ভগবদ্গীতা ৭.১৩ | ত্রিগুণময় ভাবের মোহ ও পরম অব্যয় সত্তার অজ্ঞাত রহস্য
ত্রিভির্গুণময়ৈর্ভাবৈরেভিঃ সর্বমিদং জগৎ।
মোহিতং নাভিজানাতি মামেভ্যঃ পরমব্যয়ম্।।১৩।।
অনুবাদঃ (সত্ত্ব, রজ, ও তম) তিনটি গুণের দ্বারা মোহিত হওয়ার ফলে সমগ্র জগৎ এই সমস্ত গুণের অতীত ও অব্যয় আমাকে জানতে পারে না।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোক মানবজীবনের এক গভীরতম সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ত্রিগুণময় ভাবের দ্বারা এই সমগ্র জগৎ মোহিত হয়ে আছে এবং সেই কারণেই মানুষ এই গুণসমূহের ঊর্ধ্বে অবস্থিত পরম অব্যয় সত্তাকে যথার্থভাবে চিনতে পারে না। শ্লোকটির মূল বক্তব্য কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়। এর মধ্যে মানুষের মন, প্রকৃতি, আত্মপরিচয়, জগৎ সম্পর্কে ধারণা এবং চূড়ান্ত সত্যের অনুসন্ধান সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে।
শ্লোকটির সূচনা হয়েছে ত্রিভির্গুণময়ৈর্ভাবৈঃ এই পদ দিয়ে। এখানে ত্রিভিঃ অর্থ তিন দ্বারা এবং সেই তিন হলো সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। গীতার দর্শনে প্রকৃতির সমস্ত প্রকাশ এই তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। সত্ত্ব প্রকাশ করে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, শান্তি ও সাম্য। রজঃ প্রকাশ করে গতি, আকাঙ্ক্ষা, কর্মচাঞ্চল্য, উচ্চাশা ও আসক্তি। তমঃ প্রকাশ করে জড়তা, অজ্ঞতা, অলসতা, বিভ্রান্তি ও অবিবেক। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ ও জীবনযাপনে এই তিন প্রবণতা নানা মাত্রায় প্রকাশিত হয়। তাই গুণময় শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গুণ শব্দের প্রাচীন অর্থের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি তন্তু বা সূত্রের ধারণাও রয়েছে। বহু তন্তু যেমন একত্র হয়ে একটি বস্ত্র তৈরি করে, তেমনি সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ মিলিত হয়ে প্রকৃতির অসংখ্য রূপ ও অভিজ্ঞতার জগৎ নির্মাণ করে।
এই প্রসঙ্গে ভাব শব্দটির অর্থ আরও গভীর। সংস্কৃত ভাব শব্দটি ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা এবং প্রকাশিত হওয়ার ধারণা রয়েছে। তাই ভাব কেবল আবেগ নয়। এটি কোনো অবস্থা, প্রবণতা, প্রকৃতির প্রকাশ, মানসিক গঠন অথবা অস্তিত্বের একটি নির্দিষ্ট রূপ বোঝাতে পারে। গীতার এই শ্লোকে গুণময় ভাব বলতে এমন সমস্ত পরিবর্তনশীল অবস্থা বোঝানো হয়েছে যা সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ দ্বারা প্রভাবিত। মানুষের শান্তি, অশান্তি, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, জ্ঞান, অজ্ঞতা, কর্মপ্রবণতা, অলসতা এবং অসংখ্য মানসিক ও জাগতিক অভিজ্ঞতা এই গুণময় প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এরপর এসেছে সর্বমিদং জগত্। সর্বম্ অর্থ সমস্ত এবং ইদম্ অর্থ এই। জগত্ শব্দটি গম ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে চলমানতা ও পরিবর্তনের ধারণা রয়েছে। যে জগৎ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, জন্ম নিচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে এবং বিলীন হচ্ছে, সেটিই জগত্। এখানে শব্দটির মধ্যেই একটি গভীর দার্শনিক ইঙ্গিত রয়েছে। জগৎ পরিবর্তনশীল বলেই জগৎ, আর কৃষ্ণ নিজেকে বলেছেন পরম অব্যয়। একদিকে রয়েছে গতি ও পরিবর্তনের জগৎ, অন্যদিকে রয়েছে ক্ষয়হীন ও অপরিবর্তনীয় সত্য। এই দুইয়ের পার্থক্য উপলব্ধি করাই শ্লোকটির দার্শনিক কেন্দ্র।
মানুষের সমস্যা জগতকে দেখা নয়। সমস্যা হলো জগতের পরিবর্তনশীল প্রকাশকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেওয়া। আমরা দেহকে আমি মনে করি, পেশাকে নিজের পরিচয় মনে করি, সম্পদকে নিজের নিরাপত্তা মনে করি, সামাজিক মর্যাদাকে নিজের মূল্য মনে করি এবং সুখ ও দুঃখকে নিজের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সত্য বলে গ্রহণ করি। কিন্তু দেহ পরিবর্তিত হয়, পেশা পরিবর্তিত হয়, সম্পদ আসে এবং চলে যায়, সম্পর্কের অবস্থাও পরিবর্তিত হয়, চিন্তা ও আবেগ প্রতিনিয়ত বদলে যায়। তবুও মানুষ এই পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোর সঙ্গে এমনভাবে নিজেকে এক করে ফেলে যেন এগুলিই তার স্থায়ী পরিচয়। এখানেই মোহের সূচনা।
মোহিত শব্দটি এসেছে মুহ ধাতু থেকে। এর অর্থ বিভ্রান্ত হওয়া, সত্যকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে না পারা এবং ভুল ধারণায় আবিষ্ট হওয়া। তাই গীতার মোহ কেবল আবেগের বশবর্তী হওয়া নয়। এর গভীর অর্থ হলো অনিত্যকে নিত্য বলে মনে করা, পরিবর্তনশীলকে স্থায়ী বলে গ্রহণ করা এবং সীমিত পরিচয়কে নিজের চূড়ান্ত স্বরূপ বলে মনে করা। একজন মানুষ চাকরি হারিয়ে যদি মনে করেন তার জীবন সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে, তবে তিনি একটি পরিবর্তনশীল অবস্থাকে নিজের সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলছেন। ব্যর্থতা যদি তার কাছে কেবল একটি অভিজ্ঞতা না হয়ে তার সম্পূর্ণ আত্মপরিচয়ে পরিণত হয়, তবুও একই মোহ কাজ করছে।
শ্লোকের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ নাভিজানাতি। এর মধ্যে না এবং অভিজানাতি এই দুটি অংশ রয়েছে। অভিজানাতি জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে যথার্থভাবে জানা, বিশেষভাবে উপলব্ধি করা ও চিনতে পারার অর্থ রয়েছে। এখানে কৃষ্ণ বলতে চান না যে মানুষ কোনো তথ্য জানে না। মানুষ জগত সম্পর্কে বিপুল জ্ঞান অর্জন করতে পারে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করতে পারে, সমাজ ও প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করতে পারে, তবুও সে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্যকে না জানতে পারে। তথ্য জানা এবং সত্যকে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। গীতার দৃষ্টিতে আত্মজ্ঞান এমন এক উপলব্ধি যেখানে মানুষ পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সেই চেতনাকে চিনতে শেখে যার মধ্যে এই সব অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হচ্ছে।
মাম শব্দের অর্থ আমাকে। এখানে কৃষ্ণ নিজের প্রতি নির্দেশ করছেন। কিন্তু গীতার দর্শনে এই আমি কেবল একটি ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শ্লোকের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণ নিজেকে গুণসমূহের ঊর্ধ্বে অবস্থিত পরম অব্যয় সত্তা হিসেবে প্রকাশ করছেন। তাই এখানে কৃষ্ণের আমি বলতে সেই পরম ঈশ্বরীয় সত্যকে বোঝানো হয়, যিনি প্রকৃতির গুণত্রয়ের দ্বারা আবদ্ধ নন। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ ক্রিয়াশীল, কিন্তু পরম সত্তা সেই পরিবর্তনশীলতার অধীন নন।
এখানে পরম শব্দটির অর্থ সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত এবং সীমার ঊর্ধ্বে। আর অব্যয় শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং ব্যয় ধারণার মাধ্যমে। ব্যয় মানে ক্ষয়, হ্রাস বা অবক্ষয়। অব্যয় অর্থ যার ক্ষয় নেই, যার স্বরূপ পরিবর্তনের ফলে নষ্ট হয় না। এই শব্দটি তাই শুধু অমরতার কথা বলে না। এটি এমন এক সত্যের দিকে নির্দেশ করে যা নিজস্ব স্বরূপে অক্ষুণ্ণ এবং পরিবর্তনশীল জগতের মতো ক্ষয় ও রূপান্তরের অধীন নয়।
এই শ্লোককে সাংখ্য দর্শনের আলোকে দেখলে প্রকৃতি ও পুরুষের পার্থক্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ ক্রিয়াশীল এবং প্রকৃতির বিভিন্ন বিকার মানুষের দেহ, মন ও অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রকাশিত হয়। কিন্তু চেতনা যখন প্রকৃতির এই পরিবর্তনশীল অবস্থাগুলোর সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ এক করে ফেলে, তখন বন্ধনের সৃষ্টি হয়। মানুষ বলে আমি দুঃখী, আমি ব্যর্থ, আমি সফল, আমি ক্রুদ্ধ। কিন্তু গভীর আত্মঅনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠতে পারে, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা ও ক্রোধ যদি পরিবর্তিত হয়, তবে যে সত্তা এই পরিবর্তনগুলোকে অনুভব ও প্রত্যক্ষ করছে, তার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্নই মানুষকে আত্মদর্শনের দিকে নিয়ে যায়।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের আরেকটি গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। পরিবর্তনশীল নাম ও রূপের জগতের মধ্যে মানুষ চূড়ান্ত বাস্তবতাকে খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই বাহ্যিক প্রকাশের মধ্যেই আটকে যায়। দড়িকে অন্ধকারে সাপ মনে করার উপমাটি এখানে স্মরণীয়। সাপের ভয় সত্য বলে মনে হয়, কিন্তু ভুলটি ঘটে দড়ির প্রকৃত স্বরূপ না জানার কারণে। তেমনই মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তাকে না চিনে দেহ, মন, অহংকার ও সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলতে পারে। জ্ঞান তখন কেবল নতুন কোনো তথ্য অর্জন নয়, বরং ভুল পরিচয় দূর করে প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করা।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও হৃদয়গ্রাহী। মানুষ যখন সম্পদ, ক্ষমতা, ভোগ, সম্মান কিংবা নিজের অহংকারকে জীবনের সর্বোচ্চ আশ্রয় মনে করে, তখন তার চেতনা গুণময় প্রকৃতির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তার দৃষ্টি পরিবর্তিত হতে পারে। তখন সে বুঝতে শেখে যে জীবনের পরিবর্তনশীল সাফল্য ও ব্যর্থতা তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। তার জীবনের গভীরে একটি পরম আশ্রয়ের সন্ধান রয়েছে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির একটি তাৎপর্যপূর্ণ পাঠ সম্ভব। মানুষের মধ্যে কখনও শান্ত ও স্বচ্ছ প্রবণতা দেখা যায়, কখনও তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও অস্থিরতা দেখা যায়, আবার কখনও জড়তা ও অন্ধকার নেমে আসে। গীতার ভাষায় এগুলোকে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এর বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে বোঝা যায়। কিন্তু আত্মপর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো আমি কি আমার প্রতিটি মানসিক অবস্থাই, নাকি আমি সেই চেতনা যে আমার মানসিক অবস্থাগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে। এই প্রশ্ন মানুষকে নিজের চিন্তা ও আবেগ থেকে সামান্য দূরত্ব তৈরি করতে শেখায় এবং আত্মসচেতনতার একটি গভীর স্তরের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই শ্লোকের একটি সুন্দর প্রতীক হতে পারে রঙিন কাঁচের মধ্য দিয়ে পৃথিবীকে দেখা। ধরা যাক একটি কাঁচের ঘরের ভেতর থেকে একজন মানুষ বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকাচ্ছে। কাঁচে বিভিন্ন রঙের প্রভাব রয়েছে। সে বাইরের জগতকে সেই রঙের মধ্য দিয়েই দেখছে এবং মনে করছে পৃথিবী স্বভাবতই এমন। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না যে তার দেখার মাধ্যমটিই তার অভিজ্ঞতার রং নির্ধারণ করছে। গুণময় প্রকৃতিও অনেকটা সেই রঙিন কাঁচের মতো। মানুষ নিজের মানসিক প্রবণতা, আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও আসক্তির মধ্য দিয়ে জগতকে দেখে এবং তারপর সেই দৃষ্টিকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে করে।
সমুদ্র ও ঢেউয়ের উপমাটিও এই শ্লোকের ভাবকে সহজ করে বোঝাতে পারে। সমুদ্রের উপর অসংখ্য ঢেউ সৃষ্টি হয়। কোনো ঢেউ শান্ত, কোনো ঢেউ উত্তাল, কোনোটি বড় এবং কোনোটি ছোট। তারা ক্রমাগত জন্ম নিচ্ছে এবং বিলীন হচ্ছে। মানুষের জীবনের সুখ, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা, আকাঙ্ক্ষা ও হতাশাও যেন সেই ঢেউগুলোর মতো। এগুলো পরিবর্তনশীল। কিন্তু মানুষ যখন প্রতিটি ঢেউকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে, তখন সে গভীরতার কথা ভুলে যায়। গীতার শিক্ষা তাকে সেই গভীরতার দিকে ফিরে তাকাতে আহ্বান জানায়।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটির সৌন্দর্য গভীর। এখানে পরিবর্তনশীল জগতের সঙ্গে অপরিবর্তনীয় সত্যের এক শক্তিশালী বৈপরীত্য নির্মিত হয়েছে। একদিকে আছে গুণ, ভাব, জগৎ ও মোহ। অন্যদিকে আছে পরম ও অব্যয়। একদিকে বহুরূপী প্রকাশ, অন্যদিকে চূড়ান্ত সত্য। একদিকে গতি, অন্যদিকে স্থিতি। এই বৈপরীত্য শুধু দার্শনিক নয়, গভীরভাবে কাব্যিকও।
মানবজীবনে এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত আত্মপরিচয়কে প্রশ্ন করার শিক্ষা। আমি কি কেবল আমার দেহ। আমি কি আমার পেশা। আমি কি আমার সম্পদ। আমি কি আমার সামাজিক পরিচয়। আমি কি আমার সাফল্য। আমি কি আমার ব্যর্থতা। আমি কি আমার সুখ ও দুঃখ। যদি এগুলোর সবই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, তাহলে যে সত্তা এই পরিবর্তনগুলোকে অনুভব করে এবং প্রত্যক্ষ করে, তার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্নের মধ্যেই গীতার আত্মজিজ্ঞাসার গভীরতা নিহিত।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের জগতকে অস্বীকার করতে শেখায় না। বরং জগতের প্রকৃতি বুঝে তার প্রতি আমাদের অন্ধ আসক্তিকে অতিক্রম করতে শেখায়। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে রূপ দেয়। মানুষ সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে বাস করে, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকেই নিজের চূড়ান্ত স্বরূপ মনে করলে মোহ জন্মায়। জগৎ পরিবর্তনশীল, মানুষের মানসিক অবস্থা পরিবর্তনশীল, দেহ পরিবর্তনশীল, পরিচয় পরিবর্তনশীল। এর বিপরীতে গীতার পরম অব্যয় ধারণা এমন এক সত্যের দিকে নির্দেশ করে যা ক্ষয় ও পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে।
এই কারণে ত্রিগুণময় জগতের শিক্ষা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির বিশ্লেষণে থেমে থাকে না। এটি মানুষকে নিজের গভীরে ফিরে যেতে আহ্বান করে। যে মানুষ বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও পরিবর্তনের অতীত সত্যকে অনুসন্ধান করতে শেখে, সে ধীরে ধীরে মোহ থেকে জ্ঞানের দিকে, আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা থেকে আত্মসচেতনতার দিকে এবং পরিবর্তনশীল প্রকাশ থেকে পরম সত্যের অনুসন্ধানের দিকে এগিয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণের এই বাণীর গভীরতম আহ্বান তাই এমন এক জাগরণের আহ্বান, যেখানে মানুষ শুধু জগতকে দেখে না, বরং জগতকে দেখার মধ্য দিয়ে নিজের প্রকৃত স্বরূপকেও চিনতে শুরু করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!