সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৭.১৫ | দুষ্কৃতকারীর পতন, জ্ঞানের আচ্ছাদন ও আসুরিক প্রবৃত্তির বন্ধন

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।।১৫।।
ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ।
মায়য়াপহৃতজ্ঞানা আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।।১৫।।

অনুবাদঃ মূঢ়, নরাধম, মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে এবং যারা আসুরিক ভাবসম্পন্ন, সেই সমস্ত দুস্কৃতকারীরা কখনও আমার শরণাগত হয় না।

ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোক মানুষের আধ্যাত্মিক অধঃপতন, জ্ঞানের বিকৃতি এবং পরম সত্য থেকে বিচ্ছিন্নতার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, দুষ্কর্মপরায়ণ, মূঢ়, মানবিক সম্ভাবনার দিক থেকে অধঃপতিত এবং মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়েছে, যারা আসুরিক ভাবকে আশ্রয় করেছে, তারা তাঁর শরণ গ্রহণ করে না। শ্লোকটি শুধু কিছু মানুষকে নিন্দা করার জন্য বলা হয়নি। বরং মানুষের অন্তর্জগতে কীভাবে অজ্ঞতা, মোহ, ভুল কর্ম, অহংকার ও ভোগলিপ্সা ধীরে ধীরে সত্যবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং মানুষকে পরম সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সেই গভীর প্রক্রিয়াটিই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

শ্লোকটির মূল সংস্কৃত পাঠ হলো “ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ প্রপদ্যন্তে নরাধমাঃ। মায়য়াপহৃতজ্ঞানাঃ আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ।” এর সহজ অর্থ হলো, দুষ্কর্মপরায়ণ ও মূঢ় মানুষ, যারা মানবজীবনের উচ্চতর সম্ভাবনা থেকে অধঃপতিত এবং মায়ার দ্বারা যাদের জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়েছে, যারা আসুরিক প্রবৃত্তিকে আশ্রয় করেছে, তারা পরমেশ্বরের শরণ গ্রহণ করে না। এখানে “মাং” শব্দের অর্থ আমাকে এবং গীতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে এটি কেবল ব্যক্তি কৃষ্ণকে নয়, পরম সত্য, পরম চৈতন্য এবং সর্বব্যাপী ঈশ্বরতত্ত্বকে নির্দেশ করে। আর “প্রপদ্যন্তে” শব্দের মধ্যে শুধু কারও কাছে যাওয়ার অর্থ নেই। এর মধ্যে রয়েছে শরণ গ্রহণ, নির্ভর করা এবং নিজের অহংকেন্দ্রিক অস্তিত্বকে পরম সত্যের কাছে সমর্পণ করার ভাব।

“দুষ্কৃতিন” শব্দটি সংস্কৃত “দুষ্” এবং “কৃ” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। “কৃ” ধাতুর অর্থ করা, সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। এর সঙ্গে অনিষ্ট বা বিকৃতির অর্থবোধক উপাদান যুক্ত হয়ে “দুষ্কৃতিন” অর্থ দাঁড়ায় দুষ্কর্মকারী বা যে নিজের কর্মশক্তিকে ভুল পথে ব্যবহার করে। এই শব্দটির গভীরতা এখানেই যে দুষ্কৃতিন মানেই অক্ষম বা বুদ্ধিহীন মানুষ নয়। একজন মানুষ অত্যন্ত মেধাবী, শিক্ষিত ও দক্ষ হয়েও দুষ্কৃতিন হতে পারেন, যদি তিনি নিজের জ্ঞান ও ক্ষমতাকে অন্যায়, প্রতারণা, শোষণ, হিংসা কিংবা স্বার্থপরতার কাজে ব্যবহার করেন। তাই সমস্যাটি কেবল বুদ্ধির অভাব নয়। সমস্যাটি হলো শক্তি ও কর্মক্ষমতার ভুল অভিমুখ।

এরপর এসেছে “মূঢ়” শব্দটি। এটি সংস্কৃত “মুহ্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে রয়েছে মোহগ্রস্ত হওয়া, বিভ্রান্ত হওয়া এবং সত্যকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারার ভাব। মূঢ় বলতে তাই কেবল কম বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে বোঝায় না। একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষও মূঢ় হতে পারেন, যদি তাঁর শিক্ষা ও তথ্য তাঁর অহংকার, লোভ, কামনা ও আসক্তির প্রকৃতি উপলব্ধি করতে সাহায্য না করে। এই অর্থে মূঢ়তা হলো জ্ঞানের অভাবের চেয়ে বেশি কিছু। এটি হলো সত্যকে দেখার ক্ষমতার বিকৃতি। মানুষের চোখ খোলা থাকতে পারে, কিন্তু তার দৃষ্টি যদি কামনা ও অহংকারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে সে বাস্তবতার গভীর সত্য দেখতে পারে না।

“নরাধম” শব্দটি গঠিত হয়েছে “নর” এবং “অধম” শব্দের সমন্বয়ে। নর অর্থ মানুষ এবং অধম অর্থ নিম্নতম বা অধঃপতিত। এখানে নরাধম বলতে সামাজিক মর্যাদা বা জন্মগত অবস্থার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করা বোঝায় না। বরং মানুষের মধ্যে যে আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক, নৈতিক বিচার, সত্য অনুসন্ধান এবং আত্মোত্তরণের ক্ষমতা রয়েছে, সেই উচ্চতর সম্ভাবনাকে যখন কেউ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে কেবল ভোগ, লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে, তখন তার মানবিক সম্ভাবনার অধঃপতন ঘটে। এই অর্থে নরাধম একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবস্থার নাম।

শ্লোকটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো “মায়া”। ভারতীয় দর্শনে মায়া একটি অত্যন্ত গভীর ধারণা। এর প্রাচীন অর্থের মধ্যে রয়েছে শক্তি, কৌশল, রহস্যময় সৃষ্টিশক্তি ও এমন এক প্রক্ষেপণ যার মাধ্যমে বাস্তবতা বিশেষ রূপে প্রতিভাত হয়। গীতার পরিপ্রেক্ষিতে মায়াকে কেবল মিথ্যা বা অস্তিত্বহীন জগত হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। মায়া এমন এক শক্তি, যার প্রভাবে মানুষ সীমিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পরম সত্যকে আংশিকভাবে দেখে। মানুষ তখন নিজের কামনা, ভয়, অহংকার ও আসক্তির রঙে পৃথিবীকে দেখতে শুরু করে। ফলে বাস্তবতা যেমন, সে তেমনভাবে তা দেখতে পারে না।

এই কারণেই শ্লোকে এসেছে “মায়য়াপহৃতজ্ঞানাঃ”। “অপহৃত” শব্দের অর্থ হরণ করা হয়েছে এবং “জ্ঞান” এসেছে “জ্ঞা” ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা সত্যকে চিনতে পারা। “অপহৃতজ্ঞান” বলতে তাই জ্ঞানহীন মানুষকে বোঝানো হয় না। বরং এমন মানুষকে বোঝানো হয় যার সত্যবোধ মায়ার প্রভাবে আচ্ছন্ন বা বিকৃত হয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি ধারণা। একজন মানুষ জানেন যে লোভ ক্ষতিকর, কিন্তু লোভের মুহূর্তে সেই জ্ঞান তাঁর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তিনি জানেন যে ক্রোধ ধ্বংস ডেকে আনে, কিন্তু ক্রোধের সময় নিজের জ্ঞানকে ভুলে যান। তিনি জানেন যে জীবন ক্ষণস্থায়ী, অথচ এমনভাবে সম্পদ, ক্ষমতা ও খ্যাতির পেছনে ছুটে চলেন যেন এগুলোই জীবনের চূড়ান্ত সত্য। এই অবস্থাকেই মায়ার দ্বারা জ্ঞান অপহৃত হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

শ্লোকের শেষ অংশে এসেছে “আসুরং ভাবমাশ্রিতাঃ”। “আসুর” শব্দটি অসুরসুলভ প্রবৃত্তি বা মানসিকতার নির্দেশ করে এবং “ভাব” শব্দটি অস্তিত্বের অবস্থা, মানসিক প্রবণতা বা অন্তর্গত চেতনার অবস্থাকে বোঝায়। ফলে আসুরিক ভাব মানে কেবল কোনো পৌরাণিক অসুরের মতো আচরণ করা নয়। এটি এমন এক চেতনার নাম, যেখানে অহংকার, ভোগলালসা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ এবং আত্মকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায়। মানুষ যখন এই প্রবৃত্তিগুলোকে শুধু সাময়িক দুর্বলতা হিসেবে না দেখে নিজের জীবনদর্শনের ভিত্তি করে তোলে, তখন সে আসুরিক ভাবকে আশ্রয় করে।

এই শ্লোককে মানুষের চেতনার অধঃপতনের একটি ধারাবাহিক চিত্র হিসেবেও দেখা যায়। প্রথমে মানুষ ভুল কর্ম করতে শুরু করে। ভুল কর্মের ফলে তার মন ক্রমশ অশান্ত ও কলুষিত হয়। এরপর তার বিচারবোধ দুর্বল হয়ে যায় এবং সে সত্যকে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। এই অবস্থায় তার জ্ঞান থাকলেও সেই জ্ঞান আর তাকে পরিচালিত করতে পারে না। জ্ঞান মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষ অহংকার, লোভ, ভোগ ও ক্ষমতার প্রবৃত্তিকেই নিজের স্বাভাবিক পরিচয় মনে করতে শুরু করে। তখন আসুরিক ভাব তার আশ্রয়ে পরিণত হয় এবং পরম সত্যের শরণ গ্রহণের ইচ্ছা তার মধ্যে ক্ষীণ হয়ে যায়।

এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষ অনেক সময় নিজের ভুল কাজকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য যুক্তি তৈরি করে। সে নিজের লোভকে প্রয়োজন বলে ব্যাখ্যা করে, নিজের অহংকারকে আত্মসম্মান বলে মনে করে, নিজের ক্রোধকে ন্যায়ের প্রকাশ বলে ভাবতে পারে এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষকে নীতির অংশ বলে গ্রহণ করতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে তার চিন্তা বাস্তবতার অনুসন্ধান না করে নিজের আকাঙ্ক্ষার সুরক্ষা করতে শুরু করে। তখন জ্ঞান সত্যকে প্রকাশ করার পরিবর্তে অহংকারকে রক্ষা করার যন্ত্রে পরিণত হয়। এই অবস্থাই মায়ায় অপহৃত জ্ঞানের একটি আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রূপ হিসেবে বোঝা যায়।

বেদান্তের দৃষ্টিতে মানুষের মূল সমস্যা হলো নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা। মানুষ নিজেকে কেবল দেহ, মন, সামাজিক পরিচয়, সম্পদ, সম্পর্ক কিংবা অহংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখে। সে মনে করে, আমি মানে আমার শরীর, আমার সাফল্য, আমার সম্পদ, আমার ক্ষমতা এবং আমার পরিচয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত পরিচয় এর চেয়ে গভীর। নিজের সীমিত অহংকে চূড়ান্ত সত্য মনে করাই বন্ধনের অন্যতম কারণ। অদ্বৈত বেদান্তের আলোচনায় মায়া ও অবিদ্যা মানুষের প্রকৃত স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে জীব নিজের অসীম চৈতন্যস্বরূপকে ভুলে সীমিত ব্যক্তিসত্তাকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করে।

ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের মুক্তির পথও স্পষ্ট। “মাং প্রপদ্যন্তে” অর্থাৎ পরম সত্যের শরণ গ্রহণ করা। আত্মসমর্পণ মানে নিজের বিবেক বা বুদ্ধিকে পরিত্যাগ করা নয়। বরং সীমিত অহংকারের উপর একমাত্র নির্ভরতা ত্যাগ করে পরম সত্যকে জীবনের চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করা। মানুষের ভেতরের পরিবর্তন শুরু হয় তখনই, যখন সে নিজেকে সমস্ত কিছুর কেন্দ্র ভাবার পরিবর্তে উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর সত্যের অংশ। এই উপলব্ধি অহংকারকে নম্রতায়, ভোগলালসাকে সংযমে এবং বিভ্রান্তিকে জ্ঞান অনুসন্ধানে রূপান্তরিত করতে পারে।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। দুষ্কৃতিন মানুষের বিকৃত কর্মের প্রতীক। মূঢ় তার অন্ধ ও বিভ্রান্ত চেতনার প্রতীক। নরাধম মানুষের উচ্চতর সম্ভাবনার পতনের প্রতীক। মায়া হলো সত্যের উপর আকাঙ্ক্ষা ও অহংকারের তৈরি পর্দার প্রতীক। অপহৃতজ্ঞান হলো বিবেক ও সত্যবোধের অকার্যকর হয়ে পড়ার প্রতীক। আসুরিক ভাব হলো অহংকেন্দ্রিক জীবনের প্রতীক। আর প্রপত্তি হলো সেই অহংকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতীক।

মানুষের চেতনাকে একটি আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আয়না স্বচ্ছ থাকলে সেখানে বাস্তবতার প্রতিবিম্ব পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। কিন্তু তার উপর যদি ধীরে ধীরে ধুলো জমে, তখন আয়না বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে প্রতিফলিত করে। মানুষের মনও তেমন। কামনা, ক্রোধ, লোভ, ভয়, অহংকার ও বিদ্বেষ যখন মনের উপর স্তর তৈরি করে, তখন মানুষ বাইরের জগতের পাশাপাশি নিজের প্রকৃত সত্তাকেও বিকৃতভাবে দেখতে শুরু করে। আয়নার মধ্যে প্রতিবিম্বের সমস্যা তখন শুধু বাইরের নয়, আয়নার স্বচ্ছতার সমস্যাও হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে মানুষের সমস্যা শুধু জগতের প্রকৃতি নয়, তার নিজের চেতনার স্বচ্ছতাও।

একজন অত্যন্ত শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান মানুষও এই সমস্যায় পড়তে পারেন। তার কাছে প্রচুর তথ্য থাকতে পারে, কিন্তু যদি সেই জ্ঞান তাকে নিজের কামনা, অহংকার ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন না করে, তবে সেই তথ্য তার আধ্যাত্মিক মুক্তি নিশ্চিত করে না। কারণ তথ্য মানুষের মাথা পূর্ণ করতে পারে, কিন্তু জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। আর প্রজ্ঞা মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে। গীতার জ্ঞান সেই গভীরতর পরিবর্তনের দিকে আহ্বান জানায়।

এই শ্লোকের সঙ্গে সপ্তম অধ্যায়ের পরবর্তী শ্লোকগুলোর সম্পর্কও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে কৃষ্ণ মায়ার শক্তি ও তার দুরতিক্রম্যতার কথা বলেছেন, অন্যদিকে তিনি জানিয়েছেন যে যারা তাঁর শরণ গ্রহণ করে তারা সেই মায়া অতিক্রম করতে পারে। এরপর তিনি এমন মানুষদের কথা বলেছেন যারা সুকৃতির দ্বারা ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে সপ্তম অধ্যায়ের এই অংশটি মানুষের সামনে দুটি ভিন্ন অভিমুখ তুলে ধরে। একদিকে আছে অহংকার, মোহ, দুষ্কর্ম ও আসুরিকতার দিকে নিম্নগতি। অন্যদিকে আছে জ্ঞান, ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও সত্যের দিকে উত্তরণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই শ্লোককে কোনো মানুষকে চিরস্থায়ীভাবে নিকৃষ্ট বলে ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। গীতার সামগ্রিক দর্শন পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে না। বরং মানুষের বর্তমান মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তাকে উত্তরণের পথ দেখায়। জ্ঞান যদি মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সাধনা, আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক, সংযম, ভক্তি ও সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে সেই আবরণ দূর করা সম্ভব। অন্ধকারের অস্তিত্ব আলোকে অসম্ভব করে না। বরং আলো আসার প্রয়োজনীয়তাকেই প্রকাশ করে।

অতএব ভগবদ্গীতার এই শ্লোক কেবল অন্যের দিকে আঙুল তোলার জন্য নয়। এর প্রকৃত মূল্য আত্মপরীক্ষায়। আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, আমার কর্ম কি আমাকে সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি স্বার্থপরতার দিকে। আমি কি সত্যকে দেখতে চাই, নাকি নিজের ইচ্ছামতো বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে চাই। আমি যা জানি, তা কি আমার জীবনকে পরিচালনা করছে, নাকি আমার কামনা ও অহংকার সেই জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি কোন মানসিকতাকে আশ্রয় করছি, দৈবী না আসুরিক। এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই শ্লোকটির প্রকৃত সাধনামূলক শক্তি নিহিত।

সবশেষে বলা যায়, “ন মাং দুষ্কৃতিনো মূঢ়াঃ” শ্লোকটি মানুষের বাহ্যিক আচরণের চেয়ে তার অন্তর্গত চেতনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দুষ্কর্ম থেকে মূঢ়তা, মূঢ়তা থেকে জ্ঞানের আচ্ছাদন, জ্ঞানের আচ্ছাদন থেকে আসুরিক প্রবৃত্তি এবং আসুরিক প্রবৃত্তি থেকে পরম সত্যের প্রতি বিমুখতা একটি গভীর অধঃপতনের ধারা সৃষ্টি করে। এর বিপরীতে আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক, সংযম, জ্ঞান, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণ মানুষকে সেই বন্ধন অতিক্রম করার পথে নিয়ে যেতে পারে। শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা তাই এই যে মানুষের প্রকৃত সংকট জ্ঞানের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়, বরং তার জ্ঞানকে এমন প্রবৃত্তির দ্বারা আচ্ছন্ন করে ফেলা যা তাকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ ও পরম সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর সেই কারণেই এই শ্লোক আজও মানুষের অন্তর্জগতের জন্য এক গভীর আয়না হয়ে আছে। মানুষ যতই জ্ঞানী, শক্তিশালী বা সফল হোক, যদি তার জ্ঞান সত্যের দিকে না নিয়ে যায়, তবে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ। আর যখন জ্ঞান অহংকারকে অতিক্রম করে সত্য, করুণা, বিবেক ও আত্মসমর্পণের দিকে নিয়ে যায়, তখনই তা প্রকৃত জ্ঞানে পরিণত হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 16, 2026 August 16, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি