ভগবদ্গীতা ৭.৬ | প্রকৃতিদ্বয় থেকে সৃষ্টির উৎপত্তি ও জগতের প্রভব-প্রলয়ের রহস্য
এতদযোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয়।
অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা।।৬।।
অনুবাদঃ আমার এই উভয় প্রকৃতি থেকে জড় ও চেতন সব কিছু উৎপন্ন হয়েছে। অতএব নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো যে, আমিই সমস্ত জগতের উৎপত্তি ও প্রলয়ের মূল কারণ।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকটি সমগ্র সৃষ্টিজগতের উৎপত্তি, অবস্থান ও লয়ের রহস্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, এই প্রকৃতিদ্বয় থেকেই সমস্ত সৃষ্ট সত্তার উৎপত্তি এবং সমগ্র জগতের প্রভব ও প্রলয় তিনিই। শ্লোকটি হলো, “এতদ্যোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয়। অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা।” সহজ বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, এই দুই প্রকৃতিকেই সমস্ত জীব ও সৃষ্ট সত্তার উৎপত্তির উৎস হিসেবে জেনে রাখো। আর সমগ্র জগতের উৎপত্তি এবং লয় উভয়ই আমি। এই বক্তব্যের মধ্যে কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং সৃষ্টি, অস্তিত্ব, পরিবর্তন, মৃত্যু এবং পরম সত্য সম্পর্কে ভারতীয় দর্শনের এক গভীর উপলব্ধি নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই এর শব্দগুলোর দিকে তাকাতে হয়। এতদ্যোনীনি শব্দটি গঠিত হয়েছে এতৎ এবং যোনীনি এই দুই অংশের সমন্বয়ে। এতৎ অর্থ এই এবং যোনি অর্থ গর্ভ, জন্মস্থান, উৎস, উৎপত্তির কারণ অথবা কোনো কিছুর প্রকাশের আধার। এখানে যোনি শব্দটি কেবল জৈবিক গর্ভ অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এর অর্থ আরও বিস্তৃত। যে স্থান বা কারণ থেকে কোনো কিছুর জন্ম ও প্রকাশ ঘটে, তাকেও যোনি বলা যায়। সেই অর্থে এতদ্যোনীনি বলতে বোঝানো হয়েছে যাদের উৎপত্তির উৎস এই প্রকৃতি। পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোর আলোচনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এখানে জড় প্রকৃতি এবং জীবস্বরূপ চৈতন্যশক্তির কথাই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ দৃশ্যমান জগতের পেছনে যেমন প্রকৃতির ভূমিকা রয়েছে, তেমনি জীবনের পেছনে রয়েছে চৈতন্যের উপস্থিতি।
ভূতানি শব্দটির মধ্যেও গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। তাই ভূতানি বলতে শুধু জীবজন্তু বোঝায় না। যা কিছু অস্তিত্ব লাভ করেছে বা সৃষ্ট হয়েছে, সেই সমস্ত সত্তাই এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মানুষ, পশু, পাখি, উদ্ভিদ, ক্ষুদ্র জীব থেকে শুরু করে অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তরের সকল সৃষ্ট সত্তাকে এই শব্দের বিস্তৃত অর্থের মধ্যে ধরা যায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সর্বাণি শব্দটি, যার অর্থ সমস্ত। ফলে শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য কোনো বিশেষ জাতি, প্রজাতি বা জীবনের নির্দিষ্ট কোনো স্তরের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। সমস্ত সৃষ্ট অস্তিত্বই এই মহাজাগতিক কারণ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।
এরপর এসেছে ইত্যুপধারয়। উপধারয় শব্দটির মধ্যে রয়েছে গভীরভাবে ধারণ করা, উপলব্ধি করা এবং নিশ্চিতভাবে জেনে নেওয়ার ভাব। শ্রীকৃষ্ণ কেবল অর্জুনকে একটি তথ্য জানাচ্ছেন না। তিনি তাকে বলছেন এই সত্যকে নিজের বুদ্ধি ও চেতনার মধ্যে স্থিরভাবে ধারণ করতে। আধ্যাত্মিক জ্ঞান কেবল শুনে রাখা বা মুখস্থ করার বিষয় নয়। কোনো সত্য যখন মানুষের অন্তর্দৃষ্টির অংশ হয়ে ওঠে, তখনই তা প্রকৃত জ্ঞানে পরিণত হয়। তাই উপধারয় শব্দটি এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক আবেদনকে আরও গভীর করেছে।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয়েছে অহম্ শব্দ দিয়ে। অহম্ অর্থ আমি। কিন্তু এখানে এই আমি সাধারণ মানুষের সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অহংকারের আমি নয়। শ্রীকৃষ্ণ এখানে পরম চৈতন্য ও পরমেশ্বরের অবস্থান থেকে কথা বলছেন। মানুষের আমি সাধারণত শরীর, মন, পরিচয়, সম্পদ, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কৃষ্ণের আমি সেই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। তিনি নিজেকে সমগ্র জগতের পরম কারণ ও ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করছেন। এই কারণে অহম্ শব্দটি শ্লোকটির আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
কৃৎস্নস্য শব্দের অর্থ সমগ্রের বা সম্পূর্ণের। জগতঃ অর্থ জগতের। জগত শব্দটির সঙ্গে গম ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ যাওয়া বা চলা। তাই জগতকে শুধু একটি স্থির বস্তু হিসেবে না দেখে চলমান ও পরিবর্তনশীল অস্তিত্ব হিসেবে দেখা যায়। এই পৃথিবী, জীবজগৎ, সমাজ, সভ্যতা, প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বের সমস্ত প্রকাশমান রূপ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। কোনো কিছুই একই অবস্থায় স্থির থাকে না। জন্ম হয়, বৃদ্ধি ঘটে, পরিবর্তন আসে, ক্ষয় হয় এবং একসময় একটি রূপের অবসান ঘটে। সংস্কৃত জগত শব্দের মধ্যে এই চলমানতার ধারণা যেন স্বাভাবিকভাবেই নিহিত রয়েছে।
এরপর এসেছে প্রভব শব্দটি। প্রভব শব্দটি প্র এবং ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ উৎপত্তি, প্রকাশ, আবির্ভাব অথবা অস্তিত্বে প্রকাশিত হওয়া। এখানে সৃষ্টি বলতে এমন কোনো ঘটনা বোঝানো হচ্ছে না যেখানে একেবারে শূন্য থেকে কোনো কিছু তৈরি হয়ে গেল। ভারতীয় দর্শনের দৃষ্টিতে সৃষ্টি অনেক সময় অব্যক্ত থেকে ব্যক্তের দিকে আগমন। যেমন একটি বীজের মধ্যে একটি বৃক্ষের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। উপযুক্ত পরিবেশে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরিত হয়ে দৃশ্যমান বৃক্ষে পরিণত হয়। এই প্রকাশের ধারণার সঙ্গে প্রভবের অর্থকে তুলনা করা যায়।
এর বিপরীতে রয়েছে প্রলয় শব্দটি। প্রলয় শব্দটি লয় বা লীন হওয়ার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই প্রলয়কে কেবল ধ্বংস হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। কোনো একটি প্রকাশিত রূপ তার কারণের মধ্যে ফিরে যাওয়া বা লীন হয়ে যাওয়াও প্রলয়ের ধারণার অন্তর্ভুক্ত। যেমন তরঙ্গ সমুদ্র থেকে প্রকাশিত হয় এবং আবার সমুদ্রেই মিলিয়ে যায়। তরঙ্গের রূপটি শেষ হয়ে যায়, কিন্তু জল নষ্ট হয় না। তেমনি সৃষ্টি ও প্রলয়ের ধারণায় একটি রূপের আবির্ভাব এবং তার পরবর্তী লয়কে দেখা হয়। এই দৃষ্টিতে মৃত্যু সবসময় সম্পূর্ণ শূন্যতা নয়, বরং অস্তিত্বের একটি রূপান্তর বা প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হতে পারে।
তথা শব্দের অর্থ সেইভাবেই বা তদ্রূপ। এই ছোট্ট শব্দটি প্রভব ও প্রলয়ের মধ্যে একটি গভীর সমতা প্রতিষ্ঠা করেছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সমগ্র জগতের উৎপত্তি যেমন তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি তার লয়ও তাঁর সঙ্গেই সম্পর্কিত। অর্থাৎ ঈশ্বরকে কেবল সৃষ্টির সূচনায় খুঁজলে এই শ্লোকের পূর্ণতা ধরা পড়ে না। সৃষ্টির আবির্ভাব যেমন তাঁর সঙ্গে যুক্ত, তেমনি তার বিলয় ও প্রত্যাবর্তনও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। তিনি শুধু শুরু নন, তিনি শেষেরও পরম আশ্রয়।
এই বক্তব্যের দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। জগতের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন দর্শন বিভিন্নভাবে চিন্তা করেছে। গীতার এই বক্তব্যে জগতের পেছনে একটি পরম কারণের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রকৃতি সৃষ্টির কার্যকরী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করলেও তার পরম ভিত্তি কৃষ্ণ। পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোতে কৃষ্ণ জড় প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান এবং জীবস্বরূপ উচ্চতর প্রকৃতির কথা বলেছেন। এরপর এই শ্লোকে তিনি ঘোষণা করেন যে এই প্রকৃতিদ্বয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত সমস্ত জগতের পরম উৎস তিনি নিজে। অর্থাৎ প্রকৃতি নিজে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। তার অস্তিত্বের পেছনেও রয়েছে একটি পরম চৈতন্যগত ভিত্তি।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে দেখলে পরম ব্রহ্মের ধারণা সামনে আসে। জগতের বহুবিধ নাম ও রূপের অন্তরে একটি পরম ঐক্যের সন্ধান করা হয়। যেমন অসংখ্য অলংকারের রূপ আলাদা হলেও তাদের মূল উপাদান সোনা, তেমনি বহুরূপী জগতের অন্তরে এক পরম সত্যের সন্ধান করা যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে জীব ও জড় প্রকৃতি ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে। ঈশ্বর জগতের অন্তর্নিহিত ও পরম আশ্রয়। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর, জীব ও জগতের পার্থক্য বাস্তব হলেও জগতের পরম স্বাধীনতা নেই এবং তার অস্তিত্ব সর্বোচ্চ ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল। দর্শনগুলোর ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে এই শ্লোক জগতের অস্তিত্বকে একটি পরম কারণ ও আশ্রয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যোনি এখানে মহাজাগতিক গর্ভের প্রতীক হিসেবে ভাবা যায়। যেমন মাতৃগর্ভ থেকে একটি জীবনের প্রকাশ ঘটে, তেমনি প্রকৃতিকে মহাজগতের প্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যায়। আর সেই প্রকৃতিরও যে একটি পরম ভিত্তি রয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ সেই ভিত্তির দিকেই মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। এই প্রতীক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দৃশ্যমান জগতের পেছনে অদৃশ্য কারণ কাজ করে এবং প্রকাশিত রূপের পেছনে থাকে একটি গভীরতর অস্তিত্বগত বাস্তবতা।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অসীম। মানুষের চিন্তা জন্ম নেয় এবং একসময় বিলীন হয়। আবেগ আসে এবং চলে যায়। সম্পর্কের রূপ পরিবর্তিত হয়। শরীর শৈশব থেকে যৌবন এবং বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যায়। সাফল্য আসে, ব্যর্থতা আসে, আনন্দ আসে, দুঃখ আসে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন প্রভব ও প্রলয়ের একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। কোনো অনুভূতি চিরস্থায়ী নয় এবং কোনো বাহ্যিক অবস্থাও অপরিবর্তনীয় নয়। তাই মানুষ যখন জীবনের কোনো পরিবর্তনকে চূড়ান্ত ধ্বংস বলে মনে করে, তখন এই শ্লোক তাকে বৃহত্তর অস্তিত্বচক্রের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
একটি তরঙ্গের উপমা দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গ একের পর এক উঠছে এবং মিলিয়ে যাচ্ছে। একটি তরঙ্গের দৃষ্টিতে তার জন্ম একটি নতুন ঘটনা এবং তার বিলয় যেন একটি শেষ। কিন্তু সমুদ্রের দৃষ্টিতে উত্থান ও বিলয় একই বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ। তেমনি ব্যক্তিজীবনের জন্ম ও মৃত্যু বৃহত্তর অস্তিত্বের ধারার মধ্যে ঘটে। আমরা সাধারণত নিজের ক্ষুদ্র পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ থাকার কারণে পরিবর্তনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখি। গীতা সেই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকে অতিক্রম করে সমগ্র অস্তিত্বকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে দেখতে শেখায়।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। প্রভব ও প্রলয় দুটি বিপরীতমুখী শব্দ হলেও তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একটি প্রকাশের কথা বলে এবং অন্যটি লয়ের কথা বলে। একটি সূচনার প্রতীক এবং অন্যটি প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। জগতের চলমানতার সঙ্গে এই দুই শব্দকে যুক্ত করলে একটি মহাজাগতিক ছন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। সৃষ্টি, স্থিতি, পরিবর্তন ও লয় যেন অস্তিত্বের অনন্ত সুরের বিভিন্ন মাত্রা।
এই শ্লোক মানুষের অহংবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আমরা প্রায়ই মনে করি আমি নিজেই আমার জীবনের কেন্দ্র। আমার অর্জন, আমার পরিচয়, আমার সম্পদ এবং আমার সম্পর্কই যেন আমার অস্তিত্বের শেষ সত্য। কিন্তু গীতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ব্যক্তিগত পরিচয় বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র। শরীর পরিবর্তিত হবে, মন পরিবর্তিত হবে, পরিস্থিতি পরিবর্তিত হবে এবং একসময় জীবনের বর্তমান রূপের অবসান ঘটবে। তাই পরিবর্তনশীল জিনিসকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে না করে তার অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান করাই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের উপদেশের মধ্যে উপধারয় শব্দটির গুরুত্ব এত বেশি। সত্যকে শুধু শুনলেই হবে না, তাকে ধারণ করতে হবে। যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের ধারার অংশ, তখন অহংকার কমে আসে, আসক্তি শিথিল হয় এবং পরিবর্তনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি গভীর হয়। জীবনের আনন্দ তখন কেবল ভোগের বিষয় থাকে না এবং দুঃখও কেবল ধ্বংসের প্রতীক হয়ে থাকে না। উভয়ই হয়ে ওঠে জীবনের বৃহত্তর যাত্রার অংশ।
সবশেষে বলা যায়, এতদ্যোনীনি ভূতানি সর্বাণীত্যুপধারয় এবং অহং কৃৎস্নস্য জগতঃ প্রভবঃ প্রলয়স্তথা এই শ্লোকটি আমাদের অস্তিত্বের তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কোথা থেকে এসেছি, এই জগতের প্রকৃতি কী এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় ফিরে যাই। যোনি আমাদের উৎসের কথা মনে করিয়ে দেয়, ভূতানি আমাদের অস্তিত্বের কথা বলে, জগত আমাদের পরিবর্তনশীলতার কথা জানায়, প্রভব প্রকাশের কথা বলে এবং প্রলয় প্রত্যাবর্তনের কথা বলে। আর এই সমস্ত কিছুর অন্তর্নিহিত পরম ভিত্তি হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেন অহম্। এই আমি ব্যক্তিগত অহংকারের আমি নয়, বরং সেই পরম সত্যের আমি যার মধ্যে সৃষ্টি প্রকাশিত হয় এবং যার মধ্যেই তার লয় ঘটে। তাই এই শ্লোক কেবল মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিনাশের একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়। এটি মানুষকে পরিবর্তনশীল জগতের অন্তরে অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করতে আহ্বান জানায় এবং মনে করিয়ে দেয় যে জন্ম ও মৃত্যু, প্রকাশ ও লয়, আগমন ও প্রত্যাবর্তন সবই এক মহত্তর অস্তিত্বের অন্তহীন প্রবাহের অংশ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!