সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.১৩ | গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা এবং ঈশ্বরের অকার্তৃত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।১৩।।
চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ।
তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।১৩।।

অনুবাদঃ প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানব-সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি। আমি এই প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবসমাজের গঠন, মানুষের স্বভাব, কর্মের প্রকৃতি এবং ঈশ্বরের নির্লিপ্ত সৃষ্টিশক্তি সম্পর্কে এক গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকে বলা হয়েছে যে চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ তস্য কর্ত্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্ত্তারমব্যয়ম্। এই শ্লোকের মূল ভাব হলো সমাজে চার বর্ণের যে ব্যবস্থা বিদ্যমান তা জন্মের ভিত্তিতে নয় বরং মানুষের গুণ এবং কর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে ভগবান ঘোষণা করছেন যে তিনি এই ব্যবস্থার স্রষ্টা হলেও কর্মের দ্বারা আবদ্ধ নন। তিনি চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং অকার্তা।

চাতুর্বর্ণ্য শব্দটি সংস্কৃত চতুর্ এবং বর্ণ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। চতুর্ অর্থ চার এবং বর্ণ অর্থ রং, শ্রেণি, প্রকৃতি কিংবা মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। এইভাবে চাতুর্বর্ণ্য বলতে চার প্রকার স্বভাব ও কর্মভিত্তিক মানবগোষ্ঠীর সমষ্টিকে বোঝায়। এখানে বর্ণ শব্দের অর্থ কেবল সামাজিক পরিচয় নয় বরং মানুষের অন্তর্নিহিত গুণ, প্রবণতা এবং যোগ্যতা। ময়া শব্দের অর্থ আমার দ্বারা এবং এটি নির্দেশ করে যে সমগ্র সৃষ্টি ও সামাজিক বিন্যাসের উৎস পরমেশ্বর। সৃষ্টং শব্দটি সৃজ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ সৃষ্টি করা, প্রকাশ করা বা অস্তিত্বে নিয়ে আসা। গুণ শব্দটি মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও মানসিক প্রবণতাকে বোঝায়। কর্ম শব্দের অর্থ কাজ, কর্তব্য কিংবা কার্যকলাপ। বিভাগশঃ অর্থ বিভাজন অনুসারে বা যথাযথ শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী। কর্ত্তারম্ অর্থ স্রষ্টা বা কর্তা এবং অकर्त্তারম্ অর্থ যিনি প্রকৃতপক্ষে কর্মে আবদ্ধ নন। অব্যয়ম্ শব্দের অর্থ যিনি ক্ষয়হীন, পরিবর্তনহীন এবং চিরন্তন।

শব্দ গঠনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চাতুর্বর্ণ্য শব্দটি চার এবং বর্ণের সমন্বয়ে সমাজের চারটি স্বভাবভিত্তিক বিভাগের ধারণা প্রকাশ করে। গুণকর্মবিভাগশঃ একটি যৌগিক শব্দ যেখানে গুণ, কর্ম এবং বিভাগ একত্রিত হয়ে এই সত্যকে তুলে ধরে যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জন্ম নয় বরং তার চরিত্র ও কর্ম। অकर्त্তারম্ শব্দে অ উপসর্গ কর্তা শব্দকে নাকচ করে এমন এক অবস্থার পরিচয় দেয় যেখানে কর্ম সংঘটিত হলেও কর্মের আসক্তি বা বন্ধন নেই। অব্যয়ম্ শব্দটি ঈশ্বরের নিত্য, অপরিবর্তনীয় এবং অবিনশ্বর স্বরূপকে নির্দেশ করে।

বাংলা অর্থে এই শ্লোক আমাদের জানায় যে চার বর্ণের ব্যবস্থা ঈশ্বরের সৃষ্টি হলেও তা মানুষের গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত। আক্ষরিক অর্থে ভগবান বলছেন যে তিনি এই ব্যবস্থার স্রষ্টা হলেও তাঁকে অকার্তা ও অবিনশ্বর বলে জানতে হবে। এই বক্তব্যের মধ্যে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে। ঈশ্বর সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কারণ হলেও তিনি কর্মফলের ভোগী নন এবং কোনো কর্ম তাঁকে আবদ্ধ করতে পারে না।

প্রাসঙ্গিক অর্থে এই শ্লোক মানবসমাজে সমতা ও যোগ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে। এখানে জন্মগত পরিচয়কে মুখ্য করা হয়নি বরং মানুষের স্বভাব, চরিত্র, দক্ষতা এবং কর্মকে প্রধান বিবেচনা করা হয়েছে। একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান, নৈতিকতা, কর্মদক্ষতা এবং সমাজকল্যাণে অবদানের মাধ্যমে। এই শিক্ষা সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত বিকাশের এক চিরন্তন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে প্রযোজ্য। প্রত্যেক মানুষের স্বভাব ও ক্ষমতা এক নয়। কেউ জ্ঞানচর্চায় পারদর্শী, কেউ নেতৃত্বে দক্ষ, কেউ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সফল, আবার কেউ কঠোর পরিশ্রম ও সেবার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই বৈচিত্র্য কোনো বিভেদ নয় বরং একটি সুসংগঠিত সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে এই শ্লোক শিক্ষা দেয় যে কর্ম করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে কিন্তু অহংকার বা আসক্তি ছাড়া। যিনি নিজের কর্তব্য পালন করেন অথচ নিজেকে কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করেন না তিনি কর্মযোগের প্রকৃত আদর্শের দিকে অগ্রসর হন।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। বেদান্ত দর্শনে ঈশ্বরকে সমগ্র সৃষ্টির কারণ হিসেবে স্বীকার করা হলেও তিনি কর্মফলের দ্বারা আবদ্ধ নন। সাংখ্য দর্শন অনুসারে মানুষের আচরণ ও প্রকৃতি সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণের বিভিন্ন সংমিশ্রণে গঠিত হয়। সেই কারণেই মানুষের স্বভাব ও কর্মে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কর্মযোগের আলোকে এই শ্লোক শেখায় যে প্রত্যেক মানুষ নিজের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য নিষ্কামভাবে সম্পাদন করলে আত্মোন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে। অদ্বৈত দর্শনে এই শ্লোক আরও গভীর অর্থ বহন করে যেখানে বলা হয় আত্মা প্রকৃতপক্ষে কখনো কর্তা নয় বরং কর্ম কেবল প্রকৃতির স্তরে সংঘটিত হয়।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চাতুর্বর্ণ্য মানবসমাজের বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যের প্রতীক। গুণ মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাব ও চরিত্রের প্রতীক। কর্ম জীবনের গতিশীলতা ও আত্মপ্রকাশের প্রতীক। অকার্তা আসক্তিহীন চেতনা এবং অন্তরের মুক্ত অবস্থার প্রতীক। অব্যয় পরম সত্য, নিত্য আত্মা এবং চিরন্তন সত্তার প্রতীক। এই প্রতীকগুলো মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। একজন শিক্ষক জ্ঞান বিতরণ করেন, একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করেন, একজন সৈনিক দেশ রক্ষা করেন এবং একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাজ আলাদা হলেও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে সকলের অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবার সূর্য যেমন নিরবচ্ছিন্নভাবে আলো ও তাপ প্রদান করে কিন্তু তার বিনিময়ে কিছু প্রত্যাশা করে না তেমনি ঈশ্বরও সমগ্র সৃষ্টি পরিচালনা করেন অথচ কোনো কর্মে আবদ্ধ হন না। একটি অর্কেস্ট্রায় যেমন ভিন্ন ভিন্ন বাদ্যযন্ত্র একসঙ্গে মিলিত হয়ে মনোমুগ্ধকর সুর সৃষ্টি করে তেমনি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন গুণ ও কর্ম সমাজকে পূর্ণতা প্রদান করে।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত পরিচয় জন্ম নয় বরং তার গুণ, চরিত্র এবং কর্ম। সমাজে বৈচিত্র্য স্বাভাবিক এবং সেই বৈচিত্র্যই সমাজকে শক্তিশালী ও সুষম করে তোলে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন যে প্রত্যেক মানুষকে নিজের স্বভাবসিদ্ধ কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে কিন্তু কর্মের অহংকার বা আসক্তিতে আবদ্ধ হওয়া চলবে না। ঈশ্বর সৃষ্টির মূল কারণ হলেও তিনি কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ নন। এই উপলব্ধি মানুষকে আত্মজ্ঞান, কর্মযোগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে পরিচালিত করে। তাই এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবসভ্যতা, নৈতিকতা, দর্শন এবং আত্মোন্নতির এক চিরন্তন জীবনদর্শন।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 10, 2026 August 10, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি