সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা দ্বিতীয় অধ্যায়, ২য় শ্লোকের ব্যাখ্যা: শ্রীকৃষ্ণের আত্মজাগরণের আহ্বান ও অর্জুনের দুর্বলতার প্রতি ঈশ্বরীয় উপদেশ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্। 
অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্ত্তিকরমর্জুন॥২॥

অনুবাদ: হে অর্জুন! এই সংকটময় মুহূর্তে তোমার মধ্যে এই মোহ, দুর্বলতা ও কলুষতা কোথা থেকে এল? এটি আর্যোচিত নয়, স্বর্গলাভের উপযোগী নয় এবং কীর্তিনাশক।

ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের এই শ্লোকটি কেবল অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একটি প্রশ্নই নয়, বরং মানবজীবনের সংকট, দুর্বলতা, নৈতিকতা ও আত্মজাগরণের এক গভীর দার্শনিক আহ্বান। এখানে “শ্রীভগবান উবাচ” অর্থাৎ “পরম ঐশ্বর্যসম্পন্ন ভগবান বললেন”—এই সূচনাই নির্দেশ করে যে পরবর্তী বাণী কোনো সাধারণ উপদেশ নয়, বরং সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান ও করুণাময় ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত চিরন্তন সত্য। “কুতঃ” শব্দের অর্থ “কোথা থেকে” বা “কিসের কারণে”, যা আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। “ত্বা” অর্থ “তোমার মধ্যে” এবং “কশ্মলম্” অর্থ মোহ, মানসিক কলুষতা, দুর্বলতা, অজ্ঞতা বা হৃদয়ের মলিনতা। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ জানতে চাইছেন—এই ভয়, হতাশা ও দুর্বলতা তোমার মধ্যে কোথা থেকে এলো? “ইদম্” অর্থ “এই” এবং “বিষমে সমুপস্থিতম্” অর্থ “এই সংকটপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উপস্থিত হয়েছে”। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রের মতো জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে এই দুর্বলতা সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এরপর “অনার্যজুষ্টম্” শব্দটি এসেছে, যার অর্থ “যা আর্য বা মহৎ ব্যক্তির আচরণ নয়”। এখানে “আর্য” কোনো জাতিগত পরিচয় নয়; বরং যিনি সত্যনিষ্ঠ, সাহসী, ন্যায়পরায়ণ ও চরিত্রবান—তাঁকেই আর্য বলা হয়েছে। “অস্বর্গ্যম্” অর্থ “যা উন্নতি, কল্যাণ বা স্বর্গীয় ফলের উপযোগী নয়” এবং “অকীর্ত্তিকরম্” অর্থ “যা কীর্তি নষ্ট করে, সম্মান ও মর্যাদা বিনষ্ট করে”। সর্বশেষে “অর্জুন” সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ কেবল একজন যোদ্ধাকে নয়, প্রতিটি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি, কর্তব্যবোধ ও বিবেককে জাগ্রত করছেন।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো—“হে অর্জুন! এই সংকটময় মুহূর্তে তোমার মধ্যে এই মোহ ও দুর্বলতা কোথা থেকে এলো? এটি মহৎ মানুষের উপযোগী নয়, কল্যাণদায়ক নয় এবং কীর্তিনাশক।” কিন্তু এর গভীর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এখানে “কশ্মল” কেবল ভয় বা বিষাদ নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের অভাব, নৈতিক বিভ্রান্তি, কর্তব্যবিমুখতা এবং আত্মস্বরূপ ভুলে যাওয়ার প্রতীক। জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ যখন হতাশা, ভয়, দ্বিধা বা আত্মসমর্পণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন এই শ্লোক তার অন্তরে প্রশ্ন তোলে—“এই দুর্বলতা কোথা থেকে এলো?” এই প্রশ্নই আত্মজাগরণের সূচনা। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি শেখায় যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ক্ষণস্থায়ী আবেগ নয়; বরং তার চিরন্তন আত্মা, বিবেক ও কর্তব্যবোধ। উপনিষদীয় দর্শন, সাংখ্যদর্শন এবং বেদান্তের আলোকে এই শিক্ষা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে অজ্ঞতা থেকেই মোহের জন্ম, আর জ্ঞানই সেই মোহ দূর করে।

প্রতীকী অর্থেও শ্লোকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কুরুক্ষেত্র এখানে কেবল একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি মানুষের অন্তরের নৈতিক সংগ্রামের প্রতীক। অর্জুন প্রতীক সেই মানুষের, যে জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণ প্রতীক পরম জ্ঞান, বিবেক ও ঈশ্বরীয় পথপ্রদর্শনের। আর “কশ্মল” প্রতীক অজ্ঞতা, ভয়, মানসিক দুর্বলতা ও আত্মবিস্মৃতির। সাহিত্য, মনোবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিতে এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে সংকটের মুহূর্তে আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং সত্য, জ্ঞান ও কর্তব্যের পথে দৃঢ় থাকা-ই প্রকৃত মহত্ত্ব। যেমন একজন চিকিৎসক ব্যক্তিগত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে রোগীর জীবন রক্ষা করেন, একজন সৈনিক দেশের নিরাপত্তার জন্য নিজের ভয়কে অতিক্রম করেন, অথবা একজন শিক্ষক প্রতিকূল অবস্থাতেও সত্য ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যান—তেমনি অর্জুনকেও তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতা অতিক্রম করে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য কর্তব্যপথে অবিচল থাকতে বলা হয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকটি কেবল অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের তিরস্কার নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যে এক চিরন্তন জাগরণী বার্তা। ভাষাগতভাবে এটি প্রশ্নবাচক হলেও দার্শনিকভাবে এটি আত্মজ্ঞান, সাহস, নৈতিকতা ও কর্তব্যবোধের ঘোষণা। প্রতীকীভাবে এটি শেখায় যে মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরের কোনো শক্তি নয়, বরং নিজের অন্তরের মোহ, ভয় ও অজ্ঞতা। তাই এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো—জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও দুর্বলতা নয়, বরং জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস, ন্যায় ও কর্তব্যবোধই মানুষকে প্রকৃত মর্যাদা, কল্যাণ ও চিরন্তন কীর্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: July 30, 2026 July 30, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি