ভগবদ্গীতা ৭.৭ | পরম সত্য হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ ও সূত্রে গাঁথা মণির উপমা
মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়।
ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।৭।।
অনুবাদঃ হে ধনঞ্জয়! আমার থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। সূত্রে যেমন মণিসমূহ গাঁথা থাকে, তেমনই সমস্ত বিশ্বই আমাতে ওতঃপ্রোতভাবে অবস্থান করে।
“মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়। ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।” ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের এই শ্লোকটি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ও হৃদয়স্পর্শী বাণী। এর সরল অর্থ হলো, হে ধনঞ্জয়, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই। এই সমগ্র জগৎ আমার মধ্যে এমনভাবে গাঁথা আছে, যেমন একটি সূত্রের মধ্যে অসংখ্য মণি গাঁথা থাকে। কিন্তু এই অনুবাদ শুধু শ্লোকটির বাহ্যিক অর্থ প্রকাশ করে। এর অন্তরে নিহিত আছে ঈশ্বর, জগৎ, জীব, অস্তিত্ব, ঐক্য, বহুত্ব এবং মানুষের আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধি।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ মত্তঃ এসেছে “মৎ” অর্থাৎ আমি থেকে। সংস্কৃতে পঞ্চমী বিভক্তির এই রূপের অর্থ আমার থেকে অথবা আমার চেয়ে। এর সঙ্গে পরতর শব্দটি যুক্ত হয়ে অর্থ দাঁড়ায় আমার চেয়ে অধিকতর বা আমার ঊর্ধ্বে। পরতর শব্দটি পর শব্দ থেকে গঠিত এবং এর মধ্যে ঊর্ধ্বতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সর্বোচ্চতার ধারণা রয়েছে। এরপর নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি অর্থাৎ অন্য কোনো কিছুই নেই। সব মিলিয়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে জানাচ্ছেন যে তাঁর চেয়ে ঊর্ধ্বে কোনো স্বাধীন পরম সত্য নেই। এখানে কেবল ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা নেই। বরং বলা হচ্ছে যে সমগ্র অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি ও সর্বোচ্চ আশ্রয় একটিই।
এই বক্তব্যের পরেই আসে শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর ও গভীর অংশ ময়ি সর্বমিদং প্রোতং। ময়ি অর্থ আমার মধ্যে। সর্বমিদং অর্থ এই সমস্ত কিছু বা এই সমগ্র জগৎ। আর প্রোতং শব্দের অর্থ গাঁথা, সংযুক্ত, বোনা বা কোনো আশ্রয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই একটি শব্দই শ্লোকটির দর্শনকে অসাধারণ গভীরতা দিয়েছে। কৃষ্ণ বলছেন না যে পৃথিবীর সবকিছু তাঁর পাশে পড়ে আছে অথবা তিনি দূরে দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি বলছেন সমস্ত জগৎ তাঁর মধ্যে গাঁথা। অর্থাৎ দৃশ্যমান বহুত্বের অন্তরালে একটি অদৃশ্য ঐক্য রয়েছে এবং সেই ঐক্যের ভিত্তিই পরম সত্তা।
এই সত্য বোঝানোর জন্য কৃষ্ণ যে উপমাটি ব্যবহার করেছেন তা অত্যন্ত সাধারণ অথচ অসাধারণ গভীর। তিনি বলেছেন সূত্রে মণিগণা ইব। অর্থাৎ যেমন একটি সুতোয় অসংখ্য মণি গাঁথা থাকে, তেমনি এই সমগ্র জগৎ পরম সত্তার মধ্যে সংযুক্ত। একটি মালার দিকে তাকালে আমাদের চোখে প্রথমে মণিগুলোই পড়ে। একটি মণি অন্য মণি থেকে আলাদা। কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট, কোনোটি উজ্জ্বল, কোনোটি গাঢ় রঙের। কিন্তু তাদের সবাইকে একত্রে ধরে রেখেছে একটি অদৃশ্য সূত্র। সেই সূত্র না থাকলে মণিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। ঠিক তেমনি পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ, প্রাণী, বস্তু, প্রকৃতি, নক্ষত্র, গ্রহ, চিন্তা, অনুভূতি এবং জীবনধারা রয়েছে। প্রত্যেকটির বাহ্যিক পরিচয় আলাদা হলেও তাদের অস্তিত্বের গভীরে একটি মৌলিক সংযোগ রয়েছে।
সূত্র শব্দটির অর্থ সাধারণভাবে সুতো। কিন্তু ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরায় সূত্র শব্দের অর্থ আরও গভীর। সূত্র হলো যা বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন উপাদানকে একত্রে ধারণ করে। এই অর্থে ঈশ্বরকে সূত্রের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায় যে পরম সত্তা দৃশ্যমান জগতের একটি সাধারণ উপাদান নন। তিনি সেই অদৃশ্য ভিত্তি যাঁর উপর জগতের বৈচিত্র্য প্রতিষ্ঠিত। আমরা মণি দেখি, কিন্তু সূত্রকে অনেক সময় দেখতে পাই না। তেমনি আমরা জগত দেখি, কিন্তু জগতের অন্তর্নিহিত ঐক্যের ভিত্তিকে সবসময় উপলব্ধি করতে পারি না।
মণিগণ শব্দের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক রয়েছে। মণি অর্থ রত্ন এবং গণ অর্থ সমষ্টি বা গুচ্ছ। অসংখ্য মণি যেমন একই সূত্রে যুক্ত হয়, তেমনি অসংখ্য জীব ও জগতের বিভিন্ন প্রকাশ একটি পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত। এই উপমা আমাদের শেখায় যে ঐক্য মানেই বৈচিত্র্যের বিলোপ নয়। একটি মালার সৌন্দর্য তৈরি হয় বহু ভিন্ন মণির সমন্বয়ে। যদি সব মণি একই রকম হতো, তাহলে মালার বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য অনেকটাই কমে যেত। একইভাবে পৃথিবীর মানুষ ও জীবনের অভিজ্ঞতার ভিন্নতা অস্তিত্বের কোনো ভুল নয়। বরং সেই বহুত্বের মধ্য দিয়েই একটি বৃহত্তর ঐক্য প্রকাশিত হতে পারে।
শ্লোকটির দার্শনিক তাৎপর্য এখানেই সবচেয়ে গভীর হয়ে ওঠে। মানুষ সাধারণত নিজেকে একটি পৃথক সত্তা হিসেবে অনুভব করে। আমি আলাদা, তুমি আলাদা, আমার জীবন আলাদা, আমার সাফল্য আলাদা। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমাদের অস্তিত্ব অসংখ্য সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল। আমাদের শরীর প্রকৃতির উপাদান দিয়ে গঠিত। আমাদের জীবন খাদ্য, জল, বায়ু ও সূর্যালোকের উপর নির্ভরশীল। আমাদের জ্ঞান ভাষা, শিক্ষা, পরিবার, সমাজ এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ আমরা যতই স্বাধীন বলে মনে করি না কেন, আমাদের অস্তিত্বের গভীরে রয়েছে এক বিশাল আন্তঃনির্ভরতা। মণির মতো আমরাও এক বৃহত্তর সূত্রের সঙ্গে যুক্ত।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে বহুত্বের অন্তর্নিহিত একত্বের আলোকে দেখা যায়। বাহ্যিকভাবে জগতে অসংখ্য নাম ও রূপ থাকলেও চূড়ান্ত সত্য এক। মণিগুলো আলাদা হলেও সূত্র এক। এই উপমা সেই একত্বের অনুভূতিকে শক্তিশালী করে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে জীব ও জগতের বাস্তব অস্তিত্ব স্বীকার করেও তাদের পরমেশ্বরের উপর নির্ভরশীলতা বোঝা যায়। দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে ঈশ্বর, জীব ও জগতের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও জীব ও জগতের অস্তিত্ব ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল। ফলে বিভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যার মধ্যেও একটি সাধারণ উপলব্ধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দৃশ্যমান বহুত্বের পেছনে একটি পরম আশ্রয় রয়েছে।
এই শ্লোকের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অর্থও আছে। মানুষের অহংকার তাকে অনেক সময় মনে করায় যে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নিজের অস্তিত্বের একমাত্র নির্মাতা। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের অন্য কথা শেখায়। আমরা অন্য মানুষের সাহায্য ছাড়া বেড়ে উঠতে পারি না। প্রকৃতির সহায়তা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারি না। সমাজের বাইরে আমাদের পরিচয় গড়ে ওঠে না। আমাদের ভাষা, চিন্তা ও জ্ঞানও বহু মানুষের অবদানের ফল। ফলে আমি আসলে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নই। আমি একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার কমায় এবং বিনয় সৃষ্টি করে।
আধ্যাত্মিক অর্থে শ্লোকটি মানুষকে বাহ্যিক বৈচিত্র্যের আড়ালে থাকা অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করতে আহ্বান জানায়। আমরা সাধারণত নাম ও রূপের দিকে তাকাই। মানুষকে দেখি মানুষ হিসেবে, গাছকে দেখি গাছ হিসেবে, নদীকে দেখি নদী হিসেবে। কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে প্রশ্ন ওঠে, এই সমস্ত ভিন্নতার অন্তরালে কি এমন কোনো একক সত্য আছে যা তাদের সবাইকে ধারণ করছে। গীতার উত্তর হলো সেই পরম সত্যের আশ্রয়েই সবকিছু গাঁথা।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ শিক্ষা হলো দৃশ্যমান জগতের চেয়ে অদৃশ্য ভিত্তির গুরুত্ব বোঝা। একটি মালায় মণি চোখে পড়ে, সূত্র অনেক সময় আড়ালে থাকে। কিন্তু মণির সৌন্দর্যের পাশাপাশি মালার অস্তিত্বও সূত্রের উপর নির্ভর করে। মানুষের জীবনেও এমন অনেক কিছু আছে যা চোখে দেখা যায় না অথচ দৃশ্যমান জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। ভালোবাসা দেখা যায় না, কিন্তু তার প্রভাব দেখা যায়। বিশ্বাসকে স্পর্শ করা যায় না, কিন্তু তার উপর সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে। চেতনার কোনো দৃশ্যমান রূপ নেই, অথচ আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা তার মাধ্যমে ঘটে। এই অর্থে সূত্রের উপমা আমাদের শেখায় যে বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর সবসময় চোখের সামনে দৃশ্যমান নাও হতে পারে।
এই শ্লোককে আধুনিক জীবনের একটি সহজ উদাহরণ দিয়েও বোঝা যায়। একটি ঘরে বাতি, পাখা, কম্পিউটার ও নানা যন্ত্র আলাদা আলাদা কাজ করে। তাদের রূপ আলাদা এবং কাজও আলাদা। কিন্তু তাদের কার্যক্ষমতার পেছনে একটি অভিন্ন শক্তি কাজ করছে। তেমনি সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গের রূপ ও গতি আলাদা হলেও তাদের মূল সত্তা জল। একইভাবে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় যতই ভিন্ন হোক না কেন, অস্তিত্বের গভীরে একটি বৃহত্তর ঐক্যের অনুভূতি আমাদের একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করে।
ধনঞ্জয় সম্বোধনটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ধনঞ্জয় অর্থ যিনি ধন জয় করেছেন। অর্জুন ছিলেন বীর, বিজয়ী ও কর্মশীল মানুষ। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁকে বাহ্যিক জয়ের পর অন্তরের জয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বাহ্যিক জগৎ জয় করা মানুষের পক্ষে সহজ হতে পারে, কিন্তু নিজের অহংকার, বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি ও অজ্ঞতাকে জয় করা অনেক কঠিন। এই শ্লোক যেন অর্জুনকে সেই গভীরতর জয়ের পথ দেখায়। প্রকৃত জ্ঞান তখনই আসে যখন মানুষ বুঝতে পারে যে সে একা নয় এবং তার অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত।
শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা সম্ভবত এই যে বহুত্বকে অস্বীকার না করেও ঐক্যকে উপলব্ধি করা যায়। মণি ও সূত্র এক নয়, কিন্তু তারা বিচ্ছিন্নও নয়। জগতের প্রতিটি জীবের নিজস্ব পরিচয় আছে, কিন্তু সেই পরিচয়ের গভীরে রয়েছে এক বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্য মানুষকে তখন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা যায় না। তাকে দেখা যায় একই বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি পৃথক প্রকাশ হিসেবে।
সবশেষে বলা যায়, “মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়” শুধু ঈশ্বরের সর্বোচ্চতার ঘোষণা নয়। “ময়ি সর্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব” শুধু একটি সুন্দর উপমাও নয়। এই দুটি অংশ একত্রে মানুষের সামনে অস্তিত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। একদিকে আছে পরম সত্যের সর্বোচ্চতা, অন্যদিকে আছে সমগ্র জগতের সেই সত্যের সঙ্গে গভীর সংযোগ। মণি অনেক হতে পারে, কিন্তু সূত্র এক। নাম অনেক হতে পারে, রূপ অনেক হতে পারে, জীবনযাত্রা অনেক হতে পারে, কিন্তু অস্তিত্বের গভীরে একটি ঐক্য কাজ করে। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে, বিচ্ছিন্নতা থেকে সম্পর্কের দিকে এবং বাহ্যিক বৈচিত্র্য থেকে অন্তর্নিহিত সত্যের দিকে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোক শুধু ধর্মীয় পাঠের বিষয় নয়। এটি মানুষের নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে দেখার একটি আহ্বান। আমরা প্রত্যেকে সেই মণির মতো পৃথক, কিন্তু আমাদের জীবন এক গভীর অদৃশ্য সূত্রের সঙ্গে গাঁথা। সেই সূত্রের সন্ধানই হয়তো আত্মজিজ্ঞাসার সবচেয়ে গভীর যাত্রা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!