ভগবদ্গীতা ৭.২৪ | অব্যক্ত পরম স্বরূপ, ব্যক্ত রূপ ও ঈশ্বরতত্ত্বের গভীর উপলব্ধি
অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ।
পরং ভাবমজানন্তো মমাব্যয়মনুত্তমম্।।
অনুবাদঃ বুদ্ধিহীন মানুষেরা, যারা আমাকে জানে না, মনে করে যে, আমি পূর্বে অব্যক্ত নির্বিশেষ ছিলাম, এখন ব্যক্তিত্ব পরিগ্রহ করেছি। তাদের অজ্ঞতার ফলে তারা আমার অব্যয় ও সর্বোত্তম পরম ভাব সম্বন্ধে অবগত নয়।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ২৪তম শ্লোকটি হলো—“অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ। পরং ভাবমজানন্তো মমাব্যয়মনুত্তমম্।।”—যার সরল অর্থ: “অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা আমার অব্যক্ত পরম স্বরূপকে ব্যক্ত বা প্রকাশিত রূপ লাভ করেছে বলে মনে করে; তারা আমার সেই পরম, অবিনশ্বর ও সর্বোত্তম স্বরূপকে জানে না।” এই শ্লোকের কেন্দ্রে রয়েছে ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ এবং মানুষের সীমিত উপলব্ধির মধ্যকার পার্থক্য। মানুষ সাধারণত যা চোখে দেখে, কানে শোনে বা বুদ্ধি দিয়ে ধারণা করতে পারে, সেটিকেই বাস্তবতার সম্পূর্ণ রূপ বলে মনে করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সেই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন এবং বোঝাতে চেয়েছেন যে তাঁর প্রকাশিত মানবীয় রূপের আড়ালে এমন এক পরম সত্তা রয়েছে, যা সাধারণ ইন্দ্রিয় ও অপরিণত বুদ্ধির দ্বারা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না।
“অব্যক্ত” শব্দটি সংস্কৃত “अव्यक्तम्—avyaktam” থেকে এসেছে। এটি “অ” এবং “ব্যক্ত” এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। সংস্কৃত “অ-” উপসর্গ সাধারণত না, নয়, অনুপস্থিত বা নিষেধের ভাব প্রকাশ করে এবং “ব্যক্ত” শব্দটি “√ব্যজ্—vyaj” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ প্রকাশ করা বা প্রকাশিত হওয়া। ফলে “অব্যক্ত” শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো—“যা ব্যক্ত নয়”, অর্থাৎ যা প্রকাশিত, দৃশ্যমান বা নির্দিষ্ট রূপে ধরা পড়ে না। তবে গীতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে অব্যক্ত মানে কেবল “লুকানো” নয়; বরং এমন এক পরম বাস্তবতা, যা সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নাম-রূপের সীমার বাইরে। এর বিপরীত ধারণা হলো “ব্যক্ত”—যা প্রকাশিত, নির্দিষ্ট, দৃশ্যমান ও কোনো বিশেষ রূপে উপলব্ধ। এইভাবে “অব্যক্ত” ও “ব্যক্ত” শব্দদুটি শ্লোকটির মূল দার্শনিক দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে—অপ্রকাশিত পরম সত্য এবং তার প্রকাশিত রূপ।
“ব্যক্তিমাপন্নং” অংশটির অর্থ হলো “ব্যক্ত রূপ লাভ করেছে” বা “প্রকাশিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে”। এখানে “ব্যক্তি” শব্দের অর্থ নির্দিষ্ট প্রকাশ বা স্বতন্ত্র রূপ, আর “আপন্ন” এসেছে সংস্কৃত “আ + √আপ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ লাভ করা, প্রাপ্ত হওয়া বা কোনো অবস্থায় প্রবেশ করা। অতএব “অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং” কথাটির মধ্যে এমন একটি ধারণা নিহিত আছে যে, কেউ মনে করছে—যে ঈশ্বর মূলত অব্যক্ত ছিলেন, তিনি পরে কৃষ্ণ নামের একটি নির্দিষ্ট মানবীয় রূপ লাভ করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, এই ধারণাটিই ভুল। কারণ এতে ধরে নেওয়া হয় যে ব্যক্ত রূপটি যেন পরবর্তীকালে অব্যক্ত সত্যকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। গীতার বক্তব্য বরং হলো—ঈশ্বরের ব্যক্ত প্রকাশকে তাঁর পরম সত্তার সীমা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
“মন্যন্তে” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “√মन्—man” ধাতু থেকে, যার অর্থ ভাবা, মনে করা, ধারণা করা বা বিচার করা। এখানে বিশেষ তাৎপর্য হলো, কৃষ্ণ বলছেন “তারা মনে করে”—অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু চোখে দেখার নয়, বরং দেখার পরে সেই দৃশ্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে তার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ কৃষ্ণের মানবীয় রূপ দেখতে পারে, কিন্তু সেই রূপের অর্থ কী—তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তার বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। এই কারণে “মন্যন্তে” শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের ভুল অনেক সময় তথ্যের অভাবে নয়, বরং ভুল ব্যাখ্যার কারণে ঘটে।
“মাম্” অর্থ “আমাকে”। এটি সংস্কৃত “অস্মদ্” সর্বনামের দ্বিতীয়া বিভক্তির একবচন রূপ। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে নির্দেশ করছেন না; শ্লোকের পরবর্তী অংশে তাঁর “পরম ভাব”, “অব্যয়” এবং “অনুত্তম” স্বরূপের কথা বলা হয়েছে। ফলে “মাম্” শব্দটি এখানে ব্যক্ত কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর পরম ঈশ্বরীয় সত্তার সম্পর্ককে সামনে আনে। অর্থাৎ যে কৃষ্ণকে মানুষ একটি ব্যক্তিরূপে দেখতে পাচ্ছে, সেই ব্যক্তরূপের মধ্যেই এমন এক পরম সত্তা রয়েছে, যাকে কেবল বাহ্যিক দেহ বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
“অবুদ্ধয়ঃ” শব্দটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি “অ” এবং “বুদ্ধি” থেকে গঠিত; “বুদ্ধি” শব্দটি সংস্কৃত “√বুধ্—budh” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ জাগ্রত হওয়া, জানা, সচেতন হওয়া বা উপলব্ধি করা। “অবুদ্ধয়ঃ” তাই কেবল “বোকা লোক” অর্থে বোঝা উচিত নয়। এর গভীর অর্থ হলো—যাদের আধ্যাত্মিক বিচারবোধ বা সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা এখনও পরিণত হয়নি। একজন মানুষ পার্থিব বিষয়ে অত্যন্ত মেধাবী হলেও আধ্যাত্মিক বাস্তবতা সম্পর্কে অপরিণত হতে পারেন। তাই এখানে বুদ্ধির পরিমাণের চেয়ে বুদ্ধির পরিণতি ও দিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে বুদ্ধি কেবল বাহ্যিক রূপ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, কিন্তু সেই রূপের অন্তর্নিহিত সত্য অনুসন্ধান করে না, গীতার দৃষ্টিতে সেই বুদ্ধি আধ্যাত্মিকভাবে অপরিণত।
এরপর আসে “পরং ভাবম্”—অর্থাৎ “পরম স্বরূপ”। “পরম” শব্দের মূল অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ, সীমার ওপারে বা অতীন্দ্রিয়। “ভাব” শব্দটি এসেছে “√ভূ—bhū” ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা সত্তা হিসেবে থাকা। তাই “ভাব” শব্দের অর্থ শুধু অনুভূতি নয়; প্রসঙ্গভেদে এটি অস্তিত্ব, প্রকৃতি, অন্তর্নিহিত সত্তা বা প্রকৃত স্বরূপ বোঝাতে পারে। এই শ্লোকে “পরং ভাবম্” বলতে কৃষ্ণের পরম প্রকৃতি বা প্রকৃত ঈশ্বরীয় স্বরূপ বোঝানো হয়েছে। মানুষ কৃষ্ণের বাহ্যিক রূপ দেখতে পারে, তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে পারে, কিন্তু তাঁর পরম সত্তাকে না-ও উপলব্ধি করতে পারে। তাই পরম ভাব জানা মানে শুধু কৃষ্ণ সম্পর্কে তথ্য জানা নয়; বরং কৃষ্ণের প্রকৃত অস্তিত্ব ও ঈশ্বরীয় স্বরূপ উপলব্ধি করা।
“অজানন্তঃ” শব্দের অর্থ “না জেনে” বা “যথার্থভাবে উপলব্ধি না করে”। এটি সংস্কৃত “√জ্ঞা—jñā” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। এখানে না-জানা কেবল তথ্যগত অজ্ঞতা নয়। একজন ব্যক্তি কৃষ্ণের জন্ম, জীবন, উপদেশ, যুদ্ধক্ষেত্রের ভূমিকা কিংবা তাঁর লীলার অসংখ্য তথ্য জানতে পারেন, কিন্তু তাঁর “পরম ভাব” উপলব্ধি না-ও করতে পারেন। অর্থাৎ তথ্য এবং উপলব্ধি এক জিনিস নয়। গীতার দৃষ্টিতে সত্যিকারের জ্ঞান হলো এমন জ্ঞান, যা বাহ্যিক তথ্যের স্তর অতিক্রম করে অস্তিত্বের গভীরতর সত্যকে উপলব্ধি করে।
“মম অব্যয়ম্ অনুত্তমম্”—এই অংশে কৃষ্ণ তাঁর পরম স্বরূপের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন। “মম” অর্থ “আমার”। “অব্যয়” শব্দটি “অ” এবং “ব্যয়” থেকে গঠিত; “ব্যয়” অর্থ ক্ষয়, বিনাশ বা নিঃশেষ হওয়া, আর “অব্যয়” অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা অবিনশ্বর ও অক্ষয়। পরিবর্তনশীল জগতের সবকিছু জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন ও ক্ষয়ের অধীন; কিন্তু কৃষ্ণ এখানে যে পরম সত্তার কথা বলছেন, তাকে সেই পরিবর্তনশীলতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন। “অনুত্তম” অর্থ যার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই, অর্থাৎ সর্বোচ্চ বা অতুলনীয়। ফলে “পরম”, “অব্যয়” এবং “অনুত্তম”—এই তিনটি শব্দ একত্রে কৃষ্ণের এমন এক সত্তার কথা বলে, যা সর্বোচ্চ, অবিনশ্বর এবং যার ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—“যা দেখা যায়, সেটিই কি সম্পূর্ণ সত্য?” মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো কোনো কিছুর দৃশ্যমান রূপকে তার সম্পূর্ণ বাস্তবতা বলে ধরে নেওয়া। কিন্তু গীতা বলছে, প্রকাশিত রূপ বাস্তবতার একটি প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু সেই প্রকাশই বাস্তবতার সম্পূর্ণ সীমা নয়। যেমন একটি তরঙ্গকে দেখে আমরা বলতে পারি এটি একটি তরঙ্গ, কিন্তু তরঙ্গের গভীরে রয়েছে সমুদ্র; তরঙ্গের পৃথক রূপ আছে, কিন্তু তার অস্তিত্ব সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একইভাবে কৃষ্ণের ব্যক্ত রূপকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেই ব্যক্ত রূপকে তাঁর পরম সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা—এই শ্লোকের একটি গভীর শিক্ষা। অর্থাৎ রূপ সত্যকে প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু রূপই সত্যের সম্পূর্ণ সীমা নয়।
বেদান্তের বিভিন্ন ধারায় এই শ্লোকের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি সাধারণ বিষয় স্পষ্ট—ঈশ্বরকে সীমিত মানবীয় ধারণায় আবদ্ধ করা যায় না। অদ্বৈত বেদান্তে পরম ব্রহ্ম নাম-রূপের অতীত; তাই ব্যক্ত রূপকে পরম সত্যের সীমা মনে করা যায় না। বিশিষ্টাদ্বৈত ও ভক্তি-প্রধান ব্যাখ্যায় আবার ঈশ্বরের ব্যক্তিগত রূপই পরম বাস্তবতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ; সেখানে অব্যক্ত ও ব্যক্তকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন না করে ব্যক্ত ঈশ্বরের মধ্যেই পরম সত্তার প্রকাশ দেখা হয়। ফলে বিভিন্ন বেদান্তীয় মতের মধ্যে ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও শ্লোকটির মূল সতর্কতা হলো—ঈশ্বরকে সাধারণ জীবের মতো সীমিত করে দেখা আধ্যাত্মিক অজ্ঞতার লক্ষণ।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির গভীরতা রয়েছে। মানুষ সাধারণত অপরিচিত বা অসীম কোনো বাস্তবতাকে পরিচিত কোনো শ্রেণির মধ্যে ফেলে বোঝার চেষ্টা করে। যেমন কাউকে দেখে আমরা বলি—“সে একজন শিক্ষক”, “সে একজন ধনী ব্যক্তি”, “সে একজন ব্যর্থ মানুষ” ইত্যাদি। কিন্তু কোনো পরিচয়ই একজন মানুষের সম্পূর্ণ সত্তাকে ধারণ করে না। বাহ্যিক পরিচয় হলো তার ব্যক্ত প্রকাশের একটি অংশ। একইভাবে কৃষ্ণকে কেবল “একজন মানুষ” হিসেবে দেখলে তাঁর গীতায় ঘোষিত পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। এই অর্থে “অবুদ্ধয়ঃ” শব্দটি মানুষের সেই মানসিক প্রবণতার প্রতীক, যেখানে আমরা বিশাল বাস্তবতাকে ছোট একটি পরিচিত ধারণার মধ্যে বন্দী করে ফেলি।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও “অব্যক্ত” ও “ব্যক্ত” অত্যন্ত শক্তিশালী ধারণা। একজন কবির মনে যে অনুভূতি প্রথমে ভাষাহীন ও অব্যক্ত অবস্থায় থাকে, কবিতা রচনার মাধ্যমে তা ব্যক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু কবিতার শব্দগুলো সেই অন্তর্গত অনুভূতির সম্পূর্ণ গভীরতাকে সবসময় ধারণ করতে পারে না। একইভাবে মানুষের ভালোবাসা, বেদনা, চেতনা, সম্ভাবনা বা আত্মপরিচয়েরও একটি প্রকাশিত এবং একটি গভীর অপ্রকাশিত স্তর থাকে। এই দৃষ্টিতে শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে দৃশ্যমান প্রকাশের পেছনে অদৃশ্য গভীরতা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরের মূর্তি, নাম, রূপ, লীলা বা মানবীয় প্রকাশ ভক্তির পথে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু এগুলোকে কেবল বাহ্যিক বস্তু হিসেবে দেখলে সাধনার গভীরতা সীমিত হয়ে যায়। রূপের উদ্দেশ্য হতে পারে রূপের মধ্য দিয়ে অরূপকে উপলব্ধি করা, ব্যক্তের মধ্য দিয়ে অব্যক্তকে অনুভব করা এবং দৃশ্যমানের মধ্য দিয়ে অদৃশ্য সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া। তাই আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানে নিহিত—রূপকে অস্বীকার নয়, আবার রূপের মধ্যে সত্যকে সম্পূর্ণ আবদ্ধও নয়।
বাস্তব জীবনের একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। একটি বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে আমরা বইটির বিষয় সম্পর্কে কিছু ধারণা পেতে পারি, কিন্তু প্রচ্ছদই পুরো বই নয়। আবার একটি বীজের মধ্যে একটি বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু চোখে দেখা ছোট বীজের আকার দেখে তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার পূর্ণতা বোঝা যায় না। একইভাবে ব্যক্ত রূপ হলো কোনো গভীর বাস্তবতার প্রকাশ; কিন্তু সেই প্রকাশের বাহ্যিক সীমাকে বাস্তবতার চূড়ান্ত সীমা মনে করা ভুল। এই কারণে শ্লোকটি শুধু ঈশ্বরতত্ত্বের কথা বলে না, বরং আমাদের দেখার পদ্ধতি নিয়েও শিক্ষা দেয়।
সব মিলিয়ে “অব্যক্তং ব্যক্তিমাপন্নং মন্যন্তে মামবুদ্ধয়ঃ। পরং ভাবমজানন্তো মমাব্যয়মনুত্তমম্”—এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো, সীমিত প্রকাশকে দেখে অসীম সত্যকে সীমিত করে ফেলো না। “অব্যক্ত” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাস্তবতার একটি গভীর অপ্রকাশিত স্তর আছে; “ব্যক্তিমাপন্নং” দেখায় যে সেই সত্য নির্দিষ্ট রূপেও প্রকাশিত হতে পারে; “অবুদ্ধয়ঃ” সতর্ক করে যে অপরিণত বুদ্ধি প্রকাশিত রূপকেই সম্পূর্ণ সত্য মনে করে; “পরং ভাবম্” আমাদের সেই রূপের অন্তর্নিহিত পরম সত্তার দিকে নিয়ে যায়; আর “অব্যয়মনুত্তমম্” ঘোষণা করে যে সেই পরম সত্য ক্ষয়হীন ও সর্বোচ্চ। তাই ভাষাগতভাবে এটি অব্যক্ত ও ব্যক্তের সম্পর্কের বিশ্লেষণ, দার্শনিকভাবে এটি প্রকাশ ও পরম বাস্তবতার সম্পর্কের আলোচনা, মনোবৈজ্ঞানিকভাবে এটি মানুষের উপলব্ধির সীমাবদ্ধতার শিক্ষা, আর আধ্যাত্মিকভাবে এটি বাহ্যিক রূপের মধ্য দিয়ে অন্তর্নিহিত অসীম সত্যকে উপলব্ধি করার আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!