সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৮.১৩ | ওঁকার, ব্রহ্মস্মরণ ও দেহত্যাগের মাধ্যমে পরম গতি লাভের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্মামনুস্মরন্।যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্।।১৩।।
ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্মামনুস্মরন্।
যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্।।১৩।।

অনুবাদঃ যোগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হয়ে পবিত্র ওঙ্কার উচ্চারণ করতে করতে কেউ যদি পরমেশ্বর ভগবানকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি অবশ্যই পরমা গতি লাভ করবেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোকটি মানবজীবনের সবচেয়ে গভীর একটি প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেই প্রশ্ন হলো মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের চেতনা কোথায় নিবদ্ধ থাকবে এবং সেই চেতনার চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্মামনুস্মরণ্। যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি ওঁ এই একাক্ষর ব্রহ্ম উচ্চারণ করতে করতে এবং আমাকে স্মরণ করতে করতে দেহত্যাগ করে, সে পরম গতি লাভ করে। এই শ্লোকের মধ্যে ওঁকার, ব্রহ্ম, ঈশ্বরস্মরণ, দেহত্যাগ এবং পরম গতি এই কয়েকটি গভীর ধারণা এমনভাবে একত্রিত হয়েছে যে অল্প কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সমগ্র আধ্যাত্মিক সাধনার একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

এই শ্লোকের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ওঁ। সংস্কৃত ঐতিহ্যে ওঁকে প্রণব বা ওঁকার বলা হয়। এটি কেবল একটি সাধারণ ধ্বনি নয়। বৈদিক ও উপনিষদীয় চিন্তায় ওঁকে পরম সত্যের একটি শ্রুতিময় প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। ওঁকারের ধ্বনিগত ব্যাখ্যায় অ, উ এবং ম এই তিনটি ধ্বনির সমন্বয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাণ্ডূক্য উপনিষদে এই তিন ধ্বনিকে মানুষের চেতনার জাগ্রত, স্বপ্ন এবং সুপ্ত এই তিন অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। আবার এই তিন অবস্থার অতীত যে চতুর্থ অবস্থা তাকে বলা হয়েছে তুরীয়। সেই তুরীয় হলো এমন এক চৈতন্যের প্রতীক যা জাগ্রত, স্বপ্ন এবং সুপ্তির সীমাকে অতিক্রম করে। তাই ওঁকে কেবল একটি উচ্চারিত শব্দ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় না। ওঁ হলো শব্দের মাধ্যমে নৈঃশব্দ্যের দিকে, সীমিতের মাধ্যমে অসীমের দিকে এবং দৃশ্যমানের মাধ্যমে অদৃশ্য পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি আধ্যাত্মিক প্রতীক।

ওঁ শব্দটির সঙ্গে শ্লোকে ব্যবহৃত হয়েছে ইতি শব্দটি। সংস্কৃত ভাষায় ইতি সাধারণত এইভাবে, এই বলে বা এই নাম দ্বারা বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে ওঁ ইতি বলতে বোঝায় ওঁ এই বলে বা ওঁ এই নামের দ্বারা। এরপর এসেছে একাক্ষরং শব্দটি। একাক্ষর গঠিত হয়েছে এক এবং অক্ষর এই দুটি অংশ থেকে। এক অর্থ একমাত্র বা অনন্য এবং অক্ষর অর্থ অক্ষয় অথবা ক্ষয়হীন। ভাষাগত ব্যবহারে অক্ষর বলতে বর্ণ বা ধ্বনির একক বোঝায়, কিন্তু সংস্কৃত দর্শনে অক্ষর শব্দের আরও গভীর অর্থ রয়েছে। অক্ষর শব্দটি ক্ষর ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ক্ষর অর্থ ক্ষয় হওয়া, ঝরে যাওয়া বা পরিবর্তিত হওয়া। তার সঙ্গে অ নিষেধবাচক উপসর্গ যুক্ত হলে অক্ষর অর্থ দাঁড়ায় যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। তাই একাক্ষর শব্দটি শুধু একটি অক্ষরকে নির্দেশ করে না, বরং এমন এক অনন্য ও অবিনশ্বর প্রতীককে নির্দেশ করে যার মাধ্যমে পরম সত্যকে স্মরণ করা যায়।

এরপর এসেছে ব্রহ্ম শব্দটি। ব্রহ্ম শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু বৃহ্, যার অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, প্রসারিত হওয়া এবং ব্যাপক হওয়া। এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকে ব্রহ্ম বলতে এমন এক পরম সত্তাকে বোঝানো হয় যা সীমাবদ্ধ নয়, যার বিস্তারের কোনো চূড়ান্ত সীমা নেই এবং যার মধ্যে সমগ্র অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত। এখানে ব্রহ্ম বলতে ব্রহ্মা দেবতাকে বোঝানো হয় না। ব্রহ্ম হলো পরম বাস্তবতা, পরম সত্য এবং সর্বব্যাপী চৈতন্যের ধারণা। তাই ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম বলতে বোঝানো হচ্ছে যে ওঁ এই একাক্ষর ধ্বনির মাধ্যমে অবিনশ্বর পরম ব্রহ্মকে নির্দেশ করা হয়েছে। সীমাহীন সত্যকে মানুষের স্মরণ ও ধ্যানের উপযোগী করে তুলতে ওঁ একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

শ্লোকে এরপর এসেছে ব্যাহরন্ শব্দটি। এর অর্থ উচ্চারণ করতে করতে বা আবৃত্তি করতে করতে। অর্থাৎ সাধক ওঁ উচ্চারণ করবে। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন মাম্ অনুস্মরণ্। মাম্ অর্থ আমাকে এবং অনুস্মরণ্ অর্থ বারবার বা অবিচ্ছিন্নভাবে স্মরণ করতে করতে। এখানেই শ্লোকটির গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য নিহিত রয়েছে। শুধু ওঁ উচ্চারণ করাই এই শিক্ষার সম্পূর্ণতা নয়। উচ্চারণের সঙ্গে ঈশ্বরস্মরণ যুক্ত হতে হবে। বাহ্যিক শব্দের সঙ্গে অন্তরের চেতনার মিলন ঘটতে হবে। মুখে উচ্চারিত ওঁ যদি অন্তরে ঈশ্বরস্মরণের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেই উচ্চারণ একটি আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হয়। তাই এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে শব্দের মূল্য তখনই গভীর হয় যখন সেই শব্দের অন্তর্নিহিত সত্য চেতনার মধ্যে জাগ্রত হয়।

এরপর বলা হয়েছে যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং। যঃ অর্থ যে ব্যক্তি। প্রয়াতি অর্থ প্রস্থান করে বা চলে যায়। ত্যজন্ অর্থ ত্যাগ করতে করতে এবং দেহং অর্থ দেহকে। এখানে মৃত্যু শব্দটি সরাসরি ব্যবহার না করে দেহত্যাগ এবং প্রস্থান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতীয় দর্শনের একটি গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ পায়। মৃত্যু এখানে অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিলোপ হিসেবে নয়, বরং একটি অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় প্রস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দেহ ক্ষয়শীল, পরিবর্তনশীল এবং নশ্বর। কিন্তু আত্মা সম্পর্কে গীতার সামগ্রিক দর্শন হলো আত্মা দেহের মতো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। তাই দেহ ত্যাগ মানেই আত্মার বিনাশ নয়। বরং এটি দেহকেন্দ্রিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে অন্য এক অস্তিত্বগত অবস্থায় প্রবেশের প্রতীক হিসেবেও বোঝা যেতে পারে।

শ্লোকটির শেষ অংশ হলো স যাতি পরমাং গতিম্। স অর্থ সে এবং যাতি অর্থ যায় বা গমন করে। পরমাং অর্থ সর্বোচ্চ এবং গতি অর্থ গমন, পথ, গন্তব্য বা চূড়ান্ত প্রাপ্তি। তাই পরম গতি বলতে সাধারণ কোনো স্থানকে বোঝানো হয় না। এটি হলো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এটি ব্রহ্মজ্ঞান ও মোক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এটি ঈশ্বরলাভ বা ভগবানের পরম সান্নিধ্য লাভের অর্থ বহন করতে পারে। যোগদর্শনের দৃষ্টিতে এটি চেতনার পরিশুদ্ধি এবং পরম আত্মস্বরূপ উপলব্ধির দিকে নির্দেশ করতে পারে। ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও সব ক্ষেত্রেই পরম গতি হলো মানুষের সীমাবদ্ধ অস্তিত্বকে অতিক্রম করে সর্বোচ্চ সত্যের দিকে পৌঁছানোর ধারণা।

এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক দিক হলো ওঁ এবং ব্রহ্মের সম্পর্ক। ওঁ হলো শব্দ বা প্রতীক এবং ব্রহ্ম হলো সেই পরম সত্য যার দিকে প্রতীকটি নির্দেশ করে। যেমন একটি মানচিত্র কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, কিন্তু মানচিত্রের সাহায্যে সেই স্থানের দিকে যাওয়া যায়, তেমনই ওঁ নিজে কেবল একটি ধ্বনি হলেও তার গভীর তাৎপর্য মানুষের চেতনাকে ব্রহ্মের দিকে পরিচালিত করা। তাই ওঁকে কেবল যান্ত্রিকভাবে উচ্চারণ করা নয়, তার অর্থ ও অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করাই সাধনার মূল উদ্দেশ্য। শব্দ তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন শব্দের সঙ্গে চেতনার সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ আরও গভীর হয়ে ওঠে। অদ্বৈত মতে ব্রহ্মই পরম সত্য এবং আত্মা ও ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ অভিন্ন। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, মন বা ব্যক্তিগত পরিচয় হিসেবে দেখে তখন সে সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু আত্মজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে সে উপলব্ধি করতে পারে যে তার প্রকৃত সত্তা ক্ষয়শীল দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই দৃষ্টিতে ওঁ ধ্যানের একটি উদ্দেশ্য হলো চেতনার গভীরে প্রবেশ করে সেই অবিনশ্বর আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করা। মাণ্ডূক্য উপনিষদের ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ওঁ জাগ্রত, স্বপ্ন এবং সুপ্ত এই তিন অভিজ্ঞতার স্তরকে ধারণ করে এবং তাদের অতীত তুরীয় চৈতন্যের দিকে নির্দেশ করে।

ভক্তি দর্শনের আলোকে শ্লোকটির অর্থ কিছুটা ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। এখানে বিশেষ গুরুত্ব পায় মাম্ অনুস্মরণ্ অর্থাৎ আমাকে স্মরণ করতে করতে। শ্রীকৃষ্ণের প্রতি একাগ্র স্মরণ, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণ এই ব্যাখ্যার কেন্দ্রে থাকে। অর্থাৎ ওঁকার উচ্চারণের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রতি প্রেমময় স্মরণ যুক্ত হয়। এতে পরম সত্য কেবল একটি বিমূর্ত দার্শনিক ধারণা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে প্রেম, আশ্রয় এবং সম্পর্কের জীবন্ত কেন্দ্র। এই কারণে শ্লোকটি জ্ঞান ও ভক্তির মধ্যে একটি সুন্দর সেতু নির্মাণ করে।

যোগদর্শনের ক্ষেত্রেও ওঁ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। মন যখন বিচ্ছিন্ন চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, ভয় এবং অস্থিরতার দ্বারা ক্রমাগত আন্দোলিত হয় তখন একাগ্রতা অর্জন কঠিন হয়ে ওঠে। ওঁকার জপ এবং তার অর্থের উপর মনোনিবেশ চিত্তকে একাগ্র করার একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই দৃষ্টিতে ওঁ কেবল ধর্মীয় উচ্চারণ নয়, বরং চেতনার কেন্দ্রীভবনের একটি মাধ্যম। যখন মন ধীরে ধীরে বাহ্যিক বিচ্ছিন্নতা থেকে সরে একটি পরম সত্যের দিকে নিবদ্ধ হয়, তখন মানুষের অন্তর্জগতে এক ধরনের স্থিরতা জন্ম নিতে পারে।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। ওঁ সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যাত হতে পারে। আবার এটি জাগরণ, স্বপ্ন এবং সুপ্তির প্রতীক। একই সঙ্গে এটি সেই চেতনার প্রতীক যা এই তিন অবস্থাকেও অতিক্রম করে। ফলে ওঁ সমগ্র মানব অভিজ্ঞতার একটি প্রতীকী মানচিত্রের মতো কাজ করে। অন্যদিকে দেহত্যাগ কেবল শারীরিক মৃত্যুর প্রতীক নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অহং, আসক্তি এবং দেহকেন্দ্রিক পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর বলে মনে করে তখন তার পরিচয় ক্ষয়শীলতার সঙ্গে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন সে নিজের গভীরতর চৈতন্যস্বরূপ উপলব্ধি করতে শুরু করে তখন তার পরিচয়ের পরিসর প্রসারিত হয়।

এই শিক্ষাকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি নাবিক যখন বিশাল সমুদ্রের মধ্যে থাকে তখন চারদিকে কেবল জল দেখতে পায়। তার কাছে সঠিক দিক নির্ণয় করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু একটি কম্পাস তাকে একটি নির্দিষ্ট দিকের নির্দেশনা দেয়। একইভাবে জাগতিক জীবনের অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা, ভয়, দুঃখ, আনন্দ এবং বিভ্রান্তির মধ্যে মানুষের মনও দিক হারাতে পারে। ওঁ সেই চেতনার জন্য একটি আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশকের মতো কাজ করতে পারে। আর ঈশ্বরস্মরণ সেই দিককে জীবন্ত অর্থ প্রদান করে। যখন মানুষের চেতনা ধীরে ধীরে পরম সত্যের দিকে অভ্যস্ত হয় তখন তার জীবন ও মৃত্যুর অর্থও নতুনভাবে উপলব্ধি হতে পারে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে বাস্তব শিক্ষা হলো মৃত্যুর প্রস্তুতি আসলে জীবনের প্রস্তুতি। মৃত্যুর মুহূর্তে কী স্মরণ করা হবে তা কেবল সেই শেষ মুহূর্তে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়। মানুষের সারাজীবনের চিন্তা, অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা এবং সাধনা তার চেতনার একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা তৈরি করে। যে ব্যক্তি সারাজীবন অর্থ, অহংকার, ভয় এবং ইন্দ্রিয়সুখকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকে তার চেতনার অভিমুখ এক ধরনের হতে পারে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি ঈশ্বরস্মরণ, সত্য, প্রেম, অনাসক্তি, আত্মজ্ঞান এবং করুণাকে জীবনের অংশ করে তোলে তার চেতনার অভিমুখ ভিন্ন হতে পারে। তাই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা কেবল মৃত্যুশয্যায় ওঁ উচ্চারণ করার নির্দেশ নয়। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে এমনভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা যাতে পরম সত্যের স্মরণ ধীরে ধীরে মানুষের স্বাভাবিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠে।

এই দৃষ্টিতে ব্যাহরন্ এবং অনুস্মরণ্ শব্দ দুটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ব্যাহরন্ নির্দেশ করে মুখের উচ্চারণকে এবং অনুস্মরণ্ নির্দেশ করে অন্তরের স্মরণকে। বাহ্যিক উচ্চারণ এবং অভ্যন্তরীণ চেতনা যখন একত্রিত হয় তখন সাধনা পূর্ণতা পায়। শুধু শব্দের পুনরাবৃত্তি নয়, শব্দের অর্থের মধ্যে প্রবেশ করাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি প্রিয়জনের নাম উচ্চারণ করে কিন্তু তার মনে সেই প্রিয়জনের কোনো স্মৃতি না থাকে তাহলে নামটি কেবল শব্দ হয়ে থাকে। কিন্তু নাম উচ্চারণের সঙ্গে যদি গভীর অনুভূতি ও স্মৃতি যুক্ত হয় তাহলে সেই শব্দের অর্থ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। একইভাবে ওঁ উচ্চারণের প্রকৃত শক্তি তার অন্তর্নিহিত সত্যের স্মরণে।

শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। প্রয়াতি, যাতি এবং গতি এই শব্দগুলোর মধ্যে গমন বা যাওয়ার একটি ধারাবাহিক ভাব রয়েছে। ফলে পুরো শ্লোকটি যেন একটি যাত্রার চিত্র তৈরি করে। ওঁকারের মাধ্যমে শুরু হয় চেতনার অভিমুখ, ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে তা গভীর হয়, দেহত্যাগের মাধ্যমে জাগতিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে এবং পরম গতির দিকে এগিয়ে যায়। এইভাবে মৃত্যুকে একটি সমাপ্তি হিসেবে নয় বরং একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, “ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম” গীতার একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অসীম গভীর আধ্যাত্মিক সূত্র। এখানে ওঁ হলো পরম সত্যের ধ্বনি প্রতীক, একাক্ষর হলো অনন্য ও অবিনশ্বর নির্দেশনা, ব্রহ্ম হলো সর্বব্যাপী পরম বাস্তবতা, অনুস্মরণ হলো ধারাবাহিক ঈশ্বরচেতনা, দেহত্যাগ হলো ক্ষয়শীল পরিচয়ের সীমা অতিক্রম এবং পরম গতি হলো সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক প্রাপ্তি। এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মৃত্যু জীবনের বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং মানুষের সমগ্র জীবনযাত্রা তার চেতনার অভিমুখ তৈরি করে এবং সেই চেতনার অভিমুখই তার আধ্যাত্মিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো পরম সত্যকে শুধু মৃত্যুর মুহূর্তে স্মরণ করার চেষ্টা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সেই সত্যের দিকে মনকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তোলা। মানুষ যখন ক্ষয়শীল দেহের সীমার মধ্যে থেকেও অবিনশ্বর সত্যকে স্মরণ করতে শেখে, তখন তার কাছে জীবন নতুন অর্থ পায়, মৃত্যু নতুন ব্যাখ্যা পায় এবং অস্তিত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে ওঠে পরম সত্যের উপলব্ধি।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি