ভগবদ্গীতা ৭.৯ | পৃথিবীর পবিত্র গন্ধ, অগ্নির তেজ ও সকল জীবের প্রাণস্বরূপ ঈশ্বর
পুণ্যো গন্ধঃ পৃথিব্যাং চ তেজশ্চাস্মি বিভাবসৌ।
জীবনং সর্বভূতেষু তপশ্চাস্মি তপস্বিষু।।৯।।
অনুবাদঃ আমি পৃৃথিবীর পবিত্র গন্ধ, অগ্নির তেজ, সর্বভূতের জীবন এবং তপস্বীদের তপ।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের নবম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঈশ্বরীয় উপস্থিতিকে এমন কিছু সাধারণ অথচ গভীর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন, যেগুলো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। শ্লোকটি হলো, “পুণ্যো গন্ধঃ পৃথিব্যাং চ তেজশ্চাস্মি বিভাবসৌ। জীবনং সর্বভূতেষু তপশ্চাস্মি তপস্বিষু।” এর সহজ অর্থ হলো, আমি পৃথিবীর পবিত্র গন্ধ, আমি অগ্নির তেজ, আমি সকল জীবের জীবন এবং আমি তপস্বীদের তপস্যা। এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে প্রকৃতি, জীবন, চেতনা, সাধনা এবং ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতি সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকের শুরুতেই এসেছে “পুণ্যো গন্ধঃ পৃথিব্যাং”। সংস্কৃত “পুণ্য” শব্দের অর্থ শুভ, পবিত্র, মঙ্গলময় এবং কল্যাণকর। “গন্ধ” অর্থ সুবাস বা ঘ্রাণ। “পৃথিব্যাং” অর্থ পৃথিবীতে। তাই আক্ষরিক অর্থে এখানে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর মধ্যে যে পবিত্র ও স্বাভাবিক গন্ধ, সেটিই ঈশ্বরের প্রকাশ। বৃষ্টির পরে ভেজা মাটির গন্ধ, ফুলের স্বাভাবিক সুবাস, ফলের গন্ধ কিংবা প্রকৃতির নিজস্ব কোনো নির্মল সৌরভ আমাদের চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। এখানেই এই শব্দের গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। ঈশ্বরকে সবসময় চোখ দিয়ে দেখতে হবে এমন নয়। যেমন সুবাসকে দেখা যায় না কিন্তু তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়, তেমনি ঈশ্বরীয় উপস্থিতিও অনেক সময় ইন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করে অনুভূত হয়। ভারতীয় দর্শনে গন্ধের সঙ্গে পৃথিবী তত্ত্বের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এই একটি শব্দের মধ্যেই প্রকৃতির স্থিতি, বস্তুজগতের বাস্তবতা এবং অদৃশ্য পবিত্রতার ধারণা একত্রিত হয়েছে।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “তেজশ্চাস্মি বিভাবসৌ”। “তেজ” শব্দের অর্থ আলো, দীপ্তি, শক্তি, ঔজ্জ্বল্য এবং প্রভাব। এর মূল সংস্কৃত ধাতু “ভা”, যার মধ্যে আলো দেওয়া ও প্রকাশিত হওয়ার ভাব রয়েছে। “বিভাবসু” অগ্নির একটি নাম এবং “বিভাবসৌ” অর্থ অগ্নির মধ্যে। তাই এখানে কৃষ্ণ বলছেন, অগ্নির যে দীপ্তি, যে আলো, যে জ্বালাময় শক্তি, সেটিও তাঁরই প্রকাশ। কিন্তু তেজকে শুধু আগুনের আলো হিসেবে দেখলে এই শব্দের গভীরতা ধরা পড়ে না। মানুষের চরিত্রেও তেজ থাকতে পারে, জ্ঞানে তেজ থাকতে পারে, সাহসে তেজ থাকতে পারে এবং আত্মিক শক্তিতেও তেজ থাকতে পারে। অগ্নি যেমন অন্ধকার দূর করে এবং জড় পদার্থকে রূপান্তরিত করে, তেমনি অন্তরের জ্ঞান মানুষের অজ্ঞতা দূর করে এবং তপস্যা তার চরিত্রকে রূপান্তরিত করে। তাই তেজ এখানে বাহ্যিক আলো যেমন, তেমনি অন্তরের জ্ঞান, চেতনা ও শক্তিরও প্রতীক।
“অস্মি” শব্দটির মধ্যেও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সংস্কৃত “অস্” ধাতুর অর্থ হওয়া বা অস্তিত্বশীল থাকা। “অস্মি” অর্থ আমি আছি বা আমিই। কৃষ্ণ এখানে কেবল বলছেন না যে তিনি পৃথিবীর গন্ধ সৃষ্টি করেছেন কিংবা অগ্নির তেজের কারণ। তিনি বলছেন, সেই গন্ধ ও সেই তেজের মধ্যেই তাঁর প্রকাশ রয়েছে। এর ফলে ঈশ্বরকে জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো দূরবর্তী সত্তা হিসেবে না দেখে জগতের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি হিসেবে উপলব্ধি করার একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়।
শ্লোকের সবচেয়ে গভীর অংশগুলোর একটি হলো “জীবনং সর্বভূতেষু”। “জীবন” শব্দটি সংস্কৃত “জীব” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ বেঁচে থাকা বা জীবন ধারণ করা। “সর্বভূতেষু” অর্থ সকল জীবের মধ্যে বা সমস্ত অস্তিত্বশীল সত্তার মধ্যে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, তিনি সকল জীবের জীবন। এই বক্তব্য মানুষের মধ্যে ঈশ্বরীয় উপস্থিতিকে সীমাবদ্ধ রাখে না। মানুষের মধ্যে যেমন জীবন আছে, তেমনি পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য জীবের মধ্যেও জীবন প্রবাহিত হচ্ছে। একটি বীজ মাটির মধ্যে থেকে অঙ্কুরিত হয়, একটি পাখি নিজের মতো করে জীবন ধারণ করে, একটি শিশুর শরীর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। এই জীবনধারণের অন্তর্নিহিত শক্তির মধ্যেই কৃষ্ণ তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে বলছেন।
এখানে জীবনকে কেবল শরীরের জৈবিক কার্যকলাপ হিসেবে দেখলে শ্লোকটির আধ্যাত্মিক গভীরতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। জীবন হলো অস্তিত্বের সেই রহস্যময় শক্তি, যার কারণে জড় পদার্থের সঙ্গে জীবন্ত সত্তার পার্থক্য তৈরি হয়। ভারতীয় দর্শনে এই জীবনশক্তির সঙ্গে প্রাণ ও চেতনার ধারণা গভীরভাবে যুক্ত। কৃষ্ণ যখন বলেন তিনি সকল জীবের জীবন, তখন তিনি যেন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন যে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা আসলে ঈশ্বরীয় উপস্থিতির প্রতি শ্রদ্ধা। অন্য জীবের মধ্যে নিজের মতো জীবনকে অনুভব করার মধ্য থেকেই করুণা, সহমর্মিতা ও অহিংসার বোধ জন্ম নিতে পারে।
এরপর আসে “তপশ্চাস্মি তপস্বিষু”। “তপস্” বা তপস্যা শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু “তপ”, যার অর্থ উত্তপ্ত হওয়া, জ্বলা বা তাপ সৃষ্টি করা। এখান থেকেই তপস্যার মূল ভাবটি এসেছে। তপস্যা মানে শুধু কঠিন কষ্ট সহ্য করা নয়। এর গভীর অর্থ হলো আত্মসংযম, সাধনা, আত্মশুদ্ধি এবং উচ্চতর সত্যের জন্য নিজের নিম্নতর আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি। “তপস্বী” হলেন যিনি তপস্যা করেন এবং “তপস্বিষু” অর্থ তপস্বীদের মধ্যে। তাই কৃষ্ণ বলছেন, যে সত্যিকারের সাধনা একজন মানুষকে পরিশুদ্ধ করে এবং উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায়, সেই তপস্যার শক্তিও তাঁরই প্রকাশ।
তপস্যার প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য সাধারণ জীবন থেকেও উদাহরণ নেওয়া যায়। একজন ছাত্র যখন তাৎক্ষণিক আনন্দকে পাশে রেখে নিয়মিত পড়াশোনা করে, একজন গবেষক যখন বহু ব্যর্থতার পরও সত্য অনুসন্ধান চালিয়ে যান, একজন শিল্পী যখন দীর্ঘদিন অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের প্রতিভাকে পরিণত করেন কিংবা একজন সাধক যখন ইন্দ্রিয় ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করে সত্যের সন্ধান করেন, তখন প্রত্যেকের মধ্যেই তপস্যার একটি রূপ প্রকাশ পায়। তপস্যা তাই কেবল নির্জন অরণ্যে বসে সাধনা করার বিষয় নয়। নিজের জীবনকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করার জন্য যে আত্মসংযম ও অধ্যবসায় দরকার, সেটিও তপস্যা।
এই চারটি ধারণাকে একসঙ্গে দেখলে শ্লোকটির একটি সুন্দর অন্তর্গত যাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে আছে পৃথিবীর গন্ধ, যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভূত হয়। তারপর আছে অগ্নির তেজ, যা শক্তি ও দীপ্তির প্রকাশ। এরপর আছে সকল জীবের জীবন, যা অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে। সর্বশেষে আছে তপস্যা, যা মানুষকে নিজের অন্তরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ এই শ্লোক যেন প্রকৃতি থেকে শক্তি, শক্তি থেকে জীবন এবং জীবন থেকে আত্মোন্নতির দিকে একটি আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশ করছে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের মধ্যে সর্বব্যাপী ব্রহ্মের ধারণা প্রতিফলিত হয়। যদি পরম সত্য সর্বত্র বিরাজমান হয়, তাহলে পৃথিবীর গন্ধ, অগ্নির তেজ, জীবনের স্পন্দন এবং সাধকের অন্তরের সাধনাও সেই পরম সত্যের প্রকাশ হতে পারে। ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোক আরও হৃদয়স্পর্শী। ভক্তকে যেন বলা হচ্ছে, ঈশ্বরকে কেবল মন্দিরের মধ্যে খুঁজে থেমে থেকো না। প্রকৃতির সৌন্দর্যে তাঁকে অনুভব করো, আগুনের দীপ্তিতে তাঁকে স্মরণ করো, প্রতিটি জীবনের মধ্যে তাঁর উপস্থিতিকে শ্রদ্ধা করো এবং নিজের আত্মসংযম ও সাধনার মধ্যেও তাঁকে উপলব্ধি করো।
এই কারণে “গন্ধ” এখানে অদৃশ্য ঈশ্বরীয় উপস্থিতির প্রতীক, “তেজ” জ্ঞান ও চেতনার প্রতীক, “জীবন” সর্বজনীন ঈশ্বরীয় উপস্থিতির প্রতীক এবং “তপস্যা” আত্মরূপান্তরের প্রতীক। ফুলের সুবাস যেমন চোখে দেখা যায় না অথচ অনুভব করা যায়, তেমনি জীবনের গভীরতম সত্যও অনেক সময় প্রত্যক্ষ দৃশ্যের বাইরে অনুভূত হয়। আগুন যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি জ্ঞান মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে। জীবন যেমন প্রতিটি জীবকে অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে, তেমনি ঈশ্বরীয় চেতনা সকল অস্তিত্বের মধ্যে এক গভীর ঐক্যের অনুভূতি জাগায়। আর তপস্যা যেমন মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সাহায্য করে, তেমনি আধ্যাত্মিক সাধনা মানুষকে তার গভীরতর সত্তার দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো, এখানে ঈশ্বরকে অসাধারণ কোনো দূরবর্তী অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। বরং সবচেয়ে সাধারণ জিনিসের মধ্যেই ঈশ্বরীয়তার সন্ধান করতে বলা হয়েছে। বৃষ্টির পরে মাটির গন্ধ নেওয়ার সময়, আগুনের শিখার দিকে তাকানোর সময়, কোনো জীবন্ত প্রাণীর চোখের দিকে তাকানোর সময় কিংবা নিজের কোনো কঠিন সাধনার মুহূর্তে মানুষ যদি সচেতনভাবে অস্তিত্বের গভীরতাকে অনুভব করতে পারে, তাহলে দৈনন্দিন জীবনও এক ধরনের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের ঈশ্বরকে খোঁজার দৃষ্টিটাই বদলে দেয়। ঈশ্বর কেবল দূরে নন, তিনি পৃথিবীর নির্মল সুবাসে, অগ্নির দীপ্তিতে, প্রতিটি জীবের জীবনশক্তিতে এবং সত্যের পথে চলা মানুষের তপস্যায় প্রকাশিত। “পুণ্যো গন্ধঃ” আমাদের শেখায় অনুভব করতে, “তেজশ্চাস্মি” শেখায় দীপ্তিকে চিনতে, “জীবনং সর্বভূতেষু” শেখায় সকল জীবনের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করতে এবং “তপশ্চাস্মি তপস্বিষু” শেখায় নিজের জীবনকে সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পথে রূপান্তরিত করতে। তাই এই শ্লোকের গভীরতম বার্তা হলো, অস্তিত্বের যে অংশে সত্য, সৌন্দর্য, জীবন, শক্তি ও আত্মোন্নতির প্রকাশ আছে, সেখানেই ঈশ্বরীয় উপস্থিতির আভাস রয়েছে। প্রকৃতিকে গভীরভাবে অনুভব করা, জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার সাধনাই তখন ঈশ্বরকে উপলব্ধির এক জীবন্ত পথ হয়ে ওঠে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!