সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৭.২০ | কামনায় জ্ঞানহানি ও বিভিন্ন দেবতার উপাসনার প্রকৃতি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেহন্যদেবতাঃ।তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।।২০।।
কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেহন্যদেবতাঃ।
তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।।২০।।

অনুবাদঃ জড় কামনা-বাসনার দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে, তারা অন্য দেব-দেবীর শরণাগত হয় এবং তাদের স্বীয় স্বভাব অনুসারে বিশেষ নিয়ম পালন করে দেবতাদের উপাসনা করে।

ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের বিশতম শ্লোক মানুষের মন, কামনা, জ্ঞান, স্বভাব এবং উপাসনার সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো, “কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেহন্যদেবতাঃ। তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।” সহজ অর্থে বলা যায়, বিভিন্ন কামনা দ্বারা যাদের জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে গেছে, তারা নিজেদের নিজস্ব প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত হয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম অবলম্বন করে বিভিন্ন দেবতার শরণ গ্রহণ করে। এই শ্লোকের সৌন্দর্য হলো, এটি শুধু ধর্মীয় উপাসনার কথা বলে না। এর মধ্যে মানুষের মনস্তত্ত্ব, নৈতিক বিচার, আত্মপরিচয় এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গভীর বিশ্লেষণ নিহিত রয়েছে।

এই শ্লোকের কেন্দ্রে রয়েছে “কাম” শব্দটি। সংস্কৃত কাম শব্দের সঙ্গে আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা এবং কোনো কিছু লাভ বা উপভোগ করার প্রবল বাসনার ধারণা যুক্ত। কাম বলতে শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা বোঝায় না। অর্থ, সম্মান, ক্ষমতা, সাফল্য, নিরাপত্তা, সুখ, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা নিজের ইচ্ছা পূরণের প্রবল বাসনাও কামনার অন্তর্ভুক্ত। শ্লোকে কাম শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে মানুষের অসংখ্য বিচিত্র আকাঙ্ক্ষাকে। মানুষ একসঙ্গে অনেক কিছু চায় এবং প্রত্যেকটি চাওয়া তার চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

এরপর আসে “হৃতজ্ঞান” শব্দটি, যা এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শব্দগুলোর একটি। হৃত শব্দটি সংস্কৃত হৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ হরণ করা, কেড়ে নেওয়া বা সরিয়ে নেওয়া। জ্ঞান শব্দটি এসেছে জ্ঞা ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা এবং সত্যকে চিনতে পারা। ফলে হৃতজ্ঞান অর্থ দাঁড়ায় যার জ্ঞান হরণ করা হয়েছে। তবে এখানে জ্ঞান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়নি। বরং কামনা মানুষের জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে দেয়। মানুষ তখন সত্য জানলেও সেই সত্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তার বুদ্ধি কামনার প্রভাবে এমনভাবে কাজ করে যে সে নিজের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে যুক্তি খুঁজতে শুরু করে।

মানবজীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। একজন মানুষ জানেন যে অতিরিক্ত অর্থলোভ ক্ষতিকর, তবু অর্থের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যেতে পারে। একজন মানুষ জানেন যে অহংকার সম্পর্ক নষ্ট করে, কিন্তু নিজের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ মনে করলে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন না। একজন মানুষ জানেন যে অতিরিক্ত ভোগ শরীর ও মনকে দুর্বল করে, তবু প্রবল আকাঙ্ক্ষার মুহূর্তে সেই জ্ঞান তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অর্থাৎ জ্ঞান তার মধ্যে আছে, কিন্তু কামনা সেই জ্ঞানের স্বচ্ছতা ও কার্যকর ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করেছে। এই অবস্থাকেই গীতার ভাষায় হৃতজ্ঞান বলা যায়।

শ্লোকে “প্রপদ্যন্তে” শব্দটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ, শরণাপন্ন হওয়া এবং নির্ভরতার ধারণা রয়েছে। মানুষ যখন কোনো নির্দিষ্ট কামনায় গভীরভাবে আবদ্ধ হয়, তখন সেই কামনা পূরণের জন্য সে কোনো শক্তি, ব্যক্তি, পদ্ধতি কিংবা বিশ্বাসের আশ্রয় গ্রহণ করতে চায়। এই কারণেই শ্লোকে “অন্যদেবতা” কথাটি এসেছে। এখানে অন্য দেবতার উপাসনাকে কেবল বাহ্যিক অর্থে দেখলে শ্লোকটির গভীরতা বোঝা যায় না। কৃষ্ণ মূলত সেই উপাসনার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, যেখানে মানুষের উপাসনার পেছনে থাকে নির্দিষ্ট কোনো কাম্য ফল লাভের আকাঙ্ক্ষা।

মানুষের জীবনে বিভিন্ন দেবতার প্রতীকী অর্থও রয়েছে। অর্থের প্রতি যার অন্ধ আকর্ষণ, তার জীবনের উপাস্য হয়ে উঠতে পারে অর্থ। ক্ষমতার প্রতি যার প্রবল আসক্তি, তার কাছে ক্ষমতাই সর্বোচ্চ মূল্য হয়ে উঠতে পারে। খ্যাতি, সৌন্দর্য, সাফল্য, ভোগ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা নিজের অহংকারও মানুষের জীবনে এমন এক শক্তিতে পরিণত হতে পারে যার সামনে সে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়। এই দৃষ্টিতে “অন্যদেবতা” শুধু ধর্মীয় প্রতিমা নয়, মানুষের চেতনার সেইসব সীমিত আশ্রয়ের প্রতীকও হতে পারে যেগুলোর কাছে সে নিজের সুখ ও পূর্ণতার প্রত্যাশা সমর্পণ করে।

এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে “তং তং নিয়মমাস্থায়”। অর্থাৎ মানুষ তার নির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি অবলম্বন করে। এই অংশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে কামনা সবসময় মানুষকে বিশৃঙ্খল করে না। কখনো কখনো কামনাই মানুষকে অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী করে তুলতে পারে। কেউ অর্থের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, কেউ ক্ষমতার জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনা করে, কেউ খ্যাতির জন্য নিজের জীবনকে নির্দিষ্ট ছকে পরিচালনা করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শৃঙ্খলা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। গীতার দৃষ্টিতে শুধু নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট নয়। সেই নিয়মের পেছনে থাকা চেতনা এবং উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

“প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া” অংশটি মানুষের অন্তর্গত স্বভাবের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। প্রকৃতি বলতে এখানে শুধু বাহ্যিক জগৎ বোঝানো হয় না। মানুষের মানসিক প্রবণতা, সংস্কার, অভ্যাস, আকর্ষণ, বিরাগ এবং ব্যক্তিত্বের গভীর কাঠামোকেও এর মধ্যে ধরা যায়। প্রত্যেক মানুষ একইভাবে কোনো বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। কারও মধ্যে অর্থের আকর্ষণ প্রবল, কারও মধ্যে জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা, কারও মধ্যে ক্ষমতার বাসনা, আবার কারও মধ্যে ভোগ বা খ্যাতির আকর্ষণ বেশি। নিজের প্রকৃতির দ্বারা মানুষ অনেক সময় এমনভাবে পরিচালিত হয় যে সে নিজের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পথ ও আশ্রয় বেছে নেয়।

এই শ্লোককে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোতেও গভীরভাবে বোঝা যায়। মানুষ অনেক সময় প্রথমে কোনো একটি বিষয় প্রবলভাবে চাইতে শুরু করে এবং পরে সেই চাওয়ার পক্ষে যুক্তি তৈরি করে। অর্থাৎ যুক্তি সবসময় আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। কখনো আকাঙ্ক্ষাই যুক্তিকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করে। একজন মানুষ যদি কোনো সিদ্ধান্তের ফল পেতে অত্যন্ত আগ্রহী হন, তাহলে তিনি নিজের পছন্দের ফলকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য নানা যুক্তি খুঁজে নিতে পারেন। এই অবস্থায় তার বিচারবুদ্ধি স্বাধীন থাকে না। তার কামনা যেন তার চিন্তার ওপর এক ধরনের পর্দা ফেলে দেয়।

এই কারণেই গীতার দৃষ্টিতে আসল প্রশ্ন শুধু মানুষ কী জানে তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো তার জ্ঞান কি তার জীবনকে পরিচালনা করছে। কেউ অনেক শাস্ত্র পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, কিন্তু যদি তার জীবন সম্পূর্ণভাবে লোভ, অহংকার, হিংসা এবং ভোগের দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে সেই জ্ঞান এখনো তার চেতনার গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সত্যকে জানা এবং সত্যের দ্বারা পরিচালিত হওয়া এক বিষয় নয়। গীতার আধ্যাত্মিক শিক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান দূর করতে চায়।

অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে মানুষের বন্ধনের মূল কারণ অবিদ্যা। মানুষ নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে ভুলে বাহ্যিক পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলে। তখন কামনা তাকে এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে নিয়ে যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত ও ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতেও কামনাপ্রসূত উপাসনা মানুষের চেতনাকে সীমিত ফলের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারে। কারণ তখন ঈশ্বরকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে পাওয়ার পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট ফল লাভের উপায় হিসেবে দেখা হয়। ভক্তির উচ্চতর অবস্থায় মানুষ আর শুধু বলে না যে ঈশ্বর তার ইচ্ছা পূরণ করুন। সে বলতে শেখে যে তার নিজের ইচ্ছাকে সত্য ও কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলাই শ্রেয়।

এই দৃষ্টিতে সকাম ভক্তি এবং নিষ্কাম ভক্তির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। সকাম ভক্তির কেন্দ্র হলো আমি কী পাব। সেখানে ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার পেছনে থাকে নির্দিষ্ট ফলের প্রত্যাশা। নিষ্কাম ভক্তির কেন্দ্র হলো আমি কীভাবে সত্যের সঙ্গে যুক্ত হব। সেখানে ঈশ্বর কোনো কামনা পূরণের মাধ্যম নন, বরং তিনিই চূড়ান্ত আশ্রয়। এই পরিবর্তন মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গভীর রূপান্তর। তখন প্রার্থনার ভাষাও বদলে যায়। মানুষ শুধু বলে না যে আমার ইচ্ছা পূরণ করো। সে বলতে শেখে যে আমাকে সত্য উপলব্ধি করার শক্তি দাও এবং আমার আকাঙ্ক্ষাকে শুদ্ধ করো।

এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হতে পারে কুয়াশায় ঢাকা আয়না। মানুষের জ্ঞান একটি আয়নার মতো, যার কাজ সত্যকে প্রতিফলিত করা। কিন্তু প্রবল কামনা সেই আয়নার ওপর ঘন কুয়াশার মতো জমে যায়। আয়নাটি নষ্ট হয়ে যায় না, কিন্তু তার প্রতিফলন অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। তেমনি কামনা মানুষের জ্ঞানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে না। বরং সত্যকে পরিষ্কারভাবে দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। আবার মানুষের বুদ্ধিকে একটি কম্পাসের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। কম্পাস সত্য দিক নির্দেশ করতে চায়, কিন্তু প্রবল আকাঙ্ক্ষা যদি শক্তিশালী চুম্বকের মতো তাকে টেনে ধরে, তাহলে তার দিক পরিবর্তিত হতে পারে। মানুষের মনেও ঠিক এমন ঘটনা ঘটে।

এই শ্লোক আমাদের একটি অত্যন্ত গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি আমাদের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করি, নাকি আমাদের ইচ্ছাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ প্রায়ই মনে করে সে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কিন্তু তার সিদ্ধান্তের গভীরে যদি অচেতন কামনা, অহংকার, ভয় কিংবা আসক্তি কাজ করে, তাহলে সেই স্বাধীনতা কতটা প্রকৃত স্বাধীনতা তা ভাবার বিষয়। গীতার শিক্ষা এখানেই অত্যন্ত আধুনিক। সত্যিকারের স্বাধীনতা শুধু নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার নাম নয়। সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো নিজের ইচ্ছাকে দেখার, পরীক্ষা করার এবং প্রয়োজনে তাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা।

মানবজীবনে প্রয়োজন এবং কামনার মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা এবং জীবনের মৌলিক প্রয়োজন স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা ফলকে আমরা সুখের একমাত্র শর্ত বলে মনে করি, তখন তা আসক্তিকর কামনায় পরিণত হয়। তখন মানুষ বলে, এটি না পেলে আমি সুখী হতে পারব না। এই বিশ্বাসই তাকে বস্তুর ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। একটি কামনা পূরণ হলে কিছু সময়ের জন্য আনন্দ আসে, তারপর নতুন কামনা জন্ম নেয়। এভাবে কামনা থেকে কামনা জন্ম নিয়ে মানুষ এক অন্তহীন চক্রে আবদ্ধ হতে পারে।

এই কারণে শ্লোকটি আত্মপর্যবেক্ষণের একটি শক্তিশালী আহ্বান হিসেবেও পড়া যায়। আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করা উচিত আমি আসলে কী চাই, আমার সিদ্ধান্ত কি সত্যের দ্বারা পরিচালিত নাকি আমার আকাঙ্ক্ষার দ্বারা, আমি কি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে আমার সুখের একমাত্র উৎস বানিয়ে ফেলেছি, আমার প্রার্থনা কি শুধু ফল পাওয়ার জন্য, এবং আমি যা জানি তা কি সত্যিই আমার জীবনকে পরিবর্তন করছে। এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া মানেই নিজের অন্তর্জগতের দিকে তাকানো।

সবশেষে বলা যায়, “কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ” কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়। এটি মানুষের চেতনার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ। কামনা যখন অশাসিত হয়, তখন তা জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করতে পারে। আচ্ছন্ন জ্ঞান মানুষকে নিজের প্রকৃতির অনুগত করে তুলতে পারে এবং সেই প্রকৃতি অনুযায়ী সে বিভিন্ন আশ্রয় ও সাধনার পথ বেছে নিতে পারে। কিন্তু গীতার প্রকৃত আহ্বান এই চক্রের মধ্যেই আটকে থাকা নয়। মানুষের যাত্রা হওয়া উচিত কামনা দ্বারা চালিত জীবন থেকে জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত জীবনের দিকে, সীমিত আশ্রয় থেকে চূড়ান্ত আশ্রয়ের দিকে এবং আমি কী পাব এই প্রশ্ন থেকে আমি সত্যিই কে এই প্রশ্নের দিকে।

এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্য তাই অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর। মানুষ যে জিনিসকে সবচেয়ে বেশি চায়, ধীরে ধীরে তার চিন্তা সেই জিনিসের চারপাশে আবর্তিত হতে থাকে। একসময় সেই আকাঙ্ক্ষাই তার বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত এবং জীবনপথকে পরিচালনা করতে শুরু করে। তাই মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের কামনাকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে সচেতনভাবে দেখা। যখন মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষাকে দেখতে শেখে, তার দ্বারা অন্ধভাবে পরিচালিত না হয়ে তাকে বিচার করতে শেখে এবং জ্ঞানকে আবার জীবনের চালিকাশক্তি করে তোলে, তখন হৃতজ্ঞান ধীরে ধীরে স্বচ্ছ জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। সেই রূপান্তরই গীতার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক যাত্রার অন্যতম গভীর শিক্ষা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 16, 2026 August 16, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি