় এক নয়।

শ্লোকটির একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো এটি ত্যাগের মূল্যকে বাহ্যিক পরিমাণ দিয়ে বিচার করে না। কেউ কত কিছু ছেড়েছে সেটিই প্রধান বিষয় নয়। কেন ছেড়েছে, কোন মানসিক অবস্থায় ছেড়েছে এবং তার ত্যাগ তাকে সত্য, জ্ঞান ও নৈতিকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ অল্প কিছু ত্যাগ করেও গভীরভাবে অনাসক্ত হতে পারে। আবার অন্য একজন অনেক কিছু ত্যাগ করেও নিজের অহংকার, কামনা এবং মোহের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে। তাই ত্যাগের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার অন্তর্গত চেতনা দিয়ে।

এই শিক্ষা আধুনিক জীবনে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সময়ে মানুষ নানা ধরনের চাপ, প্রতিযোগিতা এবং প্রত্যাশার মধ্যে বাস করে। অনেক সময় কঠিন দায়িত্ব সামনে এলে পালিয়ে যাওয়াকে সহজ পথ মনে হয়। আবার কখনো ব্যক্তিগত আরামকে স্বাধীনতা বলে মনে হয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা মনে করিয়ে দেয় যে কঠিন কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়া সবসময় মুক্তি নয়। কখনো কখনো কঠিন কর্তব্যই মানুষের চরিত্রকে গঠন করে এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সুযোগ দেয়।

তবে এই শিক্ষাকে অন্ধভাবে সব কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ হিসেবেও বোঝা উচিত নয়। কোনো কাজ অন্যায়, অনৈতিক বা অধর্মমূলক হলে শুধু সেটিকে কর্তব্যের নামে আঁকড়ে থাকা গীতার সামগ্রিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখানে মূল বিষয় হলো যথার্থ কর্তব্যকে জ্ঞান ও বিবেক দিয়ে শনাক্ত করা। কারণ কর্তব্য নির্ধারণের জন্যও জ্ঞান প্রয়োজন। মোহ থেকে কর্মত্যাগ যেমন তামসিক, তেমনি মোহ থেকে কোনো ভুল কর্মকে কর্তব্য বলে আঁকড়ে থাকাও জ্ঞানের লক্ষণ নয়।

অতএব এই শ্লোক মানুষকে বাহ্যিক ত্যাগের চেয়ে অন্তরের ত্যাগের দিকে নিয়ে যায়। মানুষকে নিজের কাজের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাতে শেখায়। কাজটি আমার পছন্দ কি না, কাজটি আমাকে কতটা আনন্দ দেয় বা এতে আমি কতটা লাভবান হব, এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গভীর প্রশ্ন করতে শেখায় যে কাজটি আমার কর্তব্য কি না এবং আমি কোন মানসিকতা নিয়ে সেটি করছি। এই আত্মজিজ্ঞাসাই কর্মকে আধ্যাত্মিক সাধনায় রূপান্তরিত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, “নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে। মোহাত্তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ” শ্লোকটি মানুষের জীবনে ত্যাগের প্রকৃত অর্থ বোঝার একটি গভীর দার্শনিক শিক্ষা। নিয়ত কর্ম মানুষের দায়িত্বের প্রতীক, সন্ন্যাস অন্তরের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, মোহ বিচারবুদ্ধির অন্ধকারের প্রতীক এবং তামসিক পরিত্যাগ অজ্ঞতার কারণে কর্তব্য থেকে সরে যাওয়ার প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণ এখানে শেখাচ্ছেন যে সত্যিকারের ত্যাগ মানে কেবল কাজ ফেলে দেওয়া নয়। সত্যিকারের ত্যাগ হলো কর্মের মধ্যে থেকেও অহংকার, আসক্তি এবং স্বার্থপর ফলাকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করা। মোহ থেকে কর্তব্য ত্যাগ মানুষকে মুক্ত করে না, বরং আরও গভীর অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু জ্ঞান, বিবেক এবং অনাসক্তির সঙ্গে কর্তব্য পালন করলে সেই কর্মই আত্মশুদ্ধির পথ হয়ে উঠতে পারে। তাই এই শ্লোকের চূড়ান্ত শিক্ষা হলো, কর্তব্য থেকে পালানো ত্যাগ নয়, বরং কর্তব্য পালন করতে করতে মোহ ও আসক্তিকে ত্যাগ করাই প্রকৃত আধ্যাত্মিক অগ্রগতির পথ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি