সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.১৫ | জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়ে মুক্তির পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ।কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্।।১৫।…
এবং জ্ঞাত্বা কৃতং কর্ম পূর্বৈরপি মুমুক্ষুভিঃ।
কুরু কর্মৈব তস্মাত্ত্বং পূর্বৈঃ পূর্বতরং কৃতম্।।১৫।।

অনুবাদঃ প্রাচীনকালে সমস্ত মুক্ত পুরুষেরা আমার অপ্রাকৃত তত্ত্ব অবগত হয়ে কর্ম করেছেন। অতেএব তুমিও সেই প্রাচীন মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি কর্মযোগের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা যাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল সেই প্রাচীন ঋষি মহর্ষি ও জ্ঞানীগণও কখনও কর্ম পরিত্যাগ করেননি। তাঁরা কর্মের প্রকৃত তত্ত্ব উপলব্ধি করে নিষ্কামভাবে কর্তব্য পালন করেছিলেন। সেই একই আদর্শ অর্জুনেরও অনুসরণ করা উচিত। এই শ্লোকের মূল বার্তা হলো জ্ঞান ও কর্ম পরস্পরের বিরোধী নয় বরং প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে সৎ ও নিঃস্বার্থ কর্মের দিকেই পরিচালিত করে।

শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো জ্ঞাত্বা যার উৎপত্তি সংস্কৃত জ্ঞা ধাতু থেকে। এই ধাতুর অর্থ জানা উপলব্ধি করা বা সত্যকে অনুধাবন করা। জ্ঞাত্বা শব্দের অর্থ জেনে অথবা যথার্থভাবে উপলব্ধি করে। এখানে কেবল বাহ্যিক তথ্য জানা বোঝানো হয়নি বরং গভীর আত্মোপলব্ধি এবং সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে আত্মা চিরন্তন এবং কর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত লাভ নয় বরং ধর্ম প্রতিষ্ঠা তখন তার কর্ম আর বন্ধনের কারণ হয় না বরং মুক্তির পথ হয়ে ওঠে।

কর্ম শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে যার অর্থ করা সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। কর্ম বলতে সাধারণভাবে যেকোনো কাজকে বোঝালেও গীতার দর্শনে এর অর্থ অনেক গভীর। এখানে কর্ম বলতে এমন কর্তব্যকে বোঝানো হয়েছে যা ধর্মসম্মত এবং সমাজ ও জীবনের কল্যাণে সম্পাদিত হয়। কর্ম কেবল বাহ্যিক কার্যকলাপ নয় বরং চিন্তা বাক্য ও আচরণের সমষ্টিও কর্মের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে কোনো না কোনো কর্ম করছে এবং সেই কর্মই তার চরিত্র গঠন করে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে।

মুমুক্ষু শব্দটি এসেছে মুচ ধাতু থেকে যার অর্থ মুক্ত হওয়া। মুমুক্ষু বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায় যার অন্তরে মোক্ষ বা জন্ম মৃত্যু দুঃখ এবং অজ্ঞানের বন্ধন থেকে মুক্তির প্রবল আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠেছে। মুমুক্ষু ব্যক্তি জাগতিক ভোগবিলাসকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করেন না। তিনি উপলব্ধি করেন যে সত্যিকারের শান্তি আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরচেতনার মধ্যেই নিহিত। এই শ্লোকে বলা হয়েছে যে এমন মুক্তিকামী মহাপুরুষেরাও কর্ম থেকে দূরে সরে যাননি বরং জ্ঞান দ্বারা আলোকিত কর্মের পথই অনুসরণ করেছেন।

পূর্বৈঃ শব্দের অর্থ পূর্ববর্তী মহাপুরুষদের দ্বারা। এটি কেবল অতীতের কোনো মানুষের উল্লেখ নয় বরং সেই মহান ঐতিহ্যের প্রতীক যারা সত্য ধর্ম এবং ন্যায়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূর্বতরং কৃতম্ কথাটির অর্থ পূর্বপুরুষদের দ্বারা সম্পাদিত কর্ম। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে ধর্মময় জীবন কখনও নতুন কোনো আবিষ্কার নয় বরং যুগে যুগে মহৎ মানুষের পরীক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পথ। সেই পথ অনুসরণ করাই জীবনের নিরাপদ এবং কল্যাণকর দিশা।

কুরু শব্দটি আদেশসূচক এবং এর অর্থ করো বা সম্পাদন করো। এখানে এটি কেবল বাহ্যিক নির্দেশ নয় বরং মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান। জ্ঞান লাভের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয় বরং সেই জ্ঞানকে কর্মে রূপান্তরিত করাই প্রকৃত সাধনা। কর্মহীন জ্ঞান যেমন অসম্পূর্ণ তেমনি জ্ঞানহীন কর্মও মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। তাই জ্ঞান এবং কর্মের সমন্বয়ই গীতার অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো পূর্ববর্তী মুক্তিকামী মহাপুরুষেরা কর্মের প্রকৃত তত্ত্ব জেনে কর্তব্য পালন করেছিলেন। তাই তুমিও তাঁদের অনুসরণ করে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করো। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। মানুষ যদি কেবল নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করে তবে সেই কর্ম তাকে আসক্তির বন্ধনে আবদ্ধ করে। কিন্তু যদি কর্তব্যবোধ ঈশ্বরচেতনা এবং নিঃস্বার্থ মনোভাব নিয়ে কর্ম সম্পাদন করে তবে সেই কর্মই আত্মশুদ্ধি এবং মুক্তির সোপান হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক কর্মযোগের মৌলিক ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠা করে। এখানে বলা হয়েছে যে মুক্তি কর্ম ত্যাগের মাধ্যমে নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়। জ্ঞান মানুষকে শেখায় যে সে কেবল কর্মের একটি মাধ্যম। ফলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক ঈশ্বর এবং বিশ্বব্যাপী কার্যকারণের বিধান। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার দূর করে এবং তাকে বিনয়ী দায়িত্বশীল ও শান্ত করে তোলে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানবজীবনের অবিরাম যাত্রার প্রতীক। পূর্বপুরুষদের পথ এখানে চিরন্তন প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতার প্রতীক। কর্ম মানুষের জীবনের প্রবাহের প্রতীক। জ্ঞান সেই প্রবাহের দিশারী এবং মুমুক্ষু মানুষের অন্তর্গত আলোর প্রতীক যা তাকে সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে জীবনের প্রতিটি কর্তব্য যদি নিষ্ঠা সততা এবং আত্মসচেতনতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যায় তবে সাধারণ জীবনও আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হতে পারে।

বাস্তব জীবনে একজন সৎ চিকিৎসক যখন কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য নয় বরং রোগীর জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে চিকিৎসা করেন তখন তাঁর কর্ম নিষ্কাম কর্মের আদর্শের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একজন শিক্ষক যখন ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনকে বেশি গুরুত্ব দেন তখন তাঁর কর্মও এই শ্লোকের শিক্ষাকে ধারণ করে। ইতিহাসে অসংখ্য মহাপুরুষ সমাজকল্যাণের জন্য আত্মনিবেদিত কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে কর্মবিমুখ নয় বরং অধিকতর দায়িত্ববান করে তোলে।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো সত্য জ্ঞান মানুষকে কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে না বরং কর্মকে পবিত্র করে তোলে। মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও কর্তব্য থেকে সরে যাওয়া নয় বরং নিষ্কামভাবে কর্তব্য পালন করাই জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ। অতীতের মহাপুরুষদের আদর্শ অনুসরণ করে জ্ঞানকে কর্মে এবং কর্মকে আত্মোন্নতির সাধনায় রূপান্তরিত করাই এই শ্লোকের চিরন্তন শিক্ষা। এই কারণেই শ্লোকটি কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবজীবনের জন্য এক সর্বজনীন নৈতিক দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক নির্দেশনা হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 10, 2026 August 10, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি