ভগবদ্গীতা ৮.১৫ | পুনর্জন্ম, সংসারের দুঃখ ও পরম মুক্তি লাভের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব
মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বাতম্।
নাপ্নুবন্তি মহাত্মনঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ।।১৫।।
অনুবাদঃ মহাত্মা, ভক্তিপরায়ণ যোগীগণ আমাকে লাভ করে আর এই দুঃখপূর্ণ নশ্বর সংসারে পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন না, কেন না তাঁরা পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানবজীবনের অনিত্যতা, সংসারের দুঃখময় প্রকৃতি, পুনর্জন্মের চক্র এবং পরম মুক্তির এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বতম্। নাপ্নুবন্তি মহাত্মানঃ সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ।” এর সহজ অর্থ হলো, যাঁরা আমাকে লাভ করেছেন, সেই মহাত্মাগণ আর এই দুঃখময় ও অনিত্য পুনর্জন্ম লাভ করেন না। তাঁরা পরম সিদ্ধিতে উপনীত হন। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের সমস্যা, জীবনের প্রকৃতি এবং মুক্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে ভারতীয় দর্শনের এক গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো “মামুপেত্য”। “মাম্” শব্দের অর্থ আমাকে এবং এটি সংস্কৃত “মদ্” সর্বনাম থেকে এসেছে। শ্লোকে এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে বোঝায় না, বরং গীতার সামগ্রিক দর্শনের আলোকে পরমেশ্বর বা পরম সত্যকে নির্দেশ করে। “উপেত্য” শব্দটি উপসর্গ “উপ” এবং “ই” ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয়গত গঠনের মাধ্যমে এসেছে। “উপ” অর্থ নিকটে এবং “ই” অর্থ যাওয়া। তাই আক্ষরিকভাবে “উপেত্য” অর্থ কাছে গিয়ে বা লাভ করে। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে ঈশ্বরের কাছে যাওয়া কোনো স্থান পরিবর্তনের বিষয় নয়। এটি চেতনার পরিবর্তন। মানুষের মন যখন বাহ্যিক বিষয়, ভোগ, অহংকার এবং সীমিত আত্মপরিচয় অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে ফিরে যায়, তখন সেই অন্তর্মুখী উপলব্ধিই “মামুপেত্য” ভাবের গভীর অর্থ প্রকাশ করে।
এরপর এসেছে “পুনর্জন্ম” শব্দটি। এটি “পুনর্” এবং “জন্ম” এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। “পুনর্” অর্থ আবার এবং “জন্ম” অর্থ জন্মগ্রহণ। “জন্ম” শব্দটির উৎস সংস্কৃত “জন্” ধাতু, যার অর্থ উৎপন্ন হওয়া, জন্ম দেওয়া বা জন্মগ্রহণ করা। তাই পুনর্জন্মের সরল অর্থ হলো আবার জন্মগ্রহণ করা। ভারতীয় দর্শনে এর অর্থ কেবল এক দেহ ত্যাগ করে আরেক দেহ গ্রহণ করা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কর্ম, বাসনা, আসক্তি এবং অজ্ঞানের ধারাবাহিকতা। জীব যতদিন নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না এবং কর্ম ও বাসনার বন্ধনে আবদ্ধ থাকে, ততদিন জন্ম ও মৃত্যুর চক্র চলতে থাকে। এই চক্রকেই বৃহত্তর অর্থে সংসার বলা হয়।
শ্লোকে পুনর্জন্মকে বলা হয়েছে “দুঃখালয়ম্” এবং “অশাশ্বতম্”। এই দুটি শব্দ শ্লোকটির দর্শনকে বিশেষভাবে গভীর করে তুলেছে। “দুঃখালয়” শব্দটি “দুঃখ” এবং “আলয়” নিয়ে গঠিত। দুঃখ অর্থ কষ্ট বা বেদনা এবং আলয় অর্থ আবাস বা আশ্রয়। সুতরাং দুঃখালয় অর্থ দুঃখের আবাস। এখানে সংসারকে দুঃখের আবাস বলা হয়েছে বলে এই অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয় যে পৃথিবীতে কোনো আনন্দ নেই। বরং গীতার বক্তব্য হলো পার্থিব আনন্দের মধ্যে স্থায়িত্ব নেই। মানুষ যা ভালোবাসে তা হারাতে পারে, যা অর্জন করে তা নষ্ট হতে পারে, যৌবন বার্ধক্যে পরিবর্তিত হয়, স্বাস্থ্য অসুস্থতায় রূপ নিতে পারে এবং জীবন শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হয়। ফলে সংসারের সুখ যতই আকর্ষণীয় হোক, তার সঙ্গে অনিত্যতা ও বিচ্ছেদের সম্ভাবনা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
“অশাশ্বতম্” শব্দটি এই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করে। “অ” হলো নিষেধবাচক উপসর্গ এবং “শাশ্বত” অর্থ চিরস্থায়ী বা নিত্য। অতএব অশাশ্বত অর্থ যা চিরস্থায়ী নয়। সংসারের প্রতিটি দৃশ্যমান বিষয় পরিবর্তনের অধীন। দেহ পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সম্পদ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিও পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে মানুষ যখন স্থায়ী নিরাপত্তা ও চিরস্থায়ী সুখ খুঁজতে থাকে, তখন তার মধ্যে দুঃখের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ অনিত্য বস্তু থেকে নিত্য তৃপ্তি প্রত্যাশা করা মানুষের অস্তিত্বগত এক গভীর দ্বন্দ্ব।
এই কারণেই “দুঃখালয়মশাশ্বতম্” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণা। সংসারকে এখানে সম্পূর্ণ অর্থহীন বা মূল্যহীন বলা হয়নি। সংসার মানুষের শিক্ষা, কর্ম, অভিজ্ঞতা এবং আত্মউন্নতির ক্ষেত্রও হতে পারে। কিন্তু সংসারকে চূড়ান্ত ও স্থায়ী আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করা সমস্যার কারণ। যে বস্তু নিজেই পরিবর্তনশীল, তার ওপর স্থায়ী সুখের ভিত্তি নির্মাণ করলে একসময় হতাশা আসবেই। গীতার দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সমস্যা পৃথিবীতে থাকা নয়, বরং পৃথিবীর অনিত্য জিনিসের সঙ্গে এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়া যাতে নিজের চিরন্তন স্বরূপকে ভুলে যায়।
এরপর এসেছে “নাপ্নুবন্তি” শব্দটি। এটি “ন” এবং “আপ্নুবন্তি” নিয়ে গঠিত। “আপ্” ধাতুর অর্থ লাভ করা, অর্জন করা বা প্রাপ্ত হওয়া। “ন” অর্থ না। সুতরাং “নাপ্নুবন্তি” অর্থ তাঁরা লাভ করেন না। এখানে মহাত্মাগণ আর পুনর্জন্ম লাভ করেন না। অর্থাৎ তাঁরা জন্ম ও মৃত্যুর সেই আবর্তনশীল বন্ধন থেকে মুক্ত হন। এটি কেবল বাহ্যিক জীবনের পরিবর্তনের কথা নয়, বরং চেতনার এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে অজ্ঞানের ভিত্তিতে নির্মিত সংসারবন্ধন আর কার্যকর থাকে না।
“মহাত্মানঃ” শব্দটি গীতার আধ্যাত্মিক ভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি “মহা” এবং “আত্মা” এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। মহা অর্থ মহান বা বিস্তৃত এবং আত্মা অর্থ অন্তঃসত্তা বা আত্মস্বরূপ। মহাত্মা তাই কেবল সামাজিকভাবে সম্মানিত মানুষ নন। মহাত্মা হলেন এমন ব্যক্তি যাঁর চেতনা সংকীর্ণ ব্যক্তিগত অহংকার অতিক্রম করেছে। সাধারণ মানুষ নিজের জীবনকে “আমি” এবং “আমার” এর সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে দেখে। কিন্তু মহাত্মার চেতনা ধীরে ধীরে বৃহত্তর সত্যের দিকে প্রসারিত হয়। তিনি নিজের অস্তিত্বকে কেবল দেহ, মন, সম্পদ বা সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেন না। তিনি নিজের গভীরতর আত্মস্বরূপ এবং পরম সত্যের সম্পর্ক উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন।
শ্লোকের শেষ অংশে এসেছে “সংসিদ্ধিং পরমাং গতাঃ”। “সিদ্ধি” শব্দটি সংস্কৃত “সিধ্” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ সফল হওয়া, সম্পূর্ণ হওয়া বা সিদ্ধ হওয়া। “সম্” উপসর্গ এর সঙ্গে পূর্ণতা বা সম্পূর্ণতার ভাব যুক্ত করে। ফলে “সংসিদ্ধি” অর্থ পূর্ণ সিদ্ধি বা সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা। “পরমাং” অর্থ সর্বোচ্চ বা চূড়ান্ত। আর “গতাঃ” শব্দটি “গম্” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। তাই “পরমাং সংসিদ্ধিং গতাঃ” অর্থ তাঁরা পরম সিদ্ধিতে উপনীত হয়েছেন।
এখানে সিদ্ধি বলতে কোনো অলৌকিক শক্তি অর্জন বোঝানো প্রধান উদ্দেশ্য নয়। এটি মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত পরিপূর্ণতা। যে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছে, পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং সংসারের অনিত্যতার বন্ধন অতিক্রম করেছে, তার জন্য আর বাহ্যিক অর্জনই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে না। এই অবস্থাই পরম সংসিদ্ধির দিকে অগ্রসর হওয়া।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের গভীর অর্থ আরও প্রসারিত হয়। অদ্বৈত মতে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ আত্মা এবং পরম সত্য ব্রহ্মের মধ্যে চূড়ান্ত বিভেদ নেই। কিন্তু অবিদ্যা বা অজ্ঞানের কারণে মানুষ নিজেকে দেহ ও মনের সঙ্গে একাত্ম মনে করে। এই সীমিত পরিচয় থেকেই অহংকার, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি এবং কর্মের বন্ধন সৃষ্টি হয়। কর্ম ও বাসনার ধারাবাহিকতা পুনর্জন্মের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আত্মজ্ঞান উদিত হলে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত স্বরূপ ক্ষণস্থায়ী দেহ নয়। এই জ্ঞানই মুক্তির পথ।
ভক্তিমূলক দর্শনের দৃষ্টিতে “মামুপেত্য” আরও হৃদয়গ্রাহী অর্থ বহন করে। এখানে ঈশ্বরলাভ মানে পরম পুরুষোত্তমের শরণ গ্রহণ এবং তাঁর সঙ্গে নিত্য সম্পর্ক উপলব্ধি করা। মানুষের অহংকার যখন ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণে রূপান্তরিত হয়, তখন তার জীবনের কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়। নিজের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ মনে করার পরিবর্তে সে ঈশ্বরকে জীবনের পরম আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করে। এই ঈশ্বরনিষ্ঠ চেতনা তাকে সংসারের বন্ধন অতিক্রম করার পথে নিয়ে যায়।
দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে জীব ও ঈশ্বরের মধ্যে চিরন্তন পার্থক্য রয়েছে। তাই “মামুপেত্য” অর্থ ঈশ্বরের নিকটবর্তী হওয়া এবং তাঁর কৃপায় পরম গতি লাভ করা। এখানে মুক্তির অর্থ ঈশ্বর হয়ে যাওয়া নয়, বরং ঈশ্বরের নিত্য সান্নিধ্য লাভ করা। বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি মৌলিক বিষয় একই থাকে। মানুষের চূড়ান্ত কল্যাণ অনিত্য সংসারের সীমাকে অতিক্রম করে পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার মধ্যে নিহিত।
এই শ্লোকের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অর্থও রয়েছে। “পুনর্জন্ম”কে শুধু জন্মান্তরের অর্থে না দেখে মানুষের মানসিক পুনরাবৃত্তির প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়। মানুষ একই আকাঙ্ক্ষা, একই আসক্তি, একই ক্রোধ, একই ভয় এবং একই ভুলের মধ্যে বারবার ফিরে আসে। কোনো একটি বস্তু পাওয়ার আগে মনে হয় সেটি পেলেই স্থায়ী সুখ আসবে। বস্তুটি পাওয়ার পর কিছু সময় আনন্দ হয়। তারপর সেই আনন্দ ক্ষীণ হয়ে যায় এবং নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। আবার নতুন অনুসন্ধান শুরু হয়। এইভাবে আকাঙ্ক্ষা, অর্জন, ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, আসক্তি, হারানোর ভয় এবং দুঃখের একটি চক্র চলতে থাকে। এই অর্থে মানুষের মনও নিজের মধ্যে এক ধরনের সংসার সৃষ্টি করতে পারে।
“দুঃখালয়” তখন একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রতীক হয়ে ওঠে। সমস্যা পৃথিবীতে সুখ আছে কি নেই তা নয়। সমস্যা হলো মানুষ কোথায় নিজের স্থায়ী সুখের ভিত্তি স্থাপন করছে। যদি সুখ সম্পূর্ণভাবে সম্পদ, সম্পর্ক, প্রশংসা, ক্ষমতা বা বাহ্যিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই সুখও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কারণ বাহ্যিক সবকিছু পরিবর্তনশীল। গীতার শিক্ষা তাই মানুষকে বাহ্যিক জগত থেকে পালিয়ে যেতে বলে না। বরং বাহ্যিক জগতের মধ্যে থেকেও নিজের অন্তরের প্রকৃত আশ্রয়কে আবিষ্কার করতে বলে।
এই ভাবটি একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একজন মানুষ যদি বালুর ওপর একটি সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করে এবং সেটিকে চিরস্থায়ী আশ্রয় মনে করে, তাহলে তার দুঃখের কারণ বাড়িটির সৌন্দর্য নয়। তার দুঃখের কারণ হলো সে অনিত্য ভিত্তির ওপর নিত্য নিরাপত্তার প্রত্যাশা করেছে। জগতের সমস্ত বস্তুই পরিবর্তনশীল। তাই পরিবর্তনশীল বস্তুকে ভালোবাসা অপরাধ নয়, কিন্তু তাকে চিরস্থায়ী মনে করা অজ্ঞানের কারণ হতে পারে। গীতার “অশাশ্বতম্” শব্দটি এই সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো মানুষের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা। মানুষ সাধারণত শিক্ষা, অর্থ, সম্পদ, সম্মান, সম্পর্ক এবং সাফল্যের পেছনে ছুটে। এগুলোর প্রত্যেকটিরই জীবনে মূল্য আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এগুলো কি জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য। যদি সব অর্জনের পরও মানুষের অন্তরে অশান্তি থেকে যায়, তাহলে আরও গভীর কোনো অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। গীতা সেই অনুসন্ধানকে আত্মসন্ধান এবং পরম সত্যের অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যায়।
“মামুপেত্য” এবং “পরমাং সংসিদ্ধিং” এই দুই অংশ শ্লোকটির শুরু ও শেষকে একসূত্রে যুক্ত করেছে। প্রথমে আছে পরম সত্তার লাভ এবং শেষে আছে পরম সিদ্ধিতে উপনীত হওয়া। এর মধ্যবর্তী বাধা হলো পুনর্জন্ম, দুঃখ এবং অনিত্যতার সংসার। তাই শ্লোকটি যেন একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার মানচিত্র। মানুষ অনিত্যতার মধ্যে জন্ম নেয়, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, দুঃখ ও সুখের মধ্য দিয়ে যায়, নিজের প্রকৃত স্বরূপের অনুসন্ধান করে এবং শেষ পর্যন্ত পরম সত্যের দিকে অগ্রসর হয়।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির নির্মাণ অত্যন্ত সুন্দর। একদিকে আছে পুনর্জন্ম, দুঃখালয় এবং অশাশ্বত। অন্যদিকে আছে মহাত্মা, পরম এবং সংসিদ্ধি। প্রথম অংশ মানুষকে তার আবদ্ধ অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দ্বিতীয় অংশ তাকে মুক্তির সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ শ্লোকটির মধ্যে অনিত্যতা ও নিত্যতার, বন্ধন ও মুক্তির, অজ্ঞতা ও জ্ঞানের এক গভীর বৈপরীত্য নির্মিত হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, “মামুপেত্য পুনর্জন্ম দুঃখালয়মশাশ্বতম্” মানবজীবনের এক গভীর সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়। এই জগৎ পরিবর্তনশীল এবং এখানে সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে। মানুষ যদি অনিত্য জগতের মধ্যে নিত্য আশ্রয় খুঁজতে থাকে, তবে তার মধ্যে আসক্তি, ভয় এবং দুঃখের জন্ম হতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ নিজের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে এবং পরম সত্যকে উপলব্ধির পথে এগিয়ে যায়, তখন তার জীবন নতুন অর্থ লাভ করে। “মহাত্মা” সেই মানুষ যিনি সংকীর্ণ অহংকার অতিক্রম করে বৃহত্তর আত্মসত্যের দিকে এগিয়ে যান। “মামুপেত্য” সেই ঈশ্বরমুখী উপলব্ধির প্রতীক এবং “পরমাং সংসিদ্ধিং” হলো সেই যাত্রার চূড়ান্ত পরিপূর্ণতা।
এই শ্লোকের সারকথা তাই হলো, অনিত্য জগতের মধ্যে থেকেও মানুষ নিত্য সত্যের সন্ধান করতে পারে। পুনর্জন্মের বাহ্যিক ধারণার পাশাপাশি এটি আমাদের অন্তরের পুনরাবৃত্ত আসক্তি ও দুঃখের চক্র থেকেও মুক্তির আহ্বান জানায়। যে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত আশ্রয় ক্ষণস্থায়ী বস্তুতে নয়, পরম সত্যে, সে ধীরে ধীরে মহাত্মার পথে অগ্রসর হয়। আর সেই পথের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পরম সংসিদ্ধি, যেখানে মানুষের অনুসন্ধান পূর্ণতা লাভ করে এবং জন্ম ও মৃত্যুর অনিত্য আবর্তনের ঊর্ধ্বে পরম শান্তির উপলব্ধি ঘটে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!