ভগবদ্গীতা ৭.৫ | পরা প্রকৃতি ও জীবস্বরূপ চেতনার দার্শনিক ব্যাখ্যা
অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্।
জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।৫।।
অনুবাদঃ হে মহাবাহো! এই নিকৃষ্টা প্রকৃতি ব্যতীত আমার আর একটি উৎকৃষ্টা প্রকৃতি রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকটি জগতের প্রকৃতি, জীবনের রহস্য এবং মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, অপর অর্থাৎ নিম্নতর প্রকৃতির অতিরিক্ত তাঁর আরেকটি পরা অর্থাৎ উচ্চতর প্রকৃতি রয়েছে, যা জীবস্বরূপ এবং যার দ্বারা এই সমগ্র জগৎ ধারণ করা হয়। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ বোঝাতে চান যে জগতকে কেবল তার দৃশ্যমান বস্তুগত রূপ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না। জড় জগতের পেছনে এমন একটি জীবন্ত শক্তি রয়েছে যার প্রকাশেই জীবন, চেতনা এবং অস্তিত্বের অর্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই শ্লোকটি ভালোভাবে বুঝতে হলে প্রথমে এর সঙ্গে পূর্ববর্তী শ্লোকটির সম্পর্ক উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সপ্তম অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে কৃষ্ণ তাঁর প্রকৃতিকে আট ভাগে বিভক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি এবং অহংকারকে তিনি তাঁর অপর প্রকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এগুলো জগতের বস্তুগত এবং মানসিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু পঞ্চম শ্লোকে কৃষ্ণ বলেন যে এই প্রকৃতিই তাঁর সম্পূর্ণ প্রকৃতি নয়। এর অতিরিক্ত রয়েছে তাঁর পরা প্রকৃতি। সেই পরা প্রকৃতি জীবভূতা অর্থাৎ জীবস্বরূপ এবং তার দ্বারাই এই পরিবর্তনশীল জগৎ ধারণ করা হয়। ফলে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্লোক একত্রে পড়লে বোঝা যায় যে গীতার দৃষ্টিতে বাস্তবতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে। একটি হলো জড় ও পরিবর্তনশীল প্রকৃতি এবং অন্যটি হলো জীবনের প্রকাশকারী উচ্চতর প্রকৃতি।
শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অপরেয়ম্। এই শব্দটি অপরা এবং ইযম্ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অপরা শব্দটি পর শব্দের বিপরীত ধারণা বহন করে এবং এর অর্থ নিম্নতর, অপর, অন্যতর অথবা তুলনামূলকভাবে নিচের স্তরের। ইযম্ অর্থ এই। ফলে অপরেয়ম্ বলতে বোঝায় এই অপর বা নিম্নতর প্রকৃতি। এখানে অপরা শব্দের অর্থ খারাপ বা অপ্রয়োজনীয় নয়। এটি বরং এমন একটি বাস্তবতাকে নির্দেশ করে যা পরা প্রকৃতির তুলনায় নিম্নতর স্তরের। জড় প্রকৃতি তাই গীতার কাছে মিথ্যা বা অর্থহীন নয়। বরং এটি বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর, কিন্তু এটিই বাস্তবতার সর্বোচ্চ সত্য নয়।
এরপর আসে ইতস্ত্বন্যাম্। ইতঃ অর্থ এর থেকে বা এর অতিরিক্ত এবং তু অর্থ কিন্তু বা অন্যদিকে। কৃষ্ণ এখানে আলোচনার একটি নতুন স্তর উন্মোচন করছেন। তিনি যেন বলছেন যে এই জড় প্রকৃতির বাইরে আরও একটি প্রকৃতি রয়েছে। অন্যাম্ শব্দের অর্থ অন্য বা আরেকটি। কিন্তু এই অন্য প্রকৃতি সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো শক্তি নয়। কৃষ্ণ পরবর্তী শব্দেই বলেন মে অর্থাৎ আমার। তাই তিনি বলছেন আমারই অন্য একটি প্রকৃতি। এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈশ্বরতাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ পায়। জড় এবং জীবনের উভয় স্তরই ঈশ্বরীয় শক্তির অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃতি শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে। সংস্কৃত প্রকৃতি শব্দটি প্র এবং কৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সৃষ্টি করা বা কার্য সম্পাদন করা। সেই দৃষ্টিতে প্রকৃতি হলো এমন একটি কার্যকরী শক্তি যার মাধ্যমে সৃষ্টি, প্রকাশ, পরিবর্তন এবং কার্যক্রম সংঘটিত হয়। আধুনিক ভাষায় প্রকৃতি বলতে আমরা সাধারণত গাছপালা, নদী, পাহাড়, প্রাণী কিংবা পরিবেশকে বুঝি। কিন্তু গীতার প্রকৃতি ধারণা তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এটি জগতের উপাদানগত এবং কার্যকরী শক্তিকে নির্দেশ করে। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং বস্তুগত জগতের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিদ্ধি শব্দটির অর্থ জেনে রাখো বা জেনে নাও। এটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা। কৃষ্ণ এখানে কেবল একটি তথ্য অর্জনের কথা বলছেন না। তিনি অর্জুনকে বাস্তবতার একটি গভীর সত্য উপলব্ধি করতে বলছেন। গীতার জ্ঞান তাই শুধু তাত্ত্বিক তথ্য নয়। এটি এমন জ্ঞান যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে এবং তাকে নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
মে শব্দের অর্থ আমার। এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যেই শ্লোকটির ঈশ্বরতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। কৃষ্ণ বলেন পরা প্রকৃতি আমার। অর্থাৎ জীবনের যে উচ্চতর শক্তি, সেটিও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো স্বাধীন বাস্তবতা নয়। জীবনের গভীরে যে চেতনা ও অস্তিত্বের প্রকাশ আমরা অনুভব করি, গীতা তার উৎসকে ঈশ্বরীয় শক্তির সঙ্গে যুক্ত করছে।
পরা শব্দের অর্থ উচ্চতর, শ্রেষ্ঠ, অতীত বা পরম। এখানে এটি প্রকৃতির এমন একটি স্তরকে নির্দেশ করে যা অষ্টধা জড় প্রকৃতির তুলনায় উচ্চতর। অপর ও পরা এই দুটি শব্দের মধ্যে গীতার প্রকৃতি তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য প্রকাশ পেয়েছে। অপর প্রকৃতি হলো বস্তুগত ও পরিবর্তনশীল স্তর, আর পরা প্রকৃতি হলো জীবনের প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত উচ্চতর শক্তি। তাই এই শ্লোককে কেবল জড় এবং চেতনার একটি সরল বিভাজন হিসেবে না দেখে অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তরের একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা হিসেবে বোঝা উচিত।
জীবভূতাম্ শব্দটি এই শ্লোকের হৃদয়স্থ ধারণাগুলোর একটি। জীব শব্দটি জীব্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ বেঁচে থাকা বা জীবিত থাকা। ভূত শব্দটি ভূ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। জীবভূতা অর্থ জীবস্বরূপে প্রকাশিত বা জীবনের রূপে প্রকাশিত। কৃষ্ণ এখানে এমন একটি শক্তির কথা বলছেন যা জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। এই শক্তির প্রকাশেই জড় কাঠামো জীবন্ত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মহাবাহো শব্দটি অর্জুনকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে। মহা অর্থ মহান এবং বাহু অর্থ বাহু। তাই মহাবাহো অর্থ হে মহাবাহু। কিন্তু এর মধ্যেও একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। অর্জুন বাহুবলে শক্তিশালী যোদ্ধা। কৃষ্ণ তাকে সেই শক্তির সঙ্গে জ্ঞানের শক্তির সমন্বয় করতে আহ্বান করছেন। বাহ্যিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ জয় করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের রহস্য উপলব্ধি করতে প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞান।
শ্লোকের শেষাংশ হলো যয়েদং ধার্যতে জগৎ। এখানে যয়া অর্থ যার দ্বারা এবং ধার্যতে এসেছে ধৃ ধাতু থেকে যার অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা, বহন করা বা স্থিত রাখা। জগৎ শব্দটির সঙ্গে গম ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে গমন বা পরিবর্তনের ধারণা নিহিত আছে। জগৎ অর্থ সেই পরিবর্তনশীল বিশ্ব যা ক্রমাগত চলমান। সুতরাং যয়া ইদং ধার্যতে জগৎ অর্থ যে শক্তির দ্বারা এই পরিবর্তনশীল জগৎ ধারণ করা হয়। এই একটি বাক্যের মধ্যেই জীবনের মহাজাগতিক গুরুত্ব প্রকাশিত হয়েছে।
মানুষ সাধারণত জগতকে তার দৃশ্যমান বস্তু দিয়ে বিচার করে। আমরা দেহ দেখি, পদার্থ দেখি, প্রকৃতি দেখি, প্রযুক্তি দেখি এবং শক্তির বিভিন্ন রূপ দেখি। কিন্তু গীতা প্রশ্ন তোলে যে এই সমস্ত বস্তুগত কাঠামোর মধ্যে জীবন কীভাবে প্রকাশিত হয়। একই ধরনের রাসায়নিক উপাদান থেকে গঠিত একটি জীবন্ত দেহ এবং একটি মৃতদেহের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য, সেটিই জীবনের রহস্যকে সামনে নিয়ে আসে। গীতার এই শ্লোক সেই জীবন্ত অস্তিত্বকে একটি উচ্চতর প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে।
এখানে একটি সহজ উপমা ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি যন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো যত উন্নতই হোক, শুধু কাঠামো থাকলেই তার কার্যকারিতা সম্পূর্ণ হয় না। একটি জীবন্ত মানুষের দেহও তেমনি কেবল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমষ্টি নয়। তার মধ্যে অনুভূতি আছে, চিন্তা আছে, স্মৃতি আছে, ইচ্ছা আছে, আত্মসচেতনতা আছে এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করার ক্ষমতা আছে। অবশ্য এই উপমাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া উচিত নয়। এটি শুধু বোঝাতে সাহায্য করে যে জড় কাঠামো এবং জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি গভীর পার্থক্য রয়েছে।
এই শ্লোকের দার্শনিক গুরুত্ব এখানেই যে এটি মানুষকে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কি শুধু আমার শরীর। আমি কি শুধু আমার মন। আমি কি আমার চিন্তা, স্মৃতি এবং অনুভূতির সমষ্টি। যদি দেহ পরিবর্তিত হয়, মন পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয় এবং অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, তাহলে যে সত্তা এই পরিবর্তনগুলোকে অনুভব করছে তার প্রকৃতি কী। গীতার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই গভীরতর হয়।
সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে তুলনা করলে এখানে প্রকৃতি এবং জীবনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি এবং পুরুষের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ দ্রষ্টা। গীতার বিশেষত্ব হলো এটি প্রকৃতির ধারণাকে ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করে। কৃষ্ণ বলেন যে অপর এবং পরা উভয় প্রকৃতিই তাঁর। ফলে গীতার প্রকৃতি ধারণা শুধু স্বয়ংক্রিয় বস্তুগত শক্তির ধারণা নয়। এটি ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি শক্তি।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে পড়লে দেহ, মন এবং জগতের পরিবর্তনশীলতার পেছনে চৈতন্যের প্রশ্ন সামনে আসে। অদ্বৈত দর্শনের চূড়ান্ত অনুসন্ধান হলো আত্মা এবং ব্রহ্মের প্রকৃতি উপলব্ধি করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে নিজের দেহ ও মানসিক পরিচয়ের বাইরে নিজের গভীরতর সত্তাকে অনুসন্ধান করতে বলা হয়।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব, জড় এবং ঈশ্বরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জীব এবং জড় উভয়ই ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত। এই ব্যাখ্যায় মে অর্থাৎ আমার শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। জীব নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে বাস্তব হলেও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কহীন নয়। তার অস্তিত্ব ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল এবং সে ঈশ্বরের বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।
দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর, জীব এবং জড়ের মধ্যে পার্থক্য বাস্তব। তবুও জীব এবং জড় উভয়ই ঈশ্বরের অধীন। ফলে এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে জীব ঈশ্বরের সমান নয়, কিন্তু জীবের অস্তিত্ব ঈশ্বরনির্ভর। এই ভাবটি ভক্তির দর্শনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির একটি গভীর ব্যাখ্যা সম্ভব। মানুষের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি এবং অহংকার তার নিম্নতর প্রকৃতির বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিন্তু মানুষের মধ্যে আত্মসচেতনতা, সত্যের অনুসন্ধান, নৈতিক বোধ, সৌন্দর্যের অনুভূতি এবং জীবনের অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা তাকে অন্যরকম একটি স্তরে নিয়ে যায়। মানুষ শুধু বেঁচে থাকে না। সে জানতে চায় কেন সে বেঁচে আছে। সে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করে। সে মৃত্যুর অর্থ নিয়ে চিন্তা করে। সে সত্য ও চিরন্তনের সন্ধান করে। এই অনুসন্ধানী ক্ষমতাই মানুষকে তার গভীরতর অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অপর প্রকৃতিকে যদি একটি বৃক্ষের দৃশ্যমান কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে পরা প্রকৃতিকে সেই জীবনীশক্তির সঙ্গে তুলনা করা যায় যার কারণে বৃক্ষটি কেবল কাঠের কাঠামো হয়ে থাকে না বরং একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে প্রকাশিত হয়। একইভাবে মানুষের দেহকে কেবল একটি জৈবিক কাঠামো হিসেবে দেখলে তার অভিজ্ঞতা, চেতনা এবং আত্মসচেতনতার সম্পূর্ণ অর্থ ধরা পড়ে না।
জগৎ শব্দটির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। জগৎ মানে পরিবর্তনশীল বিশ্ব। শৈশব পরিবর্তিত হয়ে যৌবন হয়, যৌবন পরিবর্তিত হয়ে বার্ধক্যে পৌঁছায়। দিন রাত হয়, ঋতু পরিবর্তিত হয়, সভ্যতা পরিবর্তিত হয়, দেহ পরিবর্তিত হয় এবং চিন্তাভাবনাও পরিবর্তিত হয়। এই সবকিছুই গমনশীল। কিন্তু এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই মানুষ একটি স্থায়ী সত্যের সন্ধান করে। গীতার আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান সেই চিরস্থায়ী সত্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়।
আধুনিক জীবনে এই শ্লোকের শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মানুষ আজ প্রকৃতির ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে মানুষ বাহ্যিক জগতকে পরিবর্তন করছে। কিন্তু বাহ্যিক জগতের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করলেই মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব দূর হয় না। মানুষ এখনও নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন করে, জীবনের অর্থ খোঁজে এবং মৃত্যুর সামনে নিজের সীমাবদ্ধতা অনুভব করে। তাই বাহ্যিক প্রকৃতির জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের অন্তর্নিহিত প্রকৃতির জ্ঞানও প্রয়োজন।
এই কারণে ভগবদ্গীতা ৭.৫ কেবল মহাবিশ্বের একটি দার্শনিক বিবরণ নয়। এটি আত্মজিজ্ঞাসার একটি আহ্বান। এটি মানুষকে বলে যে তুমি নিজেকে কেবল দেহ, মন, বুদ্ধি অথবা অহংকার হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখো না। তোমার অস্তিত্বের গভীরে এমন একটি জীবন্ত বাস্তবতা রয়েছে যার সঙ্গে সমগ্র জগতের সম্পর্ক রয়েছে। সেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার জন্য বাহ্যিক জগতের পাশাপাশি নিজের অন্তর্জগতের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতা ৭.৫ আমাদের সামনে বাস্তবতার একটি গভীর ও বহুস্তরীয় ছবি তুলে ধরে। জড় প্রকৃতি জগতের দৃশ্যমান কাঠামো তৈরি করে, কিন্তু জীবনের প্রকাশ সেই কাঠামোকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। অপর প্রকৃতি আমাদের দেহ, মন এবং বস্তুগত জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরা প্রকৃতি আমাদের জীবন্ত অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণ যখন বলেন যে এই পরা প্রকৃতি তাঁরই এবং যার দ্বারা এই জগৎ ধারণ করা হয়, তখন তিনি জীবনকে ঈশ্বরীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই শ্লোক তাই আমাদের শেখায় যে জগতকে জানতে হলে শুধু জগতের বস্তুগুলোকে জানা যথেষ্ট নয়। জীবনের প্রকৃতি জানতে হবে। আর জীবনকে জানতে হলে শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে হবে।
ভগবদ্গীতা ৭.৫ এর মূল শিক্ষা তাই এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসায় এসে মিলিত হয়। মানুষ কেবল পরিবর্তনশীল জগতের একটি ক্ষণস্থায়ী দেহ নয়। তার অস্তিত্বের মধ্যে এমন একটি জীবন্ত মাত্রা রয়েছে যা তাকে জানতে, অনুভব করতে, চিন্তা করতে এবং সত্যের সন্ধান করতে সক্ষম করে। জড় প্রকৃতি আমাদের বাহ্যিক পরিচয় গঠন করে, আর পরা প্রকৃতির ধারণা আমাদের সেই গভীরতর অস্তিত্বের দিকে ফিরিয়ে দেয়। এই উপলব্ধিই মানুষকে বাহ্যিক জগতের সীমা অতিক্রম করে নিজের অন্তরের সত্যের সন্ধানে নিয়ে যেতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!