সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ৮.১৯ | সৃষ্টির পুনরাবর্তন, ভূতগ্রামের প্রকাশ ও মহাজাগতিক প্রলয়ের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ভুতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে।রাত্র্যাগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে।।১৯।।
ভুতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে।
রাত্র্যাগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে।।১৯।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! সেই ভুতসমূহ পুনঃ পুনঃ উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মার রাত্রি সমাগমে লয় প্রাপ্ত হয় এবং পুনরায় দিনের আগমনে তারা আপনা থেকেই প্রকাশিত হয়।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টম অধ্যায়ের ঊনবিংশ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সামনে সৃষ্টিজগতের এক গভীর ও বিস্ময়কর সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে রাত্র্যাগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে”। এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো যে সমগ্র প্রকাশিত জীবজগৎ ও সৃষ্টিসমষ্টি বারবার প্রকাশিত হয় এবং আবার লয়ে বিলীন হয়ে যায়। ব্রহ্মার দিবসের আগমনে যে সৃষ্টিজগৎ প্রকাশিত হয়, ব্রহ্মার রাত্রির আগমনে সেই একই সৃষ্টিসমষ্টি আবার অপ্রকাশিত অবস্থায় ফিরে যায়। এখানে সৃষ্টি ও প্রলয়কে কোনো এককালীন ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং সমগ্র জগতকে একটি অনন্ত আবর্তনশীল মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই শ্লোকটির ভাষাগত, দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী গভীরতা নিহিত রয়েছে।

“ভূতগ্রাম” শব্দটি এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। সংস্কৃত “ভূত” শব্দটির উৎস হলো √ভূ ধাতু, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, উৎপন্ন হওয়া বা প্রকাশিত হওয়া। “ভূত” অর্থ তাই মূলত যা হয়েছে বা যা অস্তিত্ব লাভ করেছে। পরবর্তী ব্যবহারে এই শব্দের নানা অর্থ সৃষ্টি হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি প্রেত বা অশরীরী সত্তাকেও বোঝায়। কিন্তু এই শ্লোকে “ভূত” শব্দের সঙ্গে প্রেতাত্মার কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে “ভূত” বলতে সমস্ত সৃষ্ট সত্তা বা অস্তিত্বশীল জীব ও জগতের প্রকাশিত উপাদানকে বোঝানো হয়েছে। “গ্রাম” শব্দের অর্থ এখানে গ্রাম বা বসতি নয়। সংস্কৃত ভাষায় “গ্রাম” শব্দের একটি প্রাচীন অর্থ হলো সমষ্টি, গুচ্ছ বা একত্রিত সত্তার দল। তাই “ভূতগ্রাম” বলতে বোঝায় সমস্ত সৃষ্ট সত্তার সমষ্টি বা সমগ্র প্রকাশিত জীবজগত। এই একটি শব্দের মধ্যেই ব্যক্ত জগতের বিশাল পরিসরকে ধারণ করা হয়েছে।

এরপর আসে “স এবায়ং”। “সঃ” অর্থ সেই, “এব” অর্থই বা অবশ্যই এবং “অয়ম্” অর্থ এই। এই তিনটি শব্দ একত্রে একটি বিশেষ তাৎপর্য প্রকাশ করে। ভগবান বলছেন যে যে সৃষ্টিসমষ্টি একবার প্রকাশিত হয়েছিল, লয়ের পর পুনরায় যে জগৎ প্রকাশিত হয় সেটিও সেই একই সৃষ্টির ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ সৃষ্টি প্রতিবার সম্পূর্ণ নতুন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রকাশের ধারাটি একটি মহাজাগতিক চক্রের মধ্যে পুনরাবৃত্ত হয়। এখানে সময়কে সরলরেখার মতো না দেখে একটি চক্রাকার প্রবাহ হিসেবে উপলব্ধি করা হয়েছে। মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতায় জন্মের পরে মৃত্যু আসে এবং একটি জীবন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু গীতার মহাজাগতিক দৃষ্টিতে একটি সৃষ্টিচক্রের অবসানই চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। তার পরে আবার নতুন প্রকাশের সম্ভাবনা থাকে।

“ভূত্বা ভূত্বা” পদটি শ্লোকটির কাব্যিক ও দার্শনিক সৌন্দর্যকে আরও গভীর করেছে। “ভূত্বা” শব্দটি √ভূ ধাতু থেকে গঠিত এবং এর অর্থ হলো হয়ে, অস্তিত্ব লাভ করে বা প্রকাশিত হয়ে। কিন্তু এখানে এই শব্দটি পরপর দুইবার ব্যবহৃত হয়েছে। “ভূত্বা ভূত্বা” অর্থ দাঁড়ায় বারবার হয়ে, পুনঃপুনঃ অস্তিত্ব লাভ করে বা বারবার প্রকাশিত হয়ে। এই পুনরুক্তি কেবল ভাষার সৌন্দর্য নয়। এর মাধ্যমে সৃষ্টির পুনরাবৃত্তিমূলক প্রকৃতিকে শব্দের মধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে। যেন সৃষ্টি একবার ঘটে থেমে যায় না। প্রকাশ ঘটে, স্থিতি থাকে, লয় ঘটে এবং আবার প্রকাশ ঘটে। এভাবে “ভূত্বা ভূত্বা” শব্দদ্বয় সৃষ্টির অন্তহীন আবর্তনের একটি জীবন্ত চিত্র তৈরি করে।

“প্রলীয়তে” শব্দটি এসেছে √লী ধাতু থেকে। এর সঙ্গে “প্র” উপসর্গ যুক্ত হয়ে “প্রলয়” বা সম্পূর্ণ লয়ে যাওয়ার ধারণা তৈরি হয়েছে। “প্রলীয়তে” অর্থ লীন হয়, বিলীন হয় বা প্রকাশিত অবস্থা থেকে অপ্রকাশিত অবস্থায় ফিরে যায়। এখানে প্রলয়কে আধুনিক অর্থে নিছক ধ্বংস হিসেবে বোঝা উচিত নয়। গীতার দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে প্রলয় হলো প্রকাশিত রূপের অবসান এবং তার মূল অপ্রকাশিত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন। যেমন একটি বীজ থেকে বৃক্ষ জন্ম নেয় এবং বৃক্ষের জীবন শেষে আবার বীজের মাধ্যমে নতুন জীবনের সম্ভাবনা বহন করে, তেমনি সৃষ্টিও প্রকাশ ও লয়ের মধ্য দিয়ে একটি চক্র সম্পূর্ণ করে। তাই প্রলয় মানে অস্তিত্বের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি অস্তিত্বের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় প্রত্যাবর্তন।

শ্লোকে বলা হয়েছে “রাত্র্যাগমে” অর্থাৎ রাত্রির আগমনে। এখানে রাত্রি সাধারণ মানুষের পরিচিত রাত নয়। এটি ব্রহ্মার রাত্রির প্রতীক। গীতার অষ্টম অধ্যায়ে ব্রহ্মার দিবস ও রাত্রির মাধ্যমে মহাজাগতিক সৃষ্টি ও লয়ের একটি বিশাল সময়চক্র ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ব্রহ্মার দিবসে সৃষ্টি প্রকাশিত হয় এবং ব্রহ্মার রাত্রিতে তা অপ্রকাশিত অবস্থায় ফিরে যায়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে দৃশ্যমান জগতের প্রকাশ স্থায়ী নয়। দিনের মতো এর প্রকাশের একটি পর্যায় আছে এবং রাত্রির মতো এর অপ্রকাশেরও একটি পর্যায় আছে।

“অবশঃ” শব্দটি শ্লোকটির অন্যতম গভীর শব্দ। এর অর্থ নিজের বশে নয়, নিয়ন্ত্রণাধীন বা অনিবার্য নিয়মের অধীন। অর্থাৎ সৃষ্টির এই প্রকাশ ও লয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনুসারে ঘটে না। প্রকৃতির মহাজাগতিক নিয়মের অধীনেই এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। মানুষ নিজের জীবনে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে মনে করলেও জন্ম, বার্ধক্য, মৃত্যু, পরিবর্তন এবং প্রকৃতির বৃহত্তর নিয়মের সামনে তার ক্ষমতা সীমিত। “অবশঃ” শব্দটি মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং মহাজাগতিক নিয়মের অপরিহার্যতা স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি ব্যক্তিগত অহংকারের সামনে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন স্থাপন করে। মানুষ কি সত্যিই নিজের জীবনের সমস্ত কিছু নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনা করতে পারে, নাকি সে বৃহত্তর কোনো নিয়মের অংশ হিসেবে তার জীবনযাত্রা সম্পন্ন করে।

এরপর আসে “অহরাগমে প্রভবতি”। “অহর্” অর্থ দিন এবং “আগম” অর্থ আগমন। “প্রভবতি” এসেছে “প্র” উপসর্গ এবং √ভূ ধাতু থেকে। এর অর্থ হলো উৎপন্ন হয়, প্রকাশিত হয় বা পুনরায় অস্তিত্ব লাভ করে। অর্থাৎ ব্রহ্মার দিবসের আগমনে যে সৃষ্টিজগত রাত্রির সময় অপ্রকাশিত অবস্থায় ছিল তা আবার প্রকাশিত হয়। এখানে “প্রলয়” এবং “প্রভব” একে অপরের পরিপূরক। একদিকে লয়, অন্যদিকে প্রকাশ। একদিকে অপ্রকাশ, অন্যদিকে ব্যক্ত অস্তিত্ব। এই দুইয়ের মধ্যে চলমান চক্রই গীতার মহাজাগতিক সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। সাধারণ মানুষ সময়কে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি সরল ধারাবাহিকতা হিসেবে অনুভব করে। কিন্তু গীতার মহাজাগতিক দর্শনে সময়ের একটি চক্রাকার মাত্রা রয়েছে। সৃষ্টি থেকে স্থিতি, স্থিতি থেকে লয় এবং লয় থেকে পুনরায় সৃষ্টি। এই চক্র কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে শুরু হয়ে চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রকাশ ও অপ্রকাশের ধারাবাহিকতার মধ্যে জগতের অস্তিত্বকে দেখা হয়েছে। এই ধারণা মানুষের জীবনকেও নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। একটি ঋতু শেষ হয়ে অন্য ঋতু আসে। একটি দিন শেষ হয়ে নতুন দিন আসে। একটি প্রজন্ম চলে যায় এবং নতুন প্রজন্ম আসে। প্রকৃতির প্রতিটি স্তরেই আমরা কোনো না কোনোভাবে সৃষ্টি ও লয়ের এই ধারাকে দেখতে পাই।

বেদান্তীয় দৃষ্টিতে এই শ্লোকের আরও গভীর অর্থ রয়েছে। যা সৃষ্টি হয় তা পরিবর্তনশীল। যা পরিবর্তনশীল তা একসময় বিলীন হয়। অতএব দৃশ্যমান জগতের কোনো নির্দিষ্ট রূপকে চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। বেদান্ত জিজ্ঞাসা করে সেই অপরিবর্তনীয় সত্য কোথায় যার উপস্থিতিতে এই সমস্ত পরিবর্তন ঘটছে। জগতের রূপ পরিবর্তিত হয়, জীবনের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, শরীর পরিবর্তিত হয়, চিন্তা পরিবর্তিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে সমস্ত প্রকাশিত রূপ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনে যে চৈতন্য বা পরম অস্তিত্বকে বেদান্ত অনুসন্ধান করে তাকে পরিবর্তনশীল প্রকাশের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। এই কারণে শ্লোকটি আমাদের দৃশ্যমান জগতের অনিত্যতার মধ্য দিয়ে চিরন্তন সত্যের সন্ধানের দিকে নিয়ে যায়।

সাংখ্য দর্শনের আলোতেও শ্লোকটির একটি বিশেষ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সাংখ্য মতে প্রকৃতি হলো প্রকাশ ও পরিবর্তনের মূল ক্ষেত্র। অব্যক্ত প্রকৃতি থেকে ক্রমে বিভিন্ন তত্ত্ব ও উপাদানের প্রকাশ ঘটে এবং প্রলয়ের সময় সেই প্রকাশ আবার মূল অব্যক্ত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে। এই দৃষ্টিতে “ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে” প্রকৃতির প্রকাশ ও প্রত্যাবর্তনের একটি মহাজাগতিক চক্রকে নির্দেশ করে। সৃষ্টি এখানে কোনো একবারের ঘটনা নয়। প্রকৃতি তার অন্তর্নিহিত শক্তির মাধ্যমে বারবার প্রকাশিত হয় এবং আবার অপ্রকাশিত অবস্থায় ফিরে যায়।

এই শ্লোকের একটি শক্তিশালী প্রতীকী অর্থও রয়েছে। “ভূতগ্রাম” প্রতীক হয়ে উঠতে পারে সমগ্র প্রকাশিত জীবনের। “ভূত্বা ভূত্বা” প্রতীক হয়ে উঠতে পারে পুনরাবৃত্তি ও অস্তিত্বের চক্রের। “প্রলীয়তে” প্রতীক হতে পারে রূপের বিলয় ও অহংকারের অবসানের। “রাত্রি” প্রতীক হতে পারে অপ্রকাশ, নীরবতা ও অন্তর্লীন সম্ভাবনার। আর “অহর্” বা দিবস প্রতীক হতে পারে প্রকাশ, জাগরণ ও নতুন সূচনার। এই অর্থে শ্লোকটি শুধু মহাবিশ্বের ইতিহাসের কথা বলে না। এটি মানুষের অন্তর্জগতেরও একটি প্রতীকী চিত্র হয়ে ওঠে।

মানুষের মনেও সৃষ্টি ও লয়ের একটি ক্ষুদ্র চক্র রয়েছে। একটি চিন্তা জন্ম নেয়, সেই চিন্তা অনুভূতি সৃষ্টি করে, অনুভূতি কর্মে রূপ নেয়, কর্ম অভ্যাস তৈরি করে এবং একসময় সেই চিন্তা বা অনুভূতি ম্লান হয়ে যায়। আবার কোনো নতুন পরিস্থিতিতে একই চিন্তা বা অনুভূতি ফিরে আসতে পারে। ভয়, আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, ক্রোধ কিংবা আনন্দও অনেক সময় মানুষের মনে পুনঃপুনঃ প্রকাশিত হয়। এই দৃষ্টিতে “ভূত্বা ভূত্বা” মানুষের মানসিক জীবনের পুনরাবৃত্তিরও একটি শক্তিশালী প্রতীক। মানুষ যতক্ষণ না নিজের অন্তর্জগতের প্রকৃতি উপলব্ধি করে ততক্ষণ সে অনেক সময় একই মানসিক চক্রের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে।

এই শ্লোককে বোঝার জন্য সমুদ্র ও ঢেউয়ের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। সমুদ্র থেকে একটি ঢেউ উঠে আসে। কিছু সময়ের জন্য ঢেউটির একটি স্বতন্ত্র রূপ দেখা যায়। তারপর সেই ঢেউ আবার সমুদ্রের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু সমুদ্র ধ্বংস হয় না। আবার অন্য একটি ঢেউ উঠে আসে। ঢেউয়ের জন্ম হলো প্রকাশ, ঢেউয়ের বিলয় হলো লয় এবং সমুদ্রের মধ্যে তার প্রত্যাবর্তন হলো মূল অবস্থায় ফিরে যাওয়া। একইভাবে প্রকাশিত জগতের রূপ আসে এবং যায়। এই উপমা আমাদের বোঝায় যে রূপের পরিবর্তন এবং অস্তিত্বের বৃহত্তর ধারাকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

একটি বীজের মধ্যেও এই দর্শনের প্রতীক দেখা যায়। বীজ থেকে গাছ হয়, গাছ থেকে ফুল ও ফল হয়, ফল থেকে আবার বীজ আসে। যদি কেউ শুধু গাছের দিকে তাকায় তাহলে মনে হতে পারে গাছই সবকিছু। কিন্তু প্রকৃতির বৃহত্তর চক্রে গাছ একটি পর্যায় মাত্র। তেমনি প্রকাশিত জগতও অস্তিত্বের বৃহত্তর ধারার একটি পর্যায়। “ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে” এই সত্যই আমাদের সামনে তুলে ধরে যে কোনো একটি প্রকাশিত অবস্থাকে সম্পূর্ণ বাস্তবতার শেষ সীমা হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।

এই শ্লোক মানুষের অহংকারের জন্যও একটি গভীর শিক্ষা বহন করে। “অবশঃ” শব্দটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষ বৃহত্তর মহাজাগতিক নিয়মের অংশ। আমরা জন্ম বেছে নিই না, প্রকৃতির সব পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না এবং মৃত্যুকেও ইচ্ছামতো প্রতিহত করতে পারি না। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা আধ্যাত্মিক জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে আত্মসমর্পণ মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া নয়। বরং নিজের সীমিত ক্ষমতা বুঝে বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে নিজের অবস্থানকে সামঞ্জস্য করা।

শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। “ভূত্বা ভূত্বা” শব্দের পুনরাবৃত্তি যেন সৃষ্টির অন্তহীন আবর্তনের শব্দগত প্রতিচ্ছবি। একবার প্রকাশ, আবার প্রকাশ, তারপর লয় এবং পুনরায় প্রকাশ। এই পুনরুক্তির মধ্যেই যেন মহাকালের চক্র ঘুরে চলেছে। গীতার ভাষা এখানে একদিকে সংক্ষিপ্ত, অন্যদিকে অসীম অর্থবহ। কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সৃষ্টি, লয়, সময়, প্রকৃতি, নিয়তি এবং আধ্যাত্মিক সত্যের বিশাল ধারণাকে ধারণ করা হয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, “ভূতগ্রামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে” কেবল একটি মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্বের ঘোষণা নয়। এটি পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক শিক্ষা। সমস্ত প্রকাশিত রূপ জন্ম নেয়, কিছু সময় স্থিত থাকে এবং একসময় লয়ে ফিরে যায়। আবার সেই অপ্রকাশিত অবস্থা থেকেই নতুন প্রকাশ ঘটে। এই চক্র প্রকৃতিতে যেমন আছে, তেমনি মানুষের জীবন, মন এবং অভিজ্ঞতার মধ্যেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। “ভূতগ্রাম” আমাদের দৃশ্যমান অস্তিত্বের কথা বলে, “ভূত্বা ভূত্বা” তার পুনরাবৃত্তির কথা বলে, “প্রলীয়তে” তার অনিত্যতার কথা বলে, “অবশঃ” আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলে এবং “প্রভবতি” আবার নতুন প্রকাশের সম্ভাবনার কথা বলে। এই সমগ্র শিক্ষার অন্তর্নিহিত সত্য হলো যে পরিবর্তনশীল জগতকে উপলব্ধি করতে হলে তার চক্রাকার প্রকৃতিকে বুঝতে হবে এবং তারও গভীরে সেই অপরিবর্তনীয় সত্যকে অনুসন্ধান করতে হবে যার পটভূমিতে সৃষ্টি ও লয়ের এই অসীম খেলা চলমান। তাই এই শ্লোক শেষ পর্যন্ত আমাদের বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে থেমে থাকতে বলে না। বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অপরিবর্তনীয়কে, লয়ের মধ্য দিয়ে চিরন্তনকে এবং পুনর্জন্মের চক্রের মধ্য দিয়ে সেই পরম অস্তিত্বকে উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি