সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৭৭ — শ্রীহরির বিশ্বরূপের স্মরণ, মহাবিস্ময় ও আধ্যাত্মিক আনন্দ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ। বিষ্ময়ো মে মহান্ রাজন্ হৃষ্যামি চ পুনঃ…
তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ। 
বিষ্ময়ো মে মহান্ রাজন্ হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ।।৭৭।।

অনুবাদঃ হে রাজন্! শ্রীকৃষ্ণের সেই অত্যন্ত অদ্ভুত রূপ স্মরণ করতে করতে আমি অতিশয় বিস্ময়াভিভূত হচ্ছি এবং বারংবার হরষিত হচ্ছি।

ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের সপ্তসপ্ততিতম শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে শ্রীহরির বিশ্বরূপ দর্শনের স্মৃতি থেকে উদ্ভূত এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “तच्च संस्मृत्य संस्मृत्य रूपमत्यद्भुतं हरेः । विस्मयो मे महान् राजन् हृष्यामि च पुनः पुनः ॥”। এর সহজ অর্থ হলো, হে রাজন্, শ্রীহরির সেই অতিশয় বিস্ময়কর রূপ বারবার স্মরণ করে আমার মনে মহাবিস্ময় জাগে এবং আমি বারবার আনন্দ ও রোমাঞ্চে অভিভূত হই। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে স্মৃতি, বিস্ময়, ঈশ্বরানুভূতি, আনন্দ এবং আধ্যাত্মিক চেতনার এমন এক গভীর সমন্বয় ঘটেছে যা মানুষের অন্তর্জীবন সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য প্রকাশ করে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “तत्” যার অর্থ সেই বা তা। এখানে “সেই” কোনো সাধারণ বস্তু বা দৃশ্যকে নির্দেশ করছে না। এটি পূর্বে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপকে নির্দেশ করছে। অর্জুন যে মহাবিশ্বব্যাপী রূপ দর্শন করেছিলেন এবং যার মধ্যে অসংখ্য দেবতা, জীব, সৃষ্টি, বিনাশ ও সমগ্র জগতের প্রকাশ ঘটেছিল, সঞ্জয় সেই অভূতপূর্ব রূপের কথাই স্মরণ করছেন। “च” শব্দের অর্থ এবং। “तत्” ও “च” একত্র হয়ে সন্ধির মাধ্যমে “तच्च” হয়েছে। ভাষাগতভাবে এটি একটি সাধারণ সর্বনাম ও অব্যয়ের সংযোগ হলেও ভাবগতভাবে এটি একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করে।

এরপর এসেছে “संस्मृत्य संस्मृत्य”। এই দুটি শব্দ শ্লোকটির প্রাণ। “स्मृ” ধাতুর অর্থ স্মরণ করা বা মনে রাখা। এর সঙ্গে “सम्” উপসর্গ যুক্ত হয়ে “संस्मृ” রূপ গঠিত হয়েছে, যার মধ্যে গভীরভাবে বা সম্পূর্ণভাবে স্মরণ করার ভাব রয়েছে। “संस्मृत्य” অর্থ স্মরণ করে বা স্মরণ করার পর। কিন্তু সঞ্জয় একবার “संस्मृत्य” বলেননি। তিনি বলেছেন “संस्मृत्य संस्मृत्य”। এই পুনরুক্তি বোঝায় যে বিশ্বরূপের স্মৃতি তাঁর কাছে একবারের কোনো অতীত ঘটনা নয়। তিনি যতবার সেই দৃশ্য স্মরণ করেন, ততবারই তার অন্তরে সেই অভিজ্ঞতার আবেগ যেন নতুন করে জেগে ওঠে। এখানে স্মৃতি নিছক অতীতের কোনো তথ্য সংরক্ষণ নয়। স্মৃতি হয়ে উঠেছে এক ধরনের পুনরায় দর্শন।

“रूपम्” শব্দের অর্থ রূপ, আকৃতি, অবয়ব বা প্রকাশিত স্বরূপ। কিন্তু এখানে রূপ বলতে সাধারণ কোনো শারীরিক আকৃতি বোঝানো হয়নি। এটি শ্রীহরির বিশ্বরূপ। এই বিশ্বরূপের বিশেষত্ব হলো এর মধ্যে সীমিত ও অসীম, ব্যক্তি ও বিশ্ব, সৃষ্টি ও বিনাশ, দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছু এক মহাসত্তার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তাই “রূপ” শব্দটি এখানে ঈশ্বরের দৃশ্যমান প্রকাশের প্রতীক। যে অসীম সাধারণ মানুষের ইন্দ্রিয় ও চিন্তার সীমার বাইরে, সেই অসীম যখন একটি মহারূপে প্রকাশিত হয় তখন তাকে বলা হয় বিশ্বরূপ।


ভগবদ্গীতা ১৮.৭৮ — যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও ধনুর্ধর অর্জুনের ঐক্যে শ্রী, বিজয়, সমৃদ্ধি ও ধ্রুব নীতির প্রতিষ্ঠা


“अत्यद्भुतम्” শব্দটি এই বিশ্বরূপের প্রকৃতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। “अति” অর্থ অত্যন্ত বা সীমা অতিক্রম করে এবং “अद्भुत” অর্থ আশ্চর্য বা বিস্ময়কর। ফলে “अत्यद्भुतम्” অর্থ অতিশয় বিস্ময়কর বা অভূতপূর্ব। এখানে শুধু সুন্দর কোনো দৃশ্যের কথা বলা হচ্ছে না। এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা মানুষের পরিচিত ধারণা, কল্পনা ও উপলব্ধির সীমাকে অতিক্রম করে। বিশ্বরূপের সামনে মানুষের সাধারণ সৌন্দর্যবোধ যথেষ্ট নয়। সেখানে সৌন্দর্যের সঙ্গে মহত্ত্ব, রহস্য, অসীমতা এবং অস্তিত্বের গভীরতা মিলিত হয়ে এক বিশেষ ধরনের বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

“हरेः” শব্দটি “হরি” শব্দের ষষ্ঠী একবচন রূপ এবং এর অর্থ হরির। হরি শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় হরি সেই সত্তা যিনি মানুষের দুঃখ, অজ্ঞান, পাপ ও বন্ধন হরণ করেন। এখানে হরির রূপ বলতে সেই ঈশ্বরীয় বিশ্বরূপকে বোঝানো হয়েছে যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টির অন্তর্নিহিত ঐক্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে “हरेः” শব্দটি কেবল একজন দেবতার নাম নির্দেশ করছে না, বরং সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় চেতনার প্রতি ইঙ্গিত করছে।

এরপর এসেছে “विस्मयः” অর্থাৎ বিস্ময়। এই বিস্ময় সাধারণ কোনো নতুন জিনিস দেখে অবাক হওয়ার মতো নয়। এটি এমন এক গভীর বিস্ময় যা মানুষের নিজের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করায়। মানুষ যখন কোনো অসাধারণ বিষয় দেখে তখন বিস্মিত হয়। কিন্তু ঈশ্বরীয় বিশ্বরূপের সামনে যে বিস্ময় জন্মায় তা আরও গভীর। সেখানে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার জ্ঞান সীমিত, তার দৃষ্টি সীমিত এবং তার অস্তিত্ব এক অসীম মহাবাস্তবতার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তাই সঞ্জয়ের “महान् विस्मयः” বা মহাবিস্ময় আসলে অসীমের সামনে সীমিত মানুষের আত্মসচেতনতার প্রকাশ।

“मे” শব্দের অর্থ আমার। “महान्” অর্থ মহান, বিশাল বা গভীর। এই দুটি শব্দের সঙ্গে “विस्मयः” যুক্ত হয়ে দাঁড়ায় “আমার মহাবিস্ময়”। সঞ্জয় এখানে শুধু একটি ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন না। তিনি নিজের অন্তরের অবস্থাও প্রকাশ করছেন। বিশ্বরূপের অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনার মধ্যে এত গভীর ছাপ ফেলেছে যে বহুক্ষণ পরেও সেই স্মৃতি তাঁর অন্তরকে আলোড়িত করছে। এই ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ শ্লোকটিকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

“राजन्” হলো রাজা শব্দের সম্বোধনরূপ। সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে হে রাজন্ বলে সম্বোধন করছেন। এই সম্বোধনের মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ধৃতরাষ্ট্র নিজে বিশ্বরূপ দর্শন করতে পারেননি। কিন্তু সঞ্জয় দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে কুরুক্ষেত্রের ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এখন তিনি সেই অভিজ্ঞতার কথা ধৃতরাষ্ট্রকে জানাচ্ছেন। ফলে শ্লোকটি শুধু একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, বরং একজন প্রত্যক্ষদর্শীর অন্তর থেকে উঠে আসা এক গভীর স্বীকারোক্তি।

“हृष्यामि” শব্দটি এসেছে “हृष्” ধাতু থেকে। এর অর্থ আনন্দিত হওয়া, উৎফুল্ল হওয়া বা রোমাঞ্চিত হওয়া। এখানে শুধু সাধারণ আনন্দ বোঝানো হয়নি। এমন এক আনন্দের কথা বলা হয়েছে যা গভীর বিস্ময় ও ঈশ্বরীয় অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বরূপের স্মরণে সঞ্জয়ের মন যেমন বিস্ময়ে অভিভূত হয়, তেমনি তাঁর অন্তর আনন্দে পূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ঈশ্বরীয় মহত্ত্বের উপলব্ধি তাঁর মধ্যে ভয় বা হতাশা সৃষ্টি করছে না। বরং তা তাঁকে এক গভীর আনন্দে পূর্ণ করছে।


ভগবদ্গীতা ১৮.৭৮ — যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও ধনুর্ধর অর্জুনের ঐক্যে শ্রী, বিজয়, সমৃদ্ধি ও ধ্রুব নীতির প্রতিষ্ঠা


শেষে এসেছে “पुनः पुनः” অর্থাৎ বারবার। এই শব্দটি শ্লোকের আবেগকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে। শুরুতে ছিল “संस्मृत्य संस्मृत्य” এবং শেষে “पुनः पुनः”। একদিকে বারবার স্মরণ, অন্যদিকে বারবার আনন্দ। এর মধ্যে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক চক্র সৃষ্টি হয়েছে। সঞ্জয় বিশ্বরূপকে স্মরণ করেন, সেই স্মরণ তাঁর মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি করে, বিস্ময় থেকে আনন্দ ও রোমাঞ্চ জন্মায় এবং সেই আনন্দময় স্মৃতি আবার তাঁকে সেই বিশ্বরূপ স্মরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে স্মৃতি, বিস্ময় ও আনন্দ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি অবিরাম অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো একটি মহান আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কেবল ঘটনার সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রকৃত প্রভাব মানুষের অন্তরে দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে থাকতে পারে। কোনো গভীর সত্য একবার উপলব্ধি করার পর মানুষ যখন তাকে বারবার স্মরণ করে তখন সেই উপলব্ধি ধীরে ধীরে তার চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। সঞ্জয়ের বিশ্বরূপ দর্শন অতীতের ঘটনা হলেও তার স্মৃতি বর্তমানের মধ্যে সক্রিয়। তাই স্মরণ এখানে অতীতকে পুনরায় বর্তমান করে তোলার শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধনা হলো ঈশ্বরস্মরণ। ঈশ্বরকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর নাম মনে করা নয়। তাঁর রূপ, গুণ, লীলা ও মহিমাকে হৃদয়ে ধারণ করা। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে হরির বিশ্বরূপের স্মরণ এমন এক গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করছে যা তাঁর চেতনাকে ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এই কারণে শ্লোকটি স্মরণভক্তির এক অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অদ্বৈত ভাবনার আলোকে বিশ্বরূপকে দেখা যায় বহুর মধ্যে একের প্রকাশ হিসেবে। মানুষ সাধারণত জগতকে অসংখ্য পৃথক সত্তায় বিভক্ত করে দেখে। আমি, তুমি, মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি, দেবতা এবং জগত যেন আলাদা আলাদা বাস্তবতা। কিন্তু বিশ্বরূপ সেই বহুত্বের অন্তরালে একটি ঐক্যের ইঙ্গিত দেয়। সমস্ত নাম ও রূপের অন্তরালে যে এক সর্বব্যাপী সত্য বিরাজমান, বিশ্বরূপ তার দৃশ্যমান প্রতীক। এই কারণে “रूपमत्यद्भुतं हरेः” শুধু একটি মহৎ দৃশ্যের বর্ণনা নয়। এটি বহুর মধ্যে একের উপলব্ধিরও প্রতীক।

যোগদর্শনের দৃষ্টিতেও শ্লোকটির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষের মনে গভীর অভিজ্ঞতার ছাপ থেকে যায়। কোনো শক্তিশালী অভিজ্ঞতা চেতনার মধ্যে এমন একটি সংস্কার সৃষ্টি করতে পারে যা পরবর্তীকালে স্মরণের মাধ্যমে আবার সক্রিয় হয়। সঞ্জয়ের বিশ্বরূপ দর্শন তাঁর মনে এমনই গভীর ছাপ সৃষ্টি করেছে। তাই তিনি যখন সেই রূপ স্মরণ করেন তখন কেবল একটি পুরোনো দৃশ্য মনে পড়ে না। সেই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত বিস্ময়, শ্রদ্ধা এবং আনন্দও আবার জেগে ওঠে। আধুনিক মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা যায়, স্মৃতি এখানে কেবল তথ্য নয় বরং আবেগসহ পুনরুজ্জীবিত অভিজ্ঞতা।

ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের আলোকে এই শ্লোকে অদ্ভুত রসেরও গভীর প্রকাশ রয়েছে। অদ্ভুত রসের মূল অনুভূতি হলো বিস্ময়। তবে এখানে বিস্ময় শুধু চোখের সামনে নতুন কোনো দৃশ্য দেখে বিস্মিত হওয়া নয়। এটি এমন এক মহত্ত্বের অনুভূতি যার সামনে ব্যক্তি নিজের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধি করে। বিশ্বরূপের অসীমতা সঞ্জয়ের মনে সেই অদ্ভুত অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে সেই বিস্ময় হর্ষে পরিণত হয়েছে। ফলে বিস্ময় ও আনন্দ একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক নান্দনিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। আমাদের জীবনে অনেক স্মৃতি থাকে যা আমাদের কষ্ট দেয়। আবার এমন কিছু স্মৃতি থাকে যা আমাদের শক্তি দেয়, কৃতজ্ঞ করে এবং জীবনের প্রতি নতুন আস্থা সৃষ্টি করে। সঞ্জয় যে স্মৃতি বহন করছেন তা দ্বিতীয় ধরনের। তিনি অতীতের একটি মহান অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করে দুর্বল হয়ে পড়ছেন না। বরং সেই স্মৃতি তাঁকে পুনরায় বিস্মিত করছে এবং আনন্দিত করছে। এর মাধ্যমে শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে স্মৃতি শুধু অতীতের ভার নয়। সঠিক স্মরণ মানুষের বর্তমান জীবনকে আলোকিত করতে পারে।

একটি সুন্দর প্রকৃতিদৃশ্যের কথা স্মরণ করলেও মানুষের মনে অনেক সময় সেই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত অনুভূতি ফিরে আসে। কোনো মানুষ প্রথমবার সমুদ্র দেখে যে বিস্ময় অনুভব করেছিল, বহু বছর পর সমুদ্রের ছবি দেখেও তার মনে সেই বিস্ময় জেগে উঠতে পারে। কোনো মহান ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতি অনেক বছর পরেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। কিন্তু সঞ্জয়ের অভিজ্ঞতা তার থেকেও গভীর। তিনি যে বিশ্বরূপ স্মরণ করছেন তা ছিল সমগ্র অস্তিত্বকে এক মহারূপে উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা। তাই তার স্মৃতির অভিঘাতও সাধারণ স্মৃতির তুলনায় অসীমভাবে গভীর।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। গভীর জ্ঞান মানুষের বিস্ময়কে নষ্ট করে না। বরং প্রকৃত জ্ঞান অনেক সময় বিস্ময়কে আরও গভীর করে। অজ্ঞ মানুষ কোনো অজানা বিষয় দেখে বিস্মিত হয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি যত গভীরভাবে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেন ততই বুঝতে পারেন যে অস্তিত্ব কত রহস্যময় এবং কত বিস্তৃত। তাই বিস্ময় অজ্ঞতার লক্ষণ নয়। অনেক সময় বিস্ময় হলো গভীর উপলব্ধির স্বাভাবিক ফল।

সবশেষে বলা যায়, “तच्च संस्मृत्य संस्मृत्य रूपमत्यद्भुतं हरेः” থেকে “हृष्यामि च पुनः पुनः” পর্যন্ত সমগ্র শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক স্মৃতির এক অনুপম চিত্র। এখানে শ্রীহরির বিশ্বরূপ অসীম সত্যের প্রতীক, স্মরণ সেই সত্যের সঙ্গে পুনরায় সংযোগের পথ, বিস্ময় সীমিত অহংকারের ভাঙনের অনুভূতি এবং হর্ষ সেই অসীমের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার আনন্দ। সঞ্জয়ের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহান সত্যকে একবার দেখা যথেষ্ট নয়। তাকে স্মরণ করতে হয়, অন্তরে ধারণ করতে হয় এবং জীবনের মধ্যে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হয়। সেই স্মরণ যখন গভীর হয় তখন অতীতের দর্শন বর্তমানের অনুভূতিতে পরিণত হয়। তাই এই শ্লোকের মূল বাণী হলো মহৎ সত্যের দর্শন এক মুহূর্তের ঘটনা হতে পারে, কিন্তু তার গভীর স্মরণ মানুষের চেতনার মধ্যে বারবার নতুন আলো জ্বালাতে পারে। স্মৃতি তখন শুধু অতীতকে মনে রাখা নয়, বরং সত্যকে বর্তমানের মধ্যে পুনরায় অনুভব করা

ভগবদ্গীতা ১৮.৭৮ — যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও ধনুর্ধর অর্জুনের ঐক্যে শ্রী, বিজয়, সমৃদ্ধি ও ধ্রুব নীতির প্রতিষ্ঠা

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 October 13, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি