শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.৫ | বহু জন্মের স্মৃতি, ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা ও জীবাত্মার বিস্মৃতির রহস্য
শ্রীভগবানুবাচ
বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ।।৫।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে পরন্তপ অর্জুন! আমার ও তোমার বহু জন্ম অতীত হয়েছে। আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি, কিন্তু তুমি পার না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে আমার এবং তোমার বহু জন্ম অতীতে অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই সমস্ত জন্ম আমি সম্পূর্ণরূপে স্মরণ করি কিন্তু তুমি সেগুলো স্মরণ করতে পার না। এই সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা জীবাত্মার সীমাবদ্ধতা জন্ম ও পুনর্জন্মের রহস্য এবং চেতনার প্রকৃত স্বরূপ। ভাষাগত দৃষ্টিতে শ্লোকটির প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত অর্থবহ এবং সম্মিলিতভাবে এটি মানুষের আত্মপরিচয় ও ঈশ্বরচেতনা সম্পর্কে এক গভীর দর্শন প্রকাশ করে।
শ্রীভগবান শব্দটি সংস্কৃত শ্রী এবং ভগবান এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। শ্রী শব্দের অর্থ সৌন্দর্য কল্যাণ ঐশ্বর্য মঙ্গল এবং দেবীয় মহিমা। ভগবান শব্দটি ভগ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ঐশ্বর্য জ্ঞান শক্তি খ্যাতি বৈরাগ্য এবং ধর্মের পূর্ণ অধিকারী। এই দুই অংশ একত্রে শ্রীভগবান শব্দকে এমন এক সর্বোচ্চ সত্তার পরিচয় দেয় যিনি অসীম জ্ঞান শক্তি করুণা এবং মঙ্গলের আধার। উবাচ শব্দটি সংস্কৃত বচ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ বলা বা উচ্চারণ করা। এখানে উবাচ নির্দেশ করে যে ভগবানের প্রতিটি বাক্য কেবল সাধারণ উক্তি নয় বরং চিরন্তন সত্যের ঘোষণা।
বহূনি শব্দের অর্থ বহু বা অসংখ্য। এটি কেবল সংখ্যার আধিক্য বোঝায় না বরং দীর্ঘকালব্যাপী অস্তিত্বের ধারাবাহিকতাকেও নির্দেশ করে। মে অর্থ আমার এবং ব্যতীতানি শব্দের অর্থ অতিক্রান্ত বা অতিবাহিত হয়েছে। জন্মানি শব্দটি জন্মের বহুবচন রূপ যার দ্বারা বোঝানো হয়েছে একাধিক জন্ম। তব অর্থ তোমার এবং অর্জুন সম্বোধন করে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয় শিষ্যকে শিক্ষা দিচ্ছেন। তানি অর্থ সেই সমস্ত। অহং অর্থ আমি। বেদ শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। সর্বাণি অর্থ সমস্ত। ন অর্থ নয়। ত্বং অর্থ তুমি। বেত্থ অর্থ তুমি জানো বা স্মরণ করো। পরন্তপ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ শত্রুকে দগ্ধকারী বা শত্রুবিজয়ী বীর। এখানে এটি অর্জুনের বীরত্বের প্রশংসাসূচক সম্বোধন হলেও একই সঙ্গে বোঝায় যে বাহ্যিক শত্রুকে জয় করা যত সহজ নিজের অজ্ঞানতাকে জয় করা তত সহজ নয়।
আক্ষরিক অর্থে শ্লোকটি জানায় যে ভগবান এবং অর্জুন উভয়েরই বহু জন্ম অতিবাহিত হয়েছে। ভগবান সেই সব জন্মের প্রত্যেকটি জানেন কিন্তু অর্জুন তা জানেন না। এই সরল বক্তব্যের মধ্যেই এক অসাধারণ দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে। ঈশ্বর কালাতীত এবং সর্বজ্ঞ। তাঁর জ্ঞানের ওপর সময়ের কোনো প্রভাব পড়ে না। কিন্তু সাধারণ জীবাত্মা মায়ার আবরণে আবৃত হওয়ায় পূর্বজন্মের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে এবং নিজেকে কেবল বর্তমান শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করে।
এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ আরও বিস্তৃত। এখানে শ্রীকৃষ্ণ কেবল পুনর্জন্মের কথা বলছেন না বরং ঈশ্বর ও জীবের মৌলিক পার্থক্যও ব্যাখ্যা করছেন। উভয়েই বহু জন্ম গ্রহণ করলেও ঈশ্বর প্রতিটি জন্মে নিজের স্বরূপ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন। অন্যদিকে জীব কর্মফলের অধীন হয়ে নতুন দেহ ধারণ করে এবং প্রতিবারই পূর্বজন্মের স্মৃতি বিস্মৃত হয়। এই বিস্মৃতিই মানুষের অহংকার অজ্ঞতা এবং সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ।
গভীর তাৎপর্যের দিক থেকে এই শ্লোক মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে। মানুষ সাধারণত মনে করে জন্মই জীবনের সূচনা এবং মৃত্যুই সমাপ্তি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ জানাচ্ছেন আত্মার যাত্রা অনেক দীর্ঘ এবং বর্তমান জীবন সেই অসীম অভিযাত্রার একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় মাত্র। মানুষ যদি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে তবে জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সুখে অহংকার জন্মায় না এবং দুঃখে হতাশা গ্রাস করতে পারে না। কারণ সে বুঝতে শেখে যে জীবন এক ধারাবাহিক শিক্ষার পথ এবং প্রতিটি অভিজ্ঞতা আত্মার বিকাশের অংশ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক বেদান্ত দর্শনের একটি মৌলিক নীতিকে প্রতিষ্ঠা করে। ঈশ্বর সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান এবং মায়ার অধীন নন। জীবাত্মা চৈতন্যস্বরূপ হলেও মায়ার প্রভাবে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে যায়। অদ্বৈত দর্শনে এই অজ্ঞতাই বন্ধনের মূল কারণ। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ঈশ্বরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও জ্ঞান ও শক্তিতে সীমাবদ্ধ। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর এবং জীব চিরকাল পৃথক সত্তা এবং ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা জীব কখনও অর্জন করতে পারে না। এই তিনটি দর্শন ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও একটি বিষয়ে একমত যে ঈশ্বরের জ্ঞান সর্বদা পূর্ণ আর জীবের জ্ঞান সীমাবদ্ধ।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোক স্মৃতি এবং বিস্মৃতির মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতীক। ভগবান এখানে পূর্ণ চেতনার প্রতীক এবং অর্জুন সীমাবদ্ধ মানবচেতনার প্রতীক। পূর্বজন্মের বিস্মৃতি মানুষের অজ্ঞানতার প্রতীক আর ভগবানের সর্বস্মরণ সর্বজ্ঞ চৈতন্যের প্রতীক। আধ্যাত্মিক অর্থে এই শ্লোক শিক্ষা দেয় যে সাধনা জ্ঞান এবং ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত পরিচয় উপলব্ধি করতে পারে এবং অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্তি লাভ করে।
বাস্তব জীবনের উদাহরণেও এই সত্য প্রতিফলিত হয়। একটি শিশু জন্মের সময় পূর্বজন্মের কোনো স্মৃতি বহন করে না। সে ধীরে ধীরে নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলে। কিন্তু একজন শিক্ষক বা অভিভাবক তার অতীত বর্তমান এবং বিকাশের ধারাকে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। একইভাবে ঈশ্বর সমগ্র সৃষ্টির অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সমানভাবে প্রত্যক্ষ করেন অথচ মানুষ কেবল বর্তমানের ক্ষুদ্র অংশটুকুই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। সাহিত্যেও বহুবার দেখা যায় যে জ্ঞানী চরিত্র দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হয় আর অজ্ঞ চরিত্র তাৎক্ষণিক বাস্তবতাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করে। এই শ্লোক সেই চিরন্তন পার্থক্যেরই আধ্যাত্মিক প্রকাশ।
সারসংক্ষেপে বলা যায় এই শ্লোক ভাষাগতভাবে সহজ হলেও অর্থগতভাবে অত্যন্ত গভীর। এটি পুনর্জন্মের ধারণা ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান আত্মার চিরন্তন অস্তিত্ব এবং অজ্ঞতার প্রকৃতি সম্পর্কে এক অনন্য শিক্ষা প্রদান করে। শ্রীকৃষ্ণের এই ঘোষণা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা কেবল একটি শরীর বা একটি জীবনের অধিকারী নই বরং এক অনন্ত আত্মিক অভিযাত্রার পথিক। ঈশ্বর সেই অভিযাত্রার প্রতিটি অধ্যায় সম্যকভাবে জানেন কিন্তু মানুষ আত্মজ্ঞান অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত নিজের প্রকৃত ইতিহাস ভুলে থাকে। তাই এই শ্লোক কেবল অতীত জন্মের আলোচনা নয় বরং আত্মজাগরণ ঈশ্বরবিশ্বাস এবং চিরন্তন সত্য উপলব্ধির এক অনুপম আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!