সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৮ — কষ্টের ভয়ে কর্তব্যত্যাগ ও রাজসিক ত্যাগের প্রকৃতি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াত্ত্যজেৎ।স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ।।৮।।
দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াত্ত্যজেৎ।
স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ।।৮।।

অনুবাদঃ যিনি নিত্যকর্মকে দুঃখজনক বলে মনে করে দৈহিক ক্লেশের ভয়ে ত্যাগ করেন, তিনি অবশ্যই সেই রাজসিক ত্যাগ করে ত্যাগের ফল লাভ করেন না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ ত্যাগের প্রকৃতি এবং তার বিভিন্ন রূপ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অষ্টাদশ অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকে তিনি মানুষের এমন এক মানসিকতার কথা তুলে ধরেছেন, যেখানে কোনো কর্মকে কষ্টকর মনে করে অথবা শরীরের পরিশ্রম ও যন্ত্রণার ভয়ে মানুষ নিজের কর্তব্য থেকে সরে দাঁড়ায়। শ্লোকটি হলো

এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত শিক্ষা কেবল কর্ম করা বা না করার প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে মানুষের মন, তার ভয়, আরামপ্রিয়তা, কর্তব্যবোধ, আত্মসংযম এবং প্রকৃত ত্যাগের ধারণা সম্পর্কে গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে দেখাচ্ছেন যে বাইরে থেকে কোনো কাজ পরিত্যাগ করলেই তাকে প্রকৃত ত্যাগ বলা যায় না। ত্যাগের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে কেন সেই কাজ ত্যাগ করা হচ্ছে তার ওপর।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো দুঃখ। সংস্কৃত দুঃখ শব্দটি মানুষের কষ্ট, বেদনা, অস্বস্তি এবং প্রতিকূলতার একটি বিস্তৃত ধারণা প্রকাশ করে। এখানে দুঃখ বলতে শুধু শারীরিক ব্যথা বোঝানো হয়নি। কোনো কাজ করতে গিয়ে যে ক্লান্তি আসে, যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, যে পরিশ্রম করতে হয় অথবা যে অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার সবই এই অর্থের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আনন্দকে গ্রহণ করতে চায় এবং কষ্টকে এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু জীবনের প্রতিটি মূল্যবান অর্জনের পেছনে কোনো না কোনো ধরনের পরিশ্রম ও অসুবিধা থাকে। তাই কোনো কর্তব্য কঠিন হলেই সেটি পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো কর্ম। কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। কর্ম অর্থাৎ যা করা হয়। গীতার দর্শনে কর্ম শুধু দৈনন্দিন কাজ নয়। মানুষের কর্তব্য, দায়িত্ব এবং নৈতিক ভূমিকার সঙ্গেও কর্মের সম্পর্ক রয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর অধ্যয়ন করা তার কর্ম হতে পারে। একজন শিক্ষকের শিক্ষা প্রদান করা তার কর্ম হতে পারে। একজন পিতামাতার সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করাও কর্মের অন্তর্ভুক্ত। একজন মানুষের সমাজের প্রতি নৈতিক দায়িত্বও কর্মের অংশ হতে পারে। তাই গীতার আলোচনায় কর্ম বলতে জীবনের সেই সমস্ত কর্তব্যকে বোঝানো হয় যা মানুষের অবস্থান, সামর্থ্য এবং নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কায়ক্লেশ শব্দটিও এই শ্লোকের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কায় অর্থ শরীর এবং ক্লেশ অর্থ কষ্ট, যন্ত্রণা বা দুর্ভোগ। কায়ক্লেশ অর্থ শরীরের কষ্ট বা শারীরিক পরিশ্রমজনিত অস্বস্তি। মানুষ অনেক সময় এমন কাজ করতে চায় না যার জন্য তাকে ঘাম ঝরাতে হবে, দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হবে অথবা শারীরিক ও মানসিক আরাম ত্যাগ করতে হবে। এই আরামপ্রিয়তা যখন কর্তব্যপরিত্যাগের কারণ হয়ে ওঠে, তখন সেটিই শ্রীকৃষ্ণের সমালোচনার বিষয়।

এখানে ভয় শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভয় শুধু কোনো বিপদের আশঙ্কা নয়। মানুষের জীবনে ব্যর্থতার ভয়, পরিশ্রমের ভয়, অস্বস্তির ভয়, দায়িত্বের ভয় এবং নিজের স্বাচ্ছন্দ্য হারানোর ভয়ও রয়েছে। অনেক সময় মানুষ নিজের অক্ষমতার কারণে কোনো কাজ পরিত্যাগ করে না, বরং কাজটি কঠিন হতে পারে এই আশঙ্কায় আগেই পিছিয়ে যায়। এই মানসিক প্রবণতা মানুষকে তার প্রকৃত সামর্থ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সে নিজের কাছে এমন একটি যুক্তি তৈরি করে যে কাজটি কষ্টকর, তাই কাজটি না করাই ভালো। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই যুক্তি সবসময় প্রকৃত ত্যাগের পরিচয় নয়।

এই প্রসঙ্গে ত্যাগ শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ত্যাগ শব্দটি সংস্কৃত ত্যজ্ ধাতু থেকে এসেছে। এর সাধারণ অর্থ হলো ছেড়ে দেওয়া বা পরিত্যাগ করা। কিন্তু গীতার দর্শনে ত্যাগের অর্থ কেবল কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়। গীতার গভীর শিক্ষা হলো কর্মের ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা। মানুষ কর্ম করবে, কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অহংকার, স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয় হিসেবে আঁকড়ে থাকবে না। এই অবস্থান থেকেই প্রকৃত ত্যাগের ধারণা বোঝা যায়।

শ্রীকৃষ্ণ তাই বলছেন, যে ব্যক্তি কোনো কর্মকে কষ্টকর মনে করে এবং শরীরের কষ্টের ভয়ে সেই কর্ম ত্যাগ করে, তার ত্যাগ রাজসিক। এখানে রাজসিক শব্দটি রজস থেকে এসেছে। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে রজস একটি। রজসের সঙ্গে চঞ্চলতা, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা, আসক্তি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে। রাজসিক ত্যাগের ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে যে ব্যক্তি কোনো কাজ ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু তার অন্তরের আসক্তি এখনও দূর হয়নি। বরং সে নিজের আরাম, সুবিধা এবং অস্বস্তিহীন জীবনের প্রতি আসক্ত হয়ে সেই কাজ থেকে সরে গেছে।

এই কারণে শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে এমন ব্যক্তি ত্যাগের প্রকৃত ফল লাভ করে না। ত্যাগফল বলতে শুধু কোনো বাহ্যিক পুরস্কার বোঝানো হয় না। প্রকৃত ত্যাগের ফল হলো অন্তরের স্বাধীনতা, আসক্তির হ্রাস, মানসিক শান্তি, কর্তব্যবোধের পরিশুদ্ধি এবং কর্মের বন্ধন থেকে মুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল কষ্টের ভয়ে কর্ম ত্যাগ করে, তার ভিতরের আসক্তি দূর হয় না। সে হয়তো একটি কাজ থেকে দূরে সরে গেল, কিন্তু তার মধ্যে আরামের প্রতি আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ফলে বাহ্যিক ত্যাগ ঘটলেও অন্তরের বন্ধন থেকে সে মুক্ত হতে পারে না।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো কর্মত্যাগ এবং ত্যাগ এক জিনিস নয়। কর্মত্যাগ হলো কোনো কাজ পরিত্যাগ করা। কিন্তু ত্যাগ হলো কর্মের সঙ্গে যুক্ত অহংকার, স্বার্থপরতা এবং ফলের প্রতি আসক্তিকে অতিক্রম করা। একজন ব্যক্তি প্রচুর কাজ করেও ত্যাগী হতে পারেন, যদি তিনি নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হন। আবার একজন ব্যক্তি বাইরে থেকে অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েও প্রকৃত ত্যাগী নাও হতে পারেন, যদি তার অন্তরে আকাঙ্ক্ষা, অহংকার এবং স্বার্থপরতা থেকে যায়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার একটি সূক্ষ্ম দিকও প্রকাশ করে। মানুষ কখনো কখনো নিজের দুর্বলতাকে ত্যাগের নামে প্রকাশ করে। সে বলতে পারে যে সে একটি কাজ ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রকৃত কারণ হতে পারে যে সে কাজটির কষ্ট সহ্য করতে চায় না। এখানে ত্যাগের বাহ্যিক রূপ এবং অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। গীতা সেই বাহ্যিক রূপকে নয়, অন্তরের উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দেয়।

বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী জানে যে নিয়মিত পড়াশোনা করা তার ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন বলে সে তা ছেড়ে দিয়ে সহজ বিনোদনের দিকে চলে যায়। একজন ব্যক্তি জানেন যে শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম প্রয়োজন, কিন্তু ব্যায়ামে ক্লান্তি হয় বলে তিনি তা এড়িয়ে যান। একজন কর্মী জানেন যে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, কিন্তু কাজটি কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ বলে তিনি তা এড়িয়ে যান। এসব ক্ষেত্রে কষ্টের ভয় যদি কর্তব্যপরিত্যাগের মূল কারণ হয়, তাহলে শ্লোকটির শিক্ষা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

তবে এই শিক্ষার অর্থ এই নয় যে মানুষকে সব ধরনের কষ্ট সহ্য করতেই হবে অথবা নিজের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করতে হবে। কোনো কাজ যদি অন্যায়, অধার্মিক বা ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা ত্যাগ করা ভিন্ন বিষয়। আবার কোনো ব্যক্তি সত্যিই কোনো কাজ করার মতো অবস্থায় না থাকলে তার বাস্তব সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করতে হবে। গীতার শিক্ষা মূলত সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে যেখানে কর্তব্য সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও কেবল কষ্টের ভয়ে তা পরিত্যাগ করা হয়। এখানে উদ্দেশ্য এবং বিবেচনাবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই শ্লোককে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন ব্যক্তি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে চান। পাহাড়ের পথ কঠিন। পথে পাথর আছে, শরীরে ক্লান্তি আসে এবং প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তিনি যদি শুধু কষ্টের ভয়ে পথ ছেড়ে দেন, তাহলে তিনি চূড়ায় পৌঁছাতে পারবেন না। তার পথত্যাগ তাকে মুক্ত করেনি, বরং তার লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যদি তিনি পথের কষ্টকে গ্রহণ করে নিজের কর্তব্যের প্রতি অবিচল থাকেন এবং চূড়ায় পৌঁছানোর পর সেই অর্জন নিয়ে অহংকারে আবদ্ধ না হন, তাহলে তার মধ্যে কর্মযোগের আদর্শের প্রকাশ ঘটতে পারে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক মানুষের সঙ্গে তার কর্তব্যের সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। মানুষ প্রায়ই আনন্দকে ভালো এবং কষ্টকে খারাপ বলে বিচার করে। কিন্তু নৈতিকতার ক্ষেত্রে এই বিচার সবসময় যথেষ্ট নয়। কোনো কাজ আনন্দদায়ক হলেই তা নৈতিক নয় এবং কোনো কাজ কষ্টকর হলেই তা অনৈতিক নয়। কখনো কখনো ন্যায়সঙ্গত কাজ কঠিন হয় এবং অন্যায় কাজ সহজ হতে পারে। তাই নৈতিক জীবনের প্রশ্ন হলো আমি কোন কাজ থেকে আনন্দ পাচ্ছি তা নয়, বরং কোন কাজ আমার কর্তব্য এবং কোন কাজ আমার বিবেক ও ন্যায়বোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গভীর। মানুষ সাধারণত তাৎক্ষণিক আরামকে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের ওপর অগ্রাধিকার দিতে পারে। কঠিন পড়াশোনার পরিবর্তে বিনোদন বেছে নেওয়া, নিয়মিত পরিশ্রমের পরিবর্তে অলসতা বেছে নেওয়া অথবা দায়িত্বের পরিবর্তে সহজ পথ বেছে নেওয়া এই প্রবণতার উদাহরণ। সাময়িক কষ্ট এড়িয়ে মানুষ কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ হারায়। তাই কষ্ট এড়ানো এবং প্রকৃত দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। অনেক সময় সাময়িক কষ্ট গ্রহণ করাই ভবিষ্যতের বৃহত্তর কল্যাণের পথ তৈরি করে।

এই শ্লোকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক সত্যও রয়েছে। মানুষ যতক্ষণ নিজের আরাম ও স্বার্থকে জীবনের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ধরে রাখে, ততক্ষণ তার স্বাধীনতা সীমিত থাকে। কারণ তখন সে এমন কাজই করতে চায় যা তার জন্য সহজ এবং আনন্দদায়ক। কিন্তু আত্মিক পরিপক্বতা তখনই শুরু হয় যখন মানুষ বুঝতে পারে যে জীবনের সব কর্তব্য আনন্দদায়ক হবে না। কিছু কাজ কষ্টকর হবে, কিছু দায়িত্ব ভারী মনে হবে এবং কিছু পথ দীর্ঘ হবে। তবুও যদি সেই কাজ ন্যায়সঙ্গত ও কর্তব্যসঙ্গত হয়, তাহলে শুধু অস্বস্তির কারণে তা ত্যাগ করা উচিত নয়।

এই অর্থে কায়ক্লেশ কেবল শরীরের কষ্টের প্রতীক নয়। এটি জীবনের সমস্ত বাস্তব পরিশ্রমের প্রতীক। ভোরে উঠে অধ্যয়ন করা, দীর্ঘদিন ধরে কোনো দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করা, অন্যের সেবা করা, নিজের ইন্দ্রিয়কে সংযত করা অথবা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করা সবই কায়ক্লেশের প্রতীক হতে পারে। একইভাবে ভয় শুধু বিপদের ভয় নয়। এটি ব্যর্থতা, অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা এবং নিজের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হওয়ার ভয়েরও প্রতীক।

শ্লোকটির শিক্ষা তাই মানুষের কাছে একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসা নিয়ে আসে। আমি কি কোনো কাজ সত্যিই ভুল বলে ত্যাগ করছি, নাকি কাজটি কঠিন বলে ত্যাগ করছি। আমি কি কোনো দায়িত্ব থেকে মুক্ত হচ্ছি, নাকি নিজের অস্বস্তি থেকে পালাচ্ছি। আমি কি ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করছি, নাকি কর্মের দায়িত্বই এড়িয়ে যাচ্ছি। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষের নিজের চরিত্র সম্পর্কে তাকে অনেক কিছু জানতে সাহায্য করতে পারে।

গীতার কর্মযোগের আলোকে বলা যায়, মানুষের লক্ষ্য কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং কর্মের মধ্যেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করা। কর্তব্য পালন করতে হবে, কিন্তু সেই কর্তব্যের ফল নিয়ে অহংকার বা অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষায় আবদ্ধ হওয়া যাবে না। কর্ম করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, কিন্তু কর্মের ফলকে নিজের অস্তিত্বের একমাত্র মূল্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এই অবস্থানেই কর্ম ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির পথে পরিণত হয়।

দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াত্ত্যজেৎ এই শ্লোকাংশ তাই শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশ নয়। এটি মানুষের জীবনযাপনের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং নৈতিক শিক্ষা। জীবন থেকে সব কষ্ট সরিয়ে ফেলাই মুক্তি নয়। বরং কোন কষ্ট গ্রহণ করা অর্থপূর্ণ এবং কোন কষ্ট অপ্রয়োজনীয় তা বুঝতে শেখাই পরিপক্বতার লক্ষণ। কর্তব্যের পথে আসা সাময়িক কষ্টকে শুধু ভয়ের কারণে প্রত্যাখ্যান করলে মানুষ তার নিজের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের ত্যাগের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে শেখায়। ত্যাগ মানে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। ত্যাগ মানে কেবল বাহ্যিকভাবে কাজ ছেড়ে দেওয়াও নয়। প্রকৃত ত্যাগ হলো কর্তব্য পালন করতে করতে নিজের স্বার্থপর আসক্তি, অহংকার এবং ফলের প্রতি অতিরিক্ত অধিকারবোধকে অতিক্রম করা। যে ব্যক্তি কেবল কষ্টের ভয়ে কর্ম ত্যাগ করে, তার ত্যাগ রাজসিক এবং সে ত্যাগের প্রকৃত ফল লাভ করতে পারে না। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কর্তব্যকে গ্রহণ করে, কষ্টকে অতিক্রম করে, কর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকে এবং কর্মফলের প্রতি আসক্তি কমিয়ে আনে, সে ধীরে ধীরে প্রকৃত ত্যাগের পথে অগ্রসর হয়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা আজও মানুষের জীবনে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কষ্ট থেকে পালিয়ে যাওয়া সবসময় মুক্তি নয়। কখনো কখনো কর্তব্যের পথে স্থির থেকে কষ্টকে অতিক্রম করাই সত্যিকারের মুক্তির সূচনা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 August 25, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি