ভগবদ্গীতা ১৮.৯ — সাত্ত্বিক ত্যাগ: আসক্তি ও কর্মফল ত্যাগ করে কর্তব্য পালন
কার্যমিত্যেব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তেহর্জুন।
সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলং চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ।।৯।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! আসক্তি ও ফল পরিত্যাগ করে কর্তব্যবোধে যে নিত্যকর্মের অনুষ্ঠান করা হয়, আমার মতে সেই ত্যাগ সাত্ত্বিক।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের নবম শ্লোকটি ত্যাগের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “কার্যমিত্যেব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তেহর্জুন। সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলং চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ।” অর্থাৎ হে অর্জুন, যে নিয়ত কর্তব্যকর্মকে কেবল কর্তব্য বলেই সম্পাদন করা হয় এবং সেই কর্মের প্রতি আসক্তি ও কর্মফল উভয়ই ত্যাগ করা হয়, সেই ত্যাগই সাত্ত্বিক ত্যাগ বলে বিবেচিত। এই শ্লোকের মধ্যে কর্ম, কর্তব্য, আসক্তি, ফল এবং ত্যাগ সম্পর্কে এমন একটি গভীর জীবনদর্শন নিহিত রয়েছে যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে তার নৈতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ পর্যন্ত সর্বত্র প্রযোজ্য।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো “কার্যম্”। সংস্কৃত “কার্যম্” শব্দটির উৎস হলো “কৃ” ধাতু, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা, সৃষ্টি করা বা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। “কার্যম্” শব্দের মধ্যে সাধারণ কাজের তুলনায় অনেক গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। এর অর্থ এমন কিছু যা করা উচিত, যা পালনীয় এবং যা কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এখানে কাজ করার প্রবৃত্তির কথা বলা হচ্ছে না, বরং বিবেক ও কর্তব্যবোধ থেকে যে কাজ সম্পাদন করা উচিত তার কথা বলা হয়েছে। একজন মানুষ তার জীবনে অসংখ্য কাজ করতে পারে, কিন্তু সব কাজ কর্তব্য নয়। কোনো কাজ ব্যক্তিগত লাভের জন্য হতে পারে, কোনো কাজ আনন্দের জন্য হতে পারে, আবার কোনো কাজ অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্যও হতে পারে। কিন্তু “কার্যম্” সেই কাজকে নির্দেশ করে যা নিজের কর্তব্যবোধ ও নৈতিক দায়িত্বের কারণে করা উচিত।
“কার্যমিত্যেব” পদবন্ধটি এই অর্থকে আরও গভীর করে তোলে। এটি “কার্যম্”, “ইতি” এবং “এব” এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। “ইতি” অর্থ এইভাবে, এই বলে বা এই বোধে এবং “এব” অর্থ কেবল, একমাত্র বা নিশ্চয়ই। ফলে “কার্যমিত্যেব” এর গভীর ভাব হলো, “এটি কর্তব্য” এই বোধেই কর্ম সম্পাদন করা। এখানে কর্ম করার পেছনে ব্যক্তিগত লাভ, প্রশংসা, সম্মান, সাফল্য কিংবা প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষাকে প্রধান কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। কর্ম করার একমাত্র যথার্থ কারণ হলো কর্মটি কর্তব্য। এই একটি ভাবনার মধ্যেই গীতার কর্মযোগের একটি মৌলিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মানুষ সাধারণত কোনো কাজ করার আগে তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে চিন্তা করে। কাজটি করলে কী লাভ হবে, কত অর্থ পাওয়া যাবে, কতটা সম্মান অর্জিত হবে, অন্যেরা কী বলবে কিংবা নিজের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, এইসব প্রশ্ন মানুষের কর্মপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো, কর্মের যথার্থ ভিত্তি হওয়া উচিত কর্তব্যবোধ। যদি কোনো কাজ সত্যিই কর্তব্য হয়, তাহলে তার ফলের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ না রেখেও সেই কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব। এই অবস্থায় কর্ম মানুষের স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ না হয়ে তার নৈতিক চরিত্রের প্রকাশে পরিণত হয়।
শ্লোকে “যৎ কর্ম” এবং “নিয়তম্” শব্দ দুটি এই কর্তব্যের ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। “যৎ কর্ম” অর্থ যে কর্ম এবং “নিয়ত” অর্থ নির্দিষ্ট, নিয়মিত, পালনীয় বা কর্তব্যনির্ধারিত। সুতরাং এখানে যে কোনো কাজের কথা বলা হয়নি। এমন কর্মের কথা বলা হয়েছে যা ব্যক্তির জীবনের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। একজন শিক্ষকের জন্য শিক্ষা প্রদান কর্তব্য হতে পারে, একজন চিকিৎসকের জন্য রোগীর সেবা কর্তব্য হতে পারে, একজন পিতা বা মাতার জন্য সন্তানের যথাযথ লালন পালন কর্তব্য হতে পারে এবং একজন নাগরিকের জন্য সমাজের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব পালন কর্তব্য হতে পারে। কর্তব্যের প্রকৃতি ব্যক্তি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হলেও কর্তব্যবোধের মূলনীতি একই থাকে।
এরপর আসে “সঙ্গং ত্যক্ত্বা”। “সঙ্গ” শব্দের অর্থ সংযোগ, আসক্তি, মানসিক বন্ধন বা কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকা। এখানে বাহ্যিক সম্পর্কের চেয়ে মানসিক আসক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষ কোনো কাজ করতে পারেন, কিন্তু সেই কাজের সঙ্গে নিজের অহংকার ও ব্যক্তিগত পরিচয় এমনভাবে যুক্ত করে ফেলতে পারেন যে কাজটির ফলাফল তার সুখ ও দুঃখের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। তখন কর্ম আর কেবল কর্ম থাকে না, তা তার মানসিক বন্ধনে পরিণত হয়। “ত্যক্ত্বা” শব্দটি “ত্যজ্” ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ ত্যাগ করে, ছেড়ে দিয়ে বা পরিত্যাগ করে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানে কর্ম ত্যাগ করতে বলেননি। তিনি বলেছেন “সঙ্গং ত্যক্ত্বা”, অর্থাৎ আসক্তি ত্যাগ করে।
এই পার্থক্যটি গীতার ত্যাগ দর্শনের মূল চাবিকাঠি। কর্মকে পরিত্যাগ করা এবং কর্মের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ কাজ ছেড়ে দিয়ে বাহ্যিকভাবে ত্যাগী বলে মনে হতে পারেন, কিন্তু তার মন যদি এখনও সম্মান, সম্পদ, প্রশংসা কিংবা ফলাফলের প্রতি আকৃষ্ট থাকে, তাহলে প্রকৃত ত্যাগ সম্পন্ন হয় না। আবার একজন মানুষ সংসারে থেকে নিজের সমস্ত কর্তব্য পালন করেও অন্তরে অনাসক্ত থাকতে পারেন। তিনি কাজ করেন, কিন্তু কাজের ফলকে নিজের অহংকারের বিষয় করেন না। তিনি সাফল্যে অহংকারে ভেসে যান না এবং ব্যর্থতায় নিজের অস্তিত্বকে অর্থহীন মনে করেন না। এই অন্তরের স্বাধীনতাই প্রকৃত ত্যাগের লক্ষণ।
শ্লোকের “ফলং চৈব” অংশটি এই শিক্ষাকে আরও সুস্পষ্ট করে। “ফল” অর্থ কর্মের ফল, পরিণাম বা প্রত্যাশিত অর্জন। মানুষের কর্মজীবনে ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও গীতার শিক্ষা ফলকে অস্বীকার করে না। বরং ফলের প্রতি মানসিক আসক্তি ত্যাগ করার কথা বলে। একজন কৃষক জমি প্রস্তুত করতে পারেন, বীজ বপন করতে পারেন, জল দিতে পারেন এবং আগাছা পরিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু বৃষ্টি হবে কি না, প্রকৃতি কীভাবে সাড়া দেবে কিংবা ফসলের পরিমাণ কত হবে, তার সবকিছু তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। তাঁর কর্তব্য হলো কৃষিকর্ম যথাসাধ্য সঠিকভাবে সম্পন্ন করা। ফলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আছে মনে করা তাঁর পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের জীবনও অনেকটা একই রকম। আমরা চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু প্রতিটি ফলাফলকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।
এই উপলব্ধি মানুষের মানসিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি উদ্বেগ, হতাশা, ভয়, অহংকার এবং অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। একজন ছাত্র যদি মনে করে পরীক্ষার ফলই তার সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করবে, তাহলে তার মধ্যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সে যদি ভাবে যে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা তার কর্তব্য এবং ফলাফল তার প্রচেষ্টার পাশাপাশি বহু বাহ্যিক কারণের ওপরও নির্ভরশীল, তাহলে তার মানসিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পায়। একজন কর্মীও নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে পারেন, কিন্তু পদোন্নতি বা প্রশংসাকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র মাপকাঠি না বানালে তিনি অধিক স্থির ও শান্ত থাকতে পারেন।
এই কারণে “সাত্ত্বিক ত্যাগ” ধারণাটি কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক শিক্ষার বিষয় নয়, এটি গভীর মনোবৈজ্ঞানিক সত্যও বহন করে। সাত্ত্বিক মানসিকতা হলো স্বচ্ছ, সংযত, জ্ঞাননির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতা। সাত্ত্বিক ত্যাগের ক্ষেত্রে মানুষ কর্ম থেকে পালিয়ে যায় না এবং ফলের জন্য অন্ধভাবে ছুটেও বেড়ায় না। সে নিজের কর্তব্য বুঝে, যথাসাধ্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে এবং ফলাফলকে অহংকার বা হতাশার একমাত্র কারণ হতে দেয় না। ফলে তার কর্ম ধীরে ধীরে অন্তরের শুদ্ধতার মাধ্যম হয়ে ওঠে।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোক মানুষের কর্তা হওয়ার ধারণাকেও প্রশ্ন করে। সাধারণ মানুষ মনে করে, “আমি করছি, আমি অর্জন করছি, আমি সফল হচ্ছি এবং আমি ব্যর্থ হচ্ছি।” এই “আমি” কেন্দ্রিক চেতনা থেকেই কর্মের সঙ্গে অহংকারের সম্পর্ক তৈরি হয়। গীতার শিক্ষা মানুষকে এই সংকীর্ণ কর্তা ও ভোক্তার ধারণা অতিক্রম করতে সাহায্য করে। কর্ম করা মানুষের কর্তব্য, কিন্তু কর্মের প্রতিটি ফলকে নিজের ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম করে দেখা জ্ঞানের লক্ষণ নয়। কর্মের মাধ্যমে মানুষ নিজের কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু কর্মফলের দ্বারা নিজের আত্মপরিচয় নির্মাণ করবে না।
বেদান্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই শিক্ষা আরও গভীর হয়ে ওঠে। মানুষের বন্ধনের অন্যতম কারণ হলো “আমি কর্তা” এবং “আমি ভোক্তা” এই ধারণা। আমি কাজ করছি এবং আমিই তার ফল ভোগ করব এই মানসিকতা মানুষকে কর্মফলের সঙ্গে আবদ্ধ করে। কিন্তু যখন মানুষ বুঝতে শেখে যে তার কর্তব্য হলো যথাসাধ্য সৎ ও নিষ্ঠাপূর্ণ কর্ম করা এবং ফলের প্রতি অহংকারপূর্ণ আসক্তি ত্যাগ করা, তখন কর্ম ধীরে ধীরে বন্ধনের কারণ না হয়ে আত্মশুদ্ধির উপায়ে পরিণত হয়। এই কারণেই গীতায় কর্মজীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনকে পরস্পরের বিপরীত বলে মনে করা হয়নি।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। এখানে কর্ম জীবনের প্রতীক, সঙ্গ মানসিক বন্ধনের প্রতীক, ফল মানুষের প্রত্যাশার প্রতীক এবং ত্যাগ অন্তরের স্বাধীনতার প্রতীক। মানুষের জীবন থেকে কর্মকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। যতদিন মানুষ জীবিত, ততদিন কোনো না কোনোভাবে তাকে কর্ম করতে হবে। তাই মুক্তির পথ কর্ম থেকে পালানোর মধ্যে নয়, কর্মের সঙ্গে ভুলভাবে আবদ্ধ হওয়া থেকে মুক্ত হওয়ার মধ্যে। এই দৃষ্টিতে গীতার ত্যাগ হলো জগতের প্রতি বিরাগ নয়, বরং জগতের মধ্যে থেকে অনাসক্তভাবে কর্তব্য পালন করার সাধনা।
একজন চিকিৎসকের উদাহরণ এই সত্যকে সহজে বোঝায়। একজন চিকিৎসক তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতা দিয়ে একজন রোগীর চিকিৎসা করেন। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু প্রতিটি রোগীর চূড়ান্ত ফলাফল তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই তাঁর প্রকৃত কর্তব্য হলো সর্বোচ্চ নিষ্ঠায় চিকিৎসা করা। একইভাবে একজন শিক্ষক ছাত্রকে সর্বোত্তম শিক্ষা দিতে পারেন, কিন্তু ছাত্রের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে শিক্ষকের হাতে থাকে না। একজন পিতা বা মাতা সন্তানের চরিত্র গঠনে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সন্তানের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এইসব উদাহরণ দেখায় যে কর্তব্যের ক্ষেত্রে আমাদের পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু ফলাফলের ওপর সম্পূর্ণ মালিকানা দাবি করা উচিত নয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শিক্ষা তাই নিষ্ক্রিয়তার শিক্ষা নয়। বরং এটি সক্রিয় জীবনের মধ্যে অন্তরের স্বাধীনতা অর্জনের শিক্ষা। সাত্ত্বিক ত্যাগী মানুষ কাজ করেন, কিন্তু কর্মের দাস হন না। তিনি কর্তব্য পালন করেন, কিন্তু কর্তব্যের বিনিময়ে অহংকার দাবি করেন না। তিনি চেষ্টা করেন, কিন্তু ফলাফলকে নিজের আত্মমূল্যের একমাত্র মাপকাঠি বানান না। তিনি সাফল্য পেলে অহংকারে অন্ধ হন না এবং ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন না। কারণ তাঁর কাছে কর্ম নিজেই সাধনা এবং কর্তব্য নিজেই তার কর্মের নৈতিক ভিত্তি।
“কার্যমিত্যেব” তাই শুধু একটি সংস্কৃত পদবন্ধ নয়। এটি মানুষের জীবনের একটি গভীর নৈতিক নির্দেশনা। এর মধ্যে প্রশ্ন আছে, “আমি কেন এই কাজ করছি।” যদি উত্তর হয় ব্যক্তিগত লাভ, প্রশংসা বা প্রতিদান, তাহলে কর্মের সঙ্গে আসক্তির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যদি উত্তর হয়, “এটি আমার কর্তব্য, তাই আমি এটি করব”, তাহলে কর্মের চরিত্র বদলে যায়। তখন কর্ম ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বাহন না হয়ে নৈতিকতার প্রকাশ হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ত্যাগ বাহ্যিক পরিত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত ত্যাগ হলো অন্তরের আসক্তি ত্যাগ করা। কর্মকে ত্যাগ না করে কর্মের প্রতি অহংকারপূর্ণ আসক্তি ত্যাগ করা, কর্তব্য থেকে পালিয়ে না গিয়ে কর্তব্যকে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা এবং ফলের প্রতি অন্ধ আকাঙ্ক্ষা না রেখে নিজের সাধ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম কর্ম সম্পাদন করাই সাত্ত্বিক ত্যাগের মর্ম। “কার্যমিত্যেব” আমাদের কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, “সঙ্গং ত্যক্ত্বা” আমাদের আসক্তি থেকে মুক্ত হতে শেখায় এবং “ফলং চৈব” আমাদের প্রত্যাশার বন্ধন অতিক্রম করতে আহ্বান জানায়। এই তিনটি শিক্ষা একত্রে মানুষের কর্মজীবনকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম সত্য হলো, মানুষের মুক্তি কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং কর্মের মধ্যেই অনাসক্ত, নিঃস্বার্থ এবং স্বচ্ছ চেতনা নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে। কর্তব্যকে আন্তরিকভাবে পালন করা, কর্মের প্রতি আসক্ত না হওয়া এবং ফলাফলকে নিজের অহংকারের কেন্দ্র না বানানোই সেই অন্তরের স্বাধীনতা, যাকে শ্রীকৃষ্ণ সাত্ত্বিক ত্যাগ বলে অভিহিত করেছেন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!