ভগবদ্গীতা ৭.১৪ | দৈবী মায়া, ত্রিগুণের বন্ধন ও ঈশ্বরের শরণে মুক্তির পথ
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে।।১৪।।
অনুবাদঃ আমার এই দৈবী মায়া ত্রিগুণাত্মিকা এবং তা দুরতিক্রমণীয়া। কিন্তু যাঁরা আমাতে প্রপত্তি করেন, তাঁরাই এই মায়া উত্তীর্ণ হতে পারেন।
“দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া। মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে।।”—ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের চতুর্দশ শ্লোকটি মানুষের বন্ধন, মায়া এবং মুক্তির পথ সম্পর্কে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করে। এর সরল অর্থ হলো—“এই আমার দৈবী, গুণময়ী মায়া অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন; কিন্তু যারা একমাত্র আমারই শরণ গ্রহণ করে, তারাই এই মায়াকে অতিক্রম করতে পারে।” শ্লোকটির প্রথম শব্দ “দৈবী” এসেছে “দেব” শব্দ থেকে, যার সঙ্গে সংস্কৃত √দিভ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে; এর মূল ভাব আলো, দীপ্তি ও দেবত্ব। তাই “দৈবী” অর্থ ঈশ্বরীয় বা দেবীয়। “হ্যেষা” হলো “হি + এষা”-এর সন্ধিরূপ; অর্থ “নিশ্চয়ই এই” বা “প্রকৃতপক্ষে এই”। “গুণময়ী” গঠিত “গুণ + ময়ী” থেকে; “গুণ” অর্থ বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতিগত উপাদান বা প্রবণতা এবং “ময়ী” অর্থ যা দ্বারা পূর্ণ বা গঠিত। গীতার দর্শনে এই গুণ হলো সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—প্রকৃতির তিন মৌলিক প্রবণতা। ফলে “গুণময়ী মায়া” অর্থ এমন মায়াশক্তি, যা ত্রিগুণের দ্বারা পরিব্যাপ্ত। “মম” অর্থ “আমার”; কৃষ্ণ এখানে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে মায়া কোনো স্বাধীন পরম শক্তি নয়, এটি তাঁরই শক্তি। “মায়া” শব্দটি সংস্কৃত √মা ধাতুর সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত, যার মূল ভাব মাপা, সীমা নির্ধারণ করা বা পরিমিত করা; পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনে মায়া এমন এক শক্তির ধারণা লাভ করে, যার মাধ্যমে অসীম সত্য সীমিত নাম, রূপ, দেহ, মন, ইন্দ্রিয় ও বহুত্বের অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রকাশিত হয়। তাই মায়াকে শুধু “মিথ্যা” বলা যথেষ্ট নয়; গীতার প্রেক্ষাপটে এটি ঈশ্বরের দৈবী শক্তি, যা জীবকে প্রকৃতি ও ত্রিগুণের সঙ্গে আবদ্ধ করে এবং জগতের পরিবর্তনশীল রূপকে তার কাছে চূড়ান্ত বাস্তব বলে প্রতীয়মান করাতে পারে।
“দুরত্যয়া” শব্দটি “দুর্ + অতি + √ই” ধাতুগত গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত; “দুর্” অর্থ কঠিন, “অতি” অর্থ অতিক্রম করে এবং √ই অর্থ যাওয়া। সুতরাং “দুরত্যয়া” অর্থ যা অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন বা দুরতিক্রম্য। কেন মায়া এত দুরতিক্রম্য—তার উত্তর মানুষের নিজের জীবনের মধ্যেই রয়েছে। মানুষ দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, লোভ, ক্রোধ, অহংকার, সামাজিক পরিচয়, সম্পদ ও সম্পর্কের সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে একীভূত করে যে সে ভুলে যায় এগুলো তার অভিজ্ঞতার অংশ, তার পরম পরিচয় নয়। সত্ত্ব মানুষকে জ্ঞান ও স্বচ্ছতার দিকে, রজঃ আকাঙ্ক্ষা ও কর্মপ্রবণতার দিকে এবং তমঃ জড়তা, অজ্ঞান ও মোহের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করলেও তার চিন্তা, আবেগ ও আচরণের ওপর অসংখ্য প্রবণতা কাজ করে। এই অবস্থাই মায়ার বন্ধনকে শক্তিশালী করে। মায়া তাই কেবল বাইরের কোনো জগতের ভ্রম নয়; এটি মানুষের নিজের চেতনা, পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও কাজ করে।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে আসে “মামেব”—“মাম্ + এব”, অর্থ “একমাত্র আমাকেই”। “এব” শব্দটি এখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ কৃষ্ণ শুধু নিজের আশ্রয় গ্রহণের কথা বলছেন না; তিনি বলছেন “আমাকেই” শরণ করতে। এরপর “যে প্রপদ্যন্তে”—“যারা শরণ গ্রহণ করে”। “প্রপদ্যন্তে” শব্দটি “প্র + √পদ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত; √পদ্-এর মূল অর্থ পদক্ষেপ করা বা গমন করা, আর “প্রপদ্” বিশেষভাবে কারও কাছে সম্পূর্ণভাবে গমন করা, আশ্রয় নেওয়া বা আত্মসমর্পণের অর্থ বহন করে। অতএব এখানে শরণাগতি শুধু বাহ্যিক প্রণাম বা আনুষ্ঠানিক ধর্মাচরণ নয়; এর গভীর অর্থ হলো নিজের সীমিত অহংকার, ভ্রান্ত আত্মপরিচয় এবং “আমি-ই সবকিছুর কর্তা”—এই ধারণাকে অতিক্রম করে পরম সত্যের আশ্রয় গ্রহণ করা। “মায়ামেতাং” হলো “মায়াম্ + এতাম্”—“এই মায়াকে”, আর “তরন্তি” এসেছে √তৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ পার হওয়া বা অতিক্রম করা। “তরন্তি” শব্দটির মধ্যে নদী বা সমুদ্র পার হওয়ার একটি শক্তিশালী প্রতীক রয়েছে। তাই শ্লোকের শেষাংশকে এমনভাবে বোঝা যায়—যারা পরমেশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করে, তারাই মায়ার বিশাল স্রোত পার হতে পারে।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বেদান্তীয় ধারায় কিছুটা ভিন্ন হলেও এর কেন্দ্রীয় সত্য একই। অদ্বৈত বেদান্তে মায়া এমন শক্তি, যার কারণে অদ্বিতীয় ব্রহ্মের ওপর বহুত্বের অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয় এবং জীব নিজেকে দেহ-মন-অহংকারের সঙ্গে অভিন্ন মনে করে। মায়া অতিক্রম মানে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করা। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জগৎকে নিছক মিথ্যা মনে করা হয় না; জীব ও জগৎ ঈশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রপত্তি বা সম্পূর্ণ ঈশ্বরাশ্রয় মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ পথ। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য স্বীকৃত এবং জীব ঈশ্বরের কৃপা ও ভক্তির মাধ্যমে মায়ার বন্ধন অতিক্রম করতে পারে। এই ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যেও একটি সাধারণ উপলব্ধি আছে—মানুষের সীমিত অহংকার দিয়ে পরম সত্যকে অর্জন করা যায় না; তাকে কোনো না কোনোভাবে নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে পরমের আশ্রয় নিতে হয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে “মায়া” ধারণাটিকে মানুষের conditioning বা মানসিক অভ্যাসের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যদিও দুটিকে সম্পূর্ণ সমার্থক বলা ঠিক নয়। একজন মানুষ যদি বারবার মনে করে “আমি ব্যর্থ”, “আমার সম্পদই আমার পরিচয়”, “অন্যের স্বীকৃতি ছাড়া আমি মূল্যহীন” বা “আমাকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে”, তাহলে এই ধারণাগুলো ধীরে ধীরে তার কাছে বাস্তবতার মতো হয়ে ওঠে। সে নিজের চিন্তা ও প্রবণতাকে সত্য বলে গ্রহণ করে। গীতার ভাষায় মায়ার একটি দিক এমনই—মানুষ যে পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক অবস্থাকে “আমি” বলে ধরে নিয়েছে, তার সঙ্গে সে এতটাই একাত্ম হয়ে যায় যে তার গভীরতর আত্মসত্তা আড়াল হয়ে পড়ে। এই কারণে মায়া অতিক্রম মানে পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং পৃথিবীর মধ্যে থেকেও পৃথিবীর মোহকে নিজের পরম পরিচয় না বানানো।
প্রতীকী অর্থে মায়াকে কুয়াশার সঙ্গে তুলনা করা যায়। কুয়াশা রাস্তা ধ্বংস করে না, কিন্তু পথকে অস্পষ্ট করে দেয়; তেমনি মায়া আত্মাকে ধ্বংস করে না, কিন্তু আত্মস্বরূপের উপলব্ধিকে আচ্ছন্ন করে। আবার মায়াকে নদী বা সমুদ্র হিসেবেও দেখা যায়, কারণ “তরন্তি” অর্থই হলো পার হওয়া। জীবন যেন একটি স্রোত—জন্ম, মৃত্যু, আকাঙ্ক্ষা, কর্ম, সুখ, দুঃখ, আসক্তি ও ভয়ের ঢেউ সেখানে ক্রমাগত প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষ এই স্রোতের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারে; কিন্তু ঈশ্বরাশ্রয়, জ্ঞান, ভক্তি, সাধনা ও আত্মসমর্পণ তার জন্য একপ্রকার নৌকার ভূমিকা পালন করে। আধুনিক একটি উপমায় একে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। কেউ যদি এমন একটি ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করে যা এত বাস্তব মনে হয় যে সে ভুলে যায় এটি একটি অভিজ্ঞতার জগৎ, তাহলে সে সেখানে ভয়, আনন্দ, জয় ও পরাজয়কে সম্পূর্ণ সত্য বলে অনুভব করবে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার পরিচয় সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। মায়া সম্পর্কেও গীতার বক্তব্যকে এই উপমার সাহায্যে বোঝা যায়—মানুষ অভিজ্ঞতার জগৎকে অস্বীকার করবে না, কিন্তু বুঝবে যে অভিজ্ঞতার জগৎই তার সম্পূর্ণ সত্তা নয়।
বাস্তব জীবনে এর উদাহরণ খুব সহজ। একজন মানুষ মনে করল, “আমি অর্থ ও সাফল্য অর্জন করলেই স্থায়ী সুখী হব।” সে অর্থ পেল, সম্মান পেল, ক্ষমতা পেল; কিন্তু কিছুদিন পর আবার নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলো। আরও অর্থ, আরও সম্মান, আরও সাফল্য—এই চক্র চলতেই থাকল। বস্তু পরিবর্তিত হলেও আকাঙ্ক্ষার কাঠামো পরিবর্তিত হলো না। এখানেই মায়ার একটি গভীর রূপ দেখা যায়। মানুষ মনে করে সে বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করছে, অথচ অনেক সময় বস্তু, আকাঙ্ক্ষা ও স্বীকৃতির প্রয়োজনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মায়া অতিক্রমের অর্থ তাই সংসার ত্যাগ করা নয়; বরং সংসারের মধ্যে থেকেও আসক্তির দাস না হওয়া। সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদই পরিচয় হবে না; সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু অধিকারবোধ আত্মাকে গ্রাস করবে না; কর্ম থাকবে, কিন্তু কর্মফলের অহংকার মানুষকে নিজের প্রকৃত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করবে না।
সবশেষে, “দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া। মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে”—এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, মানুষের বন্ধন বাহ্যিক জগতের চেয়ে গভীর; এটি তার মন, অহংকার, আকাঙ্ক্ষা, পরিচয় এবং ত্রিগুণের সঙ্গে জড়িত। মায়া ঈশ্বরেরই দৈবী শক্তি, তাই তাকে অতিক্রম করা সহজ নয়। কিন্তু মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়ও নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে যখন সে পরম সত্যের আশ্রয় গ্রহণ করে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। “তরন্তি”—তারা পার হয়ে যায়—এই শব্দটি তাই মুক্তির এক অসাধারণ প্রতীক। মায়া ধ্বংস করতে হয় না; মায়ার ওপারে যেতে হয়। জগৎকে অস্বীকার করতে হয় না; জগতের মোহের দ্বারা নিজের প্রকৃত সত্তাকে আর আবদ্ধ হতে না দেওয়াই মুক্তির পথ। এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা তাই হতে পারে—মানুষ যতক্ষণ নিজেকে সীমিত দেহ, মন, অহংকার ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে আবদ্ধ মনে করে, ততক্ষণ সে মায়ার স্রোতে ভাসে; আর যখন সে পরম সত্যের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন সেই একই জীবন, একই জগৎ এবং একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সে মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!