শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.২ | পরম্পরায় যোগজ্ঞান, রাজর্ষিদের সাধনা ও হারিয়ে যাওয়া চিরন্তন সত্য
এবং পরম্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।।২।।
অনুবাদঃ এভাবেই পরম্পরা মাধ্যমে প্রাপ্ত এই পরম বিজ্ঞান রাজর্ষিরা লাভ করেছিলেন। কিন্তু কালের প্রভাবে পরম্পরা ছিন্ন হয়েছিল এবং তাই সেই যোগ নষ্টপ্রায় হয়েছে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে এই যোগ পরম্পরার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে এবং রাজর্ষিগণ এই জ্ঞান উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের প্রভাবে সেই মহামূল্যবান যোগ মানুষের মধ্যে ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যায়। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যেই জ্ঞান সংরক্ষণ, গুরু শিষ্য সম্পর্ক, আদর্শ নেতৃত্ব এবং সময়ের পরিবর্তনের গভীর দর্শন একত্রে প্রকাশিত হয়েছে।
এই শ্লোকের অন্যতম প্রধান ধারণা হলো পরম্পরা। সংস্কৃত পরম্পরা শব্দের অর্থ ধারাবাহিক উত্তরাধিকার বা একের পর এক প্রবাহ। প্রাপ্তম্ শব্দের অর্থ অর্জিত বা লাভ করা। এই দুই শব্দ একত্রে পরম্পরা প্রাপ্তম্ অর্থাৎ গুরু থেকে শিষ্য এবং শিষ্য থেকে পরবর্তী শিষ্যের মধ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রাপ্ত জ্ঞানকে নির্দেশ করে। এটি কেবল মুখে মুখে শিক্ষা নয় বরং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা সত্যের ধারাবাহিক সংরক্ষণ। এখানে বোঝানো হয়েছে যে প্রকৃত আধ্যাত্মিক জ্ঞান বই পড়ে সম্পূর্ণ অর্জন করা যায় না। তা একজন উপলব্ধিমান ব্যক্তির জীবন থেকে আরেকজন অনুসন্ধানীর জীবনে সঞ্চারিত হয়।
শ্লোকে রাজর্ষয়ঃ শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজা এবং ঋষি এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে রাজর্ষি শব্দের সৃষ্টি। এর দ্বারা এমন শাসকদের বোঝানো হয়েছে যাঁরা কেবল রাজ্য পরিচালনায় দক্ষ ছিলেন না বরং আত্মজ্ঞান এবং ধর্মজ্ঞানেও প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার এক অনন্য সমন্বয় ছিল। তাঁরা বুঝেছিলেন যে রাজত্বের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল শাসন নয় বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। এই কারণে তাঁরা যোগের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বিদুঃ শব্দের অর্থ জানতেন বা উপলব্ধি করেছিলেন। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল তথ্য জানা বোঝানো হয়নি। বরং এমন উপলব্ধিকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষের চরিত্র আচরণ এবং জীবনদর্শনকে পরিবর্তন করে। গীতার ভাষায় সত্যিকারের জ্ঞান সেই জ্ঞান যা আত্মাকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন করে এবং মানুষকে ধর্মময় জীবনের পথে পরিচালিত করে।
কালেন মহতা শব্দদ্বয়ের অর্থ দীর্ঘ সময়ের প্রভাবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সময়ের প্রবাহে বহু মূল্যবান জ্ঞান বিকৃত হয়েছে অথবা বিস্মৃত হয়েছে। যখন মানুষ বাহ্যিক আচারকে মূল সত্যের উপরে স্থান দেয় অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থকে ধর্মের চেয়ে বড় করে দেখে তখন প্রকৃত জ্ঞানের আলো ম্লান হয়ে পড়ে। এই শ্লোক সেই বাস্তব সত্যকেই তুলে ধরে যে সত্যকে সংরক্ষণ না করলে সময়ের প্রবাহে তা হারিয়ে যেতে পারে।
যোগো নষ্টঃ কথাটির অর্থ যোগ লুপ্ত হয়ে গেছে। এখানে যোগ বলতে কেবল ধ্যান বা আসন নয় বরং জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের বিজ্ঞান এবং কর্ম জ্ঞান ও ভক্তির সমন্বিত জীবনপদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে। যোগের নষ্ট হওয়া মানে এই জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য মানুষের চেতনা থেকে হারিয়ে যাওয়া। মানুষ তখন আচার পালন করে কিন্তু তার অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে ধর্ম কেবল বাহ্যিক রীতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরন্তপ শব্দটি অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ শত্রুদমনকারী বা বীর যোদ্ধা। তবে এই শব্দের গভীর অর্থ বাহ্যিক শত্রুর পাশাপাশি অন্তরের শত্রুকেও জয় করা। কাম ক্রোধ লোভ মোহ অহংকার এবং ঈর্ষাই মানুষের প্রকৃত শত্রু। যে ব্যক্তি আত্মজ্ঞান ও যোগের মাধ্যমে এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে পরাজিত করতে পারে সেই প্রকৃত অর্থে পরন্তপ।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এখানে জ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপকে চিরন্তন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সত্য কখনো সৃষ্টি হয় না আবার ধ্বংসও হয় না। কিন্তু মানুষের উপলব্ধি এবং চর্চার অভাবে সেই সত্য আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তাই ঈশ্বর যুগে যুগে অবতার বা মহান আচার্যের মাধ্যমে সেই চিরন্তন জ্ঞানকে পুনরায় মানুষের সামনে প্রকাশ করেন। এই ধারণা ভারতীয় দর্শনের একটি মৌলিক ভিত্তি যেখানে সত্যকে শাশ্বত এবং মানুষের স্মৃতিকে পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখা হয়।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক মানবসভ্যতার জ্ঞান উত্তরাধিকারের প্রতীক। পরম্পরা একটি প্রবাহমান নদীর মতো। নদীর জল যেমন উৎস থেকে সমুদ্র পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয় তেমনি সত্য জ্ঞানও এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হলে তবেই তার প্রাণশক্তি বজায় থাকে। যদি সেই প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে জ্ঞান কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বাস্তব জীবনে একজন দক্ষ শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য দেন না বরং নিজের অভিজ্ঞতা মূল্যবোধ এবং চরিত্রের মাধ্যমে প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করেন। একইভাবে একজন সৎ পিতা বা মাতা সন্তানের কাছে শুধু উপদেশ নয় নিজের জীবনযাপনের মাধ্যমে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ধারাবাহিকতাই পরম্পরার প্রকৃত রূপ। ইতিহাসে দেখা যায় যে যেসব সভ্যতা তাদের জ্ঞান সংস্কৃতি এবং নৈতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করতে পেরেছে তারাই দীর্ঘকাল সমৃদ্ধ থেকেছে। আর যেসব সমাজ এই ধারাবাহিকতা হারিয়েছে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের মৌলিক পরিচয়ও হারিয়েছে।
সারসংক্ষেপে বলা যায় এই শ্লোক কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক বিবরণ নয় বরং মানবজীবনের একটি চিরন্তন শিক্ষা। সত্য জ্ঞান ব্যক্তিগত সম্পদ নয় বরং উত্তরাধিকারসূত্রে রক্ষা করার মতো এক মহামূল্যবান সম্পদ। পরম্পরার মাধ্যমে সেই জ্ঞান জীবন্ত থাকে এবং সমাজকে আলোকিত করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যদি সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় তবে মানুষ বাহ্যিক উন্নতি অর্জন করলেও অন্তরের প্রজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। তাই গীতার এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সত্যকে জানতে হলে শুধু শাস্ত্র পাঠ নয় বরং জীবন্ত পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আত্মোপলব্ধির পথে অগ্রসর হওয়াই মানবজীবনের প্রকৃত সাধনা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!