সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৭.২২ | শ্রদ্ধা, উপাসনা, কাম্যফল ও পরমেশ্বরের বিধানের গভীর তাৎপর্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে। লভতে চ ততঃ কামান্ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্।।২২।।
স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে। 
লভতে চ ততঃ কামান্ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্।।২২।।

অনুবাদঃ সেই ব্যক্তি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেবতার আরাধনা করেন এবং সেই দেবতার কাছ থেকেই আমারই দ্বারা বিহিত কাম্য বস্তু অবশ্যই লাভ করেন।

“স তয়া শ্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে। লভতে চ ততঃ কামান্ময়ৈব বিহিতান্ হি তান্”—ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ২২তম শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো মানুষের শ্রদ্ধা, উপাসনা, কামনা ও ফলপ্রাপ্তির অন্তর্নিহিত সম্পর্ক এবং সেই ফলের চূড়ান্ত বিধাতা হিসেবে পরমেশ্বরের অবস্থান। শ্লোকটির আক্ষরিক অর্থ—“সেই ব্যক্তি সেই শ্রদ্ধায় যুক্ত হয়ে সেই দেবতার আরাধনা করতে চেষ্টা করে এবং তার ফলে কাম্য বিষয়গুলি লাভ করে; কিন্তু সেই কাম্য ফলগুলিও আমার দ্বারাই বিধান করা।” এখানে ‘শ্রদ্ধা’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্কৃত ‘শ্রদ্ধা’ শব্দটি সাধারণভাবে ‘শ্রদ্/শ্রত্’ এবং ‘ধা’—অর্থাৎ বিশ্বাসকে ধারণ বা স্থাপন করা—এই ভাব থেকে ব্যাখ্যাত; তাই শ্রদ্ধা কেবল অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং কোনো আদর্শ, উপাস্য, সত্য বা লক্ষ্যের প্রতি মন-প্রাণের গভীর আস্থা ও নিবেদন। ‘যুক্ত’ শব্দটি √যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যোগ করা বা সংযুক্ত করা; ফলে ‘শ্রদ্ধয়া যুক্তঃ’ বলতে বোঝায়—সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে মনকে গভীরভাবে যুক্ত করা। ‘আরাধনম্’ অর্থ উপাসনা, সেবা, সন্তুষ্ট করার প্রয়াস বা নিবেদিত সাধনা; আর ‘ঈহতে’ অর্থ চেষ্টা করে, উদ্যোগী হয় বা সাধনায় প্রবৃত্ত হয়। অর্থাৎ মানুষ শুধু বিশ্বাস করে বসে থাকে না; তার শ্রদ্ধা তাকে কর্ম ও সাধনার দিকে চালিত করে। এরপর এসেছে ‘কামান্’, যা ‘কাম’ শব্দের বহুবচন এবং যার অর্থ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, কাম্য বস্তু বা প্রত্যাশিত ফল। অর্থাৎ মানুষ যে জাগতিক বা মানসিক ফল লাভ করতে চায়—অর্থ, স্বাস্থ্য, সন্তান, সাফল্য, সম্মান, নিরাপত্তা, সুখ, বিজয় বা অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষিত বিষয়—সেগুলিই এখানে ‘কামান্’। শ্লোকের সবচেয়ে গভীর অংশ হলো ‘ময়ৈব বিহিতান্’—‘ময়া’ অর্থ ‘আমার দ্বারা’, ‘এব’ অর্থ ‘একমাত্র’ বা ‘নিশ্চয়ই’, আর ‘বিহিতান্’ অর্থ ‘বিধানকৃত’, ‘নির্ধারিত’ বা ‘ব্যবস্থা করা’। অর্থাৎ মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দেবতার উপাসনা করে তার কাম্য ফল লাভ করলেও কৃষ্ণ বলছেন, সেই ফলের চূড়ান্ত বিধান তাঁরই দ্বারা সম্পন্ন হয়। ফলে শ্লোকটি বাহ্যিকভাবে বহু দেবতার উপাসনা ও ফলপ্রাপ্তির কথা বললেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো—উপাসনার রূপ বহু হতে পারে, কিন্তু সমস্ত ফলের পরম উৎস ও বিধান এক পরমেশ্বরের অধীন।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য আরও গভীর হয় যখন একে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শ্লোকের সঙ্গে পড়া হয়। ৭.২১-এ বলা হয়েছে, মানুষ যে দেবতার রূপকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উপাসনা করতে চায়, ঈশ্বর সেই ব্যক্তির সেই শ্রদ্ধাকে স্থির করে দেন; ৭.২২-এ বলা হচ্ছে, সেই শ্রদ্ধা নিয়ে মানুষ আরাধনায় প্রবৃত্ত হয় এবং কাম্য ফল লাভ করে; আর পরবর্তী ৭.২৩-এ বোঝানো হয় যে এই ধরনের কাম্য ফল সীমিত ও নশ্বর। তাই এখানে গীতার বক্তব্য শুধু ‘যা চাইবে তা পাবে’—এত সরল নয়; বরং এর গভীরে আছে একটি প্রশ্ন—‘তুমি যা চাইছ, সেটিই কি তোমার জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি?’ মানুষ অর্থ চায়, অর্থের মাধ্যমে নিরাপত্তা চায়; নিরাপত্তার পরে সম্মান, সম্মানের পরে সুখ এবং সুখের পরে স্থায়িত্ব চায়। কিন্তু জাগতিক কাম্য বস্তু পরিবর্তনশীল ও নশ্বর। ফলে কামনা পূরণ হওয়া এবং পরম সত্য লাভ করা এক বিষয় নয়। গীতার আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো—কাম্য ফল পাওয়া সম্ভব হলেও সেই ফলের প্রতি আসক্ত হয়ে থাকা জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে পারে না।

মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও শ্লোকটির অসাধারণ তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের বিশ্বাস তার মনকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা আদর্শের দিকে কেন্দ্রীভূত করে; সেই বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় নিষ্ঠা, নিষ্ঠা থেকে সাধনা, সাধনা থেকে কর্ম এবং কর্মের মাধ্যমে ফল। এই ধারাটি শ্লোকের মধ্যেই যেন সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে—‘শ্রদ্ধা → যুক্ত হওয়া → আরাধনা → প্রচেষ্টা → কাম্য ফল → লাভ’। একজন ছাত্র যদি বিশ্বাস করে যে জ্ঞান অর্জন তার জীবনের উন্নতির পথ, সেই বিশ্বাস তাকে নিয়মিত পড়াশোনা, আত্মসংযম ও পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে; ফলে তার ফলপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এই অর্থে শ্রদ্ধা নিষ্ক্রিয় বিশ্বাস নয়, বরং কর্মকে সংগঠিত করার এক শক্তিশালী মানসিক শক্তি। তবে গীতা এখানেই থেমে যায় না; ‘ময়ৈব’ শব্দের মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। মানুষ সাধারণত দৃশ্যমান মাধ্যমকে ফলদাতা মনে করে, কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে সেই মাধ্যমের অন্তরালেও একটি পরম কারণ রয়েছে। যেমন জানালা দিয়ে ঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করলে কেউ চাইলে বলতে পারে ‘জানালা আমাকে আলো দিয়েছে’; কিন্তু প্রকৃত আলোর উৎস জানালা নয়, সূর্য। একইভাবে কোনো দেবতা উপাসকের কাম্য ফলপ্রাপ্তির কার্যকর মাধ্যম হতে পারেন, কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে সেই ফলের চূড়ান্ত বিধাতা পরমেশ্বর।

বিভিন্ন বেদান্তদর্শনে এই শ্লোকের ব্যাখ্যায় সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকলেও একটি কেন্দ্রীয় বিষয় স্পষ্ট। শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত ব্যাখ্যায় ঈশ্বর সর্বজ্ঞ এবং কর্ম ও কর্মফলের যথাযথ সম্পর্ক জানেন; তাই ফলের বিধান শেষ বিচারে ঈশ্বরেরই। রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈত ব্যাখ্যায়ও দেবতারা পরমেশ্বর থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন নন; তাঁরা পরমাত্মার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করেন এবং তাঁদের মাধ্যমে প্রদত্ত ফলের চূড়ান্ত বিধাতা ভগবান। ফলে ‘ময়ৈব বিহিতান্’ বাক্যাংশটি শুধু ধর্মীয় কর্তৃত্বের ঘোষণা নয়; এটি কার্যকারণ, ঈশ্বর, কর্ম ও ফলের সম্পর্ক সম্পর্কে গভীর দার্শনিক বক্তব্য। মানুষের উপাসনা হতে পারে বহুরূপী, কিন্তু অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি এক—এই ঐক্যের দিকেই শ্লোকটি ইঙ্গিত করে।

প্রতীকী অর্থে ‘দেবতা’কে মানুষের নির্বাচিত আদর্শ বা আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও দেখা যায়। মানুষ যাকে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ মূল্য মনে করে, বাস্তবে অনেক সময় তারই আরাধনা করে—কারও কাছে অর্থ, কারও কাছে ক্ষমতা, কারও কাছে খ্যাতি, কারও কাছে জ্ঞান, আবার কারও কাছে প্রেম বা সামাজিক মর্যাদা। তাই শ্লোকটি আধুনিক মানুষকেও প্রশ্ন করতে পারে—‘তুমি কাকে আরাধনা করছ?’ এবং তার থেকেও গভীর প্রশ্ন—‘যে ফলের জন্য তুমি তোমার জীবন ব্যয় করছ, সেটিই কি সত্যিই তোমার পরম প্রয়োজন?’ এই দৃষ্টিতে ‘আরাধনা’ শুধু মন্দিরের পূজা নয়; যে বস্তু বা আদর্শের জন্য মানুষ তার সময়, শ্রম, মন ও জীবন উৎসর্গ করে, সেটিই তার বাস্তব আরাধ্য হয়ে উঠতে পারে। ‘শ্রদ্ধা’ তখন তার অন্তরের শক্তি, ‘আরাধনা’ তার কর্ম, ‘কাম’ তার সীমিত আকাঙ্ক্ষা এবং ‘ময়ৈব’ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সমস্ত সীমিত ফলের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক পরম উৎস।

সব মিলিয়ে ভগবদ্গীতা ৭.২২-এর গভীর সারমর্ম হলো—মানুষের বিশ্বাস তাকে কোনো উপাস্য বা আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করে, সেই সংযুক্তি তাকে সাধনা ও কর্মে প্রবৃত্ত করে, এবং সেই সাধনার মাধ্যমে সে তার কাম্য ফল লাভ করতে পারে; কিন্তু সেই ফলের চূড়ান্ত বিধান কোনো সীমিত মাধ্যমের হাতে নয়, পরমেশ্বরের হাতে। তাই শ্লোকটি একই সঙ্গে মানুষের বিশ্বাসের শক্তি, কর্মের প্রয়োজনীয়তা, কামনার সীমাবদ্ধতা, উপাসনার বহুরূপ এবং ঈশ্বরের একত্বকে প্রকাশ করে। এর সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো: মানুষ যে রূপে আরাধনা করুক এবং যে কাম্য ফলই লাভ করুক, সাধনার পরবর্তী ও উচ্চতর ধাপ হলো ফলের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে সেই এক পরম উৎসের দিকে মন ফিরিয়ে নেওয়া। অর্থাৎ শ্রদ্ধা মানুষকে পথ দেখায়, আরাধনা তাকে চলতে শেখায়, কামনা তাকে একটি লক্ষ্য দেয়, ফল তাকে অভিজ্ঞতা দেয়; কিন্তু ‘ময়ৈব’ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়—সকল ফলের অন্তরালে যে পরম সত্য, চূড়ান্ত অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত তারই দিকে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 16, 2026 August 16, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি